ব্রিফন্ট(৪৫৪) বলছেন,
the assimilation of the fruit-bearing soil to the child-bearing woman is universal.
ফলপ্রস্থ পৃথিবীর সঙ্গে সন্তান-প্রসূ নারীর সম্পর্ক-কল্পনা সার্বভৌম।
কিংবা(৪৫৫)
The fecundity of the earth and the fecundity of women are viewed as being one and the same quality.
পৃথিবীর উৎপাদিক-শক্তি এবং নারীর উৎপাদিক-শক্তি উভয়কেই এক এবং অভিন্ন ধরনের মনে করা হয়।
এই বিশ্বাস যে কতো ব্যাপক ও বহুমুখী রবার্ট ব্রিফন্ট-এর রচনা অনুসরণ করে তারই আরো কিছু কিছু পরিচয় পাবার চেষ্টা করা যাক।
ব্ৰেজিলে(৪৫৬) শস্যের উৎপত্তি নিয়ে নিম্নোক্ত কাহিনী প্রচলিত আছে : একটি কুমারী মেয়ে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছিলো এবং সে জন্ম দিলো তুষার-শুভ্ৰ এক শিশুর। শিশুটি ভূমিষ্ঠ হয়েই মারা যায়, তখন তাকে কবর দেওয়া হয়। এই কবরের উপরেই একটি গাছ গজায়। সে-গাছে ফল ফলে। ফল খেয়ে মানুষদের মনে হলো, দেবতা তাদের শরীরে প্রবেশ করছে। এই গাছই পৃথিবীর প্রথম শস্য-গাছ এবং ওই ফলই পৃথিবীর প্রথম ফসল।
শস্য যে নারীদেহ সমুদ্ভূত—এই আদিম বিশ্বাসটিকে গ্ৰীক কৃষকদের(৪৫৭) লোকসংগীতের মধ্যে এখনো টিকে থাকতে দেখা যায় : এক ইহুদি মেয়ে ফসল কাটে, মেয়েটি কখনো থামে কখনো নুয়ে পড়ে গমের শিষের উপর—মেয়েটি প্রসব করলো সোনার শিশু।
আবার, আমরা আগেই দেখেছি, নারী ও প্রকৃতির উর্বর-শক্তির সাদৃশ্য-নির্ভর ওই জাদুবিশ্বাটির বিকাশ উল্টে দিক থেকেও হতে পারে। তাই প্রকৃতির ফলপ্রসূতার সাহায্যেই নারীকেও ফলপ্রসূ করবার আয়োজন দেখা যায়। দৃষ্টান্ত হিসাবে স্তর জেমস্ ফ্রেসার(৪৫৮) বলছেন, দক্ষিণ আমেরিকায় গুয়ারানি বলে রেড্-ইণ্ডিয়ানদের বিশ্বাস, মেয়ের যদি জোড়া-ফল খায় তাহলে যমজ সন্তানের জন্ম হবে। আমাদের দেশের গ্রামাঞ্চলেও ঠিক এই বিশ্বাসেরই নমুনা পাওয়া কঠিন নয়। স্যর্ ফ্রেসার(৪৫৯) আমাদের দেশ থেকেই এই বিশ্বাসের অন্যান্য দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করছেন। যেমন : উত্তর-ভারতের প্রায় সর্বত্রই মেয়েলি আচার-অনুষ্ঠান এবং পূজা-পার্বণের একটি প্রধান অঙ্গ হলো নারকেল-এর ব্যবহার। নারকেল উর্বর-শক্তিরই প্রতীক বা হয়তো সন্তানের প্রতীক। সন্তান-লাভের কামনা সফল করবার আশাতেই পুরোহিতেরা মেয়েদের নারকেল দেয়।
অন্যান্য লেখকদের রচনা থেকে এই বিশ্বাসেরই অন্যান্য নমুনা উদ্ধৃত করা যায়। যেমন, উইলিয়াম ক্রুক্(৪৬০) বলছেন, প্রাকৃতিক উর্বরতার মূলে রয়েছে জল আর তাই দেখা যায় সন্তানকামনায় বন্ধ্যা নারী জলের সাহায্য চাইছে। খণ্ডদের বিশ্বাস,—বন্ধ্যা নারীকে দুটি স্রোতের সঙ্গমস্থলে স্নান করিয়ে আনলে তার বন্ধ্যাত্ব দূর হবে। পাঞ্জাবের দিকে দেখা যায়, বন্ধ্যা নারীকে চৌকিতে বসিয়ে কুয়োর মধ্যে নামিয়ে দেওয়া হয়, কুয়োর মধ্যে সে নগ্ন হয়ে স্নান করবে আর তারপর জামাকাপড় পরে চৌকিতে বসে উপরে উঠে আসবে। কুয়োর মধ্যে নামানো সম্ভব না হলে পিপুল গাছের তলায় কুয়োর জল এনে এই অনুষ্ঠান সমাধান করতে হবে। মধ্যভারতে জাঠদের বিশ্বাস, তিনটি গ্রামের সীমানায় গিয়ে স্নান করলে বন্ধ্যা নারী সন্তান-লাভ করবে। পাঞ্জাবের নানান জায়গায় মানুষের ধারণা, চৌমাথার মোড়ে পাঁচ-কুয়োর জলে নগ্ন হয়ে স্নান করলে বন্ধ্যা নারী সন্তান-লাভ করবে। রবার্ট ব্রিফণ্ট(৪৬১) দেখাচ্ছেন, আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের মধ্যেও ঠিক একই বিশ্বাসের পরিচয় পাওয়া যায়, কেননা তাদের মধ্যেও দেখা যায় সন্তান-লাভের কামনায় মেয়েরা বৃষ্টিতে ভিজছে।
বন্ধ্যাত্ব-নিরসনের কামনা ছাড়াও বিবাহের একটি অনুষ্ঠান হিসাবে বর বা বধূ বা উভয়ের গায়েই জল ঢালবার প্রথা প্রচলিত আছে—মূল উদ্দেশ্যটা অবশ্যই ওই বন্ধ্যা-নিরসনের মতোই, অর্থাৎ উর্বরতা-মূলক প্রাকৃতিক বিষয়ের সাহায্যে নরনারীকেও ফলপ্রসূ করা। গোগু-রা(৪৬২) বিয়ের সময় বরের গায়ে এমনভাবে জল ঢালে যাতে তা গড়িয়ে বধূর গায়েও পড়ে। হিমালয়অঞ্চলে(৪৬৩) দেখা যায়, বিয়ের সময় মেয়ের বাপ মেয়ে-জামাই-এর হাত এক করে ধরে এবং তার উপর জল ঢালা হয়।
কিংবা, প্রাকৃতিক ফলপ্রসূতার সাহায্যে মানবীয় ফলপ্রসূতার কামনা সফল করবার বিশ্বাসের বিকাশ বিবাহ-অনুষ্ঠান উপলক্ষেই আরো নানানভাবে চোখে পড়তে পারে। থার্স্টন(৪৬৪) বলছেন, দক্ষিণ ভারতে নানা উপজাতির মধ্যে দেখা যায়, বিবাহ অনুষ্ঠানের অঙ্গ হিসেবে বরকে মাটি চষবার বা মাটি-চষা সংক্রান্ত কোনো ক্রিয়ার অনুকরণ করতে হয়। কূর্মীদের(৪৬৫) প্রথা অনুসারে নববধূর আঁচলে শস্যের বীজ বেঁধে দিতে হবে। অন্যত্র(৪৬৬) দেখা যায়, বিবাহ অনুষ্ঠানের একটি অঙ্গ হলো গাছ পোতবার ব্যবস্থা। বম্বে গেজেটিয়ার-এ(৪৬৭) অনুমান করা হয়েছে, মেয়েদের মাথায় সিঁথি কাটবার প্রথাটিতে ক্ষেতের ফাল অনুকরণ করবার আয়োজন—অন্তত সিঁথির সিঁদুর যে ফলপ্রসূ হবার কামনাতেই ব্যবহৃত হয় সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই।
থার্স্টন(৪৬৮) বলছেন, দক্ষিণভারতের স্থানবিশেষে বিবাহ-অনুষ্ঠানের আয়োজন হিসেবেই উইঢিবির উপর ধান এবং ডালের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয়—বিবাহ-অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বীজগুলিতে অঙ্কুর উদ্গম হবে, তখন বরবধু মিলে এই অঙ্কুরিত শস্য কুয়োয় বিসর্জন দিয়ে আসবে।
