মাতৃপ্রধান সমাজের প্রভাবে প্রজনন-কাজে নারীর প্রাধান্য স্বীকৃত হবার পরই,—অর্থাৎ কৃষিভিত্তিক সমাজ গড়ে ওঠবার পরই,— দেবীমাহাত্ম্যের মধ্যে মানবীর উর্বরা শক্তির স্পষ্ট প্রতিবিম্ব দেখা দিলো। এবং এইদিক থেকেই অধ্যাপক স্টারবেক-এর মন্তব্য সত্যিই একটি মূল সত্যের কাছাকাছি পৌঁছেছে—সন্তান-প্ৰসবিনী নারীর প্রতিনিধি হিসেবেই দেবলোকে আদিম দেবীগুলির আবির্ভাব হয়েছিলো। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই মূল সত্যটিকে প্রায় স্পর্শ করেও অধ্যাপক স্টারবেক এর তাৎপর্য-বিশ্লেষণে অগ্রসর হলেন না। কয়েকটি দৃষ্টান্তে দেবীমাহাত্ম্যের সঙ্গে উর্বর-শক্তির যোগাযোগ দেখানোর পর তিনি মোটের উপর এই দৃষ্টান্তগুলির মূল্য উপেক্ষা করবারই প্রস্তাব করলেন। কেননা, তার ধারণায় ধর্মচেতনা হিসেবে এই স্তরের ধ্যানধারণা অবিশুদ্ধ ও অসংস্কৃত; তাই এগুলির উপর নির্ভর করে প্রকৃত ধর্মভাবের রহস্য উদঘাটন করবার আশা নেই। কিন্তু শুরুতেই এগুলিকে আধুনিক অর্থে ধর্মবোধের দৃষ্টান্ত হিসেবে ধরে নিয়ে এবং তারপর এগুলির মধ্যে আধুনিক অর্থে ধর্মবোধের পরিচয় না পেয়ে এগুলিকে অসংস্কৃত, ও অতএব ধর্মবিশ্বাসের দৃষ্টান্ত হিসেবে লঘুমূল্য মনে করাও যুক্তিসঙ্গত নয়। কেননা, এমন হতে পারে যে, এ-জাতীয় ধ্যানধারণা মানবচেতনার প্রাকঅধ্যাত্মবাদী পর্যায়েরই পরিচায়ক। অর্থাৎ, ধর্ম বলতে সত্যিই যা বোঝায় এগুলির মধ্যে তার বিকাশ ঘটেনি—ধর্মবিশ্বাসের বিকাশের জন্য যে-সামাজিক পরিবেশের প্রয়োজন এগুলির উৎস হয়তো সমাজ-বিকাশের তার চেয়েও প্রাচীন পর্যায়ের মধ্যে।
প্রাক-অধ্যাত্মবাদী ধ্যানধারণার আলোচনায় পরে ফেরা যাবে।
——————–
৪১৯. R. P. Chanda IAR ch, iv.
৪২০. মার্কণ্ডেয় পুরাণ ৯২, ৪৩-৪ ।
৪২১. J. Marshall MIC 1:Plate xxii-12.
৪২২. Ibid. 1:52.
৪২৩. R. P. Chanda op. cit. 13lf.
৪২৪. Ibid. 131.
৪২৫. Ibid. 132.
৪২৬. Ibid. 134.
৪২৭. Ibid. 135.
৪২৮. বিশ্বকোষ ৭:৫০৮ “বঙ্গে যেরূপ শাক্তের প্রাধান্য ভারতের আর কোনো স্থলে এরূপ নাই।…এখানে যে-সমস্ত শিবোক্ত তন্ত্র পাণ্ডা যায়, তাহার রচনাপ্রণালী পর্যালোচনা করিলে এই গৌড়দেশে রচিত হইয়াছে বলিয়া সহজেই ধারণা হয়। তন্ত্রে যেরূপ পৃথক বর্ণমালা গৃহীত হইয়াছে, তাহাও সম্পূর্ণ এই গৌড় বা বঙ্গদেশে প্রচলিত”।
৪২৯. RP R. P. Chanda op. cit. 150-61.
৪৩০. Ibid. 133.
৪৩১ অর্থশাস্ত্র ( বসাক ) ১:১৪৬।
৪৩২. ঐ ১:১৪৩।
৪৩৩. ERE 12:193.
৪৩৪. মনু ২.১ । cf. H. H. Wilson EL 1.248.
৪৩৫. ERE 12.193.
৪৩৬. Ibid.
৪৩৭. এই গ্রন্থের পৃ. ২৫৩ দ্রষ্টব্য।
৪৩৮. ERE 5: Female Principle.
৪৩৯. Ibid.
৪৪০. R. Briffault op. cit. 1422-7, 451-60, ইত্যাদি।
৪৪১. Ibid. 1:451.
৪৪২. ERE 5:828.
৪৪৩. R. Briffault op, cit. 1:252.
৪৪৪. A. K. Coomarswamy in EB 12:209ff.
৪৪৫. ERE 5:830.
৪৪৬. অথর্ববেদ ১৪.২.১৪ ।
৩১. কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-বিশ্বাস : প্রজনন ও উৎপাদন
কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার, মেয়েলি ব্যাপার। তাই কৃষিকেন্দ্রিক আদিম জাদুবিশ্বাসটির মূল কথা হলো, উর্বরাশক্তির দিক থেকে নারীর সঙ্গে প্রকৃতির নিবিড় ও গভীর যোগাযোগের কল্পনা। মাতৃপ্রধান সংস্কৃতির স্মারকগুলিকে বৈজ্ঞানিকভাবে বোঝবার কাজে এই জাদুবিশ্বাসটিই সবচেয়ে মূল্যবান মূলসূত্র।
পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের চেতনায় আজো এই বিশ্বাসটির স্পষ্ট রূপ দেখতে পাওয়া যায়। তাই তাদের ধ্যানধারণা থেকে শুরু করলে প্রাচীন সংস্কৃতির নানান ভূর্বোধ্য বিষয় বুঝতে পারা যেতে পারে।
আদিম চিন্তা অনুসারে, মেয়েরা যে সার্থকভাবে কৃষিকাজের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে তার কারণ মেয়েদের মধ্যে একটি অদ্ভুত শক্তি লুকোনো আছে; এই শক্তির দরুনই মেয়ের সন্তানবতী হয় এবং এই শক্তির প্রভাবে তারা পৃথিবীকেও ফলপ্রসূ করে। আমেরিকায় ওরিনোকো(৪৪৭) বলে রেড-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে দেখা যায়, প্রখর রোদে মেয়েরা ছেলে-কোলে ক্ষেতের কাজ করছে। এই নিয়ে জনৈক খৃস্টান পাত্রী দলের পুরুষদের ভর্ৎসনা করেন। কিন্তু তিনি যে-জবাব পান তা খুবই আশ্চর্য : “এ-সব ব্যাপার আপনি বোঝেন না বলেই অমন বিরক্ত হচ্ছেন। আপনি তো জানেন, একমাত্র মেয়েরাই সন্তানের জন্ম দিতে পারে; আমরা পুরুষেরা তা পারি না। তাই মেয়েরা যখন বীজ বোনে তখন জনার-ক্ষেতের প্রতি ডাঁটায় দুটো—এমন কি তিনটে—করে শিষ গজায়, ম্যানিওক-ক্ষেতে প্রতিটি গাছ থেকে দু’তিন ঝুড়ি করে মূল পাওয়া যায়। কেন? কেননা, মেয়েরা জানে কেমন করে সন্তানের জন্ম দেওয়া যায় এবং সেইভাবেই ওরা ক্ষেতের ফলকেও অনেক বাড়িয়ে দিতে পারে। বীজ বোনবার পর তা থেকে কী করে শস্য-উদ্গম হবে তা শুধু ওরাই জানে। তাই বীজ বোনবার কাজটা ওদের ওপরেই ছেড়ে দেওয়া ভালো। এ-সব ব্যাপার আমাদের চেয়ে ওরা ঢের ভালো জানে।”
ব্যাভেরিয়া আর অস্ট্রিয়ার চাষীরা(৪৪৮) এখনো বিশ্বাস করে যে, অন্তঃসত্ত্বা মেয়েকে গাছের প্রথম ফলটি খাওয়ানো গেলে পরের বছর সেই গাছ থেকে অজস্র বেশি ফল পাওয়া যাবে। স্যর্ জেমস্ ফ্রেসার(৪৪৯) বলছেন, এর থেকেই বোঝা যায়, প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার আশায় নারীর ফলপ্রসূতার উপযোগিতায় কতোখানি বিশ্বাস! আবার উগাণ্ডায়(৪৫০) সাধারণের বিশ্বাস, বন্ধ্যা স্ত্রী ক্ষেতের পক্ষে ক্ষতিকর, বহু সন্তানবতী স্ত্রীর দরুন ক্ষেত থেকেও বহুলভাবে ফসল পাওয়া যায়। নিউজিল্যাণ্ড-এ(৪৫১) দেখা যায় অন্তঃসত্ত্বা নারী সম্বন্ধে যে-সব বিধি-নিষেধের ব্যবস্থা আছে, ঠিক সেই বিধিনিষেধই রাঙালুর চাষ করবার সময় মেয়েদের উপর প্রযোজ্য হয়। ব্রিফন্ট(৪৫২) দেখাচ্ছেন, এমন কি আজকের ইয়োরোপে চাষীদের মধ্যে এই ধরনের বিশ্বাসের রেশ দেখা যায়। যেমন দক্ষিণ ইতালিতে কৃষকেরা মনে করে, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় মেয়েরা যদি বীজ বোনে তাহলে গর্ভস্থ ভ্রণের অনুপাতেই গাছটি বড়ো হবে। স্যর্ জেমস্ ফ্রেসার(৪৫৩) এই জাতীয় কয়েকটি দৃষ্টান্তের উল্লেখ করে বলছেন, আদিম মানুষদের ধারণায় প্রকৃতিকে ফলপ্রসূ করবার ব্যাপারে নারীর উর্বরাশক্তির উপযোগিতা যে কতোখানি তা এই থেকেই বুঝতে পারা যায় : সন্তানবতী নারী গাছগাছড়াকেও সুফলা করবে, বন্ধ্যা নারী গাছগাছড়াকেও নিষ্ফল করবে।
