তাই তথাকথিত আর্যরা পশুপালন-মূলক অর্থনীতির পর যদি কৃষি-ভিত্তিক সমাজ গড়ে থাকে তাহলে ঐতিহাসিকভাবে সে-সমাজ অতি প্রকটভাবেই পুরুষপ্রধান হওয়া স্বাভাবিক। কিংবা, যা একই কথা, ওই আর্যদের পক্ষে কৃষিকাজে থিতিয়ে বসবার পর তাদের ধর্মচেতনায় দেবীমাহীত্ম্যের বিকাশ ঘটা সত্যিই অস্বাভাবিক। অথচ, অধ্যাপক স্টারবেক এই সিদ্ধান্তেই উপনীত হবার চেষ্টা করছেন।
লেখকের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত এইভাবে বিভ্রান্ত হলেও, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহই থাকতে পারে না যে, তিনি দেবী রহস্য-প্রসঙ্গে একটি মৌলিক সত্যের অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেছিলেন। মৌলিক সত্যটি হলো, কৃষিজীবনের সঙ্গে এই দেবী-রহস্যের যোগাযোগ। এবং, আমাদের যুক্তি অনুসারে, সে-যোগাযোগের কারণ এই নয় যে, কৃষিকাজের শান্ত পরিস্থিতিতে স্বভাব-কোমলাদের পক্ষে প্রধান হয়ে ওঠা সম্ভব বা স্বাভাবিক; তার বদলে আসল কারণ এই যে, কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার।
এদেশের বেশির ভাগ মানুষ,—তাদের অনার্য বা আর্য-পূর্ব বা যে-কোনো নামেই অভিহিত করা হোক না কেন,—অনেক যুগ ধরে অপেক্ষাকৃত অনুন্নত পর্যায়ের কৃষিকাজের উপর নির্ভর করেই জীবনযাপন করেছে। তাই তাদের চেতনাতেও দেবীপ্রাধান্য বা শক্তি-প্রাধান্যের স্বাক্ষর থাকাই স্বাভাবিক। অপরপক্ষে, বৈদিক ঐতিহ্য কোনোদিনই নারীপ্রধান হয়নি। সে-ঐতিহ্য অনুসারে শূদ্রের মতোই স্ত্রীলোকদেরও শাস্ত্রে অধিকার নেই। ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে যে-ধারাটি মাতৃপ্রধান বা নারী-প্রধান তা মূলতই অ-বৈদিক। তারই নাম তান্ত্রিক ধারা। যদিও সাধারণভাবে বলা যায়, দেশের শাসকসম্প্রদায় এই দুটি স্বতন্ত্র ধারার মধ্যে বৈদিক ধারাটিকেই গ্রহণ করেছে তবুও দেশের সাধারণ মানুষের চেতনায় মাতৃপ্রধান অ-বৈদিক ধারাটির প্রভাব অনেক প্রবল। তার কারণ, ওই অ-বৈদিক ধারাটির মধ্যে উৎপাদন-পদ্ধতির যে-পর্যায়ের প্রতিবিম্ব সাধারণ মানুষের জীবন মূলতই তার উপর নির্ভর করেছে। ভারতীয় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য বোঝবার জন্য ভারতীয় ঐতিহ্যের এই দুটি ধারার স্বাতন্ত্র্য সম্বন্ধে সচেতন হওয়া যে কতোখানি প্রয়োজন সে-বিষয়ে ইতিপূর্বে অন্যান্য বিদ্বানেরা আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ভারতীয় শিল্পের ইতিহাস আলোচনা করবার আগে ঐযুক্ত আনন্দকুমার কুমারস্বামী(৪৪৪) এই দুটি ধারার স্বাতন্ত্র্যের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন–তাঁর ধারণায়, একমাত্র তারই পটভূমিতে ভারতীয় শিল্পের ইতিহাস বুঝতে পারা সম্ভব। আমাদের মন্তব্য হলো, ভারতীয় ঐতিহের এই ছটি ধারার মধ্যে যে-ধারাটির প্রভাব ব্যাপকতর ও গভীরতর, সেটিকে—অর্থাৎ ওই মাতৃপ্রধান তান্ত্রিক ধারাটিকে,—একমাত্র কৃষিআবিষ্কারের পটভূমিতেই বুঝতে পারা সম্ভবপর।
অবশ্যই, অধ্যাপক স্টারবেক আরো একভাবে দেবলোকের স্ত্রী-পুরুষ ভেদকে ব্যাখ্যা করবার চেষ্টা করছেন। তিনি বলছেন, প্রাকৃত পর্যায়ের ধর্মবোধটা ছিলো অনেকাংশেই অসংস্কৃত; নির্লিপ্ত ও উন্নত ধর্মচেতনার মতো নয়। তার মধ্যে অনেকটাই পার্থিব কামনা, এমন কি পারিপার্শ্বিকের সঙ্গে খাপ-খাইয়ে নেবার চেষ্টা মাত্র–to adjust life to the immediate situations around it : অভাব এবং অভাব-মেটাবার রকমারি চেষ্টাই এই আদিম ধর্মচেতনার মূল কথা। অভাব-মেটানোর তাগিদ বলতে প্রধাণতই দু’রকম। এক : আত্মরক্ষা আর নিরাপত্তা। দুই : শস্য, পশু ও সন্তানের সংখ্যাবৃদ্ধি। পুরুষেরা স্বভাবতই প্রথম উদ্দেশ্যটির পক্ষে উপযুক্ত, নারীরা দ্বিতীয়টির। ফলে, প্রথমটির তাগিদে পুরুষ-দেবতার উপাসনা এবং দ্বিতায়টির তাগিদে দেবীদের উপাসনাই স্বাভাবিক(৪৪৫)।
প্রয়োজন বলতে, রক্ষা ও নিরাপত্তা। সে-উদ্দেশ্যে পুরুষ দেবতারাই বিশেষ উপযোগী। আর এক রকম প্রয়োজন হলো শস্য, পশু ও সন্তানের বৃদ্ধি। দেবীরাই উর্বরাশক্তি ও বংশবৃদ্ধির স্বাভাবিক ও সহজ প্রতীক হয়েছেন।
অথচ, বাস্তব তথ্য একেবারেই অন্য রকমের। রক্ষা ও নিরাপত্তা যে শুধু পুরুষদেবতাদেরই একচেটিয়া ব্যাপার নয় আমাদের দেশের ইতিহাসেই তার প্রচুর নজির দেখতে পাওয়া যায়—দেখা যায় দেবীদের কাছেই রক্ষা, নিরাপত্তা ও এমন কি যুদ্ধ-বিজয়ের কামনা জানানো হচ্ছে। অপরপক্ষে, পশু ও সন্তান-বৃদ্ধির ব্যাপারও দেবীদের একচেটিয়া এক্তিআরে নয়,—বৈদিক সাহিত্যে দেখা যায় প্রধানত পুরুষ দেবতাদের কাছেই মানুষ পশু ও সন্তান-বৃদ্ধির কামনা জানাচ্ছে।
ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে এই দু’রকম দৃষ্টান্ত থেকেই প্রমাণ হয় যে, দেবলোকের স্ত্রী-পুরুষ ভেদটা মরলোকের নরনারীর কোনো রকম কাল্পনিক নিয়ত-বৃত্তির উপর নির্ভর করে না, তার বদলে নির্ভর করে মানবসমাজের স্ত্রীপ্রাধান্য বা পুরুষ-প্রাধান্যের উপর। এবং মানবসমাজের এই স্ত্রী-প্রাধান্য বা পুরুষ-প্রাধান্য নির্ভর করে উৎপাদন-পদ্ধতির পর্যায়ের উপর।
কিন্তু তার মানে কি এই যে, প্রাচীন পর্যায়ের চেতনায় দেবীমাহাত্ম্যের সঙ্গে মানবীর উর্বর-শক্তির যোগাযোগ সত্যিই নেই? নিশ্চয়ই আছে। কেবল মনে রাখা দরকার, তার মূল কারণ হলো প্রজনন-ব্যাপারটি সম্বন্ধেও মানুষের যে-ধারণা তার একটা ইতিহাস আছে। সে-ইতিহাসের আভাস পাওয়া যায় আমাদের দেশের পুরোনো পরিভাষার মধ্যেই। আমাদের দেশে পুরুষ-প্রাধান্যকে বলা হয়েছে বীজ-প্রাধান্য, নারীপ্রাধান্যকে বলা হয়েছে ক্ষেত্র-প্রাধান্য–পুরুষ-প্রধান সমাজের আবহাওয়ায় মানুষ মনে করেছে প্রজননের প্রধান কারণ হলো পুরুষ-শুক্র, নারীপ্রধান সমাজের আবহাওয়ায় মানুষ মনে করেছে প্রজননের মূল কারণ হলো মারীদেহের বৈশিষ্ট্যই। এই কারণেই দেখা যায়, পুরুষ-প্রধান বৈদিক ঐতিহ্য অনুসারে প্রজনন-কাজে পুরুষের ভূমিকাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে। অথর্ববেদ(৪৪৬) অনুসারে বিবাহের সময় পুরোহিত বরকে বলবে : এই নারীই হলো তোমার ক্ষেত্র, তুমি সেই ক্ষেত্রে বীজ-বপন করে। গুরুত্বটা স্পষ্টই বীজের উপর—বীজ-বপনের উপর। অপরপক্ষে, মাতৃপ্রধান তান্ত্রিক ধারা অনুসারে সন্তান-উৎপাদন ও ধন-উৎপাদন উভয় ব্যাপারেই পুরুষ অপ্রধান : নারীই জগদম্বা, নারী থেকেই সবকিছুর জন্ম।
