The differentiation of the man as warrior and fighter is certainly not due to any constitutional indisposition or incapacity in primitive woman, but to economic necessities.
অর্থাৎ কিনা, যুদ্ধবিগ্রহের কাজ যে পুরুষদেরই হয়ে দাঁড়ালো তার কারণ আদিম মেয়েদের কোনো স্বভাবগত প্রবৃত্তি বা অসামর্থ নয়,—তার বদলে প্রকৃত কারণটা অর্থনৈতিক।
অর্থনৈতিক কারণের দরুনই মাতৃপ্রধান সমাজের বদলে পিতৃপ্রধান সমাজ দেখা দিয়েছে। এই পুরুষ-প্রধান সমাজে শুধুই যে যুদ্ধবিগ্রহের শক্তি পুরুষদের হাতে এসেছে তাই নয়, মানুষ চিন্তা করতে অভ্যস্ত হয়েছে যে, মেয়েরা স্বাভাবিকভাবেই বা প্রাকৃতিক কারণের দরুনই ভীরু ও দুর্বল। অতএব ওই ‘উইকার-সেক্স’ (weaker sex) সংক্রান্ত অতিকথা। এই অতিকথার উপর নির্ভর করেই অধ্যাপক স্টারবেক দেখাবার চেষ্টা করছেন যে, স্বাভাবিক শান্ত পরিবেশ ছেড়ে মানুষ যতোই যুদ্ধবিগ্রহের আবহাওয়ায় এসে পড়তে লাগলো ততোই বাড়তে লাগলো শৌর্য-বীর্যের সমাদর, অতএব শৌর্য-বীর্যে একচেটিয়া অধিকারী পুরুষদের প্রতিপত্তি এবং তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে দেবলোকেও পুরুষদেরই মর্যাদা। কিন্তু এ-ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, কেননা দেবদেবীদের জন্মকথা ওই স্বভাব-দুর্বলা’ সংক্রান্ত অতিকথাটির জন্মের চেয়েও অনেক প্রাচীন।
অধ্যাপক স্টারবেক-এর সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদেশী দৃষ্টান্ত তোলবার প্রয়োজন নেই। কেননা, অন্যান্য বিদ্বানের ইতিপূর্বে এর বিরুদ্ধে প্রভূত নজির সংগ্রহ করেছেন। তাছাড়া সমাজে শৌর্য-বীর্যের মর্যাদা বাড়বার দরুনই যে স্বভাব-কোমলা নারীদের প্রতিনিধিরা দেবলোকেও আভিজাত্য হারিয়েছিলেন—এ-হেন সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আমাদের দেশে চণ্ডী, চামুণ্ড প্রভৃতি অনেকের সাক্ষী খুঁজে পাওয়া যাবে।
বস্তুত, অধ্যাপক স্টারবেক নিজেই অনুভব করেছেন যে, ভারতীয় সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তাঁর ওই সিদ্ধান্তটি অতো সরাসরি প্রযোজ্য হতে পারে না। কেননা, তিনি যেমন বলছেন, একমাত্র ভারতবর্ষের ক্ষেত্রেই এর উল্টো ইতিহাস দেখা যায়। সে-ইতিহাসে দেবীমহাত্ম্যের বিকাশ অনেক পরের যুগে হয়েছে; ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সাহিত্যে, অর্থাৎ বৈদিক সাহিত্যে, দেবীপ্রাধান্য তো দূরের কথা এমন কি দেবীদের নিদর্শনই একান্ত দুর্লভ। অথচ উত্তরযুগের হিন্দুধর্ম দেবীমাহাত্ম্য পরিপূর্ণ। এই ঘটনাটির সঙ্গে অধ্যাপক স্টারবেক-এর সিদ্ধান্তের সঙ্গতি নেই, কেননা তাঁর সিদ্ধান্ত অনুসারে আদিযুগে ছিলো দেবীমাহাত্ম্য—উত্তরযুগে তার বদলে দেবমাহাত্ম্যের বিকাশ হয়েছে। অতএব, নিজের সিদ্ধান্তের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে ভারতীয় সংস্কৃতির এই বৈশিষ্ট্যটি ব্যাখ্যা করবার জন্য অধ্যাপক স্টারবেককে ভারতবর্ষের ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক বিকাশের নতুন ধারা উদ্ভাবন করতে হয়েছে : সাধারণভাবে অর্থাৎ অন্যান্য দেশের বেলায়, যদিও মানুষ শান্ত ও নির্বিঘ্ন কৃষিজীবন ছেড়ে যুদ্ধবিগ্রহের দিকে অগ্রসর হয়েছিলো তবুও ভারতবর্ষের ইতিহাসে দেখা যায় যুদ্ধবিগ্রহের যুগের পর মানুষ শান্ত কৃষিজীবন গড়ে তুলেছে—এই হলো অধ্যাপক স্টারবেক-এর বলবার কথা। তিনি(৪৪২)বলছেন, বৈদিক সাহিত্য হলো একটা যুদ্ধবিগ্রহের যুগের সাহিত্য। আর্যরা তখন স্থানীয় অনার্যদের বিরুদ্ধে এবং নিজেদের বিভিন্ন উপজাতির মধ্যেও যুদ্ধবিগ্রহ চালিয়েছে। স্বভাবতই, এ সময়কার সাহিত্য বহু দেববাদে ভরপুর হলেও তার মধ্যে দেবীমাহাত্ম্যের স্থান নেই। পরের যুগে ওই আর্যরা যখন কৃষিজীবনের শান্ত পরিবেশে থিতিয়ে বসতে লাগলো তখন ক্রমশই তাদের চেতনায় দেবীমাহাত্ম্যের বিকাশ ঘটা সম্ভব হলো—প্রমাণ : দুর্গা, কালি, সরস্বতী, শক্তি ইত্যাদি।
ওই তথাকথিত বৈদিক আর্যরা কবে কোথায় কীভাবে কৃষিকাজের শান্ত পরিবেশে থিতিয়ে বসতে লাগলো—সে-কথা অবশ্যই অধ্যাপক স্টারবেক আমাদের বলেননি। তাছাড়া হিন্দুধর্মের এই দেবীগুলি যে সত্যিই আর্যংশোদ্ভূত নয়, সে-কথা সংশয়াতীত। আর অধ্যাপক স্টারবেকের অনুমান যদি ঐতিহাসিকভাবে সত্যও হতো, তাহলেও এই কৃষিপরিবেশে আর্যদের সমাজ অত্যন্ত প্রকটভাবেই পুরুষপ্রধান হতে বাধ্য হতো। আমরা আগেই দেখেছি, বৈদিক মানুষদের পুরুষপ্রধান সমাজ–এবং অতএব পুরুষপ্রধান চিন্তাচেতনার আসল কারণটা—যুদ্ধবিগ্ৰহ-প্রবণতা নয়, তাদের পশুপালনপ্রধান অর্থনীতিই। রবার্ট ব্রিফন্ট(৪৪৩) ও বিস্তারিতভাবেই আলোচনা করে দেখিয়েছেন যে,
The development of agriculture in its most productive form in those societies which were originally pastoral, instead of raising the economic power and importance of the earthcultivating woman, has accentuated beyond measure the already established supremacy of the owners of the flocks and herds, and given rise to the most pronounced types of patriarchal society.
অর্থাৎ, যে-সব সমাজ আগে পশুপালন-নির্ভর ছিলো সেগুলির ক্ষেত্রে উন্নততর পর্যায়ের কৃষিকাজ ভূমিকৰ্ষণকারিণী নারীদের অর্থনৈতিক শক্তি ও মর্যাদা বাড়াবার বদলে পশুর মালিক পুরুষদের ইতিপূর্বেই ষে-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে তা প্রায় অসম্ভবভাবে বাড়িয়ে দিলো এবং সবচেয়ে চূড়ান্ত পুরুষপ্রধান সমাজ প্রতিষ্ঠিত করলো।
