এই মাতৃপ্রধান ধ্যানধারণার দেশে কী ভাবে সতীদাহ-প্রথার প্রচলন সম্ভব হয়েছিলো এখানে তার আলোচনা তোলা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তার বদলে আমাদের মূল আলোচ্য-বিষয়টির দিকেই দৃষ্টি রাখা যাক। এবং সেই বিষয় হলো, তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার মাতৃপ্রাধান্য বা নারীপ্রাধান্য।
উৎপাদন-পদ্ধতির ইতিহাসের দিক থেকে, অর্থাৎ কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ের দিক থেকেই প্রাচীন সংস্কৃতির নারীপ্রধান ধ্যানধারণাগুলির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ, নারীপ্রধান ধ্যানধারণাগুলির উৎসসন্ধানে আমাদের পক্ষে পরীক্ষা করা দরকার উৎপাদন-পদ্ধতির ওই পর্যায়ে আজো যে-সব মানবদল আটকে পড়ে আছে তাদের—তাদের বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে-পারা বৈজ্ঞানিক তথ্যের বিশ্লেষণ করলে তান্ত্রিকাদি মতবাদকে আমরা বুঝতে পারবো।
বলাই বাহুল্য, অধ্যাপক জর্জ টমসনের গবেষণার উপর নির্ভর করেই এবং মূলত তার গবেষণাদ্ধারা অনুপ্রাণিত হয়েই, আমরা এই মূল যুক্তির অবতারণা করবার প্রয়াস পেয়েছি। এই যুক্তির উপর নির্ভর করেই তিনি প্রাচীন গ্ৰীক সংস্কৃতির নানা দুর্বোধ্য দিক বৈজ্ঞানিক আলোয় উদ্ভাসিত করেছেন। পক্ষান্তরে, আধুনিক গবেষকদের মধ্যে র্যারা এই যুক্তিকে স্পষ্টভাৰে গ্ৰহণ করেননি তাদের রচনা বিচার করলে দেখা যায়, একটি মৌলিক সত্যের কাছাকাছি এসেও তাদের সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত কী ভাবে অস্পষ্ট এবং বিভ্রান্ত হয়েছে।
দৃষ্টান্ত হিসেবে এইখানে Encyclopaedia of Religion and Ethics-এ অধ্যাপক স্টারবেক রচিত Female Principle শীর্ষক প্রবন্ধটির উল্লেখ করা যাক।
শুরুতেই লেখক বলছেন, ধর্মবিশ্বাসের আদিমতম পর্যায়ে দেখা যায় দেবলোকে পুরুষ দেবতাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি হয় গৌণ আর না হয় তো একেবারে শূন্য। আদিম ধর্মবিশ্বাস মূলতই দেবীপ্রধান। কিন্তু ধর্মবিশ্বাসের ক্রমবিকাশ অনুসরণ করলে চোখে পড়ে, এই দেবীমাহাত্ম্য ক্রমশই অপ্রধান হয়ে যাচ্ছে; দেবীদের চেহারা ঝাপসা হতে হতে দৃশ্যপট থেকে হয় অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে, আর না হয় তো দেবীর গৌণ হয়ে গিয়ে পুরুষ-দেবতাদের পত্নীমাত্রে পরিণত হচ্ছেন। কোথাও বা দেখা যায়, দেবীটি নিজের স্বরূপ বদলে শেষ পর্যন্ত পুরুষদেবতায় পরিণত হচ্ছেন। নজির হিসেবে লেখক এখানে রবার্টস স্মিথের রচনা উদ্ধৃত করছেন : সেমিটকদের ধর্মে আদিতে যারা দেবী ছিলেন তারাই নিজেদের নারীত্ব হারিয়ে শেষ পর্যন্ত পুরুষ দেবতায় পরিণত হয়েছেন।
প্রশ্ন ওঠে, এই ঘটনার ব্যাখ্যা ঠিক কী? সুখের বিষয় অধ্যাপক স্টারবেক খুব একটা আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা খোজ করছেন না। এ-বিষয়ে তিনি
স্পষ্টই সচেতন যে, উক্ত পরিবর্তনের পিছনে সমাজ-বিবর্তনমূলক কারণ রয়েছে। তিনি বলেছেন(৪৩৮):
অনেক সময়ই দেখা যায় দেবীরা দেবলোকে উচ্চতম স্থান অধিকার করেছেন। সমাজসংগঠনের বৈশিষ্ট্য এবং সমাজে নারীর মর্যাদার উপর এই ঘটনাটি নির্ভর করে। ক্লান-জীবনে গোষ্ঠীর মধ্যে প্রধানা হলেন জননী; এই পরিস্থিতিতে দেবীমাতার পক্ষেই সর্বোচ্চ স্থান অধিকার করা সম্ভব।
অধ্যাপক স্টারবেক এমন কি এ-কথাও অস্বীকার করবেন না যে, এই দেবীমাহাত্ম্যের সঙ্গে কৃষিজীবনের যোগাযোগ আছে। কিন্তু সে-যোগাযোগ ঠিক কেন—সে-বিষয়ে তিনি স্পষ্টভাবে সচেতন নন। এবং এই কারণেই তাঁর মন্তব্য একটি মৌলিক সত্যের খুব কাছাকাছি পৌঁছোনো সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত অস্পষ্ট ও এমন কি অবান্তর হয়ে পড়েছে। তিনি বলছেন(৪৩৯) :
নানা ক্লান ও শহর মিশে যুদ্ধবিগ্রহমূলক জাতিতে পরিণত হবার পর দেবীপুজার পক্ষে উপযুক্ত সুরক্ষিত উপত্যকার শান্ত কৃষিজীবন অপ্রধান হয়ে গেলো। এই নতুন পরিস্থিতিতে শৌর্য-বীর্যের মূল্য গেলো বেড়ে; ফলে অনিবাৰ্যভাবেই প্রধান হয়ে উঠতে লাগলো পুরুষ দেবতারা এবং অপেক্ষাকৃত গৌণ পর্যায়ে নেমে এলো স্বভাব-দুর্বল নারীজাতির প্রতিনিধি ওই দেবীরা—তারা দেবতাদের পত্নীমাত্রে পরিণত হলো, অবদমিত হলো, বিস্তৃত হলো, আর না-হয়-তো আত্মরক্ষার আশায় তারা নিজেদের নারীত্বটুকু বর্জন করতে বাধ্য হলো।
সুরক্ষিত উপত্যকার শান্ত কৃষিজীবন দেবীমাহাত্ম্যের বিকাশের পক্ষে অমুকুল। কিন্তু কেন? দু’রকম উত্তর পাওয়া যেতে পারে—সুরক্ষিত ও শান্ত প্রভৃতি শব্দের উপর জোর দিলে এক রকম উত্তর, আর, কৃষিজীবন বলে কথাটির উপর জোর দিলে অন্য রকম। এর মধ্যে প্রথম উত্তরটি নিশ্চয়ই ভুল, যদিও দুঃখের বিষয় অধ্যাপক স্টারবেক ওই প্রথম উত্তরটিকেই নির্ভুল মনে করেছেন। কেন মনে করেছেন? তার কারণ, কৃষি-আবিষ্কারের ব্যাপারে মেয়েদের ভূমিকার দিক থেকে সমস্যাটিকে বোঝবার বদলে তিনি পুরুষ-প্রধান সমাজের একটি অতিকথার (myth) সাহায্যেই সমস্যাটির ব্যাখ্যা খুঁজেছেন। অতিকথাটি হলো, নারীরা স্বভাব-কোমলা বা স্বভাব-দুর্বলা—weaker sex। তাই শান্ত সুরক্ষিত আবহাওয়ায় নারী-মহিমার যে-বিকাশ সম্ভবপর শৌর্যবীর্যের যুগে তা ম্লান হয়ে যাওয়া অনিবার্য। অথচ, এই যুক্তিটি যে অতিকথা মাত্র তার বহু প্রমাণ আমাদের দেশের সংস্কৃতিতেই দেখতে পাওয়া যায় : মহিষমর্দিণী, রণচণ্ডী, কালি—এঁরা আর যাই হোন না কেন, তথাকথিত স্বভাব-দুর্বল বা স্বভাবকোমলা নন। তাছাড়া, বিদেশী পুরাণেও এ্যামাজনদের কাহিনী রয়েছে। ব্রিফণ্ট(৪৪০) দেখাচ্ছেন,—এবং প্রভূত প্রমাণের উপর নির্ভর করেই দেখাচ্ছেন,—আজকের পিছিয়ে-পড়া অসভ্য মানুষদের মধ্যে স্ত্রীলোকেরা পুরুষদের তুলনায় বেশি শক্তিশালী, সাহসী এবং এমন কি নিষ্ঠুরও; প্রাচীন সমাজে মেয়েরা যুদ্ধবিগ্রহের কাজে রীতিমতো অংশ-গ্রহণ করে। রবার্ট ব্রিফট-এর(৪৪১) সিদ্ধান্ত হলো :
