অপরপক্ষে অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর যাদের আর্যপূর্ব বলছেন,—বৈদিক সাহিত্যের পরিভাষায় যারা হলো অনার্য, কিংবা আধুনিক আমলাদের পরিভাষায় যাদের বলা হয়েছে এ্যাবরিজিনস্—তাদের অর্থনীতি ছিলো মূলতই কৃষিপ্রধান। তাই তাদের ধ্যানধারণা থেকে দেবীপ্রাধান্য বা শক্তি-প্রাধান্য বা নারীপ্রাধান্যের স্মৃতি বিলুপ্ত হয়নি।
ফলে, আমাদের দেশের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে দুটি স্বতন্ত্র ধারাকে পাশাপাশি বয়ে যেতে দেখা যায়। একটি হলো পুরুষপ্রধান বৈদিক ধারা এবং অপরটি হলো নারীপ্রধান তান্ত্রিক ধারা। মনুস্মৃতির ব্যাখ্যায় কুল্লুকভট্ট(৪৩৪) বলছেন, শ্রতিশ্চ দ্বিবিধা বৈদিকী তান্ত্রিকী চ—শ্ৰুতি দু’রকম, বৈদিক ও তান্ত্রিক। যে-কোনো কারণেই হোক না কেন, আমাদের দেশের শাসক-সম্প্রদায় এই দুটি ধারার মধ্যে বৈদিক ধারাটিকেই গ্রহণ করেছেন। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, সামগ্রিকভাবে দেশের সংস্কৃতিতে এই বৈদিক ধারাটিই প্রাধান্য পেয়েছে। জনৈক আধুনিক পণ্ডিতের বচন উদ্ধৃত করে ইয়োরোপীয় পণ্ডিত(৪৩৫)বলছেন, হিন্দুধর্মের তিন ভাগই হলো তান্ত্রিক। এবং
In the popular knowledge and belief they have practically superseded the Vedas over a large part of India……
ভারতের বিস্তৃত অঞ্চল জুড়ে এই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাই জনসাধারণের বিশ্বাস ও জ্ঞান হিসেবে বেদকে ছাড়িয়ে গিয়েছে।
শুধু তাই নয়(৪৩৬) :
Their influence unquestionably extends far beyond those who profess to accept their authority. Wilson quotes a passage from one of these treatises which claims that ‘many a man who calls himself a Siva or a Vaisnava is secretly a Sakta, and a brother of the left-handed.’ Even the Jains of North India are said to have adopted formulae and ritual from the Tantras, and the Lamaism or corrupt Buddhism of Nepal and Tibet owes much to the same source.
যারা প্রকাণ্ডভাবে তন্ত্রকে প্রামাণ্য মনে করে, তাদের গণ্ডি ছাড়িয়ে বহুদূর পর্যন্ত তন্ত্রের প্রভাব ব্যাপ্ত হয়ে রয়েছে। উইলসন তন্ত্র সাহিত্য থেকে উদ্ধৃতির সাহায্যে দেখাচ্ছেন, যারা নিজেদের শৈব বা বৈষ্ণব বলে তাদের মধ্যে অনেকেই গোপনে গোপনে তান্ত্রিক এবং বামাচারীদেরই সহগোষ্ঠী। এমন কি, দেখা যায় উত্তর ভারতের জৈনরাও তন্ত্র থেকে মন্ত্র ও অনুষ্ঠান গ্রহণ করে এবং নেপাল ও তিব্বত অঞ্চলের লামা-বাদ নামের পতিত বৌদ্ধধর্ম তন্ত্রের কাছে বহুলাংশে ঋণী।
এই জাতীয় উক্তি নিশ্চয়ই অত্যুক্তি নয়। ভারতীয় সংস্কৃতির বাস্তব পরিস্থিতি সম্বন্ধে সচেতন হলে আমরা অনায়াসেই বুঝতে পারি তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার প্রভাব আমাদের দেশের সংস্কৃতিক ঐতিহ্যে কী বিশাল ও গভীর। অর্থাৎ, শাসক সম্প্রদায়ের স্বীকৃতি ও পৃষ্ঠপোষকতা যতোখানিই হোক না কেন, বৈদিক ঐতিহ্য আমাদের দেশের জনসাধারণের মনকে সত্যিই গভীরভাবে স্পর্শ করতে পারেনি,—তার বদলে সাধারণ মানুষ ওই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাকেই আঁকড়ে থাকবার চেষ্টা করেছে।
প্রশ্ন হলো, এর বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কী? এর বাস্তব কারণ ঠিক কী? উত্তরে আমরা বলতে চাইছি, তথাকথিত ‘আর্য-শাসনের অন্তর্ভূক্ত হবার পরও দেশের সাধারণ মানুষ অপেক্ষাকৃত পুরোনো পর্যায়ের কৃষিকাজেই ব্যাপৃত থেকেছে। শ্ৰীযুক্ত রমেশ চন্দ্র দত্তের ভাষায়, এদেশের আদিবাসীদের মধ্যে যারা আর্য আক্রমণের সামনে আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়েছিলো তারা … remained as they were before, the tillers of the soil(৪৩৭)। উৎপাদন-পদ্ধতির এই বৈশিষ্ট্যটিকে বোঝবার আশাতেই আমরা ট্রাইব্যালসমাজের অসম্পূর্ণ-বিলোপ সংক্রান্ত প্রকল্পের সাহায্য গ্রহণ করেছি এবং আমাদের যুক্তি অনুসারে যেহেতু একমাত্র উৎপাদন-পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেই মানুষের ধ্যানধারণার বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া সম্ভব সেইহেতুই তান্ত্রিকাদি, তথা লোকায়তিক, ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে অগ্রসর হয়েও এই প্রকল্পটির বহিরেখা আলোচনা করবার আশায় নিছক ধ্যানধারণার আলোচনা থেকে অনেকটা দূর পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছিলাম।
রাষ্ট্রনৈতিক আকাশে বহু ঝড়ঝাপটা সত্ত্বেও, সাম্রাজ্যের বহু উত্থান-পতন সত্ত্বেও, আমাদের দেশে অন্তত ব্যাপকভাবে উৎপাদন-পদ্ধতির মৌলিক উন্নতি সমাজ-বিকাশের পুরোনো পর্যায়কে নিঃশেষে বিলুপ্ত করে নতুন পর্যায়ের সমাজের বাস্তব ভিত্তি স্থাপন করতে পারেনি। আর, অসমাপ্তভাবে বিলুপ্ত ওই পুরোনো পর্যায়ের সমাজ-বাস্তবের প্রতিবিম্ব হিসেবেই আমাদের দেশের বৃহত্তর জনতার চেতনায় পুরোনো পর্যায়ের ধ্যানধারণাগুলিরও অমন বিস্তৃত ও গভীর প্রভাব থেকে গিয়েছে। দেশের শাসক-সম্প্রদায় নিশ্চয়ই মাতৃপ্রধান সমাজ-বাস্তবকে বহুলাংশেই ধ্বংস করতে পেরেছে এবং সতীদাহ-প্রথা প্রভৃতির উৎস-সংক্রান্ত ঐতিহাসিক গবেষণা সমাধা হলে আমরা হয়তো স্পষ্টভাবেই দেখতে পাবে, এই মাতৃপ্রাধান্যকে অবদমন করবার জন্যে কতোখানি পশুবলের প্রয়োজন হয়েছিলো। কিন্তু তা সত্ত্বেও এমন কি আমাদের দেশের সমাজবাস্তব থেকেও নারীপ্রাধান্য সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। এ-বিষয়ে ডক্টর এরএনফেলস্ “ভারতবর্ষে মাতৃতন্ত্ৰ” বলে বইতে অজস্র তথ্য সংগ্রহ করেছেন। এবং ওই মাতৃপ্রধান সমাজ-বাস্তবকে পশুবলে বাইরের থেকে ভাঙবার চেষ্টা হয়েছিলো বলেই সে-ভাঙন বহুলাংশেই কৃত্রিম হতে বাধ্য হয়েছিলো : ফলে দেশের ধ্যানধারণায় খুব মৌলিক পরিবর্তন দেখা দেবার কথা নয়, তা দেখা দেয়ওনি। তাই আমাদের দেশে সতীদাহ-প্রথার পাশাপাশিই শাক্ত মতবাদের ব্যাপক ও গভীর প্রভাব দেখা যায়। যদিও অবশ্যই তান্ত্রিকমতে সতীদাহ-প্রথা নিন্দিত হয়েছে তবুও শাক্তদের দেশে সতীদাহ-প্রথার মতো কৃত্রিম পরিস্থিতি সত্যিই কল্পনা করা কঠিন। কেননা, শাক্ত মতবাদ নারী-প্রধান, মাতৃপ্রধান।
