অতএব, এখানে একটি প্রশ্ন ওঠে। এ-বিষয়ে অবশ্যই সন্দেহ নেই যে, কৃষির অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে এখানে একটি দেবীনাম পাওয়া যাচ্ছে এবং সেই দেবীর কাছেই বীজ ও ধনসমূহের বৃদ্ধি-সাধন কামনা করা হচ্ছে। এবং এইদিক থেকে কৌটিল্যের উদ্ধৃতিটি ঐযুক্ত চন্দের আলোচ্য সিদ্ধান্তের সঙ্গে নিশ্চয়ই খাপ খায়। কেননা ঐযুক্ত চন্দের মূল সিদ্ধান্ত হলো অন্যান্য দেশের মতোই আমাদের দেশেও শস্য-উদ্গম ও কৃষি-সাফল্যের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে দেবীর কল্পনাই করা হয়েছে, দেবতার নয়। কিন্তু তবুও এ-বিষয়েও কোনো সন্দেহ নেই যে, কৌটিল্যের রচনায় এখানে দেবী ছাড়াও প্রজাপতি, কাশ্বপ প্রমুখ পুরুষদেবতাদের উদ্দেশ্যেও প্ৰণতি জানানো হচ্ছে। অর্থাৎ, এখানে দেখা যাচ্ছে, কৃষি-প্রসঙ্গেই দেবীমাহাত্ম্য অনেকাংশেই দেবমাহাত্ম্য দ্বারা আচ্ছন্ন হয়ে গিয়েছে। এবং এইদিক থেকে দেখা যায়, শ্ৰীযুক্ত চন্দের আলোচ্য সিদ্ধান্ত অর্থশাস্ত্রের ওই উক্তিটির সঙ্গে স্পষ্টভাবে খাপ খাচ্ছে না।
অতএব সমস্যা ওঠে এবং সে-সমস্যার সমাধান প্রয়োজন হয়।
কৌটিল্যের রচনায়, এইভাবে দেবীমাহাত্ম্য দেবমাহাত্ম্য-দ্বারা আচ্ছন্ন কেন? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে এখানে আরো একটি প্রশ্ন তোলা প্রয়োজন। কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে যে-কৃষি কর্মের উল্লেখ তা ঠিক কোন পর্যায়ের কৃষিকাজ? কেননা, আমরা ইতিপূর্বে দেখেছি, কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার হলেও,—এবং, অতএব, কৃষিবিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়ে মানবসমাজ নারীপ্রধান (ক্ষেত্রপ্রধান) ও তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে দেবলোকও দেবীপ্রধান হলেও,—কৃষিকর্মের উন্নততর পর্যায়টি আর মেয়েদের এক্তিয়ারে ছিলো না। ফলে মানবসমাজ পুরুষ-প্রধান (বীজপ্রধান) এবং তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে দেবলোকও দেবতা-প্রধান হয়ে দাঁড়ানোই স্বাভাবিক। অতএব, অর্থশাস্ত্রের এই উদ্ধৃতিটিতে বীজবপন-প্রসঙ্গে কৃষিদেবীকে আচ্ছন্ন করে ওই পুরুষ-দেবতাদের আবির্ভাব-রহস্যটুকু বুঝতে হলে প্রশ্ন তোলা দরকার, এখানে কৃষিকর্মের ঠিক কোন পর্যায়ের পরিচয়? কৌটিল্য(৪৩২)বলছেন :
তিনি (সীতাধ্যক্ষ, অর্থাৎ রাজকীয় কৃষিকৰ্মাধ্যক্ষ) বহু হলদ্বারা পরিকৃষ্ট নিজ (বা সরকারী) ভূমিতে (মতান্তরে, সেই সেই বীজের উপযোগপ্রাপ্ত ভূমিতে) উক্ত বীজসমূহ দাস (ক্রীতদাসাদি), কর্মকর (বেতনভোগী কর্মকর) ও দগুনিক্রয়কারী পুরুষগণদ্বারা বপন করাইবেন।
কোন পর্যায়ের কৃষিকাজের পটভূমিতে এখানে বীজবপনের আলোচনা হচ্ছে তা কৌটিল্যের এই নির্দেশটি থেকেই অনুমান করা সম্ভব। ফলে পুরোনো পর্যায়ের কৃষিদেবী এখানে উপস্থিত থাকলেও তার মহিমা অনিবাৰ্যভাবেই পুরুষদেবতাদের পাশে অপেক্ষাকৃত ম্লান হয়েছে।
অবশ্যই, তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার উৎস-সন্ধানে কৃষিবিদ্যার বিশেষ করে ওই প্রাকৃত-পর্যায়টি নিয়েই আমাদের আলোচনা। কেন, তা মনে রাখবার জন্যে আমাদের মূল যুক্তিটির সংক্ষিপ্ত পুনরুল্লেখ প্রয়োজন হতে পারে।
তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার প্রধানতম লক্ষণ হলো শক্তিপ্রাধান্য। তন্ত্রে শক্তিই প্রধান, পুরুষ অপ্রধান। তান্ত্রিকেরা শাক্ত, শক্তির সাধক।
তন্ত্রের শক্তি মানে কি? নিশ্চয়ই আধুনিক পাশ্চাত্য-বিজ্ঞানের এনার্জি নয়। তাই এ-কথা কল্পনা করে আত্মপ্রসাদ লাভ করবার চেষ্টাটা আত্মপ্রবঞ্চনারই সামিল হবে যে, আমাদের দেশের প্রাচীনেরা যোগবলে উনবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার জানতে পেরেছিলেন। আসলে, এই জাতীয় আধুনিক মতামতের সঙ্গে তন্ত্রের কোনো সম্পর্কই নেই। তন্ত্রে শক্তি মানে হলো মা, কিংবা আরো সরাসরিভাবে বললে বলা যায় স্ত্রীলোক, নারী। তাই তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার মধ্যে উনবিংশ শতাব্দীর বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা অমুসন্ধান না করে কৃষিভিত্তিক সমাজবাস্তবের প্রতিবিম্ব অন্বেষণ করাই বিজ্ঞান-সম্মত প্রচেষ্টা হবে। সে-সমাজ নারীপ্রধান, কেননা কৃষিকাজ মেয়েদের আবিষ্কার। এবং এই নারীপ্রাধান্যের প্রতিবিম্ব হিসেবেই তান্ত্রিক ধ্যানধারণা শক্তি-প্রধান বা নারী-প্রধান।
তন্ত্র-প্রসঙ্গে আধুনিক গবেষক(৪৩৩) বলছেন, এই জাতীয় সমস্ত রচনাতেই নারী-তত্ত্বের উপর এতোটা জোর দেওয়া হয়েছে যে, পুরুষের কথা প্রায় সম্পূর্ণভাবেই বাদ পড়ে গিয়েছে :
In all these writings the female principle is personified and made prominent, to the almost total exclusion of the male.
এই সমস্ত রচনায় পুরুষতত্ত্বকে প্রায় সম্পূর্ণভাবে বাদ দিয়ে নারীতত্ত্বকে ব্যক্তিত্ববিশিষ্ট করা হয়েছে ও প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
এই নারীপ্রাধান্যের ব্যাখ্যা অনুসন্ধান করতে এগিয়েই আমরা কৃষিবিদ্যার আদি-পর্যায়ের কথা তুলতে বাধ্য হয়েছি। এবং আমরা দেখাবার চেষ্টা করেছি যে, বৈদিক ঐতিহের সঙ্গে তান্ত্রিক ঐতিহের মূল প্রভেদকেও এইদিক থেকেই বোঝবার অবকাশ আছে।
বৈদিক অর্থনীতি পশুপালন-প্রধান। পশুপালন-নির্ভর সমাজ পুরুষপ্রধান। তারই প্রতিবিম্ব হিসেবে বৈদিক সাহিত্য অনিবাৰ্যভাবেই পুরুষপ্রধান। বৈদিক সাহিত্যে শুধুই যে দেবী অপ্রধান ও এমন কি দুর্লভ তাই নয়; পুরুষসূক্ততে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে এক আদি-পুরুষ থেকেই বিশ্বজগতের উৎপত্তি।
