আপাতত দেখা যাক, দেবী-মাহাত্ম্যের ব্যাখ্যায় শ্ৰীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ আরো কী কী তথ্য সংগ্রহ করেছেন।
যাঁর নাম দুর্গা তাঁরই নাম শাকম্ভরী। ফলে দুর্গোৎসবের সঙ্গে ফসলের সময়টার যোগাযোগ থাকাই স্বাভাবিক। এবং তা আছেও। দুর্গোৎসব হলো শারদীয় উৎসব—ডালা যখন পাকা ফসলে ভরে ওঠবার সময় ঘনিয়ে আসে। তাই, ঐযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ(৪২৩) সিদ্ধান্ত করছেন, আদিতে দুর্গা ছিলেন শস্যদেবী,—পৃথিবীর অন্যান্য দেশের শস্যদেবীদের মতো ফসলের সময়টিতেই দুর্গোৎসবের আয়োজন। অবশ্যই, দুর্গাকে আমরা সাধারণত চিনি মহেশমর্দিনী রণচণ্ডীর রূপে। কিন্তু শ্ৰীযুক্ত চন্দ অনুমান করছেন, এ-রূপটি গৌণ, কেননা অর্বাচীন। এবং এই রণচণ্ডীর রূপটি যে অর্বাচীন শ্ৰীযুক্ত চন্দের মতে তার একটি প্রমাণ পাওয়া যায় রামায়ণ থেকে। রামায়ণের উপাখ্যান অনুসারে রাবণ-বধের জন্য রামচন্দ্র রণচণ্ডী দুর্গার কাছে বর প্রার্থনা করেছিলেন। কিন্তু শ্রীযুক্ত চন্দ বলছেন, এ-উপাখ্যান বাল্মিকীর মূল রামায়ণে নেই। মূল রামায়ণ অনুসারে রামচন্দ্র বর প্রার্থনা করেছিলেন দুর্গার বদলে সূর্যের কাছেই। এবং এর থেকে প্রমাণ হয়, দুর্গার ওই রণচণ্ডী রূপটি পরের যুগে রচিত—অর্থাৎ অর্বাচীন।
দুর্গাপূজার একটি প্রধান অঙ্গ হলো নবপত্রিকার পূজা। এবং শ্রীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ অনুমান করছেন, এই অনুষ্ঠানটি দুর্গাপূজার কৃষি-পর্যায়েরই স্মারক(৪২৪)। কেননা, নবপত্রিকার ঘটের উপর রম্ভা, কচ্চি, হরিদ্রা, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান্যের পাতা সাজানো হয়। এবং যেটা বিশেষ করে লক্ষ্য করবার বিষয়, এই ন’টি উদ্ভিদের প্রত্যেকটিরই অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয় এক-একটি দেবী। এখানেও উদ্ভিদ-জগতের সঙ্গে দেবীমাহাত্ম্যের একটা যোগাযোগ চোখে পড়ে। এবং এখানে আমরা বিশেষ করে ডালিমের অধিষ্ঠাত্রী দেবীটির উল্লেখ করতে পারি। কেননা, আমরা একটু আগেই দেখেছি, পুরুষ হয়েও আমাদের সিদ্ধিদাতা গণেশ যখন কৃষিপর্যায়ের আসর জমাতে চান তখন তাঁকে যে-সব বিসদৃশ ব্যবহার করতে হয়েছে তার মধ্যে একটি হলো এই ডালিম-ফল হাতে নেওয়া। নবপত্রিকার পূজার বেলায় কিন্তু এই অসঙ্গতি নেই। কেননা, এখানে ডালিমের অধিষ্ঠাত্রী হিসেবে কল্পনা করা হয়েছে রক্তদন্তিকা বলে একটি দেবীকেই(৪২৫)।
শ্ৰীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ আরো দেখাচ্ছেন, শাকম্ভরী বলেই দুর্গা হলেন অন্নদা বা অন্নদাতা। অন্নপূর্ণা নামটির তাৎপর্যও নিশ্চয়ই এই দিক থেকেই বুঝতে পারা যায় (৪২৬)।
দেবীমাহাত্ম্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সম্পর্ক যে কতো ঘনিষ্ঠ তার আরো একটি নিদর্শন হিসেবে শ্ৰীযুক্ত চন্দ বলছেন, শাক্তরা সকালে উঠে কুলতরু বা কুলবৃক্ষকে প্রণাম করে (৪২৭)।
বলাই বাহুল্য, ভারতীয় সংস্কৃতির এবং বিশেষ করে বাংলাদেশের সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্য বোঝবার কাজে শ্ৰীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দের গবেষণার এই ইংগিতগুলি অত্যন্ত মূল্যবান। কেননা ভারতীয় সংস্কৃতি স্পষ্টই দেবীবহুল এবং বিশেষ করে বাংলা দেশের নিজস্ব ঠাকুরদেবতা বলে যাঁদের স্বীকার করা হয় তাঁদের মধ্যে পুরুষ বলতে বোধহয় একমাত্র দক্ষিণ রায়। এবং বাংলার সংস্কৃতি যে প্রায় চোদ্দ আনাই তান্ত্রিক এবং তান্ত্রিক ধ্যানধারণার সবচেয়ে ব্যাপক ও বিশাল প্রসার যে বাংলা দেশের জমিতেই—এ-কথা বহুবার বহু বিদ্বান উল্লেখ করেছেন (৪২৮)। কিন্তু এই ঘটনাটির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা যে বাংলা দেশের উর্বর জমির মধ্যেই লুকিয়ে আছে,—অর্থাৎ কৃষিবিদ্যার দিক থেকেই যে শেষ পর্যন্ত সে-ব্যাখ্যা পাবার সম্ভাবনা আছে,—এ-বিষয়ে শ্ৰীযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দই বোধহয় সর্বপ্রথম আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, এই মূল্যবান মূলসূত্রটি আবিষ্কার করা সত্ত্বেও তিনি শেষ পর্যন্ত এর বৈজ্ঞানিক তাৎপর্যগুলি বিশ্লেষণ করেননি এবং শাক্ত মতবাদকে উৎপাদন পদ্ধতির বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে বোঝবার বদলে প্রধানতই জাতিগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে তিনি এর ব্যাখ্যা খোঁজবার চেষ্টা করেছেন (৪২৯)। ফলে শুধুই যে তাঁর গবেষণা দিকভ্রান্ত হয়েছে তাই নয়; অনেক সময় তার সিদ্ধান্তগুলি অর্ধ-সত্যমাত্রে পর্যবসিত হয়েছে।
একটা দৃষ্টান্ত দেখা যাক। শ্ৰীযুক্ত চন্দ বলছেন(৪৩০), কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রে বীজবপন-মন্ত্র প্রসঙ্গে কৃষির যে-অধিষ্ঠাত্রী দেবীর উল্লেখ করা হয়েছে তাকেও ওই শস্যদেবী দুর্গারই অনুরূপ মনে করা যেতে পারে :
The Devi named in a sacred formula (mantra) quoted by Kautilya in connection of sowing seeds in his Arthasastra is probably the prototype of Durga as corn spirit.
আমাদের মন্তব্য হলো, শুধুমাত্র এইটুকু বললে কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্রের আলোচ্য ইংগিতটুকুর আংশিক ব্যাখ্যামাত্র দেওয়া হয় এবং যে-কোনো অর্ধ-সত্যের মতোই ওই আংশিক ব্যাখ্যাটুকু অনেকাংশেই তুচ্ছ-মূল্য। শ্ৰীযুক্ত রাধাগোবিন্দ বসাকের(৪৩১) তর্জমা অনুসারে কৌটিল্যের গ্রন্থের ওইখানে লেখা আছে :
সর্বপ্রকার বীজেরই প্রথম বপন সময়ে, ইহার প্রথম বীজমুষ্টি স্বর্ণ-সংযুক্ত জলদ্বারা সিক্ত করিয়া বপন করিতে হয়। নিম্নবর্তী মন্ত্র তৎসঙ্গে পাঠ করিতে হয়, যথা— ‘প্রজাপতি, কাশ্যপ স্বৰ্ষপুত্র ও পর্জন্য দেবকে সর্বদা নমস্কার জানাইতেছি। সীতাদেবী (কৃষির অধিষ্ঠাত্রী দেবীর নাম এখানে সীতা বলিয়া ধৃত হইয়াছে) আমার বীজ ও ধনসমূহের বৃদ্ধি সাধন করুন।’
