রবার্ট ব্রিফল্ট(৪১৪) দেখাচ্ছেন এবং অজস্র তথ্যের পর্যালোচনার ভিত্তিতেই দেখাচ্ছেন, কৃষিকেন্দ্রিক জাদু-অনুষ্ঠান থেকেই উত্তরকালের নানা ধর্মসম্প্রদায়ের উদ্ভব হয়েছে। এবং কৃষিকেন্দ্রিক অনুষ্ঠান থেকে উদ্ভূত বলেই আদিতে এই সম্প্রদায়গুলি মেয়েদের গুহ্যসম্প্রদায় মাত্র ছিলো। পরে এগুলির মধ্যে পুরুষদের প্রবেশাধিকার এবং ক্রমশ প্রাধান্যও দেখা দিয়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও অতীত নারীপ্রাধান্যের স্মারক মুছে যায়নি। তাই বহুক্ষেত্রেই দেখা যায়, পুরুষ পুরোহিতদেরও নারীভাবে সাধনা করতে হচ্ছে এবং সাধনার সময় নারী সাজতে হচ্ছে।
তন্ত্র-সাধনাও সেই রকমই। বামাভাবে, বামা হয়ে, সাধনা করতে হবে।
বামাচার নামটির পিছনেও এই ইতিহাস লুকোনো আছে কি না তা ভেবে দেখা যেতে পারে। আমরা ইতিপূর্বে বাম শব্দকে কাম অর্থে গ্রহণ করেছি —বামাচার অর্থাৎ কামাচার(৪১৫)। কিন্তু ওই বামাচার নামটির—বিশেষ করে তন্ত্রসাধনার ক্ষেত্রে বামাচার নামটির—পিছনে আরো কিছু লুপ্ত ইতিহাস থাকা অসম্ভব নয়। এ-সাধনা এককালে স্ত্রী-আচার মাত্র ছিলো বলেই হয়তো একে এখনো বামাচার বলা হয়। “কাহারও মতে ইহারা অনেক বেদবিরুদ্ধ বিপরীত আচরণ করিয়া থাকেন বলিয়া বামাচারী নামে খ্যাত”(৪১৬)। অবশ্যই বাম বা বামা কোনো শব্দকেই আক্ষরিক অর্থের দিক থেকে বেদবিরুদ্ধ ব্যাঞ্জক বলে গ্রহণ করবার অবকাশ নেই। তবুও উদ্ভূত মতবাদ অন্তত একটা অর্থে ভ্রান্ত নয় : বৈদিক আচার পুরুষপ্রধান বলেই স্ত্রী-আচার বা বামাচার স্বভাবতই বেদবিরুদ্ধ। অবশ্যই এই বামাচার নামটির নজির দেখিয়েই যদি দাবি করা হয় যে, তন্ত্রসাধনা এককালে স্ত্রী-আচার মাত্র ছিলো, তাহলে আপত্তি তুলে হয়তো বলা হবে, তন্ত্রসাধনা বলতে শুধুমাত্র বামাচার নয়; নিত্যাতন্ত্রে ও কুলার্ণবে(৪১৭) সাত প্রকার আচারের কথা লিখিত আছে। কিন্তু এ-হেন আপত্তির বিরুদ্ধে খোদ তান্ত্রিকেরা যে ঘোরতর আপত্তি তুলবেন সে-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কেননা,
এখনকার বঙ্গীয় তান্ত্রিকগণের মধ্যে বামাচার ও দক্ষিণাচার উভয়াচার মিশ্রিত দেখা যায়। কিন্তু প্রকৃত তান্ত্রিকেরা একথা স্বীকার করেন না। বামকেশ্বর তন্ত্রে ৫১ পটলে লিখিত আছে :–
আচারো দ্বিবিধো দেবি বামদক্ষিণভেদতঃ।
জন্মমাত্ৰং দক্ষিণং হি অভিষেকেন বামকম্।
দেবি! বামাচার ও দক্ষিণাচার ভেদে আচার দুই প্রকার। জন্মমাত্র দক্ষিণ এবং অভিষেক হইলে বামাচারী হয়।(৪১৮)
তাহলে অকৃত্রিম তন্ত্রসাধনা বলতে বামাচারই এবং বামাচার নামটির পিছনে ওই গোপন ইতিহাস থাকা অসম্ভব নয় যে, তান্ত্রিকাচার এককালে স্ত্রী-আচার। মাত্রই ছিলো।
—————
৪০৪. A. Avelon PT Preface xvii.
৪০৫. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২:৩২০।
৪০৬. F. Engels OFPPS 107.
৪০৭. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২:৩২০।
৪০৮. ঐ ২:২৫৭।
৪০৯. বিশ্বকোষ ৭:৫০৭-৮।
৪১০. ঐ ৭:৫০৭।
৪১১. পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায় : রচনাবলী ২:২৯৭।
৪১২. বিশ্বকোষ ৭:৫১২।
৪১৩. R. G. Bhandarkar VS 146.
৪১৪. R. Briffault op. cit. 2:525, 526, 530-4, 541 ; 3:129ff.
৪১৫. পৃ. ১০২-১২।
৪১৬. বিশ্বকোষ ৭:৫১৩।
৪১৭. ঐ ৭:৫১২।
৪১৮. ঐ ৭:৫১৩।
৩০. দেবী রহস্য ও উদ্ভিদ জগৎ
প্রশ্ন ওঠে, দেবীপ্রাধান্য-মূলক বা নারী-প্রাধান্য-মূলক এই জাতীয় ধ্যানধারণার ব্যাখ্যা কী? আমাদের যুক্তি অনুসারে সে-ব্যাখ্যার মূল-মূত্র পাওয়া যাবে কৃষি আবিষ্কারের দিক থেকেই।
প্রথমত দেখা যায়, দেবী-রহস্যের সঙ্গে উদ্ভিদ-জগতের সম্পর্ক রয়েছে। এ-বিষয়ে ঐযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ(৪১৯) ইতিপূর্বেই কিছুকিছু তথ্য সংগ্ৰহ করেছেন; সেগুলি থেকেই আলোচনা শুরু করা যায়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণে(৪২০) দেবী নিজেই বলছেন :
ততোংহমথিলং লোকমাত্মদেহসমূদ্ভবৈ:
ভবিন্যামি স্বরা; শাকৈরাবৃষ্টৈ প্রাণধারকৈঃ।।
শানন্তরীতি বিখ্যাতিং তদা যাস্যাম্যহং ভুবি। ইত্যাদি।
অর্থাৎ, অনন্তর বর্ষাকালে নিজদেহ সমুদ্ভুত প্রাণধারক শাকের সাহায্যে আমি সারা জগতের পুষ্টি সরবরাহ করবো। তখন আমি জগতে শাকম্ভরী নামে বিখ্যাত হবো।
দেবীর ওই শাকম্ভর নামটা নিশ্চয়ই চিত্তাকর্ষক। ঐযুক্ত রমাপ্রসাদ চন্দ তর্জমা করেছেন, herb-bearing বা herb-nourishing I কিন্তু তার চেয়েও চিত্তাকর্ষক হলো ‘আত্মদেহসমুদ্ভবৈ: বিশেষণটি। এই বিশেষণের মূলে এক অতি-প্রাচীন বিশ্বাস চাপা পড়ে আছে এবং হরপ্পার ধুলো সরিয়ে সে-বিশ্বাসের এমনকি একটি মূর্ত নিদর্শন পর্যন্ত খুজে পাওয়া গিয়েছে। সে-নিদর্শন সম্পর্কে স্তর জন মার্সাল(৪২২) বলছেন, হরপ্পায় একটি পরমাশ্চর্য সিল(৪২১) আবিষ্কার হয়েছে। তার একপিঠে দেখা যায় একটি নগ্ন নারীমূর্তি। এই নারীর দুটি পা দু’পাশে সরানো এবং তার গর্ভের ভিতর থেকে একটি লতা গজিয়েছে।
হরপ্পার হরফের পাঠোদ্ধার সম্ভব হলে মার্কণ্ডেয় পুরাণের ওই ‘আত্মদেহসমুদ্ভবৈ: বিশেষণটির উপর আরো কিছুটা আলোকপাত করা হয়তো সম্ভব হতো, কিন্তু এই সিলটির গায়ে ছ’-অক্ষরে কী লেখা আছে তা আজো কেউই পড়তে পারেননি। তবে ওই দুর্বোধ্য হরফে যাই লেখা থাকুক না কেন, এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই যে, সিলের উপরের নারীচিত্রটির পিছনে লুকিয়ে আছে এক অতি-আদিম বিশ্বাস। রবার্ট ব্রিফন্ট-এর রচনা অনুসরণ করে আমরা ইতিপূর্বেই দেখেছি, পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের মধ্যে আজো এ-বিশ্বাস টিকে আছে যে, নারী-দেহ থেকেই আদিশস্যের উদ্গম হয়েছে। নারীদেহের সঙ্গে শস্য-উদ্গমের সম্পর্ক-মূলক এই আদিম বিশ্বাসটির বিস্তৃততর আলোচনায় আমরা পরে প্রত্যাবর্তন করবো।
