আমাদের এই মন্তব্যের বিরুদ্ধে কয়েকটি আপত্তি উঠতে পারে।
প্রথমত, তর্ক করে কেউ বলতে পারেন, তন্ত্র হাজার হোক শিবোক্তশাস্ত্র—অতএব এই শাস্ত্রের প্রকাশভঙ্গির মধ্যেই প্রমাণ রয়েছে যে, এখানে পুরুষের ভূমিকা সত্যিই গৌণ নয়।
দ্বিতীয়ত, তর্ক করে আরো বলা যেতে পারে, তান্ত্রিক সাধনায় ভৈরবীর স্থান থাকলেও পুরুষ সাধকদের দৃষ্টান্ত একটুও বিরল নয়। অথচ, আমাদের যুক্তি যদি ঠিক হয়,—অর্থাৎ কৃষি-কেন্দ্রিক জাদু-অনুষ্ঠানই যদি তন্ত্রের উৎস হয় এবং সে-অনুষ্ঠান যদি একান্তভাবেই মেয়েলি ব্যাপার হয়—তাহলে তন্ত্র সাধনাও নারী-প্রধান হবার কথা।
একে একে এই দুটি যুক্তির বিচার করা যাক।
প্রথমত তান্ত্রিক গ্রন্থগুলির রচনাভঙ্গি। শ্রীযুক্ত পাঁচকড়ি বন্দ্যোপাধ্যায়(৪০৮) একবার বলেছিলেন, “হাতের লেখা পুঁথি না পাইলে তন্ত্রের অনেক তত্ত্ব ঠিকমত বুঝা যায় না”। আমাদের মন্তব্য হলো, এমন কি ওই হাতের লেখা পুঁথিগুলিও যেহেতু অনেক উত্তরকালের সৃষ্টি সেইহেতু এগুলির রচনাভঙ্গি থেকে তন্ত্রের আদি ও অকৃত্রিম তাৎপর্য অনুমান করবার সুনিশ্চিত অবকাশ নেই। এ-রচনাভঙ্গি অর্বাচীন বলেই যে অনেকাংশে কৃত্রিম, এখানে তার সামান্ত প্রমাণ দেওয়া যায়।
এক, শাস্ত্রীয় প্রমাণ :
পদ্মপুরাণে পাষণ্ডোৎপত্তি অধ্যায়ে লিখিত আছে, লোকদিগকে ভ্ৰষ্ট করিবার জন্যই শিব নামের দোহাই দিয়া পাষণ্ডীরা অভিনব মত প্রকাশ করিয়াছে। (৪০৯)
এবং শ্ৰীমদ্ভাগবতের চতুর্থ স্কন্ধের দ্বিতীয় অধ্যায়ে ভৃগুও বলছেন(৪১০),
নষ্টশৌচ মূঢ়ধিয়ো জটাভস্মাস্থিধারিণ।
বিশস্তু শিবদীক্ষায়াং যত্র দৈবস্তুরাসবম্।।
ব্ৰহ্মা চ ব্রাহ্মণাশ্চৈব যদ্যূয়ং পরিনিন্দথ।
সেতুং বিধরণং পুংসামত পাষণ্ডমাশ্ৰিতাঃ।।
পবিত্রতাভ্রষ্ট মূঢ়বুদ্ধি জটাভষ্ম ও অস্থিধারীগণ শিবদীক্ষায় প্রবেশ করুন, যেখানে দৈবস্থরা ও আসব রহিয়াছে। ব্ৰহ্মা ও ব্রাহ্মণগণ, যাঁহাদের আপনারা এত নিন্দা করেন, তাহারাই পুরুষদিগের সেতুস্বরূপ, এইজন্যই আপনারা পাষণ্ডত্ব প্রাপ্ত হইয়াছিল।
অতএব, শাস্ত্রকারদের মতেই তন্ত্রের পক্ষে ওই শিবোক্ত-শাস্ত্র সাজবার চেষ্টাটা নেহাতই কৃত্রিম। এবং এই কৃত্রিমতা আরো প্রকট হয়ে পড়ে তন্ত্রসাধকদের ভঙ্গি থেকে।
তন্ত্রসাধকদের মনোভাব কী রকম?
তন্ত্রের শাক্ত সাধকগণ বলেন যে, শিব ত স্থাণুসদৃশ, একটা বিদ্যমানতার দ্যোতকমাত্র, তাঁহার উপাসনা করি কোন হিসাবে? শক্তি না থাকিলে শিব ত শব, অথচ শক্তিশূন্য শিব হইতেই পারেন না। অতএব, শিব আছেন, মাথার উপর থাকুন, আমরা মায়ের–আদ্যাশক্তির উপাসনা করিব। কারণ, তিনিই ত সব—তিনি মেধা, তিনি মায়া, তিনি লজ্জা, তিনি ক্ষমা, তিনি বুদ্ধি, তিনি ধৃতি, তিনি বিদ্যা, তিনি ছায়া, তিনি শান্তি, তিনি ক্ষান্তি—তাঁহাকে পুজা করিব না ত কাহার পুজা করিব?(৪১১)
অতএব, ওই প্রথম আপত্তির উত্তর দিয়ে আমরা সিদ্ধান্ত করতে চাই যে, যদিও উত্তরযুগে তান্ত্রিক গ্রন্থাদি শিবোক্ত-শাস্ত্র হিসেবেই রচিত হয়েছে তবুও রচনাভঙ্গির এই বৈশিষ্ট্য থেকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণার নারীপ্রাধান্য সত্যিই অস্বীকৃত হয় না।
দ্বিতীয়ত, সাধনপদ্ধতির কথা।
আমাদের যুক্তি যদি ঠিক হয় তাহলে অনুমান করা প্রয়োজন যে, আধুনিক কালে তন্ত্রসাধক বলতে যদিও বহু (প্রধানতই?) পুরুষসাধককে দেখতে পাওয়া যায়, তবুও এককালে এ-সাধনা একান্তভাবেই নারীদের এক্তিয়ারে ছিলো।
এ-কথা অনুমান করবার মতো কোনো তথ্য আছে কি? আছে।
আচারভেদ তন্ত্র(৪১২) বলছে :
পঞ্চতত্ত্বং খপুষ্পঞ্চ পুজয়েৎ কুলযোষিতম্।
বামাচারো ভবেত্তত্র বামা ভূত্বা যজেং পরাম॥
পঞ্চতত্ব অথবা পঞ্চমকার, খপুষ্প অর্থাৎ রজস্বলার রজঃ ও কুলস্ত্রীর পূজা করিবে। তাহা হইলে বামাচার হইবে। ইহাতে নিজে বামা হইয়া পরাশক্তির পুজা করিবে।
বামা ভূত্বা যজেং পরাম্—পরাশক্তিকে বামা হয়ে পূজা করতে হবে। এবং এ-কথা শুধুমাত্র আচারভেদ তন্ত্রের কথা নয়, তন্ত্রের একটি প্রধানতম কথা। তাই স্যর্ ভাণ্ডারকার বলছে,(৪১৩) :
The ambition of every pious follower of the system is to become identical with Tripurasundari, and one of his religious exercises is to habituate himself to think that he is a woman. Thus the followers of the Sakti school justify their appellation by the belief that God is a woman and it ought to be the aim of all to become a woman.
এই সম্প্রদায়ের নিষ্ঠাবান অনুসরকের উচ্চাকাঙ্খা হলো, ত্রিপুরাসুন্দরীর সঙ্গে অদ্বৈতভাব স্থাপন করা এবং এই সাধনপদ্ধতির একটি অঙ্গ হলো নিজেকে নারী জ্ঞান করতে অভ্যস্থ হওয়া। অতএব, শাক্ত সম্প্রদায়ের অনুগামীরা নিজেদের পদবীটিকে এই বলে ব্যাখ্যা করেন যে, ঈশ্বর নারীই এবং নারীত্বই সকলের আদর্শ।
তন্ত্রসাধকেরা এই রকম নারীভাবে সাধনা করবার চেষ্টা করেন কেন? এ-প্রশ্নের মাত্র একটিই বৈজ্ঞানিক উত্তর সম্ভবপর : তন্ত্রসাধনা আদিতে নারীদেরই সাধন-পদ্ধতি ছিলো—নারীভাবে সাধনার চেষ্টাটা তারই স্মারক।
পৃথিবীর অন্যান্য নানান ধর্মের বেলাতেও অনুরূপ ঘটনা ঘটতে দেখা যায়; যে-সাধনা আদিতে শুধুমাত্র মেয়েলি ব্যাপার ছিলো তা উত্তরকালে পুরুষদের এক্তিয়ারে আসবার পরও সাধন-পদ্ধতি ও সাধকের ভঙ্গির মধ্যে নারীপ্রাধান্যের স্মারক টিকে থেকেছে।
