সেইসঙ্গেই আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, জীবন-সংগ্রামের সেই মূর্ত পরিবেশ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই ধ্যানধারণাগুলিই যখন উত্তরকালের বিরুদ্ধ পরিবেশে, বিপরীত আবহাওয়ায়, টিকে থাকবার চেষ্টা করেছে তখন এগুলির আদি-তাৎপর্যটুকু অনিবাৰ্যভাবেই বিপরীতে পর্যবসিত হতে বাধ্য হয়েছে। তারই নমুনা পাওয়া যায় আধুনিক যুগের তান্ত্রিক গ্রন্থাবলী ও অনুষ্ঠানাদির মধ্যে। এই কারণেই, তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণার আদি-তাৎপর্য শুধুমাত্র তান্ত্রিক সাহিত্যের মধ্যে অন্বেষণ করবার চেষ্টা নিষ্ফল হতে বাধ্য। এ-জাতীয় সাহিত্যে সেই আদি-তাৎপর্যের অনেক স্মারক নিশ্চয়ই টিকে আছে; কিন্তু এই স্মারকগুলিকে ঠিকমতো বুঝতে হলে কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায় সংক্রান্ত সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্যের উপর নির্ভর করা প্রয়োজন। জামরা তাই আমাদের মূল পদ্ধতি অনুসারে এ-আলোচনার জন্যে বারবার পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া মানুষদের আচার-অনুষ্ঠান ও ধ্যানধারণার উল্লেখ করতে বাধ্য হবো। সেখানে যে-কথা স্পষ্ট ও প্রকটভাবে দেখতে পাওয়া যায় তারই সাহায্যে তান্ত্রিক সাহিত্যের অস্পষ্ট, জটিল, আপাত-অর্থহীন, একান্ত উৎকট ও বীভৎস বিষয়গুলির উপর আলোকপাত হওয়া অসম্ভব না হতেও পারে।
—————-
৩৭৮. T. A. G. Rao EHI 1:52.
৩৭৯. Ibid.
৩৮০. W. Crooke RFNI 56, 61, 176 ইত্যাদি |
৩৮১. T. A. G. Rao op. cit. 1:52.
৩৮২. A. Getty G. 18.
৩৮৩. রাও-এর হিন্দু আইকনোগ্রাফি এবং বৃহংতন্ত্রসার বর্ণিত বিভিন্ন দেবীর তান্ত্রিক ধ্যান দ্রষ্টব্য।
৩৮৪. G. Thomson SAGS 219.
৩৮৫. Ibid.
৩৮৬. Ibid.
৩৮৭. Ibid.
৩৮৮. Ibid. 219s.
৩৮৯. Ibid. 205 & 209-10.
৩৯০ বিশ্বকোষ ৩:৫৪৭ ।
৩৯১. ঐ ৩:৫৪৮
৩৯২ এরেনফেস্ (MRI) মাতৃপ্রাধান্যের স্মারকের দিক থেকে ভারতের মানচিত্র দিয়েছেন।
২৭. সাধারণ মূলসূত্র : কৃষি-আবিষ্কার ও জাদুবিশ্বাসের তীব্রতা
সাধারণ মূলসূত্র : কৃষি-আবিষ্কার ও জাদুবিশ্বাসের তীব্রতা
কৃষি-বিদ্যার প্রাথমিক পর্যায়কে ঠিকমতো বুঝতে হলে সর্বপ্রথম একটি বিষয়ে বিশেষভাবে সচেতন হওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি হলো, এই পর্যায়েই জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা মানুষের মনে সবচেয়ে তীব্রভাবে অনুভূত হয়েছে। রবার্ট ব্রিফল্ট(৩৯৩) দেখাচ্ছেন, অসভ্য মানুষদের মধ্যে সর্বত্রই দেখা যায় অন্যান্য কাজের তুলনায় কৃষিকাজকে কেন্দ্র করেই জাদুবিশ্বাস এবং জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরতা সবচেয়ে বেশি। পিউব্লো-ইণ্ডিয়ানদের মধ্যে খৃস্টান পাদ্রীরা নানাভাবে খৃস্টধর্ম প্রচারের চেষ্টা করেও এই অসভ্য মানুষগুলির মূল বিশ্বাস একটুও টলাতে পারেনি; অথচ এ-বিশ্বাস চুরমার হয়ে যেতে লাগলো যখন ইয়োরোপীয়রা সে-দেশে গিয়ে চাষবাস শুরু করলে। ইয়োরোপীয়দের কৃষিকাজ দেখে ওদের বিশ্বাস এ-ভাবে চুরমার হয়ে যেতে লাগলো কেন? কেননা, ওরা দেখলে কোনো রকম জাদু-অনুষ্ঠানের উপর নির্ভর না করেই ইয়োরোপীয়রা ফসল ফলাতে পারছে এবং সে-ফসল গুণ বা পরিমাণ কোনো দিক থেকেই নিকৃষ্ট নয়। তাই খৃস্টান পাত্রীর হাজার বক্তৃতা দিয়েও তাদের মনের যে-বিশ্বাস টলাতে পারেনি ইয়োরোপীয়দের কৃষিকাজপরিদর্শন সে-বিশ্বাসকে উৎপাটিত করতে পারলো। পিউব্লো-ইণ্ডিয়ানদের এই কাহিনীটি থেকেই অনুমান করা যায়, পিছিয়ে-পড়ে-থাকা মানুষদের মনে,—এবং অতএব এগিয়ে-আসা মানুষদের পিছনে-ফেলে-আসা পর্যায়েও,— কৃষিকাজ কতো গভীরভাবে জাদুবিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত এবং জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠানের উপর নির্ভরশীল। অবশ্যই ব্রিফন্ট শুধুমাত্র এই দৃষ্টান্তটির উপরই নির্ভর করেননি। আরো বহু তথ্য সংগ্রহ করে দেখাচ্ছেন, পৃথিবীর পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের মানুষদের কাছে জাদুবিশ্বাসগত অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে কৃষিকাজ একান্তই অসম্ভব।
প্রশ্ন হলো, কেন অসম্ভব? এই ঘটনাটির বাস্তব কারণ ঠিক কী? কৃষি-আবিষ্কারের প্রাথমিক পর্যায়ে জাদুবিশ্বাসের প্রয়োজনীয়তা এমন ঐকান্তিক কেন?
অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর(৩৯৪) বাংলার ব্রত প্রসঙ্গে যা বলছেন সেখান থেকেই আলোচনা শুরু করা যায় :
‘গঙ্গা শুকুণ্ডকু আকাশে ছাই!—সেই সময় বর্ষার জলধারা কল্পনা করে বসুধারা ব্রতের অনুষ্ঠান। এই যে জ্যৈষ্ঠের সারা মাস আষাঢ়ের ছবি মনে জাগিয়ে মানুষ প্রতীক্ষা করছে, এটা বড় কম অবসর নয় আবেগ ঘনীভূত হয়ে নানা শিল্প-ক্রিয়ায় প্রকাশ হবার জন্য।…এমনি প্রায় প্রত্যেক ব্রতেই দেখি, কামনা অনেকদিন পর্যন্ত—কোথাও একমাস, কোথাও দু’মাস—অতৃপ্ত থাকছে চরিতার্থতার পূর্বে। শস্য ফলবার আগেই শস্য উদ্গমের ব্রত আরম্ভ হল এবং শস্যের প্রকৃত উদ্গমের ও কামনার মাঝের দিনগুলো মনের আবেগে নানা কল্পনায় নানা ক্রিয়ায় ভরে উঠে নাট্য, নৃত্য, আলেখ্য, এমনি-সব নানা শিল্পের জন্ম দিতে লাগল।
কথাগুলি ঠিক তবু ঠিক নয়ও। ভাববাদী চিন্তাশীলের পক্ষে বাস্তবকে যতোখানি পর্যন্ত বুঝতে পারা সম্ভব ততোটুকু পর্যন্তই ঠিক। কিন্তু বাস্তবে সম্যক উপলব্ধির জন্যে ভাববাদ ছেড়ে বস্তুবাদীর দৃষ্টিকোণ থেকে ঘটনাটির বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
কথাগুলি কতোটুকু পর্যন্ত ঠিক? কামনা এবং কামনা-সফল-হওয়ার মাঝখানের যে-দীর্ঘ ব্যবধান তাকেই মনের ঘনীভূত আবেগ দিয়ে,—কামনা সফল হওয়ার ছবি দিয়ে,—ভরিয়ে তোলাই হলো ব্রতের উদ্দেশ্য। নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য—এমনি সব নানান উপায়ের উপর নির্ভর করেই মনের ওই ঘনীভূত আবেগকে বাঁচিয়ে রাখবার আয়োজন। অবনীন্দ্রনাথের কথাগুলি ঠিক এবং এই দিক থেকেই ঠিক।
