কিন্তু ঠিক নয়ও। ঠিক নয় এই কারণে যে, অর্ধ-অসহায় পর্যায়ের ওই মানুষগুলির কাছে কামনা আর কামনা-সফল-হওয়ার মাঝখানের ওই দীর্ঘ ব্যবধানটি এক চূড়ান্ত পরীক্ষার মতো। আর তাই, এই সময়টি জুড়ে নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য এমনি সব নানান শিল্পের সাহায্যে মনের আবেগটুকুকে বাঁচিয়ে রাখবার যে-চেষ্টা তার মূলে রয়েছে জীবন-সংগ্রামের নির্মম চাহিদা, অবসর-বিনোদন নয়—এবং সেই কারণেই অবনীন্দ্রনাথ যখন বলছেন ওই ঘনীভূত আবেগের আসল উপাদান হলো অবসর, তখন তাঁর কথা স্বীকারযোগ্য হতে পারে না।
বস্তুত, অবনীন্দ্রনাথের নিজের রচনাতেই স্বীকৃত হয়েছে, জীবনসংগ্রামের যে-পটভূমিতে ব্রতের জন্ম তার সঙ্গে জীবনসংগ্রামের আধুনিক পটভূমির অনেক তফাত এবং এ-তফাতের কথা মনে না রাখলে ব্রতের আদি-তাৎপর্য বোঝা যায় না (৩৯৫) :
অনাবৃষ্টির আশঙ্কা আমাদের যদিই বা এখন কোনোদিন চঞ্চল করে তবে হয়তো ‘হরি হে রক্ষা করো’ বলি মাত্র; কিন্তু ঋতুবিপর্যয়ের মানে যাদের কাছে ছিলো প্রাণ-সংশয়, সেই তখনকার মানুষেরা কোনো অনির্দিষ্ট দেবতাকে প্রার্থনা কেবল মুখে জানিয়ে তৃপ্ত হতে বা নিশ্চিত হতে পারত না; সে ‘বৃষ্টি দাও’ বলে ক্ষান্ত হচ্ছে না; সে বৃষ্টি সৃষ্টি করতে, ফসল ফলিয়ে দেখতে চলেছে।…এখনকার মানুষ এ-রকম বিশ্বাস করে না, ব্রতও করে না।
ব্রত হলো মনষ্কামনার স্বরূপটি। আলপনায় তার প্রতিচ্ছবি, গীতে বা ছড়ায় তার প্রতিধ্বনি; এবং প্রতিক্রিয়া হচ্ছে তার নাট্যে নৃত্যে; এক কথায়, ব্ৰতগুলি মানুষের গীত কামনা, চিত্রিত বা গঠিত কামনা, সচল জীবন্ত কামনা।
ব্রতের স্বরূপটিকে বোঝাবার জন্যে কী অসামান্ত বর্ণনা আকারে যতো ক্ষুদ্রই হোক, না কেন, অবনীন্দ্রনাথের “বাংলার ব্ৰত” ভারতীয় সংস্কৃতির ব্যাখ্যায় মহামূল্যবান গ্রন্থ। কিন্তু সেই সঙ্গেই এ-কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, অবনীন্দ্রনাথের এমন অপরূপ বর্ণনাও একদিক থেকে অসম্পূর্ণ। কেননা, আধুনিক যুগের সঙ্গে ব্রতের যুগের ওই মৌলিক প্রভেদকে স্বীকার করা সত্ত্বেও শেষ পর্যন্ত তিনি আধুনিক শিল্পীর অভিজ্ঞতা দিয়েই ব্রতের শিল্পকে ব্যাখ্যা করতে চাইছেন(৩৯৬):
অতৃপ্তির মাঝে মন দুলছে—এই দোলাতেই শিল্পের উৎপত্তি। কামনার তীব্র আবেগ এবং তার চরিতার্থতা—এ দুএর মাঝে যে একটা প্রকাণ্ড বিচ্ছেদ, সেই বিচ্ছেদের শূন্য ভরে উঠেছে নানা কল্পনায়, নানা ক্রিয়ায়, নানা ভাবে, নানা রসে।…মনের এই, উন্মুখ অথচ উংক্ষিপ্ত নয়, অবস্থাটিই হচ্ছে শিল্পের জন্মাবার অনুকূল অবস্থা। এ সময় মানুষ সুন্দর অসুন্দর বেছে নেবার সময় পায়, যেমন-তেমন করে একটা কিছু করবার চেষ্টাই থাকে না।
তাই অবনীন্দ্রনাথের কাছে মূল কথাটা হলো অবকাশ আর অবসরের কথাই। সে-কথা এ-যুগের শিল্পীর পক্ষে সত্য হতে পারে; কিন্তু ব্রতের বেলায় শুধু এইটুকু বললেই হয় না।
গঙ্গা শুকুশুকু আকাশে ছাই—পৃথিবীর চেহারাটা যখন এই রকমের পুড়ে-খাক-হয়ে যাওয়া তখন আষাঢ়ের জলধারার ছবিটিকে মনের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে ওই অর্ধ-অসহায় মানুষগুলি বাঁচবে কিসের ভরসায়, কেমন করে? তাই এতো রকমের আয়োজন,—নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য; সবই হলো কামনা-সফল হওয়ার ছবিটিকে বাঁচিয়ে রাখবার আয়োজন। আধুনিক মানুষের আধুনিক অভিজ্ঞতার মাপকাঠিতে ব্ৰতগুলির বিচার করতে গেলে ভুল হতে পারে, মনে হতে পারে সুদীর্ঘ অবসর পাওয়া গিয়েছে বলেই বুঝি শিল্প-সম্ভোগ দিয়ে এই অবসরটিকে মধুর করে তোলবার চেষ্টা চলেছে। কিন্তু তা নয়। আমাদের আধুনিক উৎপাদন-কৌশল অনেক উন্নত হয়েছে। তাই অনিশ্চয়তা কম, উৎকণ্ঠার কারণ কম,—মনের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখবার আয়োজনে আমাদের অতোখানি মরীয়া হয়ে উঠতে হয় না। কিন্তু ব্রতের জন্ম উৎপাদন-কৌশলের ইতিহাসের যে-পর্যায়ে তার পটভূমি সম্পূর্ণ অন্য রকম : সময়ের ব্যবধানটা সত্যি বলতে, অবসর নয়, তার বদলে যেন বিশ্বাসের পরীক্ষা। কামনা অনেকদিন পর্যন্ত, কোথাও বা একমাস কোথাও বা দু’মাস, অতৃপ্ত থাকছে। শস্যের কামনায় বীজ বোনা আর শস্য ফলা, ফসল পাওয়া— এ দু’-এর মধ্যে সময়ের সুদীর্ঘ ব্যবধান। সে-ব্যবধানের যেন প্রতিটি মুহূর্ত জুড়ে রয়েছে অনিশ্চয়তা, উৎকণ্ঠা, উদ্বেগ। এই অবস্থায় মনের শক্তিকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কামনা-সফল-হওয়ার ছবিটিকে চোখের সামনে তুলতে দেখা দরকার। আর তা দেখবার জন্যেই ব্রতের মধ্যে অতো রকমের আয়োজন—নৃত্য, নাট্য, আলেখ্য। এগুলিকে তাই সুদীর্ঘ অবসরকে বিনোদিত করবার কৌশল মনে করলে ভুল করা হবে; তার বদলে এগুলি হলো সুতীব্র অনিশ্চয়তা-বোধের হাত থেকে আত্মরক্ষার আয়োজন, মনের বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রাখবার কৌশল,—আর সেইদিক থেকেই জীবন-সংগ্রামের অঙ্গ।
জীবন-সংগ্রামের অঙ্গ কেন? নৃত্যে, নাট্যে, আলেখ্যে ওইভাবে কামনা সফল হওয়ার ছবিটিকে ফুটিয়ে তুলতে পারলে সত্যিই কি বাস্তব পৃথিবীকে প্রভাবিত করা যাবে নাকি? প্রত্যক্ষভাবে নিশ্চয়ই নয়, তবুও পরোক্ষভাবে নিশ্চয়ই। শস্যের কামনায় ব্রত করলেই যে প্রকৃতি শস্যময়ী হয়ে উঠবে, তা নয়। কিন্তু প্রকৃতিকে শস্যময়ী করবার কাজে যারা কোমর বেঁধেছে তাদের বুকের বল অনেকখানি বেড়ে যাবে আর ওই নতুন উদ্দীপনায় নির্ভর করে তারা যখন সত্যিই ফসল ফলাবার কাজে অগ্রসর হবে তখন তারা আরো ভালো করে ফসল ফলাতে পারবে। তাই ওই ব্রতের দরুনই প্রকৃতির উপর একটা পরোক্ষ প্রভাব এসে পড়েই, আর এইদিক থেকেই ব্ৰত সেই অর্ধঅসহায় মানুষগুলির কাছে বাস্তব জীবন-সংগ্রামের অঙ্গই।
