রক্তবর্ণ হলো নবজীবন। তাইজন্যেই দেখা যায়, প্রাচীন প্রস্তর যুগের উচ্চাবস্থার এবং নব্যগ্রস্তর যুগের কবরখানা থেকে পাওয়া হাড়গুলিতে লাল রঙ মাখানো রয়েছে। প্রতীকটির অর্থ আরো স্পষ্ট হয় যখন দেখি,—এবং প্রায়ই তা দেখতে পাওয়া যায়,—কঙ্কালগুলি গুটোনো ভ্রূণাবস্থার ভঙ্গিতে রয়েছে। মৃতের নবজন্ম সুনিশ্চিত করবার আশায় আদিম মানুষেরা এইভাবে তাকে গর্ভস্থ শিশুর মতো কুঁকড়ে এবং জীবনের রঙে রঞ্জিত করে রাখবার চেয়ে বেশি আর কীই বা করতে পারতো?
অধ্যাপক টমসনের রচনা থেকে এই উদ্ধৃতিটুকু আমাদের কাছে বিশেষ মূল্যবান। কেননা আমাদের দেশের নানান রকম আচার-অনুষ্ঠান এবং ধ্যানধারণাকে এইদিক থেকে বোঝবার সুযোগ হতে পারে। আমাদের দেশের সধবারা সিঁথিতে সিঁদুর দেয়, গাণপত্যেরা কপালে রক্ততিলক আঁকে। তান্ত্রিকেরা কাষায় বস্ত্র পরে। ভিল-র জমিতে চাষ করবার আগে একটুকরো পাথরের উপর সিঁন্দুর মাখায়, গণেশচতুর্থী ব্ৰত অনুষ্ঠানটিতেও দেখা যায় সধবা মেয়েরা পরস্পরকে সিঁদুর পরিয়ে দিচ্ছে। বস্তুত, আমাদের দেশে সধবাদের অনুষ্ঠানে সিঁদুরের ব্যবহার ভূয়ঃপ্রচলিত। এর পিছনে একটি আদিম বিশ্বাস লুকোনো আছে; ওই রক্তবর্ণ ঋতুরজের, অতএব নবজন্মের, প্রতীক। ফলে এরই স্পর্শে সধবারা সন্তানবতী হবার কামনাকে সফল করতে চায়। রক্ত ও রক্তবর্ণের এই প্রতীক-তাৎপর্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই আমরা আগেই বলেছি, আনন্দগিরি উচ্ছিষ্ট-গণপতির অনুচরদের বর্ণনায় “রুধিরবাহুল্য” বলে যে-শব্দ ব্যবহার করেছেন তার আদি-তাৎপর্য নিছক বীভৎসতা না হতেও পারে। তান্ত্রিক ধ্যানধারণার আদি-তাৎপর্য বিশ্লেষণের প্রসঙ্গে এই ঋতুরজের আলোচনায় প্রত্যাবর্তন করতে হবে।
বলাই বাহুল্য, আধুনিক-রুচিসম্পন্ন হিন্দুদের কাছে ঋতু-রজের এই জাতীয় আলোচনা কদৰ্য এবং রুচি-গৰ্হিত বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু তাঁরা এই প্রসঙ্গেই কামরূপ-কামাখ্যার কথা মনে রাখতে পারেন। কামাখ্যা যোনি-পীঠ। কালিকাপুরাণ মতে, “কুঞ্জিকা নামক পীঠস্থানে দেবীর যোনিমণ্ডল পতিত হইল। সেই যোনিমণ্ডল পতিত হইয়াই প্রস্তর হইয়াছিল, তাহাই কামাখ্যা দেবী নামে বিখ্যাত হইয়াছে।…এই যোনিমণ্ডলের পরিমাণ দৈর্ঘ্যে ২১ অঙ্গুলি এবং প্রস্থে এক বিতস্তি (১/২ হাত), উহা সিঁদুর ও কুম্কুমাদি লেপিত”(৩৯০)। এই সিঁদুর ও কুমকুমের রহস্যটা বুঝতে পারা যাবে যোগিনীতন্ত্র থেকে : “দেবী কামাখ্যা প্রতিমাসে এই স্থানে রজস্বলা হইয়া থাকেন”(৩৯১)।
অবশ্যই এই কামরূপ কামাখ্যার অঞ্চল থেকে মাতৃপ্রাধান্য আজো সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি(৩৯২)। তাছাড়া প্রবাদ আছে, ওদেশের মেয়েরা জাদু জানে—পুরুষদের ভেড়া করে রেখে দেয়। এ-প্রবাদ যে মাতৃপ্রাধান্য-সূচক সে-বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাই ওই অঞ্চল প্রসঙ্গে এ-জাতীয় ঘটনা খাপছাড়াও নয়। কিন্তু পুরুষ হয়েও হাতে ডালিম-ফল ধরে রাখার মতোই সিঁদুরকে আপন অঙ্গরাগ (গণেশভূষণ) করবার চেষ্টাটা গণেশের পক্ষে নিশ্চয়ই বিসদৃশ ও অশোভন। অর্থাৎ কিনা, এ-কথা বুঝতে পারা যাচ্ছে যে, কৃষিকেন্দ্রিক এই পরিস্থিতিটিতে পুরুষ গণপতির পক্ষে টিকে থাকবার চেষ্টাটা নেহাতই কৃত্রিম। গ্রীকদেবীদের হাতে ওই ডালিম-ফল কৃত্রিম নয়। কেননা, কৃষিআবিষ্কার মেয়েদের কাজ,— প্রাচীনতর পর্যায়ের ধ্যানধারনা অনুসারে মেয়েদের উর্বর-শক্তির প্রভাবেই প্রকৃতির উর্বর-শক্তি বৃদ্ধি পায় এবং মেয়েদের এই উর্বর-শক্তির মূলে আছে ঋতুরজ। স্বভাবতই, কৃষিমূলক পরিস্থিতিতে মেয়ের প্রধান, প্রকৃতি প্রধান— পুরুষ অপ্রধান, উদাসীন।
আর ঠিক সেই কারণেই আমাদের গণপতি যেন এই পর্যায়ে পৌঁছে নিছক পুরুষ হিসেবে আর টিকতে পারছেন না। তার মূর্তির সঙ্গে একটি করে নারীমূর্তিও সংযুক্ত হচ্ছে। তারই নাম শক্তি। গণপতি আর এখন থেকে শুধু গণপতি নন, শক্তি-গণপতি।
এইভাবে আমরা স্বভাবতই ওই পুরুষ দেবতাটিকে ছেড়ে দেবীমাহাত্মের আওতায় এসে পড়তে বাধ্য হলাম। এবং আমরা যে এইভাবে গণপতির সঙ্গ ছাড়তে বাধ্য হলাম তার কারণ আমরা পুরুষ-প্রাধান্যের আওতা থেকে নারী-প্রাধান্যের আওতায় এসে পড়েছি। তাই আলোচনাটা দেবদেবীকে উপলক্ষ্য করে হলেও নারী-প্রাধান্যের আওতায় আমরা যে এসে পড়লাম তার কারণটা আসলে আধ্যাত্মিক নয়—আধিভৌতিকই। অর্থাৎ কিনা, কৃষি-আবিষ্কার। এ-আবিষ্কার মেয়েদের। এ-আবিষ্কারের পর্যায়ে তাই মাতৃ-প্রাধান্য এবং ওই মাতৃ-প্রাধান্যের প্রতিবিম্ব হিসেবেই দেবী-প্রাধান্য।
আমাদের মূল আলোচনার দিক থেকে দেবী রহস্য অনুসন্ধান করবার প্রয়োজন আছে। কেননা তা না হলে তান্ত্রিক ধ্যানধারণার উৎস আমাদের কাছে অস্পষ্ট থাকবে। আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, কৃষি-আবিষ্কারের প্রাকৃত পর্যায়ের মধ্যেই দেবীরহস্য,—তথা তান্ত্রিকাদি ধ্যানধারণাগুলিকেও,–বোঝবার মূলসূত্র পাওয়া যাবে। এবং আজকের দিনে এ-জাতীয় ধ্যানধারণা যতোখানিই বিকৃত বীভৎসতা বলে প্রতীয়মান হোক না কেন, কৃষি-আবিষ্কারের পটভূমিতে বিচার করলে এগুলিকে উদ্দেশ্যমূলক ও জীবন-সংগ্রামের সহায়ক বলেই চিনতে পারা যায়। উৎপাদন-পদ্ধতির উন্নততর পর্যায়ে পৌঁছে মানুষ আজ প্রকৃতিকে ও প্রাকৃতিক নিয়মকানুনকে অনেক বাস্তব আর নির্ভুলভাবে জানতে শিখেছে। সেই উন্নততর জ্ঞানের মানদণ্ডে বিচার করলে নিশ্চয়ই বোঝা যায়, পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের ধ্যানধারণাগুলি কতোখানি ভুল ও কাল্পনিক; কিন্তু ওই পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ের ধ্যানধারণা সম্বন্ধে শুধুমাত্র এইটুকু জ্ঞানই পর্যাপ্ত নয়। কেননা, এই প্রসঙ্গেই আরো একটি প্রশ্ন বাকি থাকে : অতোখানি ভুল আর কাল্পনিক ধ্যানধারণাকেই এককালে আমাদের পূর্বপুরুষের অমন শ্রদ্ধা আর অটল বিশ্বাস নিয়ে আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা কেন করেছিলেন। এ-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেতে পারে, আজকের দিনেও যে-সব মানবদল আমাদের সেই পূর্বপুরুষদের অবস্থায় আটকে পড়ে আছে তাদের বাস্তব অবস্থাটা বিচার করতে পারলে। এই পদ্ধতি অনুসারে অগ্রসর হলে আমরা দেখতে পাই, সে-পর্যায়ের মানুষদের দৈন্য কী রকম ভয়াবহ এবং অনিবাৰ্যভাবেই ভয়াবহ : দৈন্যটা শুধুই জীবনযাপনের উপকরণ সংগ্রহের দিক থেকে নয়, প্রাকৃতিক রহস্যকে অনুমান করবার দিক থেকেও। সে-পর্যায়ের আধা-অসহায় মানুষগুলি প্রকৃতিকে যেটুকু আয়ত্তে এনেছে তার উপর নির্ভর করে এর চেয়ে সচ্ছল জীবন গড়ে তোলা সম্ভবই ছিলো না; এবং প্রকৃতির রহস্য সংক্রান্ত তাদের যেটুকু অন্তদৃষ্টি তাও ওইভাবে প্রকৃতিকে বশে আনবার অনুপাতেই সংকীর্ণ হতে বাধ্য। কিন্তু মানব-উন্নতির কাহিনী সরলরেখার মতো একমুখে একটানা এগিয়ে-যাওয়া নয়; পিছনের পর্যায়কে পিছনে ফেলে আসবার জন্য মানুষকে যে-মূল্য চোকাতে হয়েছে তার গুরুত্বটাও উপেক্ষা করবার নয়। সেই যৌথ-জীবনের পটভূমিতে মানুষের ধ্যানধারণা আর জীবন সংগ্রাম, —জ্ঞান আর কর্ম—দু’-এর মধ্যে প্রভেদ দেখা দেয়নি। এবং জীবন-সংগ্রামের অঙ্গ হিসেবে মানুষের চেতনায় উদিত হয়েছিলো বলেই এই পর্যায়ের ধ্যানধারণা যতোই মূঢ় আর মূক হোক না কেন,–আজকের জ্ঞানের মাপকাঠিতে এই ধ্যানধারণাগুলিকে অসম্ভব আর আজগুবি বলে সনাক্ত করা যতোই সহজসাধ্য হোক না কেন,—এগুলি শেষ পর্যন্ত মাটির পৃথিবীটাকেই আঁকড়ে ধরবার চেষ্টা করেছে, লোকোত্তরবাদের আলেয়ায় ভুলিয়ে মানুষকে পথভ্রান্ত করেনি, মুখর হয়ে ওঠেনি দেহবিহীন আত্মার এক অলীক কাহিনী নিয়ে। তাই ঈশ্বর নয়, স্বৰ্গ-নরক নয়, পরলোক-পরকাল নয়, চেতন-কারণবাদ নয়। এককথায় অধ্যত্মবাদ নয়, ভাববাদ নয়—কেননা, সমাজ-বাস্তবে কর্মজীবন থেকে চেতনা যতোদিন না বিচ্ছিন্ন হচ্ছে ততোদিন সে-চেতনার স্বাধিকার-প্ৰমত্ততার কাহিনী প্রচারিত হবার মতো বাস্তব পরিবেশই সম্ভব হয় না। এবং এই স্বাধিকারপ্রমত্ততার কাহিনীই হলো অধ্যাত্মবাদ আর ভাববাদের সবচেয়ে মৌলিক, সবচেয়ে প্রাথমিক ভিত্তি। সেই প্রাকৃত-পর্যায়ের ধ্যানধারণাগুলি অব্যক্ত, অচেতন ও জ্ঞানের দৈন্যের দিক থেকে ভয়াবহ হলেও মূলতই প্রধানকারণবাদী, বস্তুবাদী এবং দেহাত্মবাদীই। এককথায়, সে-চেতনা লোকায়তিক,—যদিও এই লোকায়তিক চেতনা আমাদের দেশের ইতিহাসে চিরকালই ওই অব্যক্ত, অচেতন ও ভয়াবহ দৈন্যের স্তরে আটকে থাকেনি।
