ট্রাইব্যাল সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ সংক্রান্ত আমাদের ওই প্রকল্পটির পক্ষে আরো একটি আনুষঙ্গিক নজির হলো, আমাদের দেশের ব্রতগুলি। অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৮১) বলেছেন, যোষিৎ-প্রচলিত বা মেয়েলি ব্রতগুলি পুরাণের চেয়ে পুরোনো এবং এগুলি যে আজো আমাদের দেশে টিকে রয়েছে তার কারণ, আমাদের দেশের সদর-মহলের চেহারায় যাই পরিবর্তন হোক না কেন, অন্দরমহলের চেহারায় তেমন পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু এ-কথার তাৎপর্য ঠিক কী? অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর (২৮২) যখন এই ব্রতগুলির তাৎপর্য খুঁজতে গিয়ে আমেরিকার হুইচল জাতি বা মেক্সিকোর অনার্য জাতিদের আচার-আচরণ থেকে মূলসূত্র অনুসন্ধান করেন তখন আর সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, ‘পুরাণের চেয়ে পুরোনো’ কথার বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য হলো সমাজবিকাশের কোনো এক পুরোনো পর্যায়—আমেরিকার হুইচল বা মেক্সিকোর অনার্যরা আজো যে-পর্যায়ে আটকে থেকেছে। তার তাই, আমাদের অন্দরমহলটা এখনো তেমন বদলায়নি—এ-কথার বৈজ্ঞানিক তাৎপর্য হবে, সমাজবিকাশের সে-পর্যায়ের চিহ্ন আমাদের দেশ থেকে পরিপূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি। অর্থাৎ, ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ-বিলোপ সংক্রান্ত আমাদের ওই প্রকল্পই। অবশ্যই, ট্রাইব্যাল-সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের উপর নির্ভর করে ব্রতগুলির আদি-তাৎপর্য উদ্ধারের চেষ্টা অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর সচেতনভাবে নিশ্চয়ই করেননি। তাই ব্রত সম্বন্ধে তাঁর মূল ইঙ্গিতগুলি দুর্মূল্য হলেও এ-বিষয়ে ভবিষ্যত-গবেষকদের পক্ষে গবেষণা করবার প্রচুর অবকাশ থেকে গিয়েছে। অর্থাৎ, ট্রাইব্যাল-সমাজ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা বৈজ্ঞানিক তথ্যের উপর নির্ভর করে অগ্রসর হলে ব্রতগুলির উপর স্পষ্টতর আলোকপাত হবার সম্ভাবনা আছে। আমরা আগেই (২৮৩) আলোচনা করেছি, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর এ-বিষয়ে একটি মূল্যবান ইঙ্গিতকে স্বেচ্ছায় উপেক্ষা করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্রতের একটি বৈশিষ্ট্য হলো, এ-জাতের আচরণ একা-একা করা যায় না—ব্রত তখনই, যখন দশে মিলে এক হয়ে একই কামনা করছে, একই আচরণে অংশ গ্রহণ করছে। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্য ঠিক কেন? অবনীন্দ্রনাথ বললেন, সে-আলোচনা স্বতন্ত্র—সে আলোচনা তাঁর নয়। কিন্তু তাঁরই স্বীকৃতি অনুসারে যদি এই বিষয়টি ব্রতের একটি মূল লক্ষণ হয়ে থাকে তাহলে একে অগ্রাহ্য করে ব্রতের পূর্ণাঙ্গ ব্যাখ্যা পাওয়া যাবে কী করে? আমরা দেখেছি, সমাজ-বিকাশের প্রাচীন পর্যায়ের দিক থেকে এই লক্ষণটি দুর্বোধ্য নয়। বরং, কল্পনায় কামনা-চরিতার্থ করে বাস্তবভাবে কামনা সফল করা,—প্রকৃতিকে জয় করা,—ততোদিনই সম্ভব যতোদিন পর্যন্ত দশের সঙ্গে একের অঙ্গাঙ্গী সম্পর্ক বিলুপ্ত না হয়। এদিক থেকে ব্রতগুলিও একটা আদি-তাৎপর্য নিশ্চয়ই ছিলো। সমাজ-বিকাশের পিছিয়ে-পড়া পর্যায়ে ব্রতগুলি মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সে-পর্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই ব্রতগুলি মানুষকে বাঁচতে সাহায্য করেছে। কিন্তু সে-পর্যায় থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই ব্রতগুলিই আজ যে-ভাবে আমাদের দেশে বেঁচে আছে তা বিচার করে শিল্পের উৎপত্তি প্রভৃতি সমস্যার উপর যতো মূল্যবান আলোকপাতই সম্ভব হোক না কেন, বাস্তব আচার-অনুষ্ঠান হিসেবে—বাস্তব বিশ্বাস হিসেবে—এগুলি আজ দেশবাসীর জীবনে অন্ধ ও অর্থহীন কুসংস্কারের বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
———————
২৬৭. অন্তত বাংলা দেশের ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই তা নয়। এই গ্রন্থের পৃষ্ঠা ৪০০-৪০১ দ্রষ্টব্য।
২৬৮. এ-বিষয়ে সবচেয়ে চিত্তাকর্ষক দৃষ্টান্ত বোধহয় মহামহোমাধ্যায় পঞ্চানন তর্করত্ন প্রণীত ব্রহ্মসূত্রের শক্তিভাষ্য।
২৬৯. H. S. Maine VCEW Lectures 1 and 2.
২৭০. Ibid. 20.
২৭১. Ibid. 39.
২৭২. Ibid. 52.
২৭৩. Quoted in LPI 131.
২৭৪. K. Marx C 358.
২৭৫. H. S. Maine op. cit. 55-6
২৭৬. Ibid. 21-2. মেইন অবশ্যই ট্রাইব্যাল শব্দ ব্যবহার করছেন না; তার বদলে বলছেন, “India, because it is the great repository of verifiable phenomena of ancient usage and ancient judicial thought…”
২৭৭. Ibid. 57-8.
২৭৮. Ibid. 53-4.
২৭৯. Ibid.
২৮০. Ibid. 13-4.
২৮১. অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর : বাংলার ব্রত ৩ এবং ৯।
২৮২. ঐ ১৮-২৩।
২৮৩. ঐ ৮।
২২. আয়ুধজীবী গণ ও বার্তাশস্ত্রোপজীবী গণ
ব্যাপক অর্থে যে-ধ্যানধারণাগুলিকে আমরা লোকায়তিক বা তান্ত্রিক আখ্যা দিয়ে থাকি সেগুলির বেলাতেও একই কথা। গ্রাম-সমবায়, জাতপ্রথা, লোকাচারমূলক আইনকানুন আর ব্রতের বেলায় যে-রকম,–সেই রকমই। বস্তুত, ওই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলির উৎস ও আদিতাৎপর্য অনুসন্ধান করবার উদ্দেশ্যে এগিয়েই আমরা এই অন্যান্য বিষয়গুলির আলোচনায় বিক্ষিপ্ত হয়েছিলাম; কেননা, যে মূল-প্রকল্পের উপর নির্ভর করে আমরা এই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলিকে চেনবার চেষ্টা করেছি সেইটি্র ব্যাখ্যা এবং সেটির পক্ষে আনুষঙ্গিক নজির দেখাবার তাগিদ ছিলো।
আমরা বলেছি, ট্রাইব্যাল সমাজেরই কোনো এক পর্যায়ের মধ্যে এই তান্ত্রিক ধ্যানধারণাগুলির উৎস আবিষ্কার করবার সম্ভাবনা আছে।
অতএব আমরা আমাদের পদ্ধতি অনুসারে প্রথম প্রশ্ন তুলবো : ট্রাইব্যাল-সমাজের পর্যায়-ভেদ সম্বন্ধে সাধারণভাবে জানতে পারা তথ্য বলতে ঠিক কী বোঝায়? বর্তমান পৃথিবীর নানা জায়গায় এখনো যে-সব ট্রাইব টিকে রয়েছে সেগুলির বাস্তব অবস্থা পর্যালোচনা করলে এ-প্রশ্নের জবাব পাওয়া যেতে পারে।
অধ্যাপক জর্জ টম্সন (২৮৪) দেখাচ্ছেন, খাদ্য আহরণ ও খাদ্য-উৎপাদনের সবচেয়ে মৌলিক ব্যবস্থার দিক থেকে আজকের পৃথিবীর ট্রাইবগুলিকে নিম্নোক্ত পর্যায়ে ভাগ করা যায় :
