১): শিকার-জীবী। দুটি স্তর।
নিম্নস্তরের শিকার-জীবীরা ফলমূল আহরণ করে এবং পশু শিকার করে নিজেদের খাদ্যসরবরাহের ব্যবস্থা করে। উচ্চ-স্তরের শিকার-জীবীরা পশু শিকার ছাড়াও মাছ ধরতে শিখেছে। নিচুস্তরে শিকারের অস্ত্র বলতে বর্শা, উঁচুস্তরে বর্শা ছাড়াও তীর-ধনুক। তাছাড়া, এই উঁচুস্তরটিতে হাঁড়িকুড়ি তৈরি, কাপড় বোনা ও পশুকে পোষ-মানাবার কিছু কিছু পরিচয় পাওয়া যায়।
২): পশুপালন-জীবী। দুটি স্তর।
দ্বিতীয় স্তরটিতে পশুপালন ছাড়াও কিছুকিছু চাষবাসের পরিচয় পাওয়া যায়।
৩): কৃষিজীবী। তিনটি স্তর।
তৃতীয় স্তরের বৈশিষ্ট্য হলো, কোদাল দিয়ে ছোটো জমিতে চাষ করবার চেষ্টা ছাড়িয়ে রীতিমতো বড়ো ক্ষেত লাঙল দেবার ব্যবস্থা এবং চাষবাসের সঙ্গে পশুপালনও।
অধ্যাপক জর্জ টম্সন (২৮৫) দেখাচ্ছেন, পশুপালনের উচ্চ স্তর এবং কৃষির তৃতীয় স্তর থেকে কারিগরি, স্থায়ী আবাস-স্থাপন এবং ধাতুর কাজ বহুলভাবে বাড়তে থাকে এবং ফলে এই দুটি স্তর থেকেই দেখা যায়, অকৃত্রিম ট্রাইব্যাল-সংগঠনে ভাঙন ধরছে।
মনে রাখা দরকার, পৃথিবীর সব-মানুষই যে আগে পশুপালনজীবী ও তারপর কৃষিজীবী হয়েছে তা নয়। মানবজাতির সব-শাখাই অবশ্য শুরু করেছে শিকারজীবী হিসেবে; তারপর কোনো শাখা এগিয়েছে পশুপালনের দিকে আবার অপর-কোনো শাখা কৃষিকাজের দিকে। এই রকম তফাত কেন? প্রধানতই প্রাকৃতিক পরিবেশের দরুন : পশুবহুল পরিবেশের মানুষেরা স্বভাবতই পশুপালনের দিকে এগিয়েছে, স্বভাব-উর্বর বুনো শস্যবহুল পরিবেশের মানুষেরা এগিয়েছে কৃষিকাজের দিকে (২৮৬)।
ট্রাইব্যাল সমাজে ভাঙন ধরবার পর? শ্রেণীসমাজ। রাষ্ট্রব্যবস্থা।
সভ্যমানুষদের প্রাগৈতিহাসিক অতীত প্রসঙ্গে আমরা ইতিপূর্বে মর্গান-কৃত পর্যায়-বিভাগের উল্লেখ করেছি। তাঁর পরিভাষায়, বর্বর-দশার মধ্য স্তরের পর থেকেই অকৃত্রিম ট্রাইব্যাল সংগঠনে ভাঙন শুরু হয়—শুরু হয় শ্রেণীবিভাগের সূচনা। কেন হলো? তার কারণ, কোথাও বা পশুপালনের উন্নতি এবং কোথাও বা কৃষিকাজের উন্নতি। পশুপালনের উন্নতির ফলেই কী ভাবে নতুন শ্রেণীবভক্ত সমাজের সূচনা হয় তার দৃষ্টান্ত হিসেবে এঙ্গেলে্স্ (২৮৭) আর্যজাতির কথা উল্লেখ করছেন। এঙ্গেল্স্-এর সময়ে সিন্ধুসভ্যতার ধ্বংসাবশেষ আবিষ্কৃত হয়নি। আধুনিক প্রত্নতত্ত্ববিদেরা (২৮৮) বলছেন, প্রাচীন মিশরের মতোই এই সিন্ধুসভ্যতার ঐশ্বর্যের ভিত্তি ছিলো কৃষির উন্নতি।
তাহলে, ভারতবর্ষের ইতিহাসেই আদিম-সমাজে ভাঙন ধরবার দুটি ধারার পরিচয় পাওয়া যায় : এক, বৈদিক মানুষদের জীবনে পশুপালনের উন্নতি ট্রাইব্যাল-সমাজে ভাঙন নিয়ে এলো। দুই, হরপ্পা-মহেনজোদারোর মানুষদের জীবনে কৃষির উন্নতি নগর সভ্যতা ও রাষ্ট্রের ভিত্তি স্থাপন করলো।
অধ্যাপক গর্ডন-চাইল্ড-ও (২৮৯) বৈদিক সাহিত্যের আভ্যন্তরীণ তথ্য পর্যালোচনা করে যে-সিদ্ধান্তে আসছেন সেই সিদ্ধান্ত অনুসারে মানতে হবে, যারা বৈদিক সাহিত্য রচনা করেছিলো, তারা পশুপালনের দ্বিতীয় পর্যায়টিতেই জীবন ধারণ করতো। এই পর্যায়টি হলো প্রাক্-বিভক্ত সমাজ এবং শ্রেণী-সমাজের সীমারেখে—একদিকে আদিম ট্রাইব্যাল সমাজ ভেঙে যাচ্ছে, আর একদিকে জন্ম হচ্ছে নতুন সমাজের। এর পরও বৈদিক মানুষদের জীবনে ট্রাইব্যাল-সমাজের যে-সব চিহ্ন পড়ে থেকেছে সেগুলি ফাঁপা কাঠামোর মতো।
সংক্ষেপে : ট্রাইব্যাল-সমাজ ছেড়ে শ্রেণী সমাজের দিকে অগ্রসর হবার দুটি পথ। এই দুটি পথকে পশুপালনের পথ ও কৃষিকর্মের পথ বলা যায়।
অবশ্যই বৈদিক মানুষেরা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে এসেছিলো কি না সে-প্রশ্ন নিয়ে বিশেষজ্ঞ-মহলে মতান্তর আছে। যদি শেষ পর্যন্ত এই কথাই প্রমাণিত হয় যে বৈদিক মানুষেরা ছিলো আদি অকৃত্রিম ভারতবাসী, এবং ভারতবর্ষ থেকেই এই আর্যদের কোনো কোনো শাখা প্রাচীন ইরান হয়ে প্রাগৈতিহাসিক ইজিয়ার দিকে অগ্রসর হয়েছিলো, (২৯০) তাহলে মানা যাবে ভারতবর্ষের বুকেই আদিম সমাজ ছেড়ে শ্রেণীসমাজের দিকে অগ্রসর হবার দুটি পথেরই পরিচয় রয়েছে : বৈদিক মানুষের বেলায় প্রথম পথটির এবং সিন্ধুসভ্যতার প্রবর্তকদের বেলায় দ্বিতীয় পথটির। কিন্তু ভারতবর্ষে আর্যোদয় সংক্রান্ত সবচেয়ে প্রচলিত মতটিই যদি শেষ পর্যন্ত অভ্রান্ত বলে প্রমাণিত হয়,–অর্থাৎ, শেষ পর্যন্ত যদি এই কথাই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, বৈদিক মানুষেরা ভারতবর্ষের বাইরে থেকে এসে এখানে উপনিবেশ স্থাপন করেছিলো,–তাহলে স্বীকার করতে হবে উপরোক্ত প্রথম পথে ভারতবর্ষের বুকে রাষ্ট্রের আবির্ভাবের নজির এখনো পাওয়া যায়নি।
আমাদের পক্ষে এখানে ওই আলোচনা নিয়ে বেশিদূর অগ্রসর হবার উপায় নেই। কিন্তু এই দুটি পথের পার্থক্যের কথা মনে রাখা আমাদের পক্ষে বিশেষ প্রয়োজন। এবং এ-কথাও মনে রাখা প্রয়োজন যে, ভারতবর্ষের বুকের উপর পশুপালনের পথ ধরে সভ্যতার দিকে অগ্রসর হবার নিজির যদিও বা সুপ্রমাণিত হয় তাহলেও মানতে হবে আপেক্ষিকভাবে সে-পথটার গুরুত্ব অনেক কম। ভারতবর্ষ কৃষিপ্রধান দেশ, পশুপালন-প্রধান নয়—যদিও অত্যন্ত বিস্তৃত দেশ বলেই এখানে পশুপালনের নজিরও অসম্ভব নয়।
অতএব আমরা বিশেষ করে এই দ্বিতীয় পথটির দিকেই দৃষ্টি আবদ্ধ রাখবো।
এই পথটির কথা বিশেষভাবে মনে রাখলে খাদ্য-আহরণ ও খাদ্য উৎপাদনের দিক থেকে অকৃত্রিম ট্রাইব্যাল-সমাজের দুটি পর্যায়ের কথা স্বীকার করা দরকার। এক, শিকার-জীবী; দুই, প্রাথমিক কৃষিজীবী—অর্থাৎ, কৃষিজীবিকার বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্য স্তর—কেননা, কৃষিজীবিকার উচ্চ স্তর থেকেই অকৃত্রিম ট্রাইব্যাল সমাজের ভাঙন শুরু।
এবার এই তথ্যগুলিকে সাধারণভাবে জানতে-পারা সত্য হিসেবে গ্রহণ করে দেখা যাক, প্রাচীন পুঁথিপত্রের কোনো কোনো উক্তিকে নতুন করে বোঝবার সুযোগ হয় কিনা।
