পুরো পৃথিবীর বুক-জুড়ে সব মানুষই সমান তালে এগিয়ে চলেনি। অথচ, এগিয়ে-চলার পথটা সব মানুষের পক্ষেই সমান। যে-পথে পরের পর কয়েকটি নির্দিষ্ট ও অনিবার্য পর্যায় আছে। তাই পৃথিবীর আনাচে-কানাচে আজো যে-সব মানবদল অগ্রগতি-পথের প্রাকৃত পর্যায়ে পড়ে আছে, তাদের অবস্থা পরীক্ষা কুরলে আজকের এগিয়ে-আসা মানুষদের ভুলে-যাওয়া অতীতটার কথাও অনুমান করবার সুযোগ থাকে। এবং এই অনুমানের ভিত্তিতেই প্রাচীন পুঁথিপত্রের কোনোকোনো অত্যন্ত দুর্বোধ্য উক্তিও বুঝতে পারা হয়তো অসম্ভব নয়; কেননা, এগুলি সেই আদিম পর্যায়ের চেতনার স্মারকচিহ্ন হতে পারে। বৈদিক সাহিত্যে বামাচারের চিহ্নগুলিকে আপাতদৃষ্টিতে ভয়ংকর ও অর্থহীন মনে হলেও আমাদের এই পদ্ধতির সাহায্যে সেগুলির আদি-তাৎপর্য অনুসন্ধান করবার চেষ্টা করা যেতে পারে।
এই পদ্ধতি অনুসারে অগ্রসর হয়েই আমরা ট্রাইব্যাল-সমাজের আলোচনায় গিয়ে পড়েছি। কেননা, মানুষের অগ্রগতির প্রাকৃত পর্যায়ের সমাজ-সংগঠন বলতে ওই ট্রাইব্যাল-সমাজের সংগঠনই। কিন্তু আজকের দিনে আমাদের পক্ষে এই ট্রাইব্যাল-সমাজের মূল লক্ষণটিকে সম্যকভাবে বুঝতে পারা সহজসাধ্য নয়। কেননা, আমাদের সমাজ-জীবনের সঙ্গে এর একেবারে গুণগত পার্থক্য আছে। আমরা বাস করি শ্রেণীবিভক্ত সমাজে, আমাদের চিন্তার কাঠামোটি শ্রেণীবিভক্ত সমাজের বৈশিষ্ট্য দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হয়। ট্রাইব্যাল-সমাজের আদি ও অকৃত্রিম রূপটির মধ্যে শ্রেণীবিভাগের চিহ্ন ফুটে ওঠেনি; সে-সমাজের মানবজীবন একান্তভাবেই যৌথজীবন। তাই রাষ্ট্র-ব্যবস্থা নেই, শাসক-শাসিতে তফাত নেই, ব্যক্তিগত-সম্পত্তি নেই, আধুনিক এক-বিবাহমূলক নরনারী-সম্পর্ক বা পরিবার-জীবন নেই। ফলে শ্রেণীসমাজ-লালিত আমাদের চিন্তা-চেতনার সাহায্যে আমরা ওই প্রাক্-বিভক্ত সমাজের বৈশিষ্ট্যকে সহজে উপলব্ধি করতে পারি না।
অবশ্যই, এই প্রাক্-বিভক্ত সমাজেরও একটা ইতিহাস আছে। ট্রাইব্যাল-সমাজের সমস্ত মানুষই এক-পর্যায়ে বাস করে না। জীবন ধারণের উপকরণগুলিকে সংগ্রহ ও উৎপাদন করবার দিক থেকে ট্রাইব্যাল-সমাজকেও বিভিন্ন পর্যায়ে ভাগ করা হয়। ওই পর্যায়গুলির কোনোটির মধ্যেই বামাচারী, তথা লোকায়তিক চিন্তা-চেতনার উৎস। সেই পর্যায়টি ঠিক কী,
এবং সে-পর্যায়ে কেন এই জাতীয় চিন্তাচেওনার জন্ম হয়েছিলো,—অর্থাৎ, এই ধ্যানধারণাগুলি সে-পর্যায়ে কোন ধরনের উদ্দেশ্য সাধন করতে চেয়েছে,—এই প্রশ্নটির আলোচনা এখনো বাকি আছে। কিন্তু সে-আলোচনা তোলবার আগে আর একটি প্রশ্ন ওঠে এবং উক্ত-প্রশ্নের মীমাংসা হিসেবেই আমরা ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ সংক্রান্ত প্রকল্প বা হাইপোথেসিসের উল্লেখ করেছি—যদিও তা করতে গিয়ে আমাদের মূল যুক্তি থেকে অনেক দূর বিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে।
প্রশ্নটা ঠিক কী?
ব্যাপক অর্থে আমরা যাকে তান্ত্রিক ধ্যানধারণা বলি আমাদের দেশে আজো তা প্রভাব অনেকাংশেই অক্ষুণ্ণ রয়েছে। আজকের দিনে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপকেরা অদ্বৈতবাদ নিয়ে যতোই উৎসাহ দেখান না কেন, তান্ত্রিক মতবাদের তুলনায় বৈদান্তিক মতবাদের প্রভাব ভারতীয় চিন্তাধারার ইতিহাসে সত্যিই ব্যাপকতর বা গভীরতর কি না তা ভালো করে ভেবে দেখবার দরকার আছে (২৬৭)। আবার, আধুনিক পণ্ডিতমহলেই কখনো কখনো চোখে পড়ে তন্ত্রের সঙ্গে বেদান্তের সমন্বয় খোঁজবার চেষ্টা করা হয়েছে (২৬৮)। এই চেষ্টা অবশ্যই কৃত্রিম। কেন কৃত্রিম,—সে আলোচনা পরে তোলা হবে। আপাতত আমাদের বক্তব্য হলো, বিশেষ করে দেশের পিছিয়ে-পড়া অঞ্চলগুলিতে এবং সমাজের নিচুস্তরের মানুষদের মধ্যে নানান সম্প্রদায় হিসেবে নানা রকম নামের অন্তরালে ওই তান্ত্রিক ধ্যানধারণারই বিকাশ চোখে পড়ে এবং সেগুলিকে পরীক্ষা করলে বোঝা যায় আমাদের দেশে এ-জাতীয় ধ্যানধারণার প্রভাব কতো ব্যাপক ও গভীর।
কিন্তু এইখানে একটা সমস্যা ওঠে। কেননা, মানুষের চিন্তা-চেতনা স্বয়ম্ভূ নয়, স্বাবলম্বী নয়, স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়। তার উৎসে আছে মানুষের মূর্ত সমাজ-জীবন। এই কারণেই মানুষের ধ্যানধারণাকে খিলানের সঙ্গে তুলনা করা হয়, সে-খিলানের ভিত্তি-স্তম্ভ বলতে বাস্তব সমাজ-জীবন।
তাই প্রশ্ন ওঠে, প্রাচীন সমাজ যদি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে থাকে তাহলে সে-সমাজেরই কোনো এক পর্যায়-প্রসূত চিন্তাচেতনার প্রভাব আজো এদেশে এতো ব্যাপক ও গভীরভাবে কী করে টিকে থাকতে পারলো? প্রশ্নটা বিশেষ করে প্রাসঙ্গিক এই কারণে যে,—আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো,—আলোচ্য ধ্যানধারণার আদিরূপটি শুধুমাত্র আমাদের দেশের চেতনাতেই প্রতিভাত হয়নি; অন্যান্য দেশের মানুষেরাও ক্রমোন্নতির কোনো এক পর্যায়ে মূলত এই রকম ধ্যানধারণাকেই সত্য বলে মনে করেছিলো। তার কারণ, অন্যান্য দেশের মানুষরাও একটা সময়ে প্রাচীন-সমাজের ওই একই পর্যায়ে জীবন-যাপন করেছে।
কিন্তু উত্তরযুগে তাদের চেতনা থেকে উক্ত ধ্যানধারণার প্রভাব মুছে গিয়েছে। কেননা, তারা ট্রাইব্যাল-সমাজকে পিছনে ফেলে এগিয়ে এসেছে, তাদের মূর্ত সমাজ-জীবন থেকে বিলুপ্ত হয়েছে ট্রাইব্যাল-সমাজের চিহ্ন।
আমাদের দেশে যদি দেখা যায় ট্রাইব্যাল-সমাজ প্রসূত ওই ধ্যানধারণাগুলির প্রভাব সম্পূর্ণভাবে বিলুপ্ত হয়নি তাহলে সন্দেহ করবার অবকাশ থাকে যে, আমাদের দেশের সমাজ ব্যবস্থারও একটি বৈশিষ্ট্য হলো, ট্রাইব্যাল-সংগঠনের প্রকৃতি এদেশ থেকে মাত্র অসম্পূর্নভাবে বিলুপ্ত হয়েছে।
তাই আমরা ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপ সংক্রান্ত ওই প্রকল্পটির আশ্রয় গ্রহণ করেছি। এবং এই প্রকল্প যে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন নয় তা দেখাবার আশাতেই আমরা গ্রাম-সমবায় ও জাতিভেদ-প্রথার বহিঃরেখা নিয়ে কিহচুটা আলোচনা তুলতে বাধ্য হলাম। সে-কারণে আমাদের আলোচনা অবশ্যই অনেকখানি বিক্ষিপ্ত হলো; কিন্তু আমাদের মূল যুক্তির দিক থেকে তার প্রয়োজন ছিলো। কেননা, সাবেকী ভারতবর্ষের সমাজ-সংগঠনের মূল বৈশিষ্ট্য বলতে ওই গ্রাম-সমবায় ও জাতিভেদ-প্রথাই।
এই দুটি বিষয়ের আলোচনা করতে গিয়েই আমাদের চোখে পড়েছে,উৎপাদন-কৌশলের উন্নতির দরুন স্বাভাবিকভাবে ট্রাইব্যাল-সমাজ ভেঙে নতুন সমাজ গড়ে ওঠবার বদলে, বাইরের আক্রমণে ট্রাইব্যাল-সমাজের গণবন্ধন ভেঙে ও স্বাধীনতা অপহরণ করে, কৃত্রিমভাবে সেই সমাজের মানুষগুলিকে নিয়েই ছোটোছোটো স্বয়ংসম্পূর্ণ গ্রাম-সমবায় প্রতিষ্ঠা করবার ফলে, একদিকে যেমন আমাদের দেশে উত্তরকালেও ট্রাইব্যাল-সমাজের ভগ্নাবশেষ বহুল পরিমাণেই টিকে থেকেছে, আবার অপর দিকে তেমনিই এই চিহ্নগুলির আদি-তাৎপর্য ট্রাইব্যাল-সমাজের মূল প্রাণশক্তি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পর্যবসিত হয়েছে নিজেদের বিপরীতে : ট্রাইব্যাল-সমাজের পটভূমিতে যা ছিলো বাঁচবার সহায়, ট্রাইব্যাল-সমাজের থেকে উৎপাটিত হয়ে নতুন পরিবেশে স্থানান্তরিত হবার পর, ট্রাইব্যাল-সমাজের প্রাণশক্তি দ্বারা সেগুলি আর লালিত হতে পারেনি। ফলে, সেগুলির আদিতাৎপর্য বিপরীতে পর্যবসিত হলো! যা ছিলো উদ্দেশ্যমূলক,—জীবনের সহায়,—নতুন পরিস্থিতিতে তাই হয়ে দাঁড়ালো উদ্দেশ্য-বিরুদ্ধ বিকৃতি,—জীবনের পরিপন্থী।
ধ্যানধারণাগুলিকে খিলানের সঙ্গে তুলনা করা হয়—যে-খিলানের ভিত্তিস্তম্ভ হলো সমাজ-বাস্তব।
অতএব, ভিত্তিস্তম্ভের বেলায় যে-কথা, খিলানের বেলাতেও তাই। অর্থাৎ, ধ্যানধারণার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যাল-সমাজের অসম্পূর্ণ বিলোপের একই পরিণাম দেখতে পাওয়া যায়। ট্রাইব্যাল-সমাজের যে-পর্যায়ে ওই বামাচারী চেতনার উৎস সেই পর্যায়ের পটভূমিতে এগুলিকে উদ্দেশ্যহীন কামবিকার বা ব্যভিচারমাত্র মনে করবার কারণ নেই। বস্তুত, আমরা একটু পরেই দেখতে পাবো, সমাজ-বিকাশের সেই পর্যায় থেকে উৎপাটিত হয়ে নতুন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে গিয়ে এগুলিই হয়ে দাঁড়ালো অর্থহীন, উদ্দেশ্যহীন, বিকৃত, বীভৎসতামাত্র। সেই বীভৎসতারই পরিচয় পাওয়া যায় তান্ত্রিক সম্প্রদায়গুলির লিখিত দলিলে, অর্থাৎ তন্ত্রসাহিত্যে। তান্ত্রিক পুঁথিগুলি সম্বন্ধে আধুনিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মনোভাব যে কী রকম তার উল্লেখ আমরা ইতিপূর্বেই করেছি, এবং এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহের অবকাশ নিশ্চয়ই আছে যে, তন্ত্রসাহিত্যে,—অর্থাত, তান্ত্রিক সম্প্রদায়ের লিখিত অভিব্যক্তির মধ্যে,—ওই ধ্যানধারণাগুলির আদি-তাৎপর্য অক্ষুণ্ণ অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায় কি না। আমরা দেখাবার চেষ্টা করবো, তা পাওয়া যায় না। কিন্তু তার আগে আমাদের যুক্তির দিক থেকে সাধারণভাবে এ-কথা দেখানো দরকার, ট্রাইব্যাল-সমাজের বিলোপ অম্পূর্ণ হবার দরুন আমাদের দেশের ইতিহাসে ধ্যানধারণার ক্ষেত্রেও ট্রাইব্যাল-সমাজের স্পষ্ট স্মারক টিকে থেকেছে।
প্রধানত দুটি দৃষ্টান্তের সাহায্যে আমরা এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করয়াব্র চেষ্টা করবো : ১) দেশের আইনকানুনের কথা, ২) ব্রতকথা।
