খেয়াল করে দেখেন একটা জিনিস। আপনি ২ সেকেন্ড শুনে যেই সমাধানটা দিচ্ছেন, সেটা কি ওই মানুষটা ২ মাস চিন্তা করে বের করতে পারেনি? অবশ্যই পেরেছে। সে সমাধান জানে। কিন্তু, সে খালি আপনার কাছে একটু ভেন্ট করতে চাচ্ছে, কথা বলে হালকা হতে চাচ্ছে। এবং এটাই হচ্ছে অনেক মানুষের স্বভাব।
মানুষ অনেক সময় সমাধান জানলেও, সমস্যা নিয়ে কথা বলতে চায়। কারণ, তারা সমাধান নয়, শ্রোতা চায়।
*
বার্তাবাহক
আমি বলি, আপনি বলেন আর অন্য কেউ বলুক, দুই যোগ দুই সব সময়ই চার হবে। এটা কে বলছে, তাতে কিছুই যায় আসে না। অর্থাৎ, আমাদের কথার সত্যতার সাথে আমাদের পরিচয়ের আসলে কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু, তবুও আমরা একটা সম্পর্ক তৈরি করে ফেলি। আমাদের সাইকোলজি বার্তার সাথে বার্তাবাহককে যুক্ত করে ফেলে। উদাহরণ দেই।
সিমেন্টের বিজ্ঞাপনে কন্ট্রাকশন সাইটে অভিনেতাকে একটা হলুদ হেলমেট আর সেফটি ভেস্ট পরিয়ে স্ক্রিপ্ট পড়ানো হবে যে, তমুক সিমেন্ট সেরা সিমেন্ট! আমি, আপনি সবাই জানি যে অভিনেতা ইঞ্জিনিয়ার না। কিন্তু, মানুষ সিমেন্টের কথা শুনতে চায় ইঞ্জিনিয়ারের মত দেখতে একজন মানুষের কাছে। একইভাবে বাচ্চাদের মিল্ক পাউডারের বিজ্ঞাপনে মডেল যেই হোক না কেন, একটা ডাক্তারের অ্যাপ্রন পরে পণ্যের গুনগান করলে আমরা শুনি। বাচ্চাদের বিজ্ঞাপনে মডেলদের সাধারণত শাড়ি পরানো হয়, কারণ মা হিসেবে মানুষ শাড়ি পরা একজন নারীকে বিজ্ঞাপনে দেখতে অভ্যস্ত। তাই ব্যাপারটা খেয়াল করেছেন? কোনো কথার সত্যতার চেয়ে আমরা বেশি। গুরুত্ব দেই যে কে কথাটা আমাদেরকে বলছে। কোনো সেলেব্রিটি যিনি নিজে যেই পণ্য কখনও ব্যবহার করেননি, সেই পণ্যের কথা বললেও মানুষ পণ্যটা কিনবে।
এটা আমাদের সীমাবদ্ধতা। কিন্তু, আমাদের মনে রাখতে হবে যে, আমরা আসলেও মানুষকে কিছু বলতে চাই; তাহলে কী বলছি সেটার চেয়েও বশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হচ্ছে বিষয়টা কাকে দিয়ে বলাচ্ছি।
*
কাজের কথায় কমিউনিকেশন
কিছু মানুষের সাথে কথা বললেই তারা কাজ ধরিয়ে দেয়। এমন মানুষের কাছ থেকে সবাই লুকিয়ে থাকতে চায়। এখন প্রশ্ন হলো, আপনি কি ওই মানুষটা, যার সাথে কথা বললেই কাজ ধরিয়ে দেয়?
খেয়াল করে দেখুন একটু। নিজেকে পরীক্ষা করে দেখতে পারেন। আপনার আশপাশের মানুষের সাথে শেষ দশবার যেই কথা হয়েছে, তার মধ্যে কয়বার আপনি কাজ নিয়ে কথা বলেছেন?
আমি এটা বলছি না যে, কাজের সময় কাজ নিয়ে কথা না বলে আড্ডা দেবেন। মোটেও এটা বলছি না। কিন্তু, কাজের বাইরে দেখা হলেও যদি কাজ নিয়ে কথা বলেন, তাহলে কিন্তু বিপদ। কারণ, আপনি চাচ্ছেন কাজ নিয়ে এগোতে। কিন্তু, অন্যরা কাজের কথা না শুনতে চেয়ে যদি আপনার কাছ থেকে পালিয়ে বেড়ায়, তাহলে কাজ তো আরও গোল্লায় যাবে। তাই, নিজের ক্ষেত্রেই একটু নজর রাখবেন যেন আপনি মানুষকে এতটা বিরক্ত না করে ফেলেন যে তারা আপনার সাথে লুকোচুরি খেলা শুরু করে!
*
লাভের চেয়ে বেশি ক্ষতি
মানুষের একটা সহজাত প্রবৃত্তি হলো, একই পরিমাণ লাভের চেয়ে লোকসানকে সে বেশি ভয় পায়।
| বইটি পড়ে রিভিউ করলে আজই ১০০ টাকা জিততে পারেন! | বইটি পড়ে রিভিউ না করলে আজই ১০০ টাকা খোয়াতে পারেন! |
উপরের দুটো অপশনের মধ্যে অধিকাংশ মানুষ দ্বিতীয় অপশনের দ্বারা বেশি প্রভাবিত হবেন। এমন অনেক সার্ভে করা হয়েছে। একটা উদাহরণ। দিয়ে বলি।
একটা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলা হয়েছে যে, জিতলে ৫০ টাকা পাবেন, হারলে ৫০ টাকা দিবেন। সমান সমান জেতা হারার ব্যাপার থাকলেও মানুষ রিস্ক নিতে চায় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে। তাই তারা চ্যালেঞ্জটা করে না। এমনকি জিতলে ৮০ টাকা আসবে, হারলে ৫০ টাকা যাবে–এমন অবস্থাতেও অনেকে চ্যালেঞ্জটা গ্রহণ করেন না। এর মানে হচ্ছে মানুষকে লাভের চেয়ে ক্ষতির কথা বলে বেশি প্রভাবিত করা যায়। এটাকে সাইকোলজির ভাষায়। বলে লস অ্যাভারশন প্রিন্সিপল (Loss Aversion Principle)।
তাই, অনেক বিজ্ঞাপনে দেখবেন লাভের কথা না বলে ক্ষতির কথা বলে মানুষকে কিনতে প্রভাবিত করা হয়। যেমন :
তমুক ব্র্যান্ডের আটা খেয়ে শরীরকে রাখুন ইয়াং! না বলে হয়তোবা বিজ্ঞাপনে বলা হবে, বিভিন্ন বার্ধক্য রোগ থেকে নিজেকে বাঁচাতে তমুক ব্র্যান্ডের আটা খান!
আমাদের টুথপেস্ট ব্যবহার করলে আপনার দাঁত সুন্দর থাকবে। না বলে হয়তোবা বলবে, আমাদের টুথপেস্ট ব্যবহার না করলে আপনার দাঁতে হবে ক্যাভিটি!
*
কীভাবে স্যরি বলবেন
আমাদের মা একটা কথা বলেন, খালি চামড়ার মুখ দিয়ে বললেই স্যরি হয়ে যায় না।
একদম সত্য। আসলে স্যরি যতটা না বলার জিনিস, তার চেয়ে বেশি করে দেখানোর ব্যাপার। এজন্য বলা হয় যে, মুখে স্যরি আসল স্যরি না, অপরাধবোধ থেকে একই ভুল রিপিট না করাটাই আসল স্যরি।
স্যরি বলতে অনেকে লজ্জা পান। কিন্তু আসল সত্য হল, নিজের ইগোটাকে সাইডে রেখে যারা স্যরি বলতে পারে, তারাই অতীতকে পেছনে ফেলে সামনে এগোতে পারে। মুহূর্তের সংকোচ যেন সারাজীবনের বোঝা না হয় আমাদের। এখন কিছু ব্যাপার স্যরি বলার সময় একটু ঠিক রাখা দরকার।
১. স্যরি বললে সরাসরি বলেন। ফোনের মাধ্যমে স্যরি বলাটা খুব একটা গ্রহণযোগ্য হয় না (যদি না সামনাসামনি দেখা করাটা অনেক কঠিন হয়ে যায়)।
