স্কুলের ব্যবহৃত ভাষায় যাকে ‘দল অর্থাৎ আমাদের দল’ আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে তাদের মধ্যে কেবলমাত্র সে ছাত্রটাই, নামের ব্যাপারে যাকে আমার মিতা বলা যেতে পারে, পড়াশুনার ক্ষেত্রে আমার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল, খেলার মাঠেও অবশ্যই প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল। সে আমার সব আদেশ অবলীলাক্রমে মেনেনিত না, আমার ইচ্ছার কাছেও নতি স্বীকার করত না।
প্রকৃতপক্ষে আমার নামের নামধারী ছাত্রটা সবক্ষেত্রে আমার জোর জুলুমের প্রতিবাদ করত, প্রবল বিরোধিতা করত। মাঝে মধ্যে কিশোর ছাত্রদের সর্দারি করতে গিয়ে আমি চরম ও নিঃশর্ত স্বেচ্ছাচার চালাতাম।
আমার স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে সহপাঠী উইলসনের বিরোধিতাই আমার কাছে সবচেয়ে অস্বস্তিকর ব্যাপার হয়ে দাঁড়াল। অসহ্য! একেবারেই বরদাস্ত করতে পারতাম না।
একটা কথা অস্বীকার করতে পারব না, আমি বাইরে যত হম্বিতম্বি করি না কেন ভেতরে ভেতরে কিন্তু তাকে ভয়ই পেতাম। আর এও সত্য যে, আমি তাকে সমকক্ষ বলেই ভাবতাম, হয়তো বা আমার চেয়ে বড়ও মনে করতাম। তবে এও খুবই সত্য যে, এই যে ‘সমকক্ষ বা আমার চেয়ে ‘বড়’ এ-কথাটাকে একমাত্র আমি নিজে ছাড়া দলের দ্বিতীয় কেউই কিছুতেই মেনে নিত না। তবে এও খুবই সত্য যে, উইলসন নিজের কিন্তু বড় একটা উচ্চাভিলাষী বা আগ্রহি যে ছিল তা বলা যায় না।
সে অন্য দশজনের কাছে মুখে যা-ই বলুক বা যা-ই করুক না কেন, অন্তরের অন্তঃস্থলে কিন্তু আমার প্রতি অব্যক্ত একটা আকর্ষণ অনুভব করত।
আমার সহধ্যায়ী উইলসনের এ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য, উভয়ের একই নামকরণ আর একই দিনে উভয়েরই স্কুলে ভর্তি হবার ঘটনা প্রভৃতিকে কেন্দ্র করে স্কুলের ছাত্রদের মধ্যে একটা বিশ্বাসের দানা বেঁধেছিল যে আমরা দুই সহোদর। এ-বিশ্বাসটা আদৌ সত্যি নয়। কিন্তু আমরা যদি সত্যি সহোদর হতাম তবে অবশ্যই যমজ ভাইই হতাম।
‘যমজ ভাই’ কথাটা কেন বললাম? এর পিছনে যুক্তি অবশ্যই আছে। কারণ, অধ্যক্ষ রেভারেন্ড ড. ব্রাসরির স্কুলের পাঠ শেষ করে সবাই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবার পর ঘটনাচক্রে আমি জানতে পেরেছিলাম, আমার নামের নামধারী সহপাঠী বন্ধুটা জন্মেছিল ১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের ১৯ জানুয়ারি। আর ঠিক একই বছরে, একই তারিখে আমিও প্রথম পৃথিবীর আলো দেখেছিলাম।
একটা কথা আমাকে স্বীকার করতেই হবে, উইলসনের নিরবচ্ছিন্ন রেষারেষি আর প্রতিবাদের ফলে আমাকে বড়ই উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্যে দিয়ে প্রতিটা দিন, প্রতিটা মুহূর্ত কাটাতে হত সত্য বটে। তা সত্ত্বেও তাকে সম্পূর্ণরূপে ঘৃণা করা। অর্থাৎ মনে প্রবল। বিদ্বেষ পোষণ করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিল না। কথাটা অবাক হবার মতো মনে হলেও এটাই ছিল প্রকৃত ব্যাপার।
কেন? কেন এমন কথা বলছি? কারণ, প্রায় রোজই তার সঙ্গে কোনো-না-কোনো ব্যাপারে আমার ঝগড়া বাঁধতই বাধত। তা সত্ত্বেও আমাদের মধ্যে কিন্তু বাক্যালাপ বন্ধ হত না। সমানে সমানেই লড়াই চলত। তবে একটা ব্যাপারে সে অন্তরের গভীরে দুর্বলতা পোষণ করত।
কোনো দীর্ঘরোগ ভোগের দরুণ হয়তো তার কণ্ঠনালিটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল যার ফলে সে তার কণ্ঠস্বর কিছুতেই করতে পারত না। কথা বললে কেবলমাত্র ফিসফিস শব্দসহ স্বর উচ্চারিত হত। তবে তার বক্তব্য বুঝতে অসুবিধা হত না, ব্যস এটুকুই। আমি তার এ দৈহিক দুর্বলতার সুযোগটা নিতে ছাড়তাম না। এ ব্যাপারে সে ছিল সত্যি অসহায়। সত্যি বলছি, আসলে আমি তার অসহায়ত্বটাকেই কাজে লাগাতাম।
আমার ওপর বদলা নেবার জন্য উইলসন চিন্তা-ভাবনা করে মাথা থেকে হরেক রকম উপায় বের করত। আর সেগুলোকে বাস্তবে প্রয়োগ করে আমাকে ঘায়েল করার জন্য উঠে পড়ে লেগে যেত। তবে সেগুলোর মধ্যে একটা রসিকতা সে প্রায়ই ব্যবহার করে আমাকে যারপর নাই ব্যতিব্যস্ত করে তুলত। সত্যি, আমি তাতে বড়ই বিব্রত হয়ে পড়তাম। আমি যে অতি নগণ্য, তুচ্ছাতিতুচ্ছ একটা কারণে এমন বেশিমাত্রায় বিব্রত হব, রেগে মেগে একেবারে আগুন হয়ে যাব, এটা সে যে কি করে মাথা খাঁটিয়ে বের করেছে, তা আজও আমার পক্ষে আবিষ্কার করা সম্ভব হয়নি।
স্বীকার করতে দ্বিধা নেই, আমার পৈত্রিক নামটার প্রতি আমার প্রথম থেকে, মনে জ্ঞান হওয়া অবধি একটা বিতৃষ্ণা অন্তরে পোষণ করে আসছিলাম। নামটার চেয়ে অনেক, অনেক বেশিমাত্রায় বিতৃষ্ণা ছিল আমার নামের আগে ব্যবহৃত পদবীটার প্রতি। সে শব্দগুলো ব্যবহার করে আমাকে সম্বোধন করল, ক্রমশ আমার সামনে যে কোনো প্রসঙ্গ উত্থাপন করা মাত্র মনে হত কানে বুঝি বিষ ঢেলে দিল। মুহূর্তের মধ্যে আমার মধ্যে ক্রোধের সঞ্চার ঘটত। আমি ক্রোধে রীতিমত ফুঁসতে লাগলাম। সে কারণেই, আমি যেদিন ভর্তি হওয়ার জন্য প্রথম স্কুলে পা দিলাম সেদিন, সে মুহূর্তে দ্বিতীয় এক উইলিয়াম উইলসনও সেখানে উপস্থিত ছিল। ব্যাপারটা বুঝতে পেরেই আমার ভেতরে অবর্ণনীয় ক্রোধের সঞ্চার ঘটল। অব্যক্ত ক্রোধে আমি ভেতরে ভেতরে ঘোৎ ঘোৎ করতে লাগলাম।
আমি কেন সেদিন এমন ক্রুদ্ধ হয়েছিলাম? আমার ক্রোধের কারণ তো অবশ্যই ছিল। নামটার প্রতি গোড়া থেকেই যে আমার বিরক্তি ছিল, তা-তো আগেই বলেছি। তাই বিরক্তিকর নামটার অধিকারী আমি স্কুলে পা দিয়েই যখন সেখানে অন্য আর এক উইলিয়াম উইলসনের উপস্থিতি উপলব্ধি করলাম তখন স্বাভাবিকভাবেই আমার মাথায় একটা ব্যাপার ঘুরপাক খেতে লাগল–‘নাম বিভ্রাট’-এর জন্যই একজনের সুনাম বদনামের বোঝা অন্য একজনের ঘাড়ে এসে পড়বে।
