[নরেনের প্রতি দৃষ্টিপাতমাত্র না করিয়া নলিনীকে
একপ্রকার ঠেলিয়া লইয়া চলিল]
নলিনী। (চলিতে চলিতে) ডক্টর মুখার্জী, চা না খেয়ে আপনি যেন পালাবেন না। আমাদের ফিরতে দেরি হবে না বলে যাচ্চি।
[নলিনী ও বিজয়া চলিয়া গেল
দয়াল।তুমিও চল না বাবা ওপরে। সেখানেই চা খাবে।
নরেন। ওপরে গেলেই দেরি হবে দয়ালবাবু, ছ’টার গাড়ি ধরতে পারব না।
দয়াল। তুমি ত সেই আটটার ট্রেনে যাও, আজ এত তাড়াতাড়ি কেন? চা না হয় এখানেই আনতে বলে দি। কি বল?
নরেন। না দয়ালবাবু, আজ চা খাওয়া থাক। (ঘড়ি দেখিয়া) এই দেখুন পাঁচটা বেজে গেছে—আর আমার সময় নেই। আমি চললুম। মামীমা যেন দুঃখ না করেন।
দয়াল। দুঃখ সে করবেই নরেন।
নরেন। না করবেন না। আর একদিন আমি তাঁকে বুঝিয়ে বলব।
[প্রস্থান
[ভিতরে নলিনী ও বিজয়ার হাসির শব্দ শোনা গেল, এবং
পরক্ষণে তাহারা দয়ালের স্ত্রীকে লইয়া প্রবেশ করিল]
দয়ালের স্ত্রী। (স্বামীর প্রতি) নরেন কোথায় গেল, তাকে দেখচি নে ত?
দয়াল। সে এইমাত্র চলে গেল। কাজ আছে, ছ’টার ট্রেনে আজ তার না ফিরে গেলেই নয়।
দয়ালের স্ত্রী। সে কি কথা! চা খেলে না, খাবার খেলে না,—এমনধারা সে ত কখনো করে না!
[সকলেই নীরব। বিজয়া আর একদিকে চোখ ফিরাইয়া রহিল]
দয়ালের স্ত্রী। (স্বামীর প্রতি) তুমি যেতে দিলে কেন? বললে না কেন আমি ভারী দুঃখ পাব?
দয়াল। বলেছিলুম, কিন্তু থাকতে পারলে না।
দয়ালের স্ত্রী। তবে নিশ্চয় কোন জরুরী কাজ আছে। মিছে কথা সে কখনো বলে না। কি ভদ্র ছেলে মা! যেমন বিদ্বান তেমনি বুদ্ধিমান। আমাকে ত মরা বাঁচালে। রোজ বিকালে নলিনী আর ও বসে বসে পড়াশুনো করে, আমি আড়াল থেকে দেখি। দেখে কি যে ভালো লাগে তা আর বলতে পারিনে। ভগবান ওর মঙ্গল করুন।
বিজয়া। সন্ধ্যা হয়ে গেল, আমি এবার যাই মামীমা।
দয়ালের স্ত্রী। তোমার বিয়েতে আমি উপস্থিত থাকবই। তা যত অসুখই করুক। নরেন বলে, বেশী নড়াচড়া করা উচিত নয়। তা সে বলুক গে,—ওদের সব কথা শুনতে গেলে আর বেঁচে থাকা চলে না। আশীর্বাদ করি সুখী হও, দীর্ঘজীবী হও,—বিলাসবাবুকে চোখে দেখিনি, কিন্তু কর্তার মুখে শুনি খাসা ছেলে। (সহাস্যে) বর পছন্দ হয়েছে ত মা, নিজে বেছে নিয়েছ—
বিজয়া। বেছে নেবার কি আছে মামীমা। মেয়েদের সম্বন্ধে সব পুরুষই সমান। মুখের ভদ্রতায় কেউ বা একটু হুঁশিয়ার, কেউ বা তা নয়। প্রয়োজন হলে দুটো মিষ্টি কথা বলে, প্রয়োজন ফুরোলে উগ্রমূর্তি ধরে। ওর ভালো-মন্দ নেই মামীমা, আমাদের দুঃখের জীবন শেষ পর্যন্ত দুঃখেই কাটে।
নলিনী। এ কথা বলা আপনার উচিত নয় মিস রায়।
বিজয়া। এখন তর্ক করব না, কিন্তু নিজের বিবাহ হলে একদিন স্মরণ করবেন, বিজয়া সত্যি কথাই বলেছিল। কিন্তু আর দেরি নয়, আমি আসি। কানাই সিং—
[নেপথ্যে] —মাইজী—
দয়াল। (ব্যস্তভাবে) অন্ধকার রাত, একটা আলো এনে দিই মা।
বিজয়া। (হাসিয়া) অন্ধকার কোথায় দয়ালবাবু, বাইরে জ্যোৎস্নায় আকাশ ভেসে যাচ্ছে। আমরা বেশ যেতে পারব, আপনি উদ্বিগ্ন হবেন না। নমস্কার!
[বিজয়া বাহির হইয়া গেল
দয়ালের স্ত্রী। (স্বামীর প্রতি) মেয়েটা কি বললে—শুনলে?
দয়াল। কি?
দয়ালের স্ত্রী। তোমাদের কি কান নেই? এসে পর্যন্ত ওর কথায় যেন একটা কান্নার সুর। যখন হাসছিল তখনও। বিজয়াকে আগে কখনও দেখিনি, কিন্তু ওর মুখ দেখে আজ মনে হলো যেন ধরেবেঁধে ওকে কেউ বলি দিতে নিয়ে যাচ্চে। জিজ্ঞেসা করলুম, বর পছন্দ হয়েছে ত মা? বললে, পছন্দের কি আছে মামীমা, মেয়েদের দুঃখের জীবন শেষ পর্যন্ত দুঃখেই কাটে। এ কি আহ্লাদের বিয়ে? দেখো, কোথায় কি একটা গোলমাল বেধেছে। ওর মা নেই, বাপ নেই,—মুখ দেখলে বড্ড মায়া হয়। না বুঝেসুঝে একটা কাজ করে বসো না।
দয়াল। আমি কি করতে পারি বল? রাসবিহারীবাবুই কর্তা।
দয়ালের স্ত্রী। তাঁর ওপরেও আর একজন কর্তা আছে মনে রেখো। তুমি ওর মন্দিরের আচার্য, ওর টাকায়, ওর বাড়িতে তোমরা খেয়েপরে সুখে আছ,—ওর ভালো-মন্দ সুখ-দুঃখ দেখা কি তোমার কর্তব্য নয়? সমস্ত না ভেবেই কি একটা করে বসবে?
দয়াল। তবে কি করব বল?
দয়ালের স্ত্রী। এ বিয়েতে আচার্যগিরি তুমি করো না। আমি বলচি, তোমাকে একদিন মনস্তাপ পেতে হবে।
দয়াল। (চিন্তান্বিত-মুখে) কিন্তু বিজয়া যে নিজে সম্মতি দিয়েছে। রাসবিহারীবাবুর সুমুখে নিজের হাতে কাগজে সই করে দিয়েছে!
নলিনী। দিক। ওর হাত সই করেছে কিন্তু হৃদয় সই করেনি, ওর জিভ সম্মতি দিয়েছে কিন্তু অন্তর সম্মতি দেয়নি। সেই মুখ আর হাতই বড় হবে মামাবাবু, তার অন্তরের সত্যিকার অসম্মতি যাবে ভেসে?
দয়াল। তুমি এ কথা জানলে কি করে নলিনী?
নলিনী। আমি জানি। আজ যাবার সময় নরেনবাবুর মুখ দেখেও কি তুমি বুঝতে পারনি?
দয়াল ও দয়ালের স্ত্রী। (সমস্বরে) নরেন? আমাদের নরেন?
নলিনী। হাঁ তিনিই।
দয়াল। অসম্ভব! একেবারে অসম্ভব!
নলিনী। (হাসিয়া) অসম্ভব নয় মামাবাবু, সত্যি।
দয়াল। (সজোরে) কিন্তু বিজয়া যে আমাকে নিজে বললেন—
নলিনী। কি বললেন?
দয়াল। বললেন, তোমার আর নরেনের পানে একটু চোখ রাখতে। বললেন, নরেনের উচিত তোমার সম্বন্ধে তাঁর মনোভাব স্পষ্ট করে জানাতে—
নলিনী। (সলজ্জে) ছি ছি, নরেনবাবু যে আমার বড়ভাইয়ের মত মামাবাবু।
দয়ালের স্ত্রী। কি আশ্চর্য কথা! তুমি আমাদের সেই জ্যোতিষকে ভুলে গেলে? তার বিলেত থেকে ফিরতে ত আর দেরি নেই।
