নরেন। দেখুন মিস দাস, ও-সব কিছু না। বিজয়া এই সেদিন অসুখ থেকে উঠলেন, এখনো ভালো সেরে উঠতে পারেন নি।
নলিনী। তাই প্রতিদিন শুকিয়ে যাচ্চেন? ডক্টর মুখার্জী, আমার মামা তবু সামনাসামনি দেখতে পান, কিন্তু আপনি তাও পান না। আপনি তাঁর চেয়েও অন্ধ। সেদিনের কথা মনে করে দেখুন, ভালোবাসলে কোন মেয়ে প্রভু-ভৃত্য সম্বন্ধের কথা বিলাসবাবুকে কিছুতে বলতে পারতেন না,—তা যত রাগই হোক।
নরেন। বড়লোক টাকার অহঙ্কারে সব পারে মিস দাস। ওদের মুখে কিছু আটকায় না।
নলিনী। এ বলা আপনার ভারী অন্যায় ডক্টর মুখার্জী। আপনার আগে আমি ওঁকে দেখেচি—আমরা এক কলেজে পড়তুম। ঐশ্বর্য আছে, কিন্তু ঐশ্বর্যের গর্ব কোনদিন কেউ অনুভব করিনি। ওঁর কত দয়া, কত দান, কত পুণ্য অনুষ্ঠান।—মনে নেই আপনার? অপরিচিত আপনি, তবু আপনার কথাতেই পূর্ণবাবুর বাড়ির পূজোর অনুমতি তখনি দিয়ে দিলেন। বিলাসবাবু, রাসবিহারীবাবু শত চেষ্টাতেও তা বন্ধ করতে পারলে না। ভদ্রতা, সহানুভূতি, ন্যায়-অন্যায়বোধ কতটা জাগ্রত থাকলে এ-রকম হতে পারে একবার ভেবে দেখুন দিকি। আমার মামা ত গরীব, কিন্তু কি শ্রদ্ধাই না তাঁকে করেন। এ কি ধনীর দর্পের প্রকাশ ডক্টর মুখার্জী?
নরেন। (কিছুক্ষণ চিন্তা করিয়া) সে সত্যি। কেউ অভুক্ত জানলে না খাইয়ে কিছুতে ছেড়ে দেবে না, যেমন করে হোক খাওয়াবেই। আর সে কি যত্ন!
নলিনী। তবে? এ-সব কি আসে সম্পদের দম্ভ থেকে?
নরেন। আর কি অদ্ভুত অপরিসীম পিতৃভক্তি এই মেয়েটির। এই বাড়িটা নিয়ে পর্যন্ত তাঁর মনে শান্তি ছিল না, নিতে হয়েছিল শুধু বিলাসবাবুর জবরদস্তিতে—
নলিনী। এ কথা আমরা সবাই জানি ডক্টর মুখার্জী।
নরেন। হাঁ অনেকেই জানে। সেদিন ওঁকে একটু বিপদগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যেই বনমালীবাবুর সেই চিঠির উল্লেখ করে বলেছিলুম, আমার বাবা যত ঋণই করে থাকুন, আপনার বাবা কিন্তু এ-বাড়ি আমাকেই যৌতুক দিয়েছিলেন। তবু আপনি কেড়ে নিলেন। শুনে বিজয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল, বললেন, সত্যি হলে এ বাড়ি আপনাকে আমি ফিরিয়ে দেব। বললুম, সত্যিই বটে, কিন্তু ফিরিয়ে নিয়ে আমি করব কি? পেটের দায়ে চাকরি করতে নিজে থাকব বাইরে,—বাড়ি হবে বন-জঙ্গল, শিয়াল-কুকুরের বাসা—তার চেয়ে যা হয়েছে সেই ভালো। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, না, সে হবে না,—নিতেই হবে আপনাকে। বাবার আদেশ আমি প্রাণ গেলেও উপেক্ষা করতে পারব না। অন্ততঃ বাড়ির ন্যায্য যা দাম—তাই নিন। বললুম, ভিক্ষে নিতে আমি পারব না। তিনি বললেন, তা হলে বিলিয়ে দেব আপনার দূরসম্পর্কীয় আত্মীয়দের। বাবা যা দিয়ে গেছেন আমি তা অপহরণ করব না— কোনমতেই না—এই আমার পণ। শুনে, দুষ্টবুদ্ধি মাথায় চেপে গেল, বললুম, ও পণ রাখতে গেলে কি কি দিতে হয় জানেন? শুধু এই বাড়িটাই নয়, এই বাড়ি, এই জমিদারি, দাস-দাসী, আমলা-কর্মচারী, খাট-পালঙ্ক-টেবিল-চেয়ার, মায় তাদের মনিবটিকে পর্যন্ত আমার হাতে তুলে দিতে হবে। দেবেন এই-সব? পারবেন দিতে?
নলিনী। (সবিস্ময়ে) বনমালীবাবুর আছে নাকি এই-সব চিঠি? কৈ আমাদের ত কাউকে বলেন নি!
নরেন। (হাসিয়া) এ তামাশা বলব কাকে? আমি কি পাগল? কিন্তু চিঠির কথা যদি বলেন ত সত্যিই আছে বনমালীবাবুর চিঠি। সত্যি আছে এই-সব লেখা। (আঙুল দিয়া দেখাইয়া) ঐ ঘরটায় ছিল একতাড়া চিঠি একটা ভাঙ্গা দেরাজের মধ্যে—বাবার চিঠি বলে দয়ালবাবু দিলেন আমার হাতে, পড়ে দেখি তাতে এই মজার ব্যাপার। জানেন ত, আমার বাবার বনমালীবাবু ছিলেন অকৃত্রিম বন্ধু। লেখাপড়ার জন্যে আমাকে বিলেতে পাঠিয়েছিলেন তিনিই।
নলিনী। তারপরে?
নরেন। বিজয়া বললেন, কৈ দেখি বাবার চিঠি। পকেটেই ছিল, ফেলে দিলুম সুমুখে। বাণ্ডিল খুলে ফেলে খুঁজতে লাগল বুভুক্ষু কাঙালের মত—হঠাৎ চেঁচিয়ে উঠল—এই যে আমার বাবার হাতের লেখা। তারপরে চিঠি দুটো নিজের মাথায় চেপে ধরে চক্ষের নিমেষে যেন একেবারে পাথর হয়ে গেল।
নলিনী। তারপরে?
নরেন। মূর্তি দেখে ভয় পেয়ে গেলুম। একেবারে নিঃশব্দ নিশ্চল! হঠাৎ দেখি চাপা কান্নায় তার বুকের পাঁজরগুলো ফুলে ফুলে উঠছে—আর বসে থাকতে সাহস হলো না, নিঃশব্দে বেরিয়ে এলুম।
নলিনী। নিঃশব্দে বেরিয়ে এলেন? আর যাননি তাঁর কাছে?
নরেন। না, সেদিকেই না।
নলিনী। তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করে না আপনার?
নরেন। (হাসিয়া) এ কথা জেনে লাভ কি?
নলিনী। না, সে হবে না, আপনাকে বলতেই হবে।
নরেন। বলতে আপনাকেই শুধু পারি। কিন্তু কথা দিন কখনো কাউকে বলবেন না?
নলিনী। কথা আমি দেব না। তবু বলতেই হবে তাঁকে দেখতে ইচ্ছে করে কি না।
নরেন। করে। রাত্রিদিনই করে।
নলিনী। (বাহিরের দিকে চাহিয়া মহা-উল্লাসে) এই যে! আসুন, আসুন। নমস্কার! ভালো আছেন?
[বিজয়া ও দয়ালের প্রবেশ]
বিজয়া। (নরেনের দিকে সম্পূর্ণ পিছন ফিরিয়া নলিনীকে) নমস্কার! ভালো আছি কিনা খোঁজ নিতে একদিনও ত আর গেলেন না?
নলিনী। রোজই ভাবি যাই, কিন্তু সংসারের কাজে—
বিজয়া। সংসারের কাজ বুঝি আমাদের নেই?
নলিনী। আছে সত্যি, কিন্তু মামীমার অসুখে—
বিজয়া। একেবারে সময় পান না। না?
নরেন। (সম্মুখে আসিয়া হাসিমুখে বলিল) আর আমি যে রয়েছি, আমাকে বুঝি চিনতেই পারলেন না?
বিজয়া। চিনতে পারলেই চেনা দরকার নাকি? (নলিনীর প্রতি) চলুন মিস দাস, ওপরে গিয়ে মামীমার সঙ্গে একটু আলাপ করে আসি। চলুন!
