বিজয়া। শুনেচেন? শুনে কি বলেন নলিনী?
দয়াল। বলে না কিছুই, শুধু মুখ টিপে হাসে।
বিজয়া। তিনি কি চলে গেছেন?
দয়াল। না, আজ যাবে। বলেছিল যাবার পথে তোমার সঙ্গে একবার দেখা করে যাবে। কিন্তু তিনটে বাজল বোধ হয়, এল বলে। কিংবা হয়ত নরেনের জন্যে অপেক্ষা করে আছে।
বিজয়া। কলকাতা থেকে আজ বুঝি তাঁর আসার কথা আছে?
দয়াল। হাঁ। আমার স্ত্রীকে দেখতে আসবেন। কিন্তু আমারই হবে সবচেয়ে মুশকিল মা, নরেন যদি কলকাতা থেকে চলে যায়।
বিজয়া। যাবার কথা আছে নাকি?
দয়াল। আছে বৈ কি। পরশুই ত বলছিল এখানে থাকার আর ইচ্ছে নেই, South Africa-র কোথায় নাকি কাজের সম্ভাবনা আছে—খবর পেলেই রওনা হবে।
বিজয়া। অত দূরে?
দয়াল। আমরাও তাই বলছিলাম। কিন্তু ও বলে, আমার দূরই বা কি, আর কাছেই বা কি? দেশই বা কি, আর বিদেশই বা কি? সবই ত সমান। শুনে ভাবলাম, সত্যিই ত। কি-ই বা আছে এখানে যা ওকে টেনে রাখবে। কিন্তু ভাবলেও চোখে যেন জল এসে পড়ে। কিন্তু আর না মা, আমি উঠি, একটু কাজ আছে সেরে নিই গে।
বিজয়া। কিন্তু বাড়ি যাবার আগে আর একবার দেখা করে যাবেন। এমনি চলে যাবেন না।
[ কালীপদ প্রবেশ করিল ]
কালীপদ। (দয়ালের প্রতি) ডাক্তারসাহেব একবার দেখা করতে চান।
দয়াল। কে ডাক্তার, আমাদের নরেন? আমার সঙ্গে দেখা করতে চায়? এখানে এসে?
কালীপদ। নীচের ঘরে বসাব, না চলে যেতে বলে দেব?
বিজয়া। চলে যেতে বলবি? কেন? যা আমার এই ঘরে তাঁকে ডেকে নিয়ে আয়।
[মাথা নাড়িয়া কালীপদ প্রস্থান করিল
দয়াল। এখানে ডেকে আনা কি ভালো হবে মা?
বিজয়া। আমার বাড়িতে ভাল-মন্দ বিচারের ভার আমার উপরেই থাক দয়ালবাবু।
দয়াল। না না, তা আমি বলিনি, কিন্তু বিলাসবাবু শুনতে পেলে কি—
বিজয়া। শুনতে পাওয়াই তাঁর দরকার মনে করি। নিজের যথাযোগ্য স্থানটার সম্বন্ধে ধারণা তাতে পাকা হয়।
[কালীপদ প্রবেশ করিল]
কালীপদ। ডাক্তারসাহেব এলেন না, চলে গেলেন।
দয়াল। চলে গেলেন? কেন?
কালীপদ। জিজ্ঞেসা করলেন, মিস দাস আছেন। বললুম, না। বললেন, তাহলে আবশ্যক নেই, ও-বাড়িতেই দেখা হবে। এই বলেই চলে গেলেন।
দয়াল। মা ডেকেছিলেন, বলেছিলে তাঁকে?
কালীপদ। বলেছিলুম বৈ কি। বললেন, আজ সময় নেই, ছ’টার গাড়িতে ফিরে যেতে হবে। যদি সময় পান আর একদিন এসে দেখা করে যাবেন।
দয়াল। (সলজ্জে) কি জানি এ রকম ত তার প্রকৃতি নয় মা। বোধ হয় সত্যিই খুব তাড়াতাড়ি।
বিজয়ী। (কালীপদর প্রতি) আচ্ছা তুই যা এখান থেকে।
[যাওয়ার মুখে কালীপদ হঠাৎ ব্যস্ত হইয়া উঠিল, বলিল, কর্তাবাবু
আসছেন এবং সসঙ্কোচে অন্য দ্বার দিয়া বাহির হইয়া গেল।
মন্থরপদে রাসবিহারীবাবু প্রবেশ করিলেন]
রাস। এই যে মা বিজয়া। দয়ালবাবুও রয়েছেন দেখছি। বসো মা বসো বসো।
[দয়াল সসম্ভ্রমে নমস্কার করিলেন, বিজয়া উঠিয়া দাঁড়াইল। রাসবিহারী
আসন গ্রহণ করিলে বিজয়া পুনরায় উপবেশন করিল]
রাস। এ ভালোই হলো যে দুজনের সঙ্গে একত্রেই দেখা হলো। আরও আগেই আসতে পারতাম কিন্তু বিলাসের হঠাৎ সর্দিগর্মির মত হয়ে—মাথায়-মুখে জল দিয়ে, বাতাস করে সে একটু সুস্থ হলে তবে আসতে পারলাম—তার মুখে সবই শুনতে পেলাম দয়ালবাবু। (দয়াল কি একটা বলিবার চেষ্টা করিতেই হাত নাড়িয়া তাঁহাকে বাধা দিয়া) না না না—তার দোষ-স্খালনের চেষ্টা করবেন না দয়ালবাবু। যে আপনার মত সাধু ভগবৎ-প্রাণ ব্যক্তিকেও অসম্মান করতে পারে তার সপক্ষে কিছুই বলবার নেই। আপনার কর্মে শৈথিল্য প্রকাশ পেয়েছে,—কিন্তু তাতে কি? সাহেবরা বিলাসের কর্তব্যনিষ্ঠা, তার কর্মময় জীবনের শত প্রশংসা করুক, কিন্তু আমরা ত সাহেব নয়, কর্মই ত আমাদের জীবনের সবখানি অধিকার করে নেই! কিন্তু ও শাস্তি পেলে কার কাছে? দেখেছেন দয়ালবাবু করুণাময়ের করুণা—ও শাস্তি পেলে তারই কাছে যে তার ধর্মসঙ্গিনী, আত্মা যাদের পৃথক নয়! দীর্ঘজীবী হও মা, এই ত চাই! এই ত তোমার কাছে আশা করি! (ক্ষণকাল পরে) কিন্তু এই কথাটা আমি কোনমতে ভেবে পাইনে বিজয়া, বিলাস আমার মত খোলাভোলা সংসার-উদাসী লোকের ছেলে হয়ে এতবড় কর্মপটু পাকা বিষয়ী হয়ে উঠল কি করে? কি যে তাঁর খেলা, কি যে সংসারের রহস্য কিছুই বোঝবার জো নেই মা!
দয়াল। তাঁর দোষ নেই রাসবিহারীবাবু, আমারই ভারী অন্যায় হয়ে গেছে। এই তরুণ বয়সেই কি যে তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠা, কি যে তাঁর চিত্তের দৃঢ়তা তা বলতে পারিনে। আমাকে তিনি উচিত কথাই বলেছেন।
রাস। উচিত কথা? এবার আমি সত্যিই দুঃখ পাব দয়ালবাবু। আপনি ভক্তিমান, জ্ঞানবান, কিন্তু বয়সে আমি বড়। এ আমি জানি, সংসারে অত্যন্ত বস্তুটা কিছুরই ভালো নয়। এও জানি, বিলাসের কর্ম-অন্ত প্রাণ, এখানে সে অন্ধ, কিন্তু তাই বলে কি মানীর মান রাখতেও হবে না? না না, আমি বুড়োমানুষ, সে তেজও নেই, জোরও নেই—এ আমি ভালো বলতে পারব না। নিজের ছেলে বলে ত এ-মুখ দিয়ে মিথ্যে বার হবে না দয়ালবাবু!
দয়াল। সাধু! সাধু!
রাস। এ ভালই হয়েছে মা। আমি অপার আনন্দ লাভ করেচি যে, বিলাস তার সর্বোত্তম শিক্ষাটি আজ তোমার হাত থেকেই পাবার সুযোগ পেলে। কিন্তু কি ভ্রম দেখেছেন দয়ালবাবু, আনন্দে এমনি আত্মহারা হয়েছি যে, আমার মাকেই বোঝাতে যাচ্চি। যেন আমার চেয়ে তিনি তার কম মঙ্গলাকাঙ্ক্ষিণী। আজ এত আনন্দ ত শুধু এইজন্যেই যে তোমার কাজ তুমি নিজের হাতে করেচ। তার সমস্ত শুভ যে শুধু তোমার হাতেই নির্ভর করচে। তার শক্তি, তোমার বুদ্ধি। সে ভার বহন করে চলবে, তুমি পথ দেখাবে। জগদীশ্বর! (চোখ তুলিয়া) ইস! চারটে বাজে যে! অনেক কাজ এখনো বাকী, আসি মা বিজয়া! আসি দয়ালবাবু। (প্রস্থানোদ্যম)
