[রাসবিহারী ক্রোধে ও ক্ষোভে নির্বাক স্তব্ধভাবে চাহিয়া রহিলেন]
বিলাস। বিজয়া আজ তোমাকে পর্যন্ত অপমান করতে ছাড়লে না।
রাস। তাতে তোমার কি?
বিলাস। আমার কি? আমার মুখের ওপর বলবে দয়ালবাবুকে রাসবিহারীবাবু আনেন নি, এনেছি আমি! বলবে, দয়াল কাজ করুন না করুন তাকে কেউ কিছু বলতে পারবে না! ও আমাকে বলে আমলা! বলে, যে নিয়মে আমার অপর কর্মচারীরা কাজ করে সেই নিয়মে কাজ করুন, নইলে চলে যান!
রাস। সে ত শুধু তোমাকে চলে যেতে বলেছে, আমার ইচ্ছে হচ্চে তোমার গলায় ধাক্কা মেরে বার করে দিই!
বিলাস। অ্যাঁ!
রাস। ছোট জাত ত আর মিছে কথা নয়! হাজার হোক সেই চাষার ছেলে ত! বামুন-কায়েতের ছেলে হলে ভদ্রতাও শিখতিস, নিজের ভাল-মন্দও বুঝতিস, হিতাহিত কাণ্ডজ্ঞানও জন্মাত। যাও, এখন মাঠে মাঠে হাল-গরু নিয়ে কুলকর্ম করে বেড়াও গে! উঠতে-বসতে তোকে পাখিপড়া করে শেখালাম যে, ভালোয় ভালোয় কাজটা একবার হয়ে যাক, তারপরে যা ইচ্ছে হয় করিস; তোর সবুর সইল না, তুই গেলি তাকে ঘাঁটাতে! সে হলো রায়-বংশের মেয়ে। ডাকসাইটে হরি রায়ের নাতনী। তুই হাত বাড়িয়ে গেছিস তার নাকে দড়ি পরাতে—মুখ্য কোথাকার! মান-ইজ্জত সব গেল, এত বড় জমিদারির আশা-ভরসা গেল, মাসে মাসে দু-দুশো টাকা মাইনে বলে আদায় হচ্ছিল সে গেল—যাও এখন চাষার ছেলে লাঙ্গল ধর গে। আবার আমার কাছে এসেছেন—চোখ রাঙ্গিয়ে তার নামে নালিশ করতে! দূর হঃ!—তোর আর মুখদর্শন করব না!
[বলিয়া রাসবিহারী নিজেই দ্রুতবেগে চলিয়া গেলেন, পিছনে পিছনে বিলাসও বিহ্বলের
ন্যায় ধীরে ধীরে বাহির হইয়া গেল। ধীরে ধীরে বিজয়া প্রবেশ
করিয়া টেবিলে মাথা নত করিয়া বসিল। দয়ালের প্রবেশ]
দয়াল। এ কি কাণ্ড করে বসলে মা! আর তা-ও আমার মত একটা হতভাগ্যের জন্যে! আমি যে লজ্জায়, সঙ্কোচে, অনুতাপে মরে যাচ্চি।
বিজয়া। (মুখ তুলিয়া চোখ মুছিয়া) আপনি কি বাড়ি চলে যাননি?
দয়াল। যেতে পারলাম না মা। পা থরথর করে কাঁপতে লাগল, বারান্দার ওধারে একটা টুলের ওপর বসে পড়লাম। অনেক কথাই কানে এল।
বিজয়া। না এলেই ভাল হতো, কিন্তু আমি অন্যায় কিছু করিনি। আপনাকে অপমান করার তাঁর কোন অধিকার ছিল না।
দয়াল। ছিল বৈ কি মা। যে কাজ আমার করা উচিত ছিল করিনি, একটা চিঠি লিখে তাঁর কাছে ছুটি পর্যন্ত নিইনি—এ-সব কি আমার অপরাধ নয়? রাগ কি এতে মনিবের হয় না?
বিজয়া। কে মনিব, বিলাসবাবু? নিজেকে কর্ত্রী বলতে আমার লজ্জা করে দয়ালবাবু, কিন্তু ও দাবী যদি কারো থাকে সে আমারই। আর কারো নয়।
দয়াল। ও কথা বলতে নেই মা, রাগ করেও না। আমাদের মনিব যেমন তুমি তেমনি বিলাসবাবু। এই ত আমরা সবাই জানি।
বিজয়া। সে জানা ভুল। আমি ছাড়া এ বাড়িতে আর কেউ মনিব নেই।
দয়াল। শান্ত হও মা, শান্ত হও। বিলাসবাবু একটু ক্রোধী, অল্পেই চঞ্চল হয়ে পড়েন এই তাঁর দোষ, কিন্তু মানুষ ত সর্বগুণান্বিত হয় না, কোথাও একটু ত্রুটি থাকেই। এইখানে নলিনীর সঙ্গে আমার মেলে না। সেদিন রোগে তুমি শয্যাগত, তোমার ঘরের মধ্যে নরেনকে অপমান করার কথা শুনে নলিনী রাগে জ্বলতে লাগল। বললে, এর আসল কারণ বিলাসবাবুর বিদ্বেষ। নিছক হিংসা আর বিদ্বেষ।
বিজয়া। বিদ্বেষ কিসের জন্যে দয়ালবাবু?
দয়াল। কি জানি, কেমন করে যেন নলিনীর মনে হয়েছে নরেনকে তুমি মনে মনে—করুণা—করো। এইটেই বিলাসবাবু কিছুতে সইতে পারচেন না।
বিজয়া। কিন্তু করুণা ত তাঁকে আমি করিনি। আমার একটা কাজেও ত তাঁর প্রতি করুণা প্রকাশ পায়নি দয়ালবাবু।
দয়াল। আমিও ত তাই বলি। বলি, তেমন করুণা ত বিজয়া সকলকেই করেন। আমাকেই কি তিনি কম দয়া করছেন!
বিজয়া। দয়ার কথা ইচ্ছে হলে আপনারা বলতেও পারেন, কিন্তু নরেনবাবু পারেন না। বরঞ্চ, বার বার যা পেয়েছেন সে আমার নিষ্ঠুরতারই পরিচয়। সত্যি কিনা বলুন?
দয়াল। (সলজ্জে) না না, সত্যি নয়—সত্যি নয়—তবে নরেন নিজে কতকটা তাই ভাবে বটে। সেদিন কালীপদকে দিয়ে তুমি আমার ওখানে তার microscope-টা পাঠিয়ে দিলে, নরেন জিজ্ঞাসা করলে, কত টাকা দিতে বলেচেন? কালীপদ বললে, টাকার কথা বলে দেননি—এমনি। এমনি কি রে? কালীপদ বললে, হাঁ, এমনি নিয়ে যান, টাকা বোধহয় দিতে হবে না। সত্যি ত আর এ বিশ্বাস করা যায় না—নিশ্চয় কালীপদর ভুল হয়েছে—এতেই নরেন রেগে উঠে বললে, তাঁকে বল্ গে যা, আমাকে দান করার দরকার নেই, ঠাট্টা করবারও দরকার নেই। যা, ফিরিয়ে নিয়ে যা।
বিজয়া। শুনেছি আমি কালীপদর মুখে।
দয়াল। কিন্তু নলিনী তাঁকে বারণ করেছিল। ওর ধারণা নরেনের হয়ত কাজ আটকাচ্চে ভেবেই বিজয়া পাঠিয়ে দিয়েছেন, নইলে উপহার বলেও নয়, বিদ্রূপ করার জন্যেও নয়। ভেবেচেন হাতে হাতে টাকা না নিয়ে যেদিন হোক পরে নিলেই হবে। আমারও তাই মনে হয়। বল ত মা সত্যি নয় কি?
বিজয়া। জানিনে দয়ালবাবু। অসুখের মধ্যে পাঠিয়েছিলুম, ঠিক মনে করতে পারিনে তখন কি ভেবেছিলুম।
দয়াল। কিন্তু নলিনী বলে নিশ্চয় এই। বললে, নরেনের মত ভদ্র, আত্মভোলা, নিঃস্বার্থপর মানুষকে কেউ কখনো অপমান করতে পারে না এক বিলাসবাবু ছাড়া। কিন্তু নরেন নিজে কোনমতেই এ কথা বিশ্বাস করতে পারলে না, বললে, যে লোক আমার পরম দুর্গতির দিনে ওটা দুশো টাকা দিয়ে কিনে দুদিন পরেই নিজের মুখে চারশো টাকা চায় তার কিছুই অসম্ভব নয়। ওরা বড়লোক, ওদের অনেক ঐশ্বর্য—তাই আমাদের মত নিঃস্বদের উপহাস করতেই ওরা আনন্দ পায়। কিন্তু যাক গে এ-সব কথা মা! তোমাদের উভয়কেই ভালবাসি, ভাবলে আমার ক্লেশ বোধ হয়। (একটুখানি মৌন থাকিয়া) নরেন কিন্তু তোমার বিলাসকে অকপটে ক্ষমা করেছে। এমনি অন্যমনস্ক, নিঃসঙ্গ লোক ও, যে সবাই যখন শুনেচে তোমাদের বিবাহ স্থির হয়ে গেছে, তখনো শোনেনি কেবল ও-ই! তোমার ঘর থেকে বার করে এনে রাসবিহারীবাবু যখন খবরটা তাকে দিলেন তখন শুনে যেন ও চমকে গেল। বিলাসবাবুর রাগের কারণটা বুঝতে পেরে তাঁকে তখনি ক্ষমা করলে। শুধু এইটুকুই সে আজো ভেবে পায় না যে, তার মত দরিদ্র গৃহহীন দুর্ভাগাকে বিলাসবাবু সন্দেহের চোখে দেখলেন কি ভেবে। এত বড় ভ্রম তাঁর হলো কি করে? আমিও ঠিক তাই ভাবি, শুধু নলিনীই ঘাড় নাড়ে—সমস্ত কথাই সে শুনেচে।
