আমার কথা শুনিয়া মাণিকচাঁদ কহিল, মিথ্যা আপনি আমাকে লইয়া পীড়াপীড়ি করিতেছেন। হীরালাল যে কে, তাহা আমি জানি না, বা এই সংবাদপত্রে বর্ণিত চুরি বা হত্যার বিষয় আমি কিছুমাত্র অবগত নহি।
অবগত আছ কি না, তাহা পরে জানিতে পারিবে। এই বলিয়া আমি সেই গৃহের দরজা তালাবদ্ধ করিয়া দিলাম, এবং মাণিকচাঁদ ও দ্বারবানকে লইয়া আমি আমার থানায় গমন করি লাম। থানা হইতে একটী পাহারার বন্দোবস্ত করিয়া পাঠাইয়া দিলাম। যে পর্যন্ত সমস্ত গোলযোগ মিটিয়া না গেল, সেই পৰ্য্যন্ত সেই গৃহের উপর পাহারা রহিল।
থানায় গিয়া মাণিকচাঁদ ও সেই দ্বারবানকে আবদ্ধ অবস্থায় রাখিলাম, এবং সমস্ত বিষয় সবিশেষরূপে বিবৃত করিয়া বোম্বাই পুলিসের নিকট একখানি জরুরি টেলিগ্রাম পাঠাইয়া দিলাম। পরদিবস সেই টেলিগ্রামের উত্তর আসিল; তাহার সারমর্ম এইরূপ :–
আপনার টেলিগ্রাম পাইয়াছি। যে বিষয়ের অনুসন্ধানের নিমিত্ত আমরা এখানে অতিশয় ব্যস্ত হইয়া পড়িয়াছিলাম, এবং কিরূপ উপায়ে হীরালাল বালমুকুন পরিচয়ে এই স্থানে কৰ্ম্ম করিতে প্রবৃত্ত হয়, তাহার কিছুই এ পর্যন্ত ঠিক করিয়া উঠিতে পারিতে ছিলাম না। আপনা-কর্তৃক তাহার সমস্তই প্রকাশিত হইয়া পড়িয়াছে, এবং আপনি হীরালালের সহায়তাকারীগণকে ধৃত করিয়া আমাদিগের যে কি উপকার করিয়াছেন, তাহা বলিতে পারি না। আপনি তাহাদিগকে যেন কোনরূপেই ছাড়িয়া দিবেন না। আমরা আপনার নিকট গমন করিতেছি, সাক্ষাৎ হইলে সমস্ত ব্যাপার জানিতে পারিবেন। আমরা অদ্যই মেল ট্রেণে রওনা হইব।
এই সংবাদ পাইয়া মনে মনে অতিশয় আনন্দিত হইলাম। কেবলমাত্র সন্দেহের উপর নির্ভর করিয়া যে কাৰ্য্যে হস্তক্ষেপ করিয়াছিলাম, দেখিলাম, তাহার সুফলই ফলিয়াছে।
সময় মত দুইজন পুলিস-কর্ম্মচারী বোম্বাই হইতে আসিয়া উপস্থিত হইলেন। তাঁহারা সেই চোর ও হত্যাকারী হীরা লালকেও তাঁহাদিগের সঙ্গে করিয়া কলিকাতায় আনিলেন। হীরালাল প্রথমতঃ কোন কথাই বলিয়াছিল না; কিন্তু কলি কাতায় আসিয়া মাণিকচাঁদ ও দ্বারবানকে বন্ধনাবস্থায় দেখিতে পাইবার পরই সমস্ত কথা স্বীকার করিল। সে যাহা কহিল, বোম্বাই-পুলিস-কর্ম্মচারীদ্বয় তাহা লিখিয়া লইলেন। উহা আমার লিখিবার প্রয়োজন না থাকিলেও, আমার অভ্যাসের দোষে আমি তাহা লিখিয়া লইলাম। হীরালাল যাহা বলিয়াছিল, তাহার সারমর্ম এইরূপ :–
আমার নাম হীরালাল। আমার জন্মস্থান মধ্য ভারতে; কিন্তু আমার থাকিবার নির্দিষ্ট কোন স্থান নাই। ভারতবর্ষের প্রধান প্রধান সহরমাত্রেই আমার একটা না একটী আজ্ঞা আছে। যখন যে স্থানে গমন করি, তখন সেই স্থানেই দুই চারিদিবস অতিবাহিত করিয়া থাকি। আমি বাল্যকালেই আমাদিগের ভাষায় একরূপ শিক্ষিত হইয়াছিলাম, এবং সকল প্রকার কৰ্ম্ম কাৰ্য্যই আমি করিতে জানি। কিন্তু চুরি ভিন্ন কখনও অপর কোন কাৰ্য্য করি নাই। চুরি করিয়াই এতকাল কাটাইয়া আসি মাছি, ও অনেকবার ধরা পড়িয়া জেলেও গিয়াছি সত্য; কিন্তু কখনও কোন গরিবের দ্রব্য অপহরণ করি নাই, বা অল্প মূল্যের দ্রব্যে কখনও হস্তাৰ্পণ করি নাই। যখন যে স্থানে যে কাৰ্য্যে হস্তাৰ্পণ করিয়াছি, তখন সেই কাৰ্যে দশ বিশ হাজারের কম লইয়া সেই স্থান হইতে প্রত্যাবর্তন করি নাই; কিন্তু একটামাত্র পয়সাও কখনও রাখিতে পারি নাই। যেরূপ ভাবে আয় করি য়াছি, ব্যয় করিয়াছিও সেইরূপে।
বোম্বাইয়ের যে মহাজনের গদিতে আমি চুরি করিয়া ধৃত হইয়াছি, অনেকদিবস হইতে সেই গদিতে চুরি করিবার আমার মিতান্ত ইচ্ছা ছিল; কিন্তু এ পর্যন্ত কোনরূপেই সুযোগ করিয়া উঠিতে পারিতেছিলাম না। কিরূপ অবস্থায় ও কোথায় যে উহার ধনভাণ্ডার স্থাপিত, তাহা এ পর্যন্ত জানিতে পারিয়া ছিলাম না বলিয়াই, এতদিবস আমার মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিতে পারি নাই। যে সময় উহার গদিতে একজন গোমন্তার প্রয়ো জন হইল, সেই সময় আমি অন্তরালে থাকিয়া, যাহাকে আপনার এখন মাণিকচাঁদ বলিয়া জানিতে পারিয়াছেন, তাহাকে সেই কার্যে নিযুক্ত করিবার নিমিত্ত অনেকরূপ চেষ্টা করিয়া ছিলাম; কিন্তু কোনরূপেই কৃতকার্য হইতে পারি নাই। লাভের মধ্যে মাণিকচাঁদ সেই স্থানে দুই চারির যাতায়াত করাতে তাঁহারা উহাকে চিনিতে পারিয়াছিলেন। নতুবা আমি নিজে প্রকাশ্যরূপে এই কাৰ্যে কখনই খাকিতাম না। মাণিকচাঁদ যে কাৰ্য্য করিয়াছিল, আমি তাহাই করিতাম, আমার কাৰ্য মাণিকদের দ্বারা সম্পন্ন হইত।
যখন মাণিকচাঁদকে কোনরূপেই সেই কাৰ্য্যে নিযুক্ত করা ইতে পারিলাম না, তখন সেই কার্ষে যে নিযুক্ত হইতেছে, তাহারই অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হইলাম, এবং পরিশেষে জানিতে পারিলাম যে, কলিকাতা হইতে বালমুকুন নামক এক ব্যক্তি সেই কার্যে নিযুক্ত হইয়াছেন, ও শীঘ্রই তিনি কলিকাতা হইতে আগমন করিয়া সেই কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইবেন। কর্ম্মচারী হইয়া উঁহাদিগের কার্যের মধ্যে প্রবেশ করিতে না পারিলে, কোন্ স্থানে উঁহাদিগের অর্থাদি রক্ষিত হয়, তাহা জানিতে পারিবার কোনরূপ সম্ভাবনা নাই দেখিয়া, সেই দিবসেই মাণিক চাদকে কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলাম। কলিকাতায় আসিয়া তাহার প্রধান কাৰ্য্য এই হইল যে, যেরূপ উপায়েই হউক, বালমুকুনের সন্ধান করিয়া তাহাকে হস্তগত করিতে হইবে, এবং যাহাতে বালমুকুন সেই কার্যে নিযুক্ত হইতে না পারে, বিধিমতে তাহার চেষ্টা করিতে হইবে। অথচ এদিকে যে পর্যন্ত আমি আপন কাৰ্য উদ্ধার করিয়া না লইতে পারি, সেই পর্যন্ত বালমুকুনকে আপন হস্তে রাখিয়া যাহাতে সে বোম্বাই সহরে আসিতে পারে, তাহার বন্ধোবস্তও করিতে হইবে। মাণিক চাদকে এইরূপ উপদেশ দিয়া, তাহাকে দ্রুতগতি কলিকাতায় পাঠাইয়া দিলাম। মাণিকটা বড় বুদ্ধিমান ও সবিশেষ কৌশলী। তিনি কলিকাতায় আসিয়া অনায়াসেই বালমুকুনকে অনুসন্ধান করিয়া বাহির করিলেন, এবং তাহাকে অধিক বেতন প্রদান পূর্ব্বক প্রলোভিত করিয়া যে কার্যে তিনি নিযুক্ত হইয়াছিলেন, সেই কাৰ্যে প্রবৃত্ত হইতে তাঁহাকে স্থগিত করিলেন। তিনি সেই কাৰ্য্য পরিত্যাগ করিতেছেন, এই মর্মে একখানি পত্র তাঁহার নিকট হইতে লিখাইয়া লইয়া মাণিকচাঁদ সেই ফারমে পাঠাইয়া দিবার ভানে কোনরূপে হস্তগত করিয়া পরিশেষে উহা আমার নিকট প্রেরণ করিলেন। যে টেলিগ্রামে বালমুকুন তাহার কাৰ্য্যে নিয়োজিত হইবার আদেশ পাইয়াছিলেন, সেই টেলিগ্রাম খানি পর্যন্ত হস্তগত করিয়া আমার নিকট পাঠাইয়া দিলেন, এবং কোন না কোন কৌশল অবলম্বন করিয়া বালমুকুন যাহাতে বোম্বাই সহরে আসিয়া উপস্থিত হইতে না পারেন, তাহার চেষ্টা করিতে লাগিলেন। এদিকে আমি সেই টেলিগ্রাম দেখা ইয়া, আমাকে বালমুকুন নামে পরিচয় দিয়া, অনায়াসেই সেই কার্যে নিযুক্ত হইয়া সবিশেষ মনোযোগের সহিত নির্দিষ্ট কাৰ্য্য করিতে লাগিলাম। এইরূপে ক্রমে দশ বারদিবস অতি বাহিত হইতে না হইতেই যে যে স্থানে অর্থাদি বা বহুমূল্য অলঙ্কারাদি রক্ষিত থাকে, তাহা জানিতে পারিলাম, এবং সুযোগ মত ক্রমে ক্রমে সেই সকল স্থান যে সকল তালা দ্বারা আবদ্ধ ছিল, তাহার চাবি প্রস্তুত করাইয়া লইলাম। আমার ইচ্ছা ছিল, সুযোগমত একদিবস রাত্রিতে চাবি খুলিয়া সমস্ত অর্থাদি, অপহরণ করিব, এবং পূর্বের ন্যায় তালাবদ্ধ করিয়া দিয়া সেই স্থানেই কাৰ্য করিতে প্রবৃত্ত থাকি। চুরির বিষয় প্রকাশ হইয়া পড়িলে, এবং পুলিসের অনুসন্ধান ক্রমে শেষ হইয়া গেলে, চাকরী পরিত্যাগ করিয়া আপন ইচ্ছানুযায়ী স্থানে গমন করিব ও সেই স্থানে সেই সকল অর্থ ব্যয় করিয়া কিছুদিবস বাবুগিরি করিয়া কাটাই। আমি যাহা ভাবিয়াছিলাম, ঈশ্বর কিন্তু তাহা হইতে দিলেন না। চুরি করিয়া বহির্গত হইবার কালীনই সমস্ত অপহৃত দ্রব্যের সহিত ধৃত হইলাম, এবং পরিশেষে আত্মরক্ষা করিবার মানসে নরহত্যা পর্যন্ত করিতেও কিছুমাত্র সঙ্কুচিত হইলাম না! এখন আমার অদৃষ্টে যাহা আছে, তাহা হইবেই হইবে। তাহার নিমিত্ত আমি কিছুমাত্র দুঃখিত নহি, বা আমার প্রধান সঙ্গী, যিনি এখন আপনাদিগের নিকট মাণিকচাঁদ নামে পরিচিত, তাহার নিমিত্তও আমি দুঃখিত নহি। কারণ, আমরা উভয়ে পরামর্শ করিয়া যেরূপ কাৰ্য্যে হস্তাৰ্পণ করিয়াছি, তাহার ফল ভোগ করাই আমাদিগের কর্তব্য। কিন্তু এই দ্বারবানের নিমিত্ত আমি আন্তরিক দুঃখিত। কারণ, এ ব্যক্তি আমাদিগের সহিত কখনও কোন অসৎ কাৰ্যে প্রবৃত্ত হয় নাই, বা এ আমাদিগের নিকট পরিচিতও নহে। সামান্য অর্থের লোভে যে এইবার এই ব্যক্তি মাণিকচাঁদকে কিছু সাহায্য করিয়াছে, তাহার আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই; কিন্তু সে যে ইহার ভিতরের বিষয় অবগত আছে, তাহা আমার বোধ হয় না।
