তখন উভয়কেই উত্তমরূপে বাঁধিয়া আমি মাণিকচাঁদকে কহি, লাম, দেখ মাণিকচাঁদ! তুমি যাহা অনুমান করিয়াছিলে, তাহা প্রকৃত; আমি তোমাকে প্রকৃতই ধৃত করিতে আসিয়াছি। সুতরাং এখুন যে কেন তোমাকে ধৃত করিলাম, তাহা তুমি এখন বেশ বুঝিতে পারিয়াছ। এখন তুমি আমাকে সমস্ত প্রকৃত কথা বলিতে প্রস্তুত আছ কি না?
মাণিক। আমি আপনার কথা কিছুই বুঝিয়া উঠিতে পারি তেছি না, এবং কেনইবা আপনি আমাদিগকে এরূপে ধৃত করি লেন, তাহারও কিছু অনুসন্ধান করিয়া উঠিতে পারিতেছি না।
আমি। যে ব্যক্তি হত্যা করিবার সহায়তা করিতে পারে, ও চুরি করিবার নিমিত্ত নানাবিধ উপায় উদ্ভাবন করিয়া অপরের দ্বারা সেই কাৰ্য্য সমাধা করিয়া লইতে পারে, সে যে কেন ধৃত হইল, তাহা তাহার বুঝিতে না পারিবারই কথা। সে যাহা হউক, তুমি এখন প্রকৃত কথা বলিবে, কি না?
আমার এই প্রকার কথা শুনিয়া বালমুকুন কেবল আমার মুখের দিকেই একদৃষ্টিতে চাহিয়া রহিলেন। তাঁহার ভাবগতি দেখিয়া অনুমান হইতে লাগিল, আমার এই অবস্থা দেখিয়া বালমুকুন যেন একবারে বিস্মিত হইয়া পড়িয়াছেন, ভালমন্দ কিছুই যেন বুঝিয়া উঠিতে পারিতেছেন না। বালমুকুনের এই অবস্থা দেখিয়া আমি তাহাকে কহিলাম, আপনি এরূপ বিস্মিত হইতেছেন কেন? ইহারা আপনাকে মধ্যে রাখিয়া একটী ভয়ানক চুরি করিয়াছে, এবং আপন প্রাণ লইয়া পলায়ন করিবার মানসে একটী হত্যা করিতেও পরাজুখ হয় নাই।
মাণিক। এ মিথ্যা কথা। ইহা আপনাকে কে বলিল?
আমি। আমাকে অপরে যাহা কিছু বলুক, বা অপর কোন স্থান হইতে আমি যেরূপে সংবাদ পাই, আর না পাই, তোমারই
সংবাদপত্রে কি সংবাদ প্রকাশিত হইয়াছে, তাহাই কেন একবার পড়িয়া দেখ না। তাহা হইলেই ত আমাকে তোমার আর কোন কথা জিজ্ঞাসা করিবার প্রয়োজন হইবে না। এই বলিয়া মাণিক চাদের টেবিলের উপর যে সংবাদ-পত্ৰখানি আমি প্রাপ্ত হইয়া পাঠ করিয়াছিলাম, সেই সংবাদপত্র হইতে সেই বিষয়টা আমি পাঠ করিলাম। উহার সারমর্ম এইরূপ —
ভয়ানক হত্যা ও অদ্ভুত চুরি।
অপরাধী ধৃত হইয়াছে; কিন্তু কে যে তাহার এই বিষয়ে সবিশেষরূপে সাহায্য করিয়াছে, তাহার সন্ধান এখনও পর্যন্ত হয় নাই।
বালমুকুন নামক এক ব্যক্তি কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া, বোম্বাই সহরের একজন প্রধান ধনীর অধীনে একটী কার্যে নিযুক্ত হয়। চাকরী করা তাহার উদ্দেশ্য ছিল না, তাহার ইচ্ছা, চাকরের ভানে কিছুদিবস সেই স্থানে কাৰ্য্য করিয়া, ধনীর ধনভাণ্ডার প্রভৃতির উত্তমরূপ অনুসন্ধান লয়। এইরূপে সেই মহাজনের কোন্ কোন্ স্থানে কিরূপ অর্থ আছে, তাহা যেমন জানিতে পারিল, অমনি সুযোগমত ক্রমে ক্রমে সেই সকল স্থান যে সকল তালার দ্বারা বন্ধ থাকে, একে একে তাহার সমস্ত চাবি প্রস্তুত করিয়া লয়, এবং সুযোগমত একদিবস রাত্রিকালে সেই সমস্ত তালা খুলিয়া নোট, টাকা, সুবর্ণ-অলঙ্কার ও জহরত আদিতে প্রায় লক্ষাধিক টাকা অপহরণ করিয়া সমস্ত তালা পুনরায় আবদ্ধ-পূৰ্ব্বক যেমন বাহির হইবার চেষ্টা করে, সেই সময় একজন দ্বারবান্ উহা জানিতে পারিয়া বালমুকুনকে ধরিবার চেষ্টা করে, এবং চোর চোর বলিয়া ভয়ানক গোলযোগ করে। বালমুকুন সেই সময় অনন্যোপায় হইয়া আপনার প্রাণ লইয়া পলায়ন করিবার মানসে সেই দ্বারবানের উপর সবিশেষরূপ বলপ্রয়োগ করে; কিন্তু যখন কোনরূপেই তাহার হস্ত হইতে পরিত্রাণ না পায়, সেই সময় একখানি অস্ত্র দ্বারা বালমুকুন্ তাহাকে সাংঘাতিকরূপ আঘাত করিয়া পলায়নের চেষ্টা করে। সেই অস্ত্রখানি বোধ হয়, বালমুকুন সঙ্গে করিয়া আনিয়াছিল। দ্বারবান সেই অস্ত্রাঘাতেই হতজ্ঞান হইয়া সেই স্থানে পতিত হয়, এবং পরিশেষে ইহজীবন সম্বরণ করে। দ্বারবানকে হত্যা করিয়াও বালমুকুন্ সেই স্থান হইতে পলায়ন করিতে সমর্থ হয় নাই, অপরাপর কতকগুলি লোক সেই সময় সেই স্থানে উপস্থিত হইয়াছিল, পরিশেষে বালমুকুন তাহাদিগের দ্বারা ধৃত হইয়াছে। বালমুকুন যে কে, তাহা এ পর্যন্ত সবিশেষরূপে স্থিরীকৃত হয় নাই। পুলিস সবিশেষরূপ যত্নসহকারে এই মোকদ্দমার অনুসন্ধানে নিযুক্ত হইয়াছেন। কেহ কেহ বলিতেছেন, বালমুকুন অপর আর কেহই নহে; বোধ হয়, মধ্যপ্রদেশীয় সেই ভয়ানক দস্যু হীরালাল। যাহা হউক, এ বিষয়ের সমস্ত রহস্য বাহির হইয়া পড়িলে, ইহার আনুপূর্বিক সংবাদ আমরা পাঠকগণকে প্রদান করিতে চেষ্টা করিব।
সংবাদপত্রখানি পাঠ করা সমাপ্ত হইলে আমি মাণিকচাঁদকে জিজ্ঞাসা করিলাম, কেমন মাণিকচাঁদ! তোমার এখন আর কোন কথা জিজ্ঞাস্য আছে?
তখন মাণিকচাঁদ আমার কথার আর কোনরূপ উত্তর প্রদান করিতে পারিল না; মস্তক নত করিয়া কেবলমাত্র একটী দীর্ঘনিশ্বাস পরিত্যাগ করিল।
বালমুকুন কহিলেন, কি মহাশয়! আমি এই হত্যা করি আছি? দোহাই মহাশয়! আমি সেই স্থানে গমন করি নাই, এই কলিকাতা আমি পরিত্যাগ করি নাই। সেই ফারমে আমার কৰ্ম্ম হইয়াছিল সত্য; কিন্তু সেই কৰ্ম্ম আমি পরিত্যাগ করিয়াছি। যখন আমি সেই স্থানে গমন করি নাই, তখন সেই চুরি ও হত্যা আমার দ্বারা সম্পন্ন হইবে কি প্রকারে?
আমি। বালমুকুন্! ইহাতে তোমার ভীত হইবার কোন কারণ নাই। যে ব্যক্তি তোমার নাম গ্রহণ করিয়া, সেই স্থানে কৰ্ম্ম করিতে প্রবৃত্ত হইয়াছিল, তাহার প্রকৃত নাম বোধ হইতেছে হীরালাল। মাণিকচাঁদ এখন সমস্ত কথা পরিষ্কার করিয়া আমাদিগকে বলিবে, এবং তাহারই বা প্রকৃত নাম কি, তাহাও বোধ হয়, এখন আর সে গোপন করিবে না।
