আমি। অলঙ্কারগুলি?
স্ত্রীলোক। আমার ঘরে আছে।
আমি। বাহির করিয়া আন।
আমার কথা শুনিয়া সেই স্ত্রীলোকটী আপন ঘরের ভিতর প্রবেশ করিল ও মৃত্তিকা নির্মিত একটী পুরাতন হাঁড়ির মধ্য হইতে কতকগুলি মূল্যবান্ অলঙ্কার বাহির করিয়া আনিয়া আমার হস্তে প্রদান করিল। সেই বালকের অঙ্গে যে সকল অলঙ্কার ছিল, তাহার একটা তালিকা তাহার পিতা পূৰ্বেই আমাকে প্রদান করিয়াছিলেন, এবং তালিকার নকল আমার পকেট বহিতে লেখা ছিল। তাহার সহিত আমি গহনাগুলি মিলাইয়া দেখিলাম। দেখিলাম, কেবলমাত্র একখানি ছোট গহনা ব্যতীত আর সমস্ত গুলিই উহাতে আছে। সেই গহনাখানির কথা জিজ্ঞাসা করায়, সে কহিল, ওই গহনাখানি উহার অঙ্গে ছিল না, আমি উহা পাই নাই। যখন আমি সমস্ত গহনাই বাহির করিয়া দিতে পারিলাম, তখন সেই সামান্য গহনাখানি লইয়া আমি কি করিব?
সেই স্ত্রীলোকের এ কথা কিন্তু আমি বিশ্বাস করিলাম না। আমার মনে সন্দেহ হইল, সেই ছোট গহনাখানি সে কোথায় বিক্রয় করিয়া তাহার দ্বারা নিজের ও বালকের আহারের খরচের সংস্থান করিতেছে। সুতরাং সেই সামান্য একখানি গহনার নিমিত্ত আমি তাহাকে লইয়া আর সবিশেষ পীড়াপীড়ি করিলাম না। গহনা গুলি ও বালকটীকে সঙ্গে লইয়া আমি পূর্ব-কথিত সেই বাজারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। যে দুইটী স্ত্রীলোকের নিকট হইতে আমি এই সন্ধান প্রাপ্ত হইয়াছিলাম, যাইবার সময় তাহাদিগকে বলিয়া গেলাম যে, তৎপরদিবস বৈকালে তাঁহারা যেন আমার সহিত সেই বাজারে সাক্ষাৎ করে। সেই সময় তাহাদিগের প্রাপ্য পারিতোষিকের টাকা তাহাদিগকে প্রদান করিব। উঁহারা আমার কথায় বিশ্বাস করিয়া সেই স্থান হইতে প্রস্থান করিল। আমিও সেই স্থান হইতে বালক, অলঙ্কার প্রভৃতি লইয়া বাজারে গিয়া উপস্থিত হইলাম। বাজারে পৌঁহুছিয়া সেই বালকের পিতা সেই বড় মানুষটীকে তথায় আনিবার নিমিত্ত দ্রুতগতি একটী লোক পাঠাইয়া দিলাম।
পরদিবস অতি প্রত্যূষেই বালকের পিতা লোকজনের সহিত তোয় আসিয়া উপস্থিত হইলেন, এবং বালকটীকে দেখিয়াই ক্ৰন্দন করিয়া ফেলিলেন। পূৰ্ব্ব-কথিত স্ত্রীলোকদ্বয়কে আমি যে পারিতোষক প্রদান করিতে স্বীকার করিয়াছিল, তাহা তাঁহার নিকট বলিবা মাত্র তিনি সেই টাকা আমার হস্তে প্রদান করিলেন। পূর্বদিনের কথামত বৈকালে সেই স্ত্রীলোকদ্বয় আগমন করিলে, আমি সেই অর্থ তাহাদিগকে প্রদান করিলাম। বালকের পিতা উভয়কে আরও পঞ্চাশ টাকা প্রদান করিলেন, এবং বে স্ত্রীলোকটীর নিকট হইতে বালকটী ও গহনাগুলি পাওয়া গিয়াছিল, তাহার পারিতোধিক স্বরূপ তিনি দুইশত টাকা আমার হস্তে প্রদান করিলেন। কিন্তু আমি কহিলাম, এই স্ত্রীলোকটী যে অপরাধ করিয়াছে, তাহার নিমিত্ত ইহার দণ্ড হইবে, কি ইহাকে পারি তোযিক প্রদান করা যাইবে? উত্তরে তিনি কহিলেন, ও যে অপরাধ করিয়াছে, আইনে তাহার দও থাকিলে, উহার দণ্ড হওয়া উচিত; কিন্তু আমার পুত্রীকে যে জীবিত অবস্থায় রাখিয়া এ পর্যন্ত উহাকে খাওয়াইয়াছে, পরাইয়াছে, তাহার নিমিত্ত উহাকে দুইশত টাকা পারিতোষিক প্রদান করিতেছি।
তাঁহার নিকট হইতে আমি সেই দুইশত টাকা গ্রহণ করি লাম সত্য; কিন্তু এরূপ অবস্থায় আমার সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর আদেশ ব্যতীত আমি তাহাকে অব্যাহতি প্রদান করিতে সাহসী হইলাম না।
যে একখানি সামান্য অলঙ্কার পাওয়া গেল না, বালকের পিতামাতা, চাকর-চাকরাণী প্রভৃতি কেহই স্পষ্ট করিয়া বলিতে পারিল না, যে সময় ভুল-ক্রমে বালকটীকে পরিত্যাগ করা হইয়া ছিল, সেই সময় সেই অলঙ্কারখানি তাহার অঙ্গে ছিল কি না?
কিরূপে সেই স্ত্রীলোকটী বালককে পাইল, তাহা তাহাকে জিজ্ঞাসা করায় সে কহিল যে, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে দুই তিনদিবস পূর্বে সে উলুবেড়িয়ায় গমন করিয়াছিল। সেই স্থান হইতে প্রত্যা বৰ্তন করিবার সময় যে জাহাজ হইতে বড়লোকটী সপরিবারে উলুবেড়িয়ায় অবতরণ করেন, সে উলুবেড়িয়া হইতে সেই জাহাজে উঠিয়া আপনার গ্রামে আগমন করিতেছিল। জাহাজে উঠিয়া যে কামরায় ওই বালকটী ছিল, সে সেই দিকে গমন করে, এবং দেখিতে পায়, সেই কামরায় একখানি বেঞ্চের উপর ওই বালকটিী অলঙ্কার-ভূষিত হইয়া নিদ্রিত রহিয়াছে। বালকটীর এইরূপ অবস্থা দেখিয়া, কিয়ৎক্ষণ সে সেই স্থানে অপেক্ষা করে; কিন্তু সেই স্থানে উহার কোন লোকজনকে দেখিতে না পাইয়া, ভুল-ক্রমে কেহ তাহাকে ফেলিয়া গিয়াছে, এই ভাবিয়া তাহাকে আপন বাড়ীতে লইয়া যায়।
বালক, বালকের পিতা, অলঙ্কার ও সেই স্ত্রীলোকটীকে লইয়া আমি কলিকাতায় আসিলাম, এবং আমার সর্বপ্রধান কর্ম্মচারীর নিকট উপস্থিত হইয়া তাহাকে সকল কথা বললাম। সেই স্ত্রীলোকের উপর মোকদ্দমা চালান যাইতে পারে, আইনে এরূপ কোন বিধান না পাওয়ায়, তাহাকে ছাড়িয়া দেওয়া হইল, এবং বালকের পিতার ইচ্ছানুযায়ী প্রদত্ত পূৰ্ব্ব-কথিত দুইশত টাকাও তাহাকে প্রদান করা হইল। সে হাসিতে হাসিতে আপন গৃহাভি মুখে প্রস্থান করিল।
বলা বাহুল্য যে, এই বালকের অনুসন্ধানের নিমিত্ত আমিও আমার সমস্ত খরচ-পত্রাদি ও উপযুক্ত পারিতোষিক যথাসময়ে প্রাপ্ত হইয়াছিলাম।
। সম্পূর্ণ ।
দায়ে খুন
দায়ে খুন (অর্থাৎ যেমন জুয়াচুরি তেমনই সাজা!)
DETECTIVE STORIES No, ৪3. দারোগার দপ্তর ৮৩ম সংখ্যা।
প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায় প্রণীত।
সিকদারবাগান বান্ধব পুস্তকালয় ও সাধারণ পাঠাগার হইতে এবাণীনাথ নন্দী কর্তৃক প্রকাশিত।
All Rights Reserved.
সপ্তম বর্ষ। সন ১৩০৫ সাল। ফাল্গুন।
Printed By Shashi Bhusan Chandra, at the GREAT TOWN PRESS, 68, Nimtola Street, Calcutta.
