আমি তাহার কথায় বিশ্বাস করিয়া, তাহার নির্দেশমত তাহার সহিত গমন করিলাম। কিয়দ্দূর গিয়া সে আমাকে একখানি সামান্য খড়ের ঘর দেখাইয়া দিয়া কহিল, ইহাই সেই স্ত্রীলোকটীর বাড়ী, এবং এই বাড়ীতে সেই বালকটীও আছে। আপনি এখন এই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলেই সেই বালকটীকে দেখিতে পা ইবেন। তখন আপনি জানিতে পারিবেন যে, সেই বালকটী আপনার কি না।
সেই স্ত্রীলোকটীর কথা শুনিয়া আমি আস্তে আস্তে সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলাম। দেখিলাম, একটী স্ত্রীলোক একটী বালককে ক্রোড়ে করিয়া তাহার ঘরের দাওয়ায় বসিয়া আছে। তাহার সম্মুখে, আমার সহিত যে স্ত্রীলোকদ্বয় গমন করিয়াছিল, তাহাদিগের মধ্যে অপর স্ত্রীলোকটী বসিয়া তাহার সহিত গল্প করিতেছে।
আমি ও আমার সমভিব্যাহারী লোকটী একবারে সেই বাড়ীর ভিতর প্রবেশ করিলে, আমাদিগকে দেখিয়া সেই স্ত্রীলোকটী যেন একটু ভীত হইল।
আমি দেখিলাম, যে বালকটী উহার নিকট রহিয়াছে, তাহার আকৃতি প্রকৃতি সমস্তই সেই জাহাজে-ভুল-ক্রমে পরিত্যক্ত বালকের সদৃশ। এক কথায় আমি বেশ বুঝিতে পারিলাম, এই বালকটাই কলিকাতার সেই বড়লোকটীর পুত্র।
সেই স্ত্রীলোক কোন কথা বলিতে না বলিতেই আমি তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলাম, এ বালকটীকে তুমি কোথায় পাইলে?
স্ত্রীলোক। ইটি আমার পুত্র।
আমি। তোমার নিজের সন্তান?
স্ত্রীলোক। না, আমার নিজের সন্তান নহে; আমার ভগিনীর সন্তান। কিন্তু যখন আমি উহাকে প্রতিপালন করিতেছি, তখন আমারই সন্তান নয় ত কি?
আমি। আমি ওসকল মিথ্যা কথা শুনিতে চাহি না। তুমি জান আমি কে? তোমাকে আমি পূৰ্বেই সতর্ক করিয়া দিতেছি, তুমি মিথ্যা কথা কহিও না। মিথ্যা বলিলে তোমার সবিশেষরূপ অনিষ্ট ভিন্ন কখনই ইষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই। আমি পুর্বে সকল কথা জানিতে পারিয়াছি, তাঁহার পর তোমার নিকট আগমন করিয়াছি। প্রকৃত কথা না বলিলে, আমি তোমাকে ধরিয়া লইয়া যাইব।
স্ত্রীলোক। আপনি কে?
আমি। আমি পুলিস-কর্ম্মচারী। তুমি এই বালকটীকে অপ হরণ করিয়া লইয়া আসিয়াছ। তোমার নামে বালক-চুরির নালিশ হইয়াছে, তাই আমি তাহার অনুসন্ধান করিতে আসিয়াছি, এবং মাল, আসামী, উভয়ই পাইয়াছি। এখন তুমি আমার নিকট প্রকৃত কথা বলিবে কি?
স্ত্রীলোক। আমি প্রকৃতই বলিতেছি, আমি এই বালককে চুরি করিয়া আনি নাই।
আমি। যদি চুরি করিয়া না আনিলে, তাহা হইলে তুমি ইহাকে পাইলে কোথায়?
স্ত্রীলোক। কোন স্থানে পড়িয়াছিল, দেথিয়া আমি উহাকে উঠাইয়া আনিয়া যত্নে প্রতিপালন করিতেছি। আমি চুরি করিয়া আনিব কেন?
আমি। যদি তুমি ইহাকে অপহরণ করিয়া আন নাই, তাহা হইলে ইহার পিতামাতার নিকট তুমি ইহাকে লইয়া যাও নাই কেন?
স্ত্রীলোক। আমি জানি না উহার পিতামাতা কে?
আমি। থানায় গিয়া ইহাকে জমা দেও নাই কেন?
স্ত্রীলোক। বালক পাইলে যে থানায় গিয়া জমা দিতে হয়, তাহা আমি জানি না। আমি মনে করিয়াছিলাম, যাহার বালক, সে আসিয়া লইয়া যাইবে।
আমি। এই বালকটী পড়িয়াছিল, আর তুমি যে ইহাকে পাইয়াছ, এই কথা কাহাকেও বলিয়াছ?
স্ত্রীলোক। না।
আমি। কেন বল নাই?
স্ত্রীলোক। ভয়ে বলি নাই।
আমি। তুমি এই বালকটীকে কোথায় পাইয়াছিলে?
স্ত্রীলোক। যে স্থানে পাইয়াছিলাম, সেই স্থানের নাম আমি অবগত নহি। আমার সহিত চলুন, আমি দেখাইয়া দিব।
আমি। কোন্ স্থানে পড়িয়াছিল?
স্ত্রীলোক। একটী ময়দানের মধ্যে।
আমি। মিথ্যা কথা। তুমি ইহাকে ময়দানের মধ্যে পাইয়াছ, তাহা আর কে অবগত আছে?
স্ত্রীলোক। আর কেহই জানে না।
আমি। এখন আর মিথ্যা কথা বলিও না। কোন একখানি জাহাজের মধ্য হইতে তুমি ইহাকে উঠাইয়া আনিয়াছ, আর এখন মিথ্যা করিয়া বলিতেছ, একটী ময়দানে এ পড়িয়াছিল।
স্ত্রীলোক। না, আমি জাহাজ হইতে আনি নাই। আমি জাহাজে কি করিতে যাইব?
আমি। ইহার অঙ্গে যে সকল অলঙ্কার ছিল, সেই সকল অলঙ্কার কোথায়?
স্ত্রীলোক। ইহার অঙ্গে কোন অলঙ্কার ছিল না।
আমি। আমি তোমাকে এখনও সতর্ক করিয়া দিতেছি যে, তুমি এখনও প্রকৃত কথা বল। অলঙ্কারের সহিত তুমি ইয়াকে জাহাজ হইতে আনিয়াছ কি না?
স্ত্রীলোক। না মহাশয়! আমি ইহাকে জাহাজ হইতে আনি নাই।
আমি। আমি এখনই তোমার ঘর উত্তমরূপে অনুসন্ধান করিব। তোমার ঘর হইতে যদি কোন অলঙ্কার বাহির হয়, তাহা হইলে তুমি জানি যে, কোনরূপেই তোমার নিষ্কৃতি নাই।
স্ত্রীলোক। অনায়াসেই আপনি আমার ঘর অনুসন্ধান করিয়া দেখিতে পারেন।
স্ত্রীলোকের শেষ কথাটী শুনিয়া আমার মনে একটু সন্দেহ হইল। একবার ভাবিলাম, হয় ত প্রকৃতই এ অলঙ্কারের সহিত জাহাজ হইতে এই বালকটীকে আনয়ন করে নাই। অপর কোন ব্যক্তি জাহাজ হইতে ইহাকে আনিয়া উহার অঙ্গ হইতে অলঙ্কার গুলি অপহরণ করিয়া ইহাকে কোন স্থানে নিক্ষেপ করিয়া চলিয়া গিয়াছিল। পরিশেষে এই স্ত্রীলোকটী ইহাকে সেই অবস্থায় দেখিতে পাইয়া উঠাইয়া আনিয়াছে।
মনে মনে এইরূপ একবার ভাবিলাম সত্য; কিন্তু উহার কথায় আমি একবারে বিশ্বাস করিতে পারিলাম না। উহার ঘরের ভিতর প্রবেশ করিয়া উহার ঘর অনুসন্ধান করিতে প্রবৃত্ত হইলাম।
সেই স্ত্রীলোকটী যখন দেখিল যে, আমি উহার ঘর অনু সন্ধান করিতে কোনরূপেই নিবৃত্ত হইলাম না, তখন সে আমার দুইখানি পা জড়াইয়া ধরিয়া কাঁদিতে কাঁদিতে কহিল, আমি প্রকৃত কথা বলিতেছি, আপনি আমাকে ক্ষমা করুন। আমি আর মিথ্যা কথা বলিব না, আমি জাহাজ হইতে ইহাকে আনয়ন করিয়াছি।
