দারোগা। এতদুর ঘটিয়াছিল, এ কথা আমাকে পূর্বে বলেন নাই কেন? অনুসন্ধানকারী দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়া কোন না কোনরূপে আমি ইহার প্রতিবিধানের চেষ্টা করিতাম। আপনার কি মনে নাই যে, অনেক সময় গোফুর খাঁর নিকট আমি অনেক উপকার প্রাপ্ত হইয়াছি।
হোসেন। আপনার কথা সেই সময় আমাদিগের মনে এক বারেই পড়ে নাই। বিশেষতঃ মনে পড়িলেই বা কি হইত? আপনি যে এই থানায় আছেন, তাহা আমরা কেহ অবগত ছিলাম না। আপনি গোফুর খাঁর নিকট অনেক সময় উপকার পাইয়াছেন বলিতেছেন বটে; কিন্তু এখন আপনার নিকটেই বা কিরূপে উপকারের প্রত্যাশা করা যাইতে পারে?
দারোগা। আপনার এ কথার অর্থ কি?
হোসেন। অর্থ যে কি, তাহা আর আপনি বুঝিতে পারিতেছেন না? আজ কালকার যেরূপ নিয়ম হইয়া পড়ি তেছে, তাহা ত আপনি বেশ জানেন। আপনি যাহার উপকার করিবেন, সে কিসে সেই উপকারকারীর অনিষ্ট করিতে সমর্থ হইবে, তাহারই চেষ্টা সর্বদা করিয়া থাকে।
দারোগা। আপনার কি বিশ্বাস যে, জগতের সকলেই সেই চরিত্রের লোক?
হোসেন। সকলে না হইতে পারেন; কিন্তু পনর আনা লোকের চরিত্র যে সেইরূপ, তাহাতে আর কিছুমাত্র সন্দেহ নাই।
দারোগা। আমি যদি পূৰ্ব্বে ইহার অণুমাত্রও জানিতে পারিতাম, তাহা হইলে বোধ হয়, আমি সবিশেষরূপে আপনাদিগের উপকার করিতে পারিতাম।
হোসেন। যাহার সময় উত্তীর্ণ হইয়া গিয়াছে, তাহার আর উপায় নাই! এখন বলুন দেখি, আপীলে কোনরূপ ফল পাইবার উপায় আছে কি?
দারোগা। আমার বোধ হয়, আপীলে এ মোকদ্দমার কিছু হইবে না।
হোসেন। এই মোকদ্দমার কাগজ-পত্ৰ ত আপনি কিছুই দেখেন নাই, তবে আপনি কিরূপে বলিতেছেন যে, আপীলে কোনরূপ ফল পাওয়া যাইবে না?
দারোগা। কাগজ-পত্র না দেখিলেও আমার জানিবার বিশেষ কারণ আছে। যে জজসাহেব এই মোক দমার বিচার করিয়াছেন, তাঁহাকে আমি অনেক দিবস হইতে উত্তমরূপে অবগত আছি। তাঁহার মত বুদ্ধিমান কর্ম্মচারী অতি অল্পই দেখিতে পাওয়া যায়। তাহার উপর মোকদ্দমার রায় লিখিবার ক্ষমতা তাঁহার যেরূপ আছে, সেরূপ ক্ষমত। এই প্রদেশীয় বর্তমান কর্ম্মচারীগণের মধ্যে আর কাহারও আছে কি না সন্দেহ। এ পর্যন্ত তাহার বিচারিত যত মোকদ্দমার আপীল হইয়াছে, হাইকোর্ট হইতে তাহার একটীও মোকদ্দমার রায় পরিবর্তিত হয় নাই। বরং তাহার রায় দেখিয়া, সকলেই তাহার প্রশংসা করিয়াছেন।
হোসেন। যে আশায় আমি উঁহাদিগকে এতক্ষণ পর্যন্ত জীবিত রাখিয়াছি, তবে কি আমাদিগের সে আশা নাই?
দারোগা। আপীলের আশা ছাড়িয়া দিয়া যদি আর কোনরূপ উপায় থাকে, তাহার চেষ্টা দেখুন। আপীলে কিছু হইবে না।
হোসেন। আর উপায় কি দেখিব? এমন উপায় আর কি হইতে পারে, যাহাতে উঁহাদিগের উভয়ের প্রাণরক্ষা হয়?
দারোগা। কোনরূপ যোগাড়যন্ত্র করিয়া যদি লাটসাহেবের নিকট হইতে উঁহাদিগের জীবন-ভিক্ষা লইতে পারেন, তাহা হইলেই হইতে পারে।
হোসেন। সেরূপ যোগাড় কিরূপে হইতে পারে? সে ক্ষমতা আমাদিগের নাই।
দারোগা। কেন থাকিবে না, যাহার প্রচুর অর্থ আছে, তাহার সমস্ত ক্ষমতাই আছে। তবে যোগাড় চাই, পরিশ্রম চাই, তাহার উপর অর্থ ব্যয় করিবার ইচ্ছা চাই।
হোসেন। আমাদিগের যতদূর সম্ভব, অর্থ সাহায্য করিতে প্রস্তুত আছি; কিন্তু যোগাড় করিবার ক্ষমতা আমাদিগের নাই। গোফুর খাঁর উপর যদি আপনার এতদূর দয়া হইয়াছে, তাহা হইলে অনুগ্ৰহ করিয়া বলিয়া দিন, কিরূপ ভাবে যোগাড় করিলে, বা কাহার সাহায্য গ্রহণ করিলে, আমার মনিবদ্বয়ের জীবন রক্ষা করিতে সমর্থ হইব।
দারোগা। এখন আপনি উঁহাদিগের জীবনের নিমিত্ত কত অর্থ ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন?
হোসেন। আমাদিগের যতদুর সাধ্য, তাহা অপেক্ষা আরও অধিক অর্থ ব্যয় করিতে আমি প্রস্তুত আছি।
দারোগা। আপনাদিগের কি ক্ষমতা আছে, তাহা আমি জানি না। কি পরিমাণ অর্থ ব্যয় করিতে পারিবেন, তাহা আমাকে স্পষ্ট করিয়া বলুন, তাহা হইলে আমি বুঝিতে পারি যে, উঁহাদিগের জীবন রক্ষা হইতে পারিবে কি মা! তাহা হইলে আমার যেরূপ বুদ্ধি, সেইরূপ একটা সামান্য উপায় বলিয়া দিব, বা আবশ্যক হয়, আমি নিজে উহাতে হস্তক্ষেপ করিব।
হোসেন। দেখুন দারোগা সাহেব! জীবনের অপেক্ষা অর্থ কিছু অধিক মুল্যবান্ নহে। যদি ইহারা জীবন প্রাপ্ত হন, তাহা হইলে আমার বিশ্বাস, উঁহাদিগের নিকট যাহা কিছু সঞ্চিত অর্থ আছে, এবং চেষ্টা করিয়া আরও যতদূর অর্থের সাহায্য হইতে পারে, তাহার সমস্তই উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন।
দারোগা। ওরূপ গোলযোগের কথা আমি বুঝি না। আমাকে পরিষ্কার করিয়া বলুন দেখি, পাঁচ লক্ষ টাকা উঁহারা ব্যয় করিতে প্রস্তুত আছেন কি?
হোসেন। পাঁচ লক্ষ টাকা। এখন ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের নাই।
দারোগা। তবে কয় লক্ষ টাকা ব্যয় করিবার ক্ষমতা উঁহাদিগের আছে?
হোসেন। উঁহাদিগের সহিত পরামর্শ না করিয়া, আমি এ কথার ঠিক উত্তর দিতে পারিতেছি না। আমার বোধ হয়, যদি উঁহাদিলের জীবন রক্ষা করিতে পারেন, তাহা হইলে এক লক্ষ টাকা পর্যন্ত উঁহারা ব্যয় করিতে সমর্থ হইবেন। তাহার অধিক যে পারিবেন, তাহা আমার বোধ হয় না। দারোগা। আচ্ছা, আপনি গমন করুন, এবং হাজত গৃহের বাহির হইতে উঁহাদিগকে জিজ্ঞাসা করিয়া আসুন; দেখুন, উঁহারা কি বলেন। দুই লক্ষ মুদ্রার কম এ কাৰ্য্য কখনই সম্পন্ন হইতে পারে না। যদি উঁহারা আমার প্রস্তাবে সম্মত হন, তাহা হইলে আপনি সময় নষ্ট না করিয়া, শী আমার নিকট আগমন করিবেন। আমি আপনার অপেক্ষায় এই স্থানে বসিয়া রহিলাম।
