প্রহরী। এখনই। আপনি আমার সহিত আসুন, তিনি হায় বাহিরের গৃহে আপনার প্রতীক্ষায় বসিয়া আছেন।
হোসেন। চল।
এই বলিয়া : হোসেন সেই স্থান হইতে গাত্রোখান করিয়া সেই প্রহরীর পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। যাইবার সময় তাহাকে জিজ্ঞাসা করিলেন, তুমি এই থানায় কতদিবস পর্যন্ত আছ?
প্রহরী। প্রায় আট নয় বৎসর।
হোসেন। দারোগা সাহেব এখানে কতদিবস আসিয়াছেন? প্রহরী। এক বৎসরের কম হইবে না, বরং কিছু বেশী হইবে।
হোসেন। তোমাদিগের দারোগা সাহেব কেমন লোক?
প্রহরী। খুব ভাল লোক; গরিবের মা-রাপ। আমরা সবিশেষ সুখ-সচ্ছনে তাহার নিকট কৰ্ম্ম করিতেছি।
হোসেন। দারোগা সাহেবের বাসায় তাহার পরিবারগণ কেহ আছেন, কি তিনি একাকীই এই স্থানে বাস করিতেছেন?
প্রহরী। তাঁহার পরিবার ও পুত্র কন্যাগণ এই স্থানেই ছিলেন; অদ্য আন্দাজ একমাস হইল, কোন কাৰ্য্য উপলক্ষে তিনি তাঁহাদিগকে আপনার বাড়ীতে পাঠাইয়া দিয়াছেন। এখন কেহই এখানে নাই, কেবল দারোগা সাহেব একাকী এখানে আছেন।
প্রহরীর সহিত এইরূপ নানাপ্রকার কথা কহিতে কহিতে হোসেন দারোগা সাহেবের বাসায় গিয়া উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, দারোগা সাহেব একাকী হোসেনের অপেক্ষায় তাঁহার বাহিরের গৃহে বসিয়া রহিয়াছেন।
এইরূপ অবস্থায় দারোগা সাহেবকে একাকী বসিয়া থাকিতে দেখিয়া, হোসেন একটু বিস্মিত হইলেন। কারণ, ইতিপূর্বে অনেকবার তিনি দারোগা সাহেবের সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছেন, কিন্তু কখনই তাঁহাকে একাকী দেখিতে পান নাই। অপর কেহ উপস্থিত না থাকিলেও, অভাবপক্ষে দুই চারিজন পরিচারকও সর্বদা তাহার নিকট থাকি।
তৃতীয় পরিচ্ছেদ।
দারোগা সাহেবের নিকট হোসেন গমন করিলে, তিনি হোসেনকে সেই স্থানে বসিতে বলিলেন। হোসেন তাহার সন্নিকটবর্তী এক স্থানে উপবেশন করিলে, তিনি কহিলেন,
আপনি আমাকে চিনিতে পারেন নাই?
হোসেন। আপনাকে আর চিনিতে পারি না, খুব চিনিতে পারিয়াছি। কিন্তু প্রথমতঃ আপনাকে চিনিতে পারি নাই বলিয়া, ক্ষমা প্রার্থনা করিতেছি, মাফ করিবেন।
দামোগা। আপনার মনিব ও মনিব-পুত্র যে একটা মোক জমায় পড়িয়াছেন, এ কথা আমি পূৰ্বে শুনিয়াছিলাম; কিন্তু তাঁহাদিগের যে এই অবস্থা ঘটিবে, তাহা আমি একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই।
হোসেন। মনে না করিবারই কথা। ইহারা যে একবারে চরমদণ্ডে দণ্ডিত হইবেন, তাহা আমরা একবারের নিমিত্তও মনে করি নাই, বা আমাদিগের উকীল কৌশলীগণও কখন এরূপ ভাবেন নাই।
দারোগা। আপনি বহুদর্শী ও একজন পুরাতন কর্ম্মচারী। জমিদারী-বুদ্ধি আপনার যথেষ্ট আছে। প্রথমতঃ এই মোক দমার নিমিত্ত যদি একটু চেষ্টা করিতেন, তাহা হইলে বোধ হয়, এরূপ অবস্থা কখনই ঘটিত না।
হোসেন। আমার সাধ্যমত চেষ্টা করিতে কিছুমাত্র ত্রুটি করি নাই; কিন্তু সেই সকল চেষ্টাতেও কোন ফলই দর্শিল না।
দারোগা। প্রথমে কি চেষ্টা করিয়াছিলেন। অনুসন্ধান কারী দারোগার সহিত সাক্ষাৎ করিয়াছিলেন কি?
হোসেন। এই মোক প্রথমে যে সময় রুজু হয়, সেই সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না; জমিদারীর কাৰ্য্য উপলক্ষে মফঃস্বলে গমন করিয়াছিলাম। মোকমার সংবাদ যেমন আমি শুনিতে পাইলাম, অমনি আমি চলিয়া আসিলাম।
আসিয়াই অনুসন্ধানকারী দারোগাকে কিঞ্চিৎ প্রণামী দিয়া তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিলাম। সেই সাক্ষাতের ফল আপনি এই দেখিতেই পাইতেছেন।
দারোগা। প্রণামীর পরিমাণটা, বোধ হয়, কম হইয়াছিল; তাই তাহার দ্বারা সবিশেষরূপ উপকার প্রাপ্ত হন নাই।
হোসেন। তাহার পক্ষে সামান্য হইতে পারে, কিন্তু আমার পক্ষে কম নহে। আমি তাঁহাকে সহস্র মুদ্রা প্রদান করিয়াছিলাম।
দারোগা। তাহা হইলে তিনি কোনরূপ তোমাদিগের সাহায্য করিলেন না কেন?
হোসেন। সে অনেক কথা। এই মোকদ্দমা যেরূপ ভাবে সাজান হইয়াছিল, প্রকৃত পক্ষে তাহার কিছুই ঘটে নাই, সমস্তই মিথ্যা।
দারোগা। দারোগা তোমাদিগের নিকট হইতে সহস্র মুদ্রা গ্রহণ করিলেন, এবং তোমাদিগের উপরই মিথ্যা মোকদ্দমা সাজাইলেন, এ কথা শুনিতে কেমন কেমন বোধ হয়।
হোসেন। তাহার কারণ আছে।
দারোগা। এমন কি কারণ হইতে পারে?
হোসেন। লজ্জার কথা বলিব কি! দারোগা সাহেব কোথা হইতে একটী সুরূপা স্ত্রীলোককে বাহির করিয়া আনিয়াছিলেন, এবং তাহার সমস্ত খরচ-পত্ৰ দিয়া একখানি বাড়ীতে তাহাকে রাখিয়াছিলেন। আমার মনিব-পুত্র ওসমানের চরিত্র নিতান্ত মন্দ হইয়া পড়ে। এমন কি, কোন সুশ্রী রমণীর প্রতি লোভ হইলে তাহাকে তাহা হইতে নিবৃত্ত করিবার ক্ষমতা কাহারও ছিল না। এই নিমিত্তই প্রজাদের মধ্যে সকলেই তাহার শক্ত হইয়া পড়ে। যে রমণীকে দারোগা সাহেব রাখিয়াছিলেন, সেই রমণীর কথা ওসমান কিরূপে জানিতে পারে। পরিশেষে কোনরূপ উপায় অবলম্বন করিয়া তাহাকে আয়ত্ব করে। দারোগা সাহেব এই কথা জানিতে পারিয়া, প্রথমতঃ ওমানের নিকট সংবাদ পাঠাইয়া সেই রমণীকে যথাস্থানে পুনরায় রাখিয়া আসিতে কহেন; কিন্তু ওসমান তাহার এই অনুরোধে কর্ণপাতও করেন না। তখন দারোগা সাহেব তাহার উপর সবিশেষরূপ অসন্তুষ্ট হন, এবং তাহার চরিত্রের কথা তাহার পিতা গোফুর খাঁর নিকট গিয়া বলেন। গোফুর খাঁও পুত্র-স্নেহ বশতঃ তাহার প্রতিবিধানের কোনরূপ চেষ্টাও করেন না। কাজেই দারোগা সাহেব উভয়ের প্রতি অন্তরের সহিত চটিয়া যান, এবং কিরূপে উভয়কেই সবিশেষরূপে বিপদাপন্ন করিতে সমর্থ হইবেন, কেবল তাহারই ছিদ্র অনুসন্ধান করিতে থাকেন। সেই সময় একটা সুযোেগ উপস্থিত হয়। হেদায়েৎ নামক এক ব্যক্তি আসিয়া নালিশ করে যে, সে তাহার যুবতী কন্যাকে পাইতেছে না, এবং শুনিতেছে যে, ওসমান তাহার কন্যাকে লইয়া গিয়াছে। এই সংবাদ পাইয়া দারোগা সাহেব তিলকে তাল করিয়া ফেলি লেন। পিতা-পুত্র উভয়কেই জড়াইয়া তাহার নিকট হইতে এজাহার লইলেন, ও যেরূপ ভাবে সাক্ষি-সাবুদের সংগ্রহ করিবার প্রয়োজন, তাহার সমস্তই ঠিক করিয়া আপনার প্রতিহিংসা সাধুন পূর্বক মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করিলেন। লাভের মধ্যে আমাদিগের আরও সহস্র মুদ্রা নিরর্থক নষ্ট হইল।
