হোসেন। আপনারা যদি কোন কথা তাহাদিগকে জিজ্ঞাসা না করেন, তাহা হইলে আমি জিজ্ঞাসা করিতেছি।
সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার তোমার কোন অধিকার নাই। হত্যাপরাধে যাহাদিগের প্রাদণ্ডের আদেশ হইয়াছে, তাহাদিগের সহিত কথা কহিয়া, তুমি আমাদিগের চাকরী লইতে চাও?
হোসেন। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিলে, আপনাদিগের চাকরী যাইবে কি প্রকারে, তাহা আমি বুঝিতে পারিতেছি না।
সঃ প্রহরী। চাকরী যাউক, আর না যাউক, উঁহাদিগের সহিত আমি কোনরূপে তোমাকে কথা কহিতে দিব না।
হোসেন। আপনার অনভিমতেই আমি কথা কহিব কেন? কিন্তু আমি ইহাদিগকে যদি কোন কথাই বলি, তাহা মন্দ কথা নহে। তাহাতে আপনাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হইবার সম্ভাবনা নাই।
সঃ প্রহরী। আমাদিগের কোনরূপ অনিষ্ট হউক, বা না হউক, তাহা দেখিবার তোমার কিছুমাত্র আবক নাই। মূল কথা, তুমি উঁহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতে পারিবে না।
হোসেন। যদি আমি ইহাদিগের সহিত কোন কথা কহিতেই না পারিব, তাহা হইলে আপনাদিগের সহিত আমার আসিবার কি প্রয়োজন ছিল?
সর্দ্দার-প্রহরী। প্রয়োজন ত আমি কিছুই দেখি না। না আসিলেই পারিতে।
হোসেন। আমি না আসিলে, আপনাদিগকে কে গাড়ির ভাড়া প্রদান করিত?
সঃ প্রহরী। গাড়ি ভাড়া কিছু আমাদিগের উপকারের নিমিত্ত দেও নাই। তোমারই মনিবদ্বয় হাঁটিয়া যাইতে অপারক, তাই তাঁহাদিগের নিমিত্ত গাড়ির ভাড়া প্রদান করিয়াছ। গাড়ি ভাড়া প্রদান না করিলে, আমরা অনায়াসেই উঁহাদিগকে আঁটাইয়া লইয়া যাইতে পারিতাম।
হোসেন। বলি, জমাদার সাহেব! ও সকল কথা থাক, এখন আপনাদিগের মনের কথা কি বলুন দেখি। আপনারা যাহা বলিবেন, আমি তাহাতেই প্রস্তুত আছি।
সঃ প্রহরী। খুনী আসামীর সহিত কথা কহিতে দেওয়া যে কতদুর ঝুঁকির কাৰ্য, তাহা ত আপনারা জানেন না। যদি আমাদের কোনরূপ সাধ্য না থাকে, তাহা হইলে আমরা সেই ঝুকি কেন গ্রহণ করিব? আপনি বুদ্ধিমান, আপনাকে অধিক আর কি বলিব?
হোসেন। আমাকে আর বলিতে হইবে না, এ কথা আমাকে পূর্বে বলিলেই পারিতেন। আপনারা কিছু প্রার্থনা করেন, বুঝিয়াছি। বলুন, এখন আমাকে কি দিতে হইবে।
সঃ প্রহরী। আপনি বড় মানুষ, আপনাকে আমরা আর কি বলিব? আপনি আপনার বিবেচনামত কাৰ্য্য করিলেই চলিবে।
হোসেন। এখন আর আমার বুদ্ধি-মুদ্ধি কিছুই নাই, ভাল মন্দ বুঝিবার ক্ষমতা এখন দুর হইয়া গিয়াছে। এই সামান্য কাৰ্য্যের নিমিত্ত আমাকে কয়টা টাকা দিতে হইবে, তাহা স্পষ্ট করিয়া আমাকে বলুন। আমার সাধ্য হয়, আমি প্রদান করি। আর আমার ক্ষমতার অতীত হয়, তাহা হইলে এই স্থান হইতেই আমি ধীরে ধীরে প্রস্থান করি।
সর্দ্দারপ্রহরী। আপনাকে কিছু অধিক প্রদান করিতে হইবে। আমরা পাঁচজন বই আর নয়। আমাকে কুড়ি টাকা ও অপর চারিজনকে দশ টাকা করিয়া চল্লিশ টাকা প্রদান করিলেই হইবে। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা, কেবল ষাট টাকা বৈত নয়!
হোসেন। আপনার পক্ষে ইহা অতি সামান্য টাকা; কিন্তু আমার পক্ষে ইহা খুব অধিক হইতেছে। আমি অত টাকা দিতে পারি না। আমি আপনাদিগের সম্মান রক্ষার নিমিত্ত ত্রিশ টাকা প্রদান করিতেছি।
সঃ প্রহরী। এ কাৰ্য ত্রিশ টাকায় হইতে পারে না। আপনার ইচ্ছা হয়, ষাট টাকা দিন, ইচ্ছা না হয়, এক টাকা দিবারও প্রয়োজন নাই। আমি অধিক করিয়া বলি নাই, আমি যেরূপ:এক কথার লোক, সেইরূপ এক কথাই বলিয়াছি।
হোসেন। আচ্ছা মহাশয়! আমি ষাট টাকাই প্রদান করিতেছি। ইহার পর আমাকে ত আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না?
সঃ প্রহরী। উঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার নিমিত্ত আপ নাকে আর কিছু প্রদান করিতে হইবে না। কিন্তু আমাদিগের কাহারও সম্মুখে ব্যতীত নির্জনে আপনি উঁহাদিগের সহিত কোন রূপ কথা বলিতে পারিবেন না।
এইরূপ কথাবার্তার পর হোসেন ষাট টাকা প্রদান করিয়া তাঁহাদিগের সহিত কথা কহিবার আদেশ পাইলেন। কিন্তু সেই সময় সবিশেষ কোনরূপ কথা কহিবার অবকাশ পাইলেন না। তাহাদিগকে তৎক্ষণাৎ এক্কার উপর আরোহণ করিতে হইল। হোসেনও আপন একায় গিয়া আরোহণ করিলেন। এক্কায় আরোহণ করিবার সময় হোসেন কেবলমাত্র তাহাদিগকে কহিলেন, জজসাহেব আপনাদিগের প্রাণদণ্ডের আদেশ প্রদান করিয়াছেন বলিয়া যে, আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইবেই, তাহা আপনারা মনে করিবেন না। আপনার উপার্জিত বিষয়ের এক পয়সামাত্র অবশিষ্ট থাকিতে, কোনরূপেই আমি আপনাদিগের প্রাণদণ্ড হইতে দিব না। টাকাব যথেষ্ট সংগ্রহ করিয়া আমি সঙ্গেই রাখিয়াছি। হাইকোর্ট হইতে যেরূপ উপায়ে হউক, এই হুকুম রদ করাইবু। ঈশ্বর যদি একান্তই বিমুখ হন, হাইকোর্ট হইতে যদি কিছু করিয়া উঠিতে না পারি, তাহা হইলে ছোট লাটকে ধরিয়া হউক, বড় লাটকে ধরিয়া হউক, বিলাত পর্যন্ত গড়িয়া হউক, কোন না কোনরূপে আপনাদিগকে অব্যাহতি প্রদান করাইব।
হোসেনের কথা শুনিয়া গোফুর ও ওসমান কেবল এইমাত্র কহিলেন, দেখুন, ভরসার মধ্যে ঈশ্বর?
ইহার পরেই এক্কা সকল সেই স্থান হইতে চলিল। একা, চালক অশ্বগণকে সবলে কষাঘাত করিতে লাগিল। প্রহারের ভয়ে অশ্বগণ দ্রুতবেগে গমন করিতে লাগিল। দুই ঘণ্টার পথ একঘণ্টায় চলিতে লাগিল।
চতুর্থ পরিচ্ছেদ।
দিবা দ্বিপ্রহরের সময়, এক্কা সকল একটী সরাইয়ের নিকট গিয়া উপস্থিত হইলে, আসামীদ্বয়ের সহিত প্রহরীগণ সেই স্থানে অবতরণ করিয়া সেই সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিল। সেই স্থানে কোন দ্রব্যেরই অভাব ছিল না। সরাইয়ের মধ্যেই শীতল জল-পূর্ণ একটা প্রকাণ্ড ইদারা। সরাইয়ের মধ্যস্থিত একখানি ঘরের মধ্যেই বেনিয়ার দোকান; উহাতে আটা, চাউল, ধৃত ও তরকারি প্রভৃতি আবশ্যক আহারীয় দ্রব্য এবং হড়ী, কাষ্ট, কঁচা সালপাতা প্রভৃতি সমস্তই পাওয়া যায়। প্রহরীগণ সরাইয়ের ভিতর প্রবেশ করিয়াই তাহার মধ্যে যে সকল সারি সারি ঘর ছিল, তাহার একখানির মধ্যে আসামীদ্বয়কে রাখিয়া দিল। সেই ঘরের কেবলমাত্র একটী দরজা ভিন্ন অপর জানালা দরজা আর কিছুই ছিল না; সুতরাং সেই ঘরকে একরূপ হাজত-গৃহ বলিলেও চলে। সেই ঘরের সম্মুখে দৌড় বারান্দার উপর সারি সারি পাচ খানি চারিপায়া আসিয়া পড়িল। প্রহরীগণ সেই স্থানে আপনাপন পোষাক পরিচ্ছদাদি রাখিয়া, সেই চারিপায়ার উপর উপবেশন করিল; কেহ বা লম্বা হইয়া শয়ন করিল। প্রহরীগণকে শয়ন করিতে দেখিয়া, দুই জন নাপিত (নাউ) আসিয়া তাহাদিগের পদসেবায় প্রবৃত্ত হইল, এবং দুইজন বারকনিতা আসিয়া সেই স্থানে দণ্ডায়মান হইল। উঁহারা এইরূপ সমাগত পথিকগণের সেবা-সুশ্রুষা করিয়া আপনাপন উদরান্নের সংস্থান করিয়া থাকে। নাপিতগণের থাকিবার স্থান সেই সরাইয়ের ভিতর না থাকিলেও, দিনরাত্রি তাঁহারা সকলেই প্রায় সেই স্থানে অবস্থিতি করে; কিন্তু বার-বনিতাগণ সেই সরাইয়ের ভিতরেই একটা একটা ঘর লইয়া, তাহাতেই অবস্থিতি করিয়া থাকে।
