পরদিবস অতি প্রত্যুষে প্রহরীগণ আসামীদ্বয়কে লইয়া একারােহণে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইলেন। হোসেনও তাঁহার অনুচরদ্বয়ের সহিত অপর এক্কায় আরোহণ করিয়া তাহাদিগের পশ্চাৎ পশ্চাৎ গমন করিতে লাগিলেন। প্রহরী গণের মধ্যে যে ব্যক্তি সর্ব প্রধান ছিল, সেই স্থান হইতে বহির্গত হইবার পূর্বে কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেব তাহাকে হোসেনের সহিত পরিচয় করিয়া দিয়াছিলেন ও বলিয়া দিয়াছিলেন, হোসেন তাহাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিবে। যে স্থানে যে কোন খরচের প্রয়োজন হইবে, তাহা হোসেনই দিবেন। আসামীদ্বয়কে আহারাদি করাইবার নিমিত্ত যে কোন সাহায্যের প্রয়োজন হইবে, হোসেন তৎক্ষণাৎ সেই সকল সাহায্য করিবেন। একা প্রভৃতির যখন যেরূপ ভাড়া লাগিবে, হোসেনকে বলিলে তৎক্ষণাৎ তিনি তাহা প্রদান করিবেন।
কোর্ট-ইনস্পেক্টার সাহেবের আদেশ পাইয়া, প্রহরী আর কোন কথা কহিল না। কারণ, সে উত্তমরূপে অবগত ছিল যে, যদি হোসেন বা অপর কোন ব্যক্তি এক্কা প্রভৃতির ভাড়া প্রদান না করে, তাহা হইলে যে কয়দিবসে হউক, তত পথ তাহা দিগকে পদব্রজে গমন করিতে হইবে।
প্রহরী-সর্দারের মনে মনে একটু দুরভিসন্ধি ছিল। কোর্ট ইনস্পেক্টারের সম্মুখে কিন্তু সে তাহা প্রকাশ করিল না। তখন তাহার প্রস্তাবে সম্মত হইয়া আসামীদ্বয় ও হোসেনের সমভিব্যাহারে সেই স্থান হইতে বহির্গত হইল।
কিয়দ্দূর গমন করিবার পর, পথের এক স্থানে একটা জলাশয় দৃষ্টিগোচর হইল। প্রহরী-সর্দ্দার সেই স্থানে একা থামাইতে আদেশ প্রদান করিলেন। আদেশ প্রতিপালিত হইল। একা হইতে অবতরণ করিয়া সকলে সেই স্থানে একটু বিশ্রাম করি লেন, এবং প্রহরীগণ একে একে আপনাপন হস্তমুখাদি প্রক্ষালন করিয়া লইলেন। তাঁহাদিগের সকলের হস্তমুখাদি প্ৰক্ষালিত হইলে, প্রহরী-সর্দ্দার হোসেনকে কহিলেন, মহাশয়! আসামী স্বয়কে লইয়া সদরে উপস্থিত হইতে এক্কা-ভাড়া প্রভৃতি যে সকল খরচ পড়িরে, তাহা আমাদিগকে মিটাইয়া দিন।
হোসেন। একা-ভাড়া প্রভৃতির জন্য আপনার ব্যস্ত হইবার কোন প্রয়োজন নাই। যখন আমি আপনাদিগের সঙ্গে সঙ্গে গমন করিতেছি, তখন সমস্তই আমি প্রদান করিব।
সর্দ্দার-প্রহরী। আপনি যে উহা প্রদান করিবেন, তাহা কোর্ট ইনস্পেক্টার সাহেব বলিয়াই দিয়াছেন; কিন্তু বারে বারে আপনার নিকট চাহিয়া লওয়া অপেক্ষা একবারেই উহা আমাদিগকে প্রদান করা উচিত নহে কি?
হোসেন। যখন আমাকে দিতে হইবে, তখন আপনি একবারেই লউন, বা বারে বারেই লউন, তাহাতে আমার কিছুমাত্র ক্ষতি নাই।
সঃ প্রহরী। তাহা হইলে উহা আমাকে অগ্ৰেই প্রদান করুন।
হোসেন। কত খরচ পড়িবে, তাহা আমি এখন পর্যন্ত জানিতে পারিতেছি না; সুতরাং অগ্রে আমি আপনাকে উহা কি প্রকারে প্রদান করিতে পারি? আপনাদিগের সহিত যে সকল একা আছে, উঁহারা কি একবারে সদর পর্যন্ত গমন করিতে পারিবে?
সঃ প্রহরী। উঁহারা এতদূর কিরূপে গমন করিবে? এক এক থানায় গমন করিবার পর উঁহাদিগকে ছাড়িয়া দিব ও সেই স্থান হইতে অন্য এক্কা গ্রহণ করিব।
হোসেন। তাহা হইলে আপনাদিগকে কত টাকা গাড়িভাড়া দিতে হইবে, তাহা আমি এখন কিরূপে জানিতে পারিব? যেমন যে একা ছাড়িয়া দিবেন, অমনি তাহার ভাড়া মিটাইয়া দিলে চলিবে না?
সঃ প্রহরী। তাহা কিরূপে হইবে? সে সময় যদি আপনি উপস্থিত না থাকেন, তাহা হইলে কিরূপে ভাড়া প্রদান করিবেন?
হোসেন। আমি ত আপনাদিগের সহিত উপস্থিত আছি। যখন যাহা বলিবেন, তখনই তাহা প্রদান করিব।
সর্দ্দার-প্রহরী। এখন ত উপস্থিত আছেন দেখিতেছি; কিন্তু রাস্তা হইতে যদি আপনি চলিয়া যান, তাহা হইলে তখন আমি কি করিব? ও সকল গোলযোগেরই এখন প্রয়োজন নাই। আমার নিকট কিছু অর্থ আপনি প্রদান করুন, তাহা হইতে আমি ভাড়া প্রদান করিব। খরচ-পত্র বাদে যাহা অবশিষ্ট থাকিবে, তাহা পরিশেষে আমি আপনাকে ফিরাইয়া দিব।
হোসেন। আচ্ছা মহাশয়, তাহাই হউক। যদি আপনারা আমাকে অবিশ্বাস করেন, তাহা হইলে এই কুড়িটী টাকা আপনার নিকট রাখিয়া দিন।
সঃ প্রহরী। আমি আপনার নিকট ভিক্ষা করিতে বসি নাই! এখন যদি আপনি পঞ্চাশ টাকা প্রদান করেন, তাহা হইলে আমি উহা গ্রহণ করিব; নতুবা আমি আসামীদ্বয়কে হাঁটাইয়া লইয়া যাইব।
হোসেন। হাঁটাইয়া লইয়া যাইবার প্রয়োজন নাই। আমি পঞ্চাশ টাকাই আপনাকে প্রদান করিতেছি, তাহা হইতে আপাততঃ যে সকল খরচ-পত্রের প্রয়োজন হয়, আপনি করুন। পরে যদি আরও কিছু আবশ্যক হয়, তাহাও আমি প্রদান করিব।
এই বলিয়া হোসেন পঞ্চাশটী টাকা বাহির করিয়া সেই সর্দ্দার প্রহরীর হস্তে প্রদান করিলেন। তিনি উহা গ্রহণ করিয়া আপনার নিকট রাখিয়া দিলেন, ও অপর প্রহরীগণকে সম্বোধন করিয়া কহিলেন, চল ভাই! আর দেরী করিবার প্রয়োজন নাই।
সর্দ্দার-প্রহরীর এই কথা শুনিয়া হোসেন কহিলেন, মহাশয়। আপনারা হস্ত মুখ প্রক্ষালনাদি সকল কার্য শেষ করিয়া লইলেন; কিন্তু ইহারা হস্ত মুখাদি ধুইবে কি না, তাহা ত কিছু জিজ্ঞাসা করিলেন।
সর্দ্দার-প্রহরী। সে কথা জিজ্ঞাসা করিবার আমাদিগের কোন প্রয়োজন নাই। কোন বিষয়ের আবশ্যক হইলে ইহারা আপনারাই আমাদিগকে বলিবেন। তখন বিবেচনা করিয়া দেখা যাইবে যে, উঁহাদিগের প্রার্থনা শ্রবণ-যোগ্য কি না।
