চলমান গাড়ির মধ্যে বসে একসময় সুব্রত বলে, ডাক্তার সান্যাল চমৎকার লোক, কি বলেন মিঃ রায়?
কিরীটী চলন্ত গাড়ির খোলা জানালা দিয়ে রাস্তার দুপাশের নানাজাতীয় অগণিত লোকজনের দিকে খরদৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখছিল।
সুব্রতর কথায় চমকে উঠে বললে, অ্যাঁ! কিছু বলছিলেন সুব্রতবাবু?
কি ভাবছেন মিঃ রায়?
না, কিছু না।
একসময় গাড়ি ডাঃ চৌধুরীর বাড়ির সামনে এসে থামল। চৌধুরীর পুরনো চাকর দাশু দরজার গোড়াতে ওদের জন্য অপেক্ষা করছিল, কারণ তাকে আগেই তার করা হয়েছিল।
ওদের সকলকে গাড়ি থেকে নামতে দেখে ব্যাকুল কণ্ঠে দাশু প্রশ্ন করে, আমার দাদাবাব-সনৎবাবু, আসেননি বাবু?
সুব্রত আমতা আমতা করে বললে, না দাশু সনৎবাবু আসেননি তো এ জাহাজে, পরের জাহাজে আসছেন।
খাওয়া-দাওয়ার পর কিরীটী একসময় বললে, আজকের দিনটা একেবারে পূর্ণ বিশ্রাম। পাদমেকং ন গচ্ছামি।
কথা শেষ করেই সে কলহাস্যে গান ধরল…
আজ আমাদের ছুটি রে ভাই,
আজ আমাদের ছুটি।
সুব্রত কিরীটীর হঠাৎ হাসিখুশীর কারণ বুঝতে পারল না, তবু হাসতে হাসতে বললে, ছুটি নয়, বরং এই তো সবে শুরু!
কিরীটী হাসতে হাসতে বললে, না। তারপরই আবার আগের মত গান গেয়ে চলল।
গান থামিয়ে কিরীটী আবার একসময় বললে, এখন একটা লম্বা ঘুম, তারপর জাগরণ। চা-পান ও জলখাবার ভক্ষণ, মোটরে চেপে রেঙ্গুন শহরটা ভ্রমণ, প্রত্যাগমন, স্নান-আহার, অতঃপর সারাটি রজনী ঘুম—এই হল আমার কর্মতালিকা অদ্য।
কিরীটী যেন দুবছরের শিশু। আনন্দে আর কলহাস্যে সে যেন মশগুল হয়ে উঠেছে।
সুব্রত হাসতে হাসতে বলে, ব্যাপার কি বলুন তো মিঃ রায়?
ব্যাপার কিস্তিমাত!
বলেন কি?—রাজু ও সুব্রত ব্যাকুল হয়ে উঠল।
কিরীটী ডান হাতের একটা আঙুল ওষ্ঠের উপর রেখে গভীর ভাবে মাথাটা দোলাতে দোলাতে বললে, চুপ করুন, চুপ করুন। সর্বদা মনে রাখবেন এটা কলকাতা শহর নয়, এটা কালো ভ্রমরের নিজের এলাকা। কিন্তু দেখলেন তো শেষ পর্যন্ত, আমার অনুমান মিথ্যা হয়নি! সনৎবাবুকে ওরা নিয়ে এল। যাক, তাঁর পক্ষে এ একপ্রকার ভালই হল, কি বলেন? বিনা খরচায় সাগরযাত্রাটা হয়ে গেল তাঁর।
কিন্তু তার উদ্ধারের কি করা যায়?
মা ভৈ …হবে হবে, সব হবে। জানেন তো সবুরে মেওয়া ফলে!
কিরীটী মৃদু মৃদু হাসতে থাকে।
১৭. কিরীটীর যুক্তি
সমস্ত দ্বিপ্রহর একটা টানা দিবানিদ্রা দিয়ে সকলেই যেন শরীরটা বেশ সুস্থ বোধ করে।
কয়েক দিন ধরে জাহাজে অবিশ্রাম ঢেউয়ের দোলায়, মনে হয় এখনও যেন দেহটা দুলছে।
বৈকালিক চা-পানের পর রাজু শহর দেখতে বের হয়েছিল, কিরীটী আর সুব্রত দোতলার ব্যালকনিতে পাশাপাশি দুখানা চেয়ার পেতে বসে গল্প করছিল।
সুব্রত বলছিল, যদিও আমি মুহূর্তের জন্য স্ট্রেচারে শায়িত সনৎদাকে দেখেছি, তবু–
কিরীটী বাধা দেয়, যদিও বলছেন কেন এখনও? আপনার মনে কি কোন সন্দেহ আছে সুব্রতবাবু? আপনি আমার কথা যদি বিশ্বাস করেন তা হলে জানবেন, সকালবেলার সেই স্ট্রেচারে শায়িত ব্যক্তি আর কেউ নন, আমাদের সনৎবাবুই।
কিন্তু কেন যে আপনি ভাবছেন কালো ভ্রমর সনৎদাকে প্রাণে মারবে না, এটা আমি ঠিক যেন এখনও বুঝে উঠতে পারছি না।
প্রাণে যে মারবেই না বা প্রাণে মারা একেবারেই অসম্ভব, সে কথা তো আমি বলিনি সুব্রতবাবু। আপনারা আমার কথার ঠিক অর্থ ধরতে পারেননি। আমি বলতে চেয়েছি, বর্তমানে তারা সনৎবাবুর প্রাণহানি করবে না, করতে পারে না।
কেন?
আচ্ছা আপনার প্রশ্নের জবাব দেবার আগে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই সুব্রতবাবু!
বলুন?
আচ্ছা আপনার অমরবাবুর মত্যু সম্পর্কে কি ধারণা? আপনি কি মনে করেন সত্যিই কোন আততায়ীর হাতেই অমরবাবুর মৃত্যু ঘটেছে?
না।
কেন? কারণ তাই যদি হবে, তা হলে অন্ততঃ কালো ভ্রমর নিশ্চয়ই মৃতদেহের মুখটা ওভাবে বিকৃত করে রেখে যেত না।
তা হলে আপনি ধরেই নিচ্ছেন যে, এই হত্যা-ব্যাপারের সঙ্গে কালো ভ্রমর সুনিশ্চিত ভাবেই জড়িত আছে?
হ্যাঁ।
ঠিক তাই সুব্রতবাবু। সেইজন্যই সনৎবাবুকে বর্তমানে কালো ভ্রমর প্রাণে মারতে পারে না। কালো ভ্রমরের বিদ্বেষ শুধু সনৎবাবুর ওপরেই নয়, আপনার ওপরে অমরবাবুর ওপরেও। তবে সেই সঙ্গে আরও একটা কথা আমার মনে হচ্ছে, সনৎবাবুর ওপরে কালো ভ্রমরের রাগ বা বিদ্বেষ থাকাটা স্বাভাবিক এবং তার কারণও আমাদের চোখের সামনে আছে। কিন্তু আপনার ওপরে তার বিদ্বেষের কারণ যে কেবলমাত্র গতবারের লজ্জাকর পরাজয়ের ব্যাপারটাই, এটা মানতে যেন কিছুতেই আমার মন চায় না সুব্রতবাবু!
কেন? এ কথা বলছেন কেন কিরীটীবাবু?
তাই যদি বুঝতে পারতাম, তা হলে কালো ভ্রমরের এবারের অভিযানের অর্থটাও আমার নিকট পরিষ্কার হয়ে যেত। এই ঘটনা ঘটবার কিছুদিন আগে থেকেই কালো ভ্রমর সম্পর্কে আমি যথাসাধ্য খোঁজ নিয়েছি। একটা জিনিস আমি লক্ষ্য করেছি, কালো ভ্রমর আর যাই হোক ছিচকে চোর-ডাকাত নয়। কারণ বিশেষ করে তাহলে ধনিক সম্প্রদায়ের প্রতিই তার যত কিছু বিদ্বেষ, যত বিতৃষ্ণা থাকত না এবং বিশেষ বিশেষ কতকগুলি কুকীতি ছাড়া সাধারণ আরও পাঁচটা দুর্ধর্ষ ডাকাত বা চোরের মতই হাঙ্গামা, ডাকাতি ও খুনখারাপি করে করে বেড়াত।
কিরীটীর শেষের কথায় কান না দিয়েই সুব্রত বলে, কিন্তু একটা কথা এখনও আমি বুঝে উঠতে পারছি না কিরীটীবাবু, এই এত বড় রেঙ্গুন শহরে কোন পথে আপনি সনৎদার সন্ধান করবেন?
