সিঁড়ির নীচে সে জায়গাটায় তত আলো নেই। সিঁড়ির গায়ে যে বৈদ্যুতিক আলোটা জ্বলছে, তার ক্ষমতাও খুব বেশী নয়। সেই অস্পষ্ট আলোতে দেখা গেল সিঁড়ির নীচে একটা লোক পড়ে গোঁ গোঁ করছে।
কিরীটী লোকটার মুখের ওপর ঝুকে পড়ে দেখল, লোকটা কোন কারণে অজ্ঞান হয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি সিঁড়ির ধারে যে কলিং বেল ছিল, সেটা টিপে দিলে।
দেখতে দেখতে জাহাজের উচ্চপদস্থ কর্মচারী হতে আরম্ভ করে খালাসীরা পর্যন্ত অনেকেই এসে হাজির হল।
সকলের মুখেই শঙ্কিত ভাব।
একজন খালাসী ক্যাপ্টেনের আদেশে লোকটির চোখ-মুখে জল দিতে শুর করলে। জাহাজের ডাক্তার খবর পেয়ে ছুটে এলেন এবং নাড়ি দেখে বললেন, ও কিছু নয়, কোন কারণে হয়তো অজ্ঞান হয়ে গেছে।
লোকটি অল্পক্ষণ পরেই জ্ঞান ফিরে পেয়ে উঠে বসল। চোখ-মুখে তার তখনও একটা ভয়াত ভাব। চারিদিক চকিত দৃষ্টিতে দেখে লোকটা অস্ফুট ঘরে কেবল বললে, ভূত ভূত!
জাহাজের মেট শুধায়, ভূত! কি বলছিস রে?
হ্যাঁ কর্তা, ভূত! আমি দেখেছি, স্বচক্ষে দেখেছি। এই দেখুন আমার গলা টিপে ধরেছিল। উঃ, আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। বলে লোকটি আবার হাঁপাতে লাগল।
লোকটার কথা শুনেই সকলে যেন একটু ভয় পেয়ে গেছে। বুড়োগোছের একজন খালাসী এগিয়ে এসে বলল, আমিও কাল রাত্রে এমনি সময় ওই বাক্সগুলোর পিছনে কি একটা দেখেছিলাম। উঃ, কী ভীষণ মুখ তার! এই পর্যন্ত বলেই বুড়ো ভয়ে চোখ বুজল।
সমবেত সমস্ত লোকের মনেই কেমন একটা অস্পষ্ট আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। সকলেই একটা শঙ্কিত চাউনি নিয়ে একে অন্যের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। ক্যাপ্টেনের মুখটাও গম্ভীর হয়ে গেল।
রাত্রি আর বেশী নেই। একটি দুটি করে আকাশের তারাগুলো নিভতে শুরু করেছে।
১৬. আবার মগের মুল্লুকে
রেঙ্গুন শহর।
জাহাজ তখনও জেটিতে লাগেনি।
সুব্রত, কিরীটী, রাজু ও ডাঃ সান্যাল জাহাজের রেলিংয়ের কাছে দাঁড়িয়ে জেটির দিকে তাকিয়ে আছে।
লোকজন, কুলী, কর্মচারী প্রভৃতির সমাগমে স্থানটি একেবারে সরগরম।
প্রভাতী সূর্যের সোনালি আলো দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। জাহাজে বসে রেঙ্গুন নদীর পারে ভাসমান অবস্থায় শহরটিকে যেন একটি ছবির মতই দেখায়।
ডাক্তার বলছিলেন, কাল দুপুরে আমার ওখানে আপনাদের মধ্যাহ্নিক নিমন্ত্রণ রইল। এই নিন আমার কার্ড। বলতে বলতে ডাক্তার কোটের পকেট থেকে একটা ছোট কার্ড বের করে সুব্রতর হাতে দিলেন। তাতে লেখা আছে?
ডাঃ এস, সান্যাল
এম. বি. এম. সি. পি (লণ্ডন)
৩০, কমিশনার রোড, রেঙ্গন।
সুব্রত কার্ডটা পকেটে রেখে দিল।
জাহাজ ততক্ষণে জেটিতে লেগেছে। ক্ৰমে যাত্রী একে একে নামতে শুরু করে।
কিরীটীর পরামর্শমত ঠিক হয়েছিল সবশেষে ওরা নামবে। তাড়াতাড়ি কিছু নেই।
সুব্রত আনমনে রেলিংয়ে ভর দিয়ে যাত্রীদের অবতরণ দেখছিল।
একটা স্ট্রেচারে করে বোধ হয় একজন রোগীকে নামানো হচ্ছিল। দুটো খালাসী স্ট্রেচারটা ধরে নামাচ্ছিল। স্ট্রেচারে শায়িত ব্যক্তির কপাল পর্যন্ত কাপড়ে ঢাকা।
সহসা একজন যাত্রীর হাত লেগে লোকটার মুখের কাপড় সরে যেতেই সুব্রত চমকে উঠল, সেদিকে হাত বাড়িয়ে কি বলতে যেতেই তার মুখ দিয়ে একটা অস্ফুট শব্দ বেরিয়ে এল যেন, কে? কে?
কিরীটীর চোখেও সে দৃশ্য এড়ায়নি। কিন্তু ততক্ষণে আর একটা লোক, যে স্ট্রেচারের সঙ্গে সঙ্গে চলছিল, ক্ষিপ্রহাতে মুখের কাপড়টা আবার টেনে দিয়েছে স্ট্রেচারে শায়িত লোকটার।
সহসা সুব্রত অদৃশ্যে নিজের হাতের ওপরে একটা চাপ অনুভব করে পাশের দিকে তাকাতেই কিরীটীর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যায়। কিরীটীর চোখে অদৃশ্য কিসের যেন সঙ্কেত।
সুব্রত নিজেকে সামলে নেয় মুহূর্তে।
কিরীটীর মুখে কোন কিছু চিন্তার ছায়া পর্যন্ত যেন নেই, একান্ত নির্বিকার সে মুখ।
পাশেই দণ্ডায়মান ডাক্তারও সুব্রতর সেই অস্ফুট শব্দ শুনতে পেয়েছিলেন। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ওদের দিকে চেয়ে তিনি প্রশ্ন করলেন, কি হল মিঃ রায়?
কিরীটী ততক্ষণে নীচে নামবার সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেছে। রাজু কিরীটীর মুখের দিকে তাকায়নি, তাই সে হঠাৎ বলে ওঠে, সনৎদা!
সনৎদা? ডাক্তার প্রশ্ন করেন।
কিন্তু ততক্ষণে রাজু সুব্রতর চোখের দিকে দৃষ্টি পড়ায়, নিজেকে সামলে নিয়ে একটু মৃদু হেসে বললে, না কিছু না, আমাদের একজন চেনা লোককে যেন জেটিতে দেখলাম।
চেনা লোক! ডাক্তার বিস্মিত ভাবে তাকান।
হ্যাঁ। মানে, খবর পেয়েছিলাম, তিনি যেন, এই–
তিনি যেন কি? ক্ষমা করুন, যদি বিশেষ কোন গোপনীয় কিছু থাকে, তবে অবিশ্যি আমি শুনতে চাই না।
সুব্রত হেসে বললে, না, এমন বিশেষ কিছু গোপনীয় নয়, আচ্ছা বলবখন আপনাকে। চলুন এবারে নামা যাক।
জাহাজ-ঘাটের বাইরে কিরীটী একটা লাইটপোস্টের নীচে দাঁড়িয়ে ব্যাকুল অনুসন্ধানী দৃষ্টি ফিরিয়ে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল।
সুব্রত এসে পিছনে দাঁড়িয়ে ডাকল, মিঃ রায়!
দেরি হয়ে গেছে। পেলাম না সুব্রতবাবু।
পেলেন না?
না, চলুন।
ডাক্তারের প্রকাণ্ড কালো রংয়ের সুদৃশ্য হাম্বার গাড়িটা তার জন্য অপেক্ষা করছিল।
ডাক্তার সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে গাড়িতে চেপে বসলেন। গাড়ি ছেড়ে দিল।
একটা গাড়িতে সমস্ত মালপত্র চাপিয়ে ওরা চালককে মিঃ চৌধুরীর বাড়ির ঠিকানা বলে দিয়ে গাড়িতে চেপে বসল।
