অদূরে একটা মোড়া পেতে রাজ, বসেছিল। সে ইতিমধ্যেই প্রস্তুত হয়ে নিয়েছিল।
মা গরম গরম লুচি ভেজে একটা পাত্রে রাখছিলেন। সকলে মিলে সেগুলোর সৎকার করতে লেগে গেল।
মার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সকলে এসে গাড়িতে চেপে জাহাজঘাটে এসে পৌঁছে দেখলে, জাহাজ ছাড়তে তখন আর বেশী দেরি নেই। জাহাজের ঘন ঘন হুইসেল চারিদিক প্রকম্পিত করে তুলছে। যাত্রী এবং তাদের আত্মীয়স্বজনে জাহাজঘাটে বেশ ভিড়।
একটা সেকেণ্ড ক্লাস কেবিন রিজার্ভ করা হয়েছিল। সুব্রত, কিরীটী, রাজু ও চাকর জংলী সিঁড়ি বেয়ে জাহাজে গিয়ে উঠল।
নির্দিষ্ট সময়েই জাহাজ ভোঁ দিতে দিতে জেটি ছেড়ে এগিয়ে চলল।
নবোদিত সূর্যের রঙিন আলোয় গঙ্গার ছোট ছোট ঢেউগুলি যেন গলিত রুপোর মতই ঝকঝক করে জলছে।
গঙ্গাবক্ষ থেকে বয়ে আসছে প্রথম ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া মৃদু মৃদু যেন স্নেহের স্নিগ্ধ করপ্রলেপ কারও।
নির্মেঘ নীলাকাশ সূর্যালোকে যেন ঝলমল করছে।
বর্ষার গঙ্গার গৈরিক জলরাশি ভেদ করে ধীরে মন্থরগতিতে জাহাজ এগিয়ে চলেছে। গঙ্গার দুপাশে সদ্য ঘুম ভাঙার সাড়া পড়ে গেছে। এদিকওদিকে বড় জাহাজ নোঙর ফেলে দাঁড়িয়ে আছে। ছোট স্টীমলঞ্চগুলো এদিকওদিক যাতায়াত করে। ছোট বড় নানা আকারের নৌকো অনেক দেখা যায়। মাঝে মাঝে শোনা যায় জাহাজের ইঞ্জিনঘরের ঘণ্টা।
রাতের রহস্যজনক অন্ধকার কেটে গিয়ে আবার নতুন দিনের যাত্রা হয় শুরু। দিনের শেষে ঘুমের দেশের পথের বাঁকে সাঁঝের আঁধার আবার বিদায় নেয় শেষদিনের আলোর কাছে। রাত্রি আবার ফিরে আসে তার রহস্য নিয়ে।
এই তো নিয়ম।
আকাশের প্রতি গ্রহতারাও এগিয়ে চলেছে অনন্ত যাত্রাপথে। মানুষও তেমনি দিনের পর দিন, রাত্রির পর রাত্রি তাদের নব নব যাত্রার পথে এগিয়ে চলেছে।
কালো ভ্রমর ওদের ডাক দিয়েছে।
সুব্রত ভাবে : কালো ভ্রমর!
কিরীটী ভাবে : কালো ভ্রমর!
রাজুও ভাবে : কালো ভ্রমর!
ডেকের উপর রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে কিরীটী, সুব্রত ও রাজু ক্রমবিলীয়মান কূলের দিকে চেয়ে।
কিরীটী বললে একসময়, মাটি আর জলের মধ্যে যেন একটা স্নেহের বাঁধন আছে সুব্রতবাবু। দেখুন কূলের মাটি যেন বুক পেতে দিয়েছে জলের স্পর্শটুকু পেতে।
জাহাজ কূল ছেড়ে অনেকখানি এগিয়ে চলে। ক্রমে বজবজ উলুবেড়িয়া পশ্চাতে পড়ে গেল।
হঠাৎ একসময় সুব্রত রাজুর দিকে ফিরে বললে, গেলবার নীতীশটা আমাদের সঙ্গে ছিল।
এবারেও নীতীশকে চিঠি দিয়ে নিয়ে এলে হত!
এখন তো সে হোস্টেলে থাকে না, রাধানগরে তার মামার ওখানে থাকে। ওদের রাধানগরের বাসার ঠিকানাও আমার জানা নেই। সুব্ৰত জবাব দেয়।
১৩. ডাঃ সান্যাল
পরের দিন।
সন্ধ্যা হতে তখন আর খুব বেশী দেরি নেই। সাগরের কালো জলে– সাঁঝের ধূসর ছায়া ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে। মেঘপুরীর বাতায়নে বাতায়নে সবেমাত্র দিগাঙ্গনারা দু-একটি করে তারার প্রদীপ জ্বালিয়ে গেল বুঝি।
বঙ্গোপসাগরের উত্তাল জলরাশির ওপর দিয়ে ঢেউয়ের তালে তালে নেচে চলেছে বিরাট অর্ণবপোত কত যাত্রী বুকে নিয়ে!
সাগরের বুক থেকে কেমন একটা যেন ঠাণ্ডা হাওয়া আসে, শীত-শীত করলেও তা বেশ আরামদায়ক।
ডেকে সেই বিকেল চারটে হতে এতক্ষণ পর্যন্ত অনেক যাত্রীই সাগরের সান্ধ্যশোভা উপভোগ করছিল। সবাই এখন কেবিনে চলে গেছে; শুধু যায়নি কিরীটী সুব্রত, রাজু ও একজন প্রৌঢ় ভদ্রলোক।
ভদ্রলোকের চেহারা যেমন প্রশান্ত, তেমনি ধীর ও গম্ভীর, দার্শনিকের মত এলোমেলো কাঁচা-পাকা চুল, চোখে একজোড়া সোনার ফ্রেমের চশমা। পরনে একটা ঢোলা জাপানী সিল্কের পায়জামা। গায়ে স্ট্রাইপ-দেওয়া কিমনো। সেলুন ডেকের উপর পাতা একটা বেতের চেয়ারে হেলান দিয়ে ভদ্রলোক এতক্ষণ গভীর মনোযোগ দিয়ে একটা কি মোটা ইংরাজী বই পড়ছিলেন। ডেকের ওপর সমবেত বহু লোকজনের নানা জাতীয় কণ্ঠস্বরে একটিবারের জন্যও তাঁর মনযোগ নষ্ট হয়নি।
সাঁঝের আঁধার গাঢ় হয়ে আসবার সঙ্গে সঙ্গে ভদ্রলোক হাতের বইখানি মুড়ে সামনের অস্পষ্ট আলো-ছায়াঘেরা সাগরের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন।
কিরীটী আপনমনে গুনগুন করে গাইছিল—
বনের ছায়ায়, জল ছল ছল সুরে
হৃদয় আমার, কানায় কানায় পুরে
ক্ষণে ক্ষণে ঐ গুরুগুরু তালে তালে
গগনে গগনে গভীর মৃদঙ্গ বাজে
আমার দিন ফুরাল!
সহসা কিরীটী চমকে উঠল। ঠিক পাশ থেকে কে যেন বললে, চমৎকার গলাটি তো আপনার! যেমন মিষ্টি, তেমনি দরদভরা। আহা, থামলেন কেন? শেষ করুন না গানটা?
কিরীটী মুখ ফিরিয়ে দেখে কথা বলছেন সেই প্রৌঢ় ভদ্রলোকটি, যিনি এতক্ষণ নিবিষ্ট মনে বই পড়ছিলেন।
আপত্তি যদি না থাকে, তাহলে শেষ করুন গানটা। ভদ্রলোক পুনরাবৃত্তি করলেন।
কিরীটী মৃদু হাসলেন, তারপর ধীরে ধীরে আবার শুরু করে–
কোন দূরের মানুষ এল আজ কাছে।
মনের আড়ালে নীরবে দাঁড়ায়ে আছে!
সত্যি, কিরীটীর গলাটি ভারী মিষ্টি!
কিরীটী তিন-চারবার সমগ্র গানটি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে গেয়ে থামল।
ভদ্রলোক বললেন, সত্যি বড় ভাল লাগল আপনার গান। বসেছিলাম ওখানটায়, হঠাৎ গানের সুর কানে যেতেই উঠে এসেছি।
কথা বলতে বলতে ভদ্রলোক যেন কেমন একটু অনিমনা হয়ে যান। তারপর আবার ধীরে ধীরে বলে চললেন, সংসারের কোলাহল, জীবনের নানা ত্রুটি বিচ্যুতি, প্রতিহিংসা, কর্তব্য-অকর্তব্য—সব যেন মুহূর্তে ভুলিয়ে দেয় এই গানের সুর। গানের সুরে আমি ভুলে যাই আমার নিজেকে।..কেউ বোঝে না, কেউ জানে না, কত দুঃখ আমার সমস্ত বুকখানায় জমাট বেধে আছে।
