রাজু বললে, মিঃ রায়, কতক্ষণ এসেছেন?
কিরীটী ঘরের মধ্যে ঢুকে এগিয়ে আসতে আসতে বললে, আপনাদের সকলেরই মনে একটা সংশয় জেগেছে যে, সনৎবাবু এখানে পড়ে রইলেন, অথচ আমরা বর্মা চলেছি। আমার কথা যদি বিশ্বাস করতে না পারেন, তবে এইটকুই এখন শুধু জেনে রাখুন যে, সনৎবাবুকে যেমন করেই হোক ওরা কালকে রেঙ্গুনগামী জাহাজে তুলবেই। আমি আপনাদের আগেও বলেছি, এখনও বলছি কালো ভ্রমর যেমনি শয়তান তার চাইতেও ঢের বেশী তীক্ষ্ণধী। তার ওপর আরও একটা কথা হচ্ছে এই যে, সনৎবাবুকে ওরা প্রাণে মারবে না। তাই সনৎবাবু যেখানেই থাকুন না কেন, আমাদের দুর্ভাবনার আপাততঃ তেমন কিছু নেই। কালো ভ্রমর দুধর্ষ হলেও তার শত্রুর অভাব নেই, এমনি দুনিয়ার নিয়ম। এই দেখুন—বলতে বলতে কিরীটী জামার পকেট থেকে সেই সকালের ১৮নং বাড়িতে পাওয়া সাংকেতিক কাগজখানা বের করে সকলের চোখের সামনে ধরল।
সুব্রত ও রাজু উভয়েই একান্ত কৌতুহলে দেখি দেখি বলে কাগজটার ওপরে ঝুকে পড়ল।
কিরীটী আবার বলতে লাগল, সমস্ত জীবনভরে কালো ভ্রমর হয়তো প্রভূত অর্থ সংগ্রহ করেছে; কিন্তু তা থেকে তার ভোগে একটি পাইপয়সাও বোধ হয় লাগাতে পারেনি। আজ পর্যন্ত যতদিন সে বেচে আছে এবং ভবিষ্যতে আরও যতদিন সে বেচে থাকবে, সে শুধু সেই সংগৃহীত অর্থ যক্ষের মত আগলেই থাকবে। এ জীবনের অর্থপিপাসা মত্যুর পরও হয়তো তাকে এই পৃথিবীর মাটির বুকে টেনে আনবে। যে হাহাকার নিয়ে সে সারাজীবন কাটিয়ে গেল, সেই হাহাকারই থেকে যাবে তার বায়ভূত দেহে!
কিরীটীর কথাগুলো যেমনি দরদভরা তেমনি সতেজ। সকলেই বিস্ময়বিমুগ্ধ হয়ে কথাগুলো শুনছিল, উত্তরে কেউ একটি কথাও বলতে পারে না।
রাজু বললে, আমি কটা দিনই বা ওদের দলে ছিলাম, কিন্তু যে দলের সর্দার, তার দেখা মাত্র একবারের বেশী দুবার মেলেনি, তাও ছদ্মবেশে মুখোশের অন্তরালে অন্ধকার ঘরে। শুনেছি ওদের দলের কেউ নাকি আজ পর্যন্ত সর্দারকে স্বাভাবিক বেশে একদিনও দেখেনি। সে হরেক রকমের রুপ ধরে সকলের মাঝে ঘুরে ঘুরে বেড়ায়, পাশে থেকেই তার হকুম চালায় সকলের ওপরে, অথচ তাকে দেখলেও চেনা যায় না। একটা কথা ওদের মুখে আমি বরাবর শুনেছি, সর্দারকে নাকি রাত্রি ছাড়া দিনের আলোয় আজ পর্যন্ত কেউই দেখেনি এবং তাও ছদ্মবেশে। যে মুহতে দিনের আলো নিভে গিয়ে রাতের অন্ধকার চারিদিকে নেমে আসে, ঠিক সেই মুহূর্তে সর্দারও তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়। আবার যেমনি পুব আকাশে ভোরের আলো প্রকাশ পায়, সর্দার যে কোন ফাঁকে কোথা দিয়ে আপনাকে লুকিয়ে ফেলে, শত চেষ্টা করেও আজ পর্যন্ত কেউ তা ধরতে পারেনি।
***
রাত্রি দশটা হবে।
আকাশ বেশ পরিষ্কার। কালো আকাশের কোলে—দূরে, অনেক দূরে মেঘপুরীর বাতায়নে যেন তারার প্রদীপ জালিয়েছে। তারই আলো সৃষ্টি করেছে পৃথিবী ও আকাশের মাঝে এক অপূর্ব আলো-ছায়াঘেরা পথ। ওপরে একখানা মাদুর পেতে মার পাশে বসে সুব্রত ও রাজু আসন্ন বিদেশযাত্রা সম্বন্ধে নানা গল্প করছে।
সনৎদার বাড়ির সেই সন্ধ্যার কথা মনে পড়ছে, রাজু? সেই ড্রাগন– কালো ভ্রমরের মৃত্যুদূত! একসময় বললে সুব্রত।
রাজু হাসতে হাসতে বললে, মনে নেই আবার? কিন্তু যাই বল, ড্রাগনের সত্যসত্যই ক্ষমতা আছে বলতে হবে। অন্য কোন ক্ষমতা না থাকলেও আকর্ষণী ক্ষমতা যে আছে—সে বিষয়ে একেবারে নিঃসন্দেহ!
হু, ক্ষমতা আছে বৈকি। কিন্তু একজনের কথা আমার বারবারই মনে হচ্ছে রাজু। সেবার আমাদের বিদেশযাত্রার সময় এমন একজন বন্ধু ছিলেন আমাদের পাশে পাশে সর্বদা, যাঁর সদাসতর্হ স্নেহদৃষ্টি সারাক্ষণ আমাদের নিরাপদে রেখেছিল। তিনি না থাকলে সেই মগের মুল্লক থেকে ফিরে এসে বাংলার মাটিতে পা দেওয়া হয়ত এ জীবনে আর আমাদের কারোরই ঘটে উঠত কিনা সন্দেহ। আবার সেই বিদেশের পথে চলেছি। সেবার যেমন অচেনা ছিল, এবারেও ঠিক তাই। সেদিনকার সেই পরম বন্ধুটি আজ আর আমাদের সঙ্গে নেই। এ পৃথিবী হতে তিনি চিরবিদায় নিয়ে গেছেন। আর সত্যি সত্যি কথা বলতে গেলে সেজন্য দায়ী তো আমরাই।…
শেষের দিকে সুব্রতর কণ্ঠস্বর যেন বুজে এল অশ্রুতে।
সত্যি, অমরবাবুর ঋণ আমরা আর এ জীবনে শোধ করার সুযোগ পেলাম না। রাজু বললে।
***
তখনও রাতের আকাশ থেকে ভাল করে আঁধারের ঘোর কেটে যায়নি। সবেমাত্র পুবদিক লালচে আভায় রঙিন হয়ে উঠতে শুরু করেছে।
সুব্রতর ঘুমটা ভেঙে গেল রাজুর ডাকে। রাজু ডাকছিল, এই সুব্রত, ওঠ ওঠ। কত রবি জলে রে, কে বা আঁখি মেলে রে! এরপর ব্যায়াম করবিই বা কখন, আর যাবিই বা কখন? জাহাজের সময় তো হয়ে এল।
সুব্রত চোখ রগড়াতে রগড়াতে উঠে বসল। পাশের ঘর থেকে স্টোভের গর্জন কানে আসে।
আসন্ন যাত্রার জন্য মা নিশ্চয়ই খাবার তৈরী করছেন।
সুব্রত তাড়াতাড়ি শয্যা ছেড়ে উঠে বাথরুমে গিয়ে মুখটা ধুয়ে ছাদে চলে গেল এবং খোলা বাতাসে বারবেলটা নিয়ে ব্যায়াম করতে শুরু করে দিল। তাড়াতাড়ি ব্যায়াম শেষ করে স্নানটাও সেরে নিল। স্নান শেষ করে জামাকাপড় পরে নীচের ঘরে এসে দেখে, ইতিমধ্যে কিরীটী ওদের বাড়িতে পৌঁছে গেছে।
কিরীটীবাবু এসে গেছেন দেখছি!
আগের দিন কথা হয়েছিল যে সকলে মিলে সুব্রতদের বাড়ি থেকে রওনা হবে।
কিরীটী বলে, হ্যাঁ, জাহাজের আর বেশী দেরি নেই, একটু তাড়াতাড়ি করুন।
