তারপর?
তারপর তারা টাকা সম্পর্কে আরও কী বলাবলি করলে। তারপর সবাই চলে গেল।
ভদ্রলোকের নাম কিছু শোননি?
না।
সুব্রত এতক্ষণে বুঝলে, তার সন্দেহ একেবারে অমূলক নয়। এই হতভাগ্য মেয়েটির জীবনের সঙ্গে একটা জটিল রহস্য জড়িয়ে আছে। এবং খুব সম্ভব সেই রহস্যের সঙ্গে হয়ত মিঃ সরকারের হত্যারও কোন যোগাযোগ আছে।
এমন সময় বন্ধ দরজার গায়ে নক শোনা গেল।
কে?
আমি কামতাপ্রসাদ।
ভিতরে আসুন।
কামতাপ্রসাদ ঘরের মধ্যে প্রবেশ করে সুব্রতকে নমস্কার জানাল।
সুব্রত বললে, আপনাকে ডেকেছিলাম ম্যানেজার সাহেব। আমি কাল থেকে আপনার হোটেলের ফ্ল্যাট ছেড়ে দেব। আপনার বিলটা পাঠিয়ে দেবেন।
ম্যানেজার সন্ত্রস্ত হয়ে উঠলেন। কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, হঠাৎ ফ্ল্যাট ছেড়ে দেবেন কেন মিঃ রায়? কোনরকম অসুবিধা…
না, ধন্যবাদ। এখানে থাকার আর আমার দরকার নেই, তাই ছেড়ে দিচ্ছি।
আচ্ছা আপনি যেতে পারেন। বিলটা পাঠিয়ে দেবেন। নমস্কার।
অগত্যা ম্যানেজারকে নমস্কার জানিয়ে বিদায় নিতে হল।
সুব্রত উঠে দরজাটায় খিল দিয়ে আবার সোফায় এসে বসল।
সুব্রত ঘড়ির দিকে চেয়ে দেখলে, রাত্রি প্রায় সাড়ে এগারোটা। এবারে শোওয়া দরকার। কাল সকালে অনেক কাজ। এখন কিছু বিশ্রামের একান্ত প্রয়োজন।
বাবলু, তোমার ঘুম পায়নি?
না, দাদা। আজ কেন যেন আমার একটুও ঘুম পাচ্ছে না। আপনার মত কেউ আগে আমার সঙ্গে এত ভাল করে কথা তো বলেনি। কেউ তো আগে আমাকে এত আদর করেনি, এত ভালবাসেনি।
তুমি যে আমার ছোট বোন। তোমাকে কি আমি ভাল না বেসে থাকতে পারি ভাই।
আমাকে আপনি কখনও বকবেন না, দাদা?
না, তুমি আমার লক্ষ্মী বোন। রাত্রি অনেক হল, এবার আমরা ঘুমাব। এই ঘরে ঐ বিছানায় তুমি শোও। আমি এই সোফাটার ওপরে শোব।
না, না, দাদা আপনি খাটের ওপরে বিছানাটায় শোন। আমি মাটিতেই ঐ পাশের ঘরে শোব।
দূর পাগলী, তা কি হয়! মাটিতে কি কেউ শোয় নাকি! অসুখ করবে ঠাণ্ডা লেগে।
কেন দাদা, আমি তো রোজ মাটিতেই শুতাম। কখনও আমার অসুখ করেনি। কখনও আমি খাটের বিছানায় শুইনি।
তবে আর কি, আজ প্রথম শোও। এবার থেকে তো তুমি খাটেই শোবে। যাও, লক্ষ্মী মেয়ের মত এবার গিয়ে শুয়ে পড়।
তবু যেন বাবলুর সংকোচ যায় না। সে ইতস্তত করে।
কই যাও, শুয়ে পড়! রাত অনেক হয়েছে–যাও।
আমার ময়লা কাপড়জামা। আপনার সুন্দর বিছানা একেবারে নষ্ট হয়ে যাবে দাদা।
আরে পাগলী, তাতে কী হয়েছে। আবার বোপর বাড়ি দিয়ে কাচিয়ে নিলেই হবে, যাও।
এবারে আর বাক্যব্যয় না করে ধীরে ধীরে বাবলু গিয়ে সুব্রতর শয্যায় শুয়ে পড়ল।
সুব্রত কিন্তু তখনও ঘরের মধ্যে অস্থিরভাবে পায়চারি করে বেড়াচ্ছে। অসংখ্য চিন্তা। একটার পর একটা কেবলই যেন তার মাথার মধ্যে এসে জট পাকাচ্ছে।
একসময় সুব্রতর ঘরের উজ্জ্বল বৈদ্যুতিক বাতিটা নিভিয়ে দিয়ে নীল আলোটা জ্বেলে দিল।
ধীরে ধীরে সুব্রত শয্যার পাশে এসে দাঁড়াল।
নিভাঁজ নিখুঁত পরিষ্কার শয্যার ওপরে বাবলু ঘুমিয়ে পড়েছে। বেচারী একান্ত সংকোচের সঙ্গে জড়োসড়ো হয়ে শুয়ে আছে।
নীল মৃদু আলোয় ভারি সুন্দর দেখাচ্ছে দুঃখ-তাপক্লিষ্ট অভাগা মেয়েটির মুখখানি। রুক্ষ মলিন চুলগুলি স্তি, এলোমেলো ভাবে উপাধানের ওপরে বিক্ষিপ্ত।
ছিন্ন মলিন শাড়িখানি দিয়ে সর্বাঙ্গ ঢেকে নিয়েছে।
ধীরে ধীরে গভীর স্নেহে সুব্রত তার হাতখানি বাবলুর কপালের ওপরে রাখল। আহা বেচারী, কার স্নেহের দুলালী—ভাগ্যের স্রোতে বিড়ম্বিতা!
সুব্রতর চোখে জল এসে গেল।
১৬. অনেক রাত্রে সুব্রত ঘুমিয়েছিল
অনেক রাত্রে সুব্রত ঘুমিয়েছিল। ঘুম ভাঙল যখন, প্রভাতের রৌদ্র খোলা জানালাপথে ঘরে এসে ঢুকেছে।
হঠাৎ ওর নজরে পড়ল, বাবলু সুব্রতর জুতোজোড়ায় একমনে কালি দিচ্ছে।
ও কি হচ্ছে বাবলু?
দাদা, আপনার জুতোটা ময়লা হয়ে গিয়েছিল। তাই পরিষ্কার করে রাখছি।
আরে পাগলী মেয়ে, থাক্ থাক্—তুমি এদিকে আমার কাছে এস তো।
সসংকোচে বাবলু এসে সুব্রতর পাশটিতে দাঁড়াল। সুব্রত সস্নেহে হাত দিয়ে জড়িয়ে বাবলুকে আরও কাছে টেনে আনল। কাল রাত্রে খুব ঘুমিয়েছ, না বাবলু?
হ্যাঁ।
তোমার খিদে পায়নি? চা খাবে না?
চা তো আমি খাই না, দাদা। তাছাড়া, সকালে কিছুই খাই না আমি।
কিন্তু এবার থেকে রোজ সকালে তোমাকে কিছু খেতে হবে।
বেশ, আপনি যখন বলছেন খাব।
সুব্রত কলিং বেল টিপে বেয়ারাকে ডেকে জলখাবার ও চা আনতে বলে বাথরুমে গিয়ে প্রবেশ করল। প্রত্যহ ভোরে স্নান তার বহুদিনের অভ্যাস।
স্নান সেরে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে সুব্রত ঘরে ঢুকে দেখল, রেডিওটার সামনে দাঁড়িয়ে বাবলু কৌতূহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে যন্ত্রটার দিকে।
সুব্রত এগিয়ে এল, এটা কি জান, বাবলু?
না তো!
এটা রেডিও, বেতার যন্ত্র। এতে গান শোনা যায়। শুনবে গান?
আমি গান খুব ভালবাসি দাদা। আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, রোজ রাত্রে মা আমাকে গান গেয়ে ঘুম পাড়াতেন। বাবলুর চোখ দুটি ছলছলিয়ে এল।
সুব্রত সুইচ টিপে রেডিওটা চালিয়ে দিল!
রেডিওতে কল্পনা গুপ্তার গান হচ্ছে–রবীন্দ্র সংগীত।
বেয়ারা ট্রেতে করে চা ও খাবার নিয়ে এল।
খেতে খেতে সুব্রত বললে, প্রথমে আমরা দোকানে যাব বাবলু। সেখান থেকে তোমার জামাকাপড় কিনে তারপর তোমাকে এক দিদির বাড়িতে নিয়ে যাব। এখন কিছুদিন সেখানেই তুমি থাকবে, যতদিন না তোমার মাকে খুঁজে পাই, কেমন?
