হঠাৎ একটা কথা ওর মাথায় বিদ্যুৎ-চমকের মত এসে উদয় হয়। অদ্ভুত চিঠিটার অনুসন্ধান করতে লোকগুলো তার ফ্ল্যাটে হানা দিয়েছিল এবং তাদেরই অনুসরণ করতে গিয়ে ও শেষ পর্যন্ত ঐ গুণ্ডার দলে গিয়ে পড়ে। সেইখানেই আশ্চর্যভাবে মেয়েটিকে পাওয়া গেল। তবে কি মিঃ সরকারের হত্যার সঙ্গে মেয়েটির জীবনের কোন সূত্র পাক খেয়ে আছে?
প্রথম থেকে আগাগোড়া ব্যাপারটা সমালোচনা করলে স্পষ্টই এখন বোঝা যায়, মিঃ সরকারের মৃত্যুর সঙ্গে প্রকাণ্ড একটা জটিল রহস্য পাকিয়ে আছে। ব্যাপারটা যতখানি ও সহজ ভেবেছিল ঠিক ততখানি সহজ তো নয়ই, বরং বেশ কিছু গোলমেলে ও জটিল।
পর পর দুটো দিন ও নানাভাবে এত ব্যস্ত রয়েছে যে কিরীটীর সঙ্গে গিয়ে বর্তমান কেসটা সম্পর্কে যে একটা ভোলাখুলি আলোচনা করবে তার সময় পর্যন্ত পাওয়া যাচ্ছে না। তারপর যে চারজন লোককে ও সেই বাড়িতে বন্দী করে পুলিসের হেফাজতে তুলে দিয়ে এসেছে, কাল সর্বাগ্রে তাদের নাড়াচাড়া করে দেখতে হবে। হয়তো বা সেদিক থেকেও কোন সূত্রের সন্ধান পাওয়া যেতে পারে।
কিন্তু তার সন্দেহ যদি সত্যই অমূলক হয়, তবে সর্বাগ্রে যেমন করেই হোক বাবলুকে একটি বিশেষ নিরাপদ স্থানে রেখে আসা দরকার। কিন্তু কোথায় সে বাবলুকে রাখতে পারে? হোটেল তো সে বর্তমানে ছেড়েই দেবে। কেননা গত রাতের ব্যাপারে ও স্পষ্টই বুঝতে পেরেছে। হোটেলের ম্যানেজারকে ওরা হাত করেছে। ম্যানেজারকে আর বিশ্বাস করা চলে না। নিজের আমহার্স্ট স্ট্রীটের বাসায় নিয়ে যাবে? বাড়িতে এক রাজুর মা। বাকি সব বেশির ভাগ সময় বাইরে বাইরে থাকে। গুণ্ডার দলের কিছুই অসাধ্য নেই। মেয়েটিকে সত্যিই যদি তাদের প্রয়োজন থাকে, তবে যে কোন সময় চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। কিরীটীর ওখানে রাখবে? না, তাও সম্ভব নয়। তবে কোথায় রাখা যেতে পারে? কোথায় মেয়েটি নিরাপদে থাকবে? হা ঠিক মনে পড়েছে। নিশীথের বোন অমিয়াদি শ্যামবাজারে থাকেন। তারও দুটি-তিনটি ছেলেমেয়ে আছে। ঠিক, অমিয়াদির বাসাতেই আপাতত এখন বাবলুকে কিছুদিন রাখাই সর্বাপেক্ষা যুক্তিসঙ্গত মনে হয়। তাছাড়া বাবলুকে যদি অমিয়াদির বাসাতেই রাখা যায়, তবে গুণ্ডার দল হয়তো ওর সন্ধান সহজে নাও পেতে পারে। সুব্রতর আঙ্গুলো তো ওদের জানা থাকাই বেশী সম্ভব। বাবলুকে অমিয়াদির ওখানে কিছুদিন রাখতে হবে।
চিন্তার স্রোতে সুব্রত ভেসে চলেছিল, বাবলুর কথা ওর মনেই ছিল না। হঠাৎ চোখ মেলে চাইতেই দেখলে সামনে দাঁড়িয়ে বাবলু ভীরু দৃষ্টি মেলে এই দিকে তাকিয়ে আছে।
সুব্রত ব্যস্ত হয়ে উঠল।—এ কি বাবলু তুমি দাঁড়িয়ে আছ কেন? বোসো।
আপনি তো আমাকে বসতে বলেননি দাদা!
বোসো, বোসো।
বাবলু এবার সোফাটায় বসল সংকুচিতভাবে।
১৫. শোন বাবলু
শোন বাবলু, আমি তোমাকে কয়েকটা কথা জিজ্ঞাসা করব। যতটা তুমি জান, সব জবাব তুমি আমাকে দেবে, কেমন?
বলুন।
আচ্ছা বাবলু, তোমার মনে পড়ে কতদিন তুমি ওদের সঙ্গে আছ?
কার—অবুর কাছে?
হ্যাঁ।
অনেক দিন। ঠিক কতদিন তা আমার মনে নেই দাদা, তবে অনেক দিন।
আচ্ছা ঐ যে ঢ্যাঙা লম্বা লোকটা, যার গায়ে তুমি রাত্রে চা ফেলে দিয়েছিলে, তার নাম কী জান?
ওকে সবাই সর্দার বলে ডাকে। তবে মাঝে মাঝে সিংহ যখন আসত, ওকে বঙ্কা বলে ডাকতে দুএকবার শুনেছিলাম।
সিংহ! সে আবার কে?
সিংহ—তাকে আপনি চেনেন না? সবাই তাকে খুব ভয় করে। জানেন, সর্দারও তাকে ভয় করে। সিংহ তো কারও সঙ্গে কথা বলে না। যখন সক্কলে বাড়ি থেকে চলে যায়, অনেক রাত্রে সিংহ তখন আসে। তখন কেউ বাড়িতে থাকে না। আমি দুদিন লুকিয়ে লুকিয়ে সিংহকে দেখেছি। আমি নীচে যে ঘরটাতে থাকতাম, রাত্রে সিংহ তার পাশের ছোট ঘরটায় এসে সর্দারের সঙ্গে কি সব কথাবার্তা বলতো।
বাবলুর কথা শুনে সুব্রতর কৌতূহল যেন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। সে গভীর আগ্রহে বাবলুর কথা শুনতে লাগল।
তুমি সিংহকে দেখেছ বাবলু? সে কেমন দেখতে? আবার দেখলে তাকে তুমি চিনতে পারবে?
না, যে দুবার তাকে দেখেছি, তার মুখে একটা কালো রংয়ের মুখোশ ছিল। লোকটা দেখতে কিন্তু জোয়ান আর খুব লম্বা।
তাদের কথাবার্তা কিছু তোমার মনে আছে বাবলু?
সব কথা তো ওদের শুনতে পারিনি। সর্দারকে আমার বড্ড ভয় করে। একদিন শুধু…
হঠাৎ বাবলু যেন সন্ত্রস্তভাবে সুব্রতর মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে গেল।
কি, থামলে কেন? বল কি শুনেছিলে—বল!
আপনি কাউকে বলে দেবেন না তো দাদা? সর্দার শুনতে পেলে কিন্তু ঠিক আমাকে মেরে ফেলবে! কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।
তোমার কোন ভয় নেই ভাই, তুমি বল কাউকে আমি বলবো না। তাছাড়া তোমাকে এমন জায়গায় আমি রেখে আসব, কেউ তোমার সন্ধান পাবে না।
কয়েকদিন আগে আমি আমার ঘরে শুয়ে ঘুমিয়ে আছি। হঠাৎ পাশের ঘরে কথাবার্তার শব্দ শুনে আমার ঘুম ভেঙে গেল। তাড়াতাড়ি পা টিপেটিপে উঠে দুই ঘরের মাঝখানে যে জানালাটা বন্ধ থাকত, সেখানে গিয়ে কান পেতে দাঁড়ালাম। জানালাটার একটা কপাট ফাটা। সেই ফাটা দিয়ে পাশের ঘরের সব কিছু দেখা যেত। দেখলাম ঘরের মধ্যে তিনজন আছে, সর্দার, সিংহ, আর একজন ভদ্রলোক। ভদ্রলোককে কোনদিনও আমি দেখিনি, তাই চিনতে পারলাম না। তাছাড়া ভদ্রলোক জানালার দিকে পিছন ফিরে বসে ছিল। তাদের দুএকটা কথা শুনে বুঝলাম, তারা আমার কথা নিয়েই আলোচনা করছে। শুনলাম সিংহ ভদ্রলোকটিকে বলছে, তোমার কোন ভয় নেই, কেউ ও মেয়ের সন্ধান পাবে না। কেউ জানবে না যে, এইখানে এ বাড়িতে বষ্কার কাছে লুকানো আছে। কিন্তু টাকা ত্রিশ হাজার চাই। ভদ্রলোক তার উত্তরে বললেন, বেশ, ত্রিশ হাজারই পাবে। মেয়েটার কোন অযত্ন হচ্ছে না তো? সর্দার বললে, আপনি পাগল হয়েছেন! ভদ্রলোক বললেন, উঃ, ঐ মেয়েটাই আমার কাল।
