থাকব!
বেয়ারা ডিকাপগুলো নিয়ে গেল। সুব্রত ম্যানেজারকে পাঠিয়ে দিতে ও একটা ট্যাক্সি ডেকে আনতে বললে।
কিছুক্ষণ পরে ম্যানেজার ঘরে এসে প্রবেশ করলেন, হাতে তার বিল।
সুব্রত বিলের টাকা মিটিয়ে দিয়ে বললে, দুপুরের দিকে আমার নোক এসে আমার জিনিসপত্র নিয়ে যাবে।
ম্যানেজার টাকা নিয়ে চলে গেল।
ট্যাক্সি হোটেলের নীচেই অপেক্ষা করছিল। সুব্রত বাবলুকে নিয়ে ট্যাক্সিতে উঠে বসল। কমলালয়ের সামনে ট্যাক্সি থামিয়ে বাবলুকে সঙ্গে করে দোকানের মধ্যে গিয়ে প্রবেশ করল সে।
সুব্রত একজন সেলারকে ডেকে বলল, এর গায়ের মাপে বেশ ভাল ফ্রক ও জামা দিন। একে ঘরের ভিতরে নিয়ে গিয়ে জামা পরিয়ে দিন। আরও তিন-চার সেট ভাল ভাল জামাকাপড় দেবেন।
বাবলু যখন আবার সুব্রতর সামনে এসে দাঁড়াল, তখন তাকে ভারি সুন্দর দেখাচ্ছিল। মলিন শতচ্ছিন্ন বেশভূষার দৈন্যে তার যে স্বাভাবিক রূপ ঢাকা পড়ে ছিল, এখন সুন্দর বেশভূষায় তা যেন শতদলের মতই বিকশিত হয়ে উঠল।
ফিকে নীল রংয়ের সুন্দর একখানা ফ্রক। পায়ে সাদা মোজা, সাদা জুতো, মাথায় লাল রিবন। বাবলু সলজ্জ কুণ্ঠিত হাসিতে সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল।
সুব্রত বললে, বাঃ, এই তো আমাদের বাবলুরাণী! এইবার চল দিদির বাসায় যাই।
অন্যান্য কাপড়গুলি কাগজের বাক্সে দোকানদার সুব্রতর সামনে এনে রাখলে।
দাম মিটিয়ে দিয়ে সুব্রত বাবলুর হাত ধরে ট্যাক্সিতে এসে উঠে বসল, চল শ্যামবাজার।
ট্যাক্সি শ্যামবাজারের দিকে ছুটে চলল।
***
অমিয়াদির স্বামী ডাঃ অচিন্ত্য বোস কলকাতার মধ্যে একজন বিশেষ নামকরা ডাক্তার। শ্যামবাজারে দেশবন্ধু পার্কের উত্তর কোণে ডাঃ বোসের আধুনিক কেতায় তৈরি কংক্রিটের ত্রিতল বাড়ি।
বাড়ির সামনের দিকে পার্ক। পিছনের দিকে একটা সরু রাস্তা। রাস্তার হাত পাঁচ-ছয়েকের মধ্যেই বেলগাছিয়া ক্যানেল বয়ে গেছে।
অমিয়াদির তিনটি মেয়ে, ছেলে নেই। প্রথম মেয়েটির বয়স দশ-এগারোর মধ্যেসাম রাণু। রোগা লিলিকে চেহারা। প্রায়ই অসুখে ভোগে। দ্বিতীয়-তৃতীয় যথাক্রমে নয় বছর ও পাঁচ বছরের।
ডাঃ বোস অত্যন্ত নিরীহ গোবেচারা গোছর মানুষ। দিন ও রাত্রির প্রায় বেশির ভাগ সময়ই তার কলে রুগীদের নিয়ে বাড়ির বাইরে বাইরেই কাটে।
বাড়ির সর্বময়ী কর্ত্রী অমিয়াদি।
অমিয়াদিকে সুব্রতর খুবই ভাল লাগে। মোটাসোটা গড়ন। সমগ্র মুখখানি জুড়ে যেন একটা মাতৃত্বের প্রশান্তি। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। অর্থশালী লোকের স্ত্রী হয়েও হাবভাব অত্যন্ত সাদাসিধে। চালচলনে, কথাবার্তায় এতটুকু বড়মানুষী ভাব নেই।
সুব্রত গাড়ি থেকে নেমে ট্যাক্সিওয়ালাকে অপেক্ষা করতে বলে বাবলুর হাত ধরে সোজা। গিয়ে বাড়ির মধ্যে প্রবেশ করল।
বেলা তখন প্রায় নটা হবে। একধামা তরিতরকারী নিয়ে বঁটি পেতে অমিয়াদি থালার ওপরে সকলের রান্নার জন্য তরকারী কুটছেন। পরিধানে একখানা চওড়া লালপাড় গরদের শাড়ি। সদ্য স্নানের ওপর ভিজে চুলগুলি ঘোমটার ফাঁক দিয়ে বুকের ওপরে এলানো। সামনেই বসে ঘোট মেয়ে টুলটুল একটা হাসিখুশি বই নিয়ে পড়ছে–
ইঁদুর ছানা ভয়ে মরে
ঈগল পাখি পাছে ধরে।
সুব্রত এসে ডাকল, অমিয়াদি!
কে রে? ওমা, সুব্রত! কী খবর ভাই? কতদিন পরে এলে ভাই—ওটি কে? সুন্দর মেয়েটি তো!
সামনেই একটা বেতের মোড়া ছিল। সেটার ওপরে বসতে বসতে সুব্রত বললে, তোমায় একটা কাজের ভার দিতে এলাম অমিয়াদি। এই মেয়েটি আমার একটি বোন-বাবলু। বলতে বলতে সুব্রত সস্নেহে বাবলুকে হাতের বেড় দিয়ে নিজের কাছে টেনে নিল।
টুলটুল ততক্ষণে পড়া থামিয়ে তার শিশুসুলভ কৌতূহলী দৃষ্টিতে বাবলুর দিকে পিট-পিট করে তাকাচ্ছে।
চা খেয়ে এসেছ ভাই?
খেয়ে এসেছি। কিন্তু আর এক কাপেও বাধা নেই।
অমিয়াদি ভৃত্য মাধবকে চা করে আনবার জন্য আদেশ দিলেন।
বেশ মেয়েটি। এখানে এস বাবলু। অমিয়াদি সস্নেহে বাবলুকে কাছে ডেকে নিয়ে বললেন, ঠিক যেন প্রতিমার মত মুখখানি। কোথায় পেলে একে সুব্রত?
সুব্রত সংক্ষেপে বাবলুর সব কথা অমিয়াদিকে খুলে বললে। বাবলুর কাহিনী শুনতে শুনতে ততক্ষণে একান্ত স্নেহশীলা অমিয়াদির দুচক্ষু বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে। দুহাতে গভীর স্নেহে অমিয়াদি বাবলুকে বুকের ওপরে টেনে নিলেন, আহা বাছা রে!
সুব্রত বলল, ওর মাকে যতদিন না খুঁজে পাই ততদিন ওকে আপনার কাছে রাখতে হবে, অমিয়াদি। আপনার বাড়িতে ওর সমবয়সী আছে—কোন কষ্ট হবে না বেচারার। আপনার কোন আপত্তি হবে না তো দিদি?
আপত্তি! তুমি কি যে বল সুব্রত? যতদিন খুশি ও আমার বাড়িতে থাকুক।
সহসা সুব্রত ও অমিয়াদি দুজনেই লক্ষ্য করলেন, মেয়েটি অমিয়াদির বুকের মধ্যে মাথা খুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে আরম্ভ করেছে।
অমিয়াদি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন, কি হল মা, কাদছ কেন? বাবলু অশ্রুসজল মুখখানি সুব্রতর মুখের ওপরে তুলে ধরে বলল, দাদা আপনারা এত ভাল! আপনারা আমাকে এত ভালবাসেন। আমি জানি আবার আমাকে অবুর হাতে যেতে হবে। কেন যেন কেবলই আমার মনে হচ্ছে, এসব সত্যি নয়, এ আমি স্বপ্ন দেখছি। আমি শুনতে পাচ্ছি কেবলই অবু আমাকে ডাকছে। আমাকে সে একবার পেলে আর রক্ষে রাখবে না। খুব মারবে কেটে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেবে।
অমিয়াদি গভীর স্নেহে বাবলুর পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, না, না বাবলু। তোমার কোন ভয় নেই। কেউ তোমাকে আর আমাদের কাছ থেকে নিয়ে যেতে পারবে না।
