সুব্রত কলিং বেল বাজিয়ে বেয়ারাকে ডাকল।
বেয়ারা এসে সেলাম জানাল।
দুজনের খাবার নিয়ে এসো–কী খাবে তুমি খুকী?
মেয়েটি কাতর দৃষ্টি তুলে সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল।
কী খাবে? রসগোল্লা? সন্দেশ?
রসগোল্লা। সেটা কী?–মেয়েটা বোকার মতই যেন প্রশ্ন করলে।
সুব্রত বেয়ারাকে দোকান থেকে কিছু ভাল ভাল খাবার আনতে বললে। আরও বললে, ঘণ্টাখানেক বাদে ম্যানেজারকে ডেকে দিতে।
বেয়ারা সেলাম দিয়ে চলে গেল।
শোন খুকী, ক্ষেন্তী ছাড়া তোমার আর কোন নাম নেই?
মেয়েটি সুব্রতর প্রশ্নে আবার মুখ তুলে তাকাল।অনেকদিন আগে আমার একটা পুরোনো নাম ছিল।
কী নাম তোমার মনে নেই?
আছে। বাবলু।
বাবলু! বাঃ কী সুন্দর নাম।
কিন্তু ওরা তো আমাকে ও নামে ডাকত না। মেয়েটি ভয়ে ভয়ে বললে।
তা হোক, এখন থেকে তোমাকে সবাই ও-নামেই ডাকবে।
কেউ আমাকে ও নামে ডাকে না, ও নামটা আমি ভুলেই গেছি। কিন্তু মাঝে মাঝে রাত্রে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, কে যেন ঐ নামে চুপি চুপি কেবলই ডাকছে-বাবলু, সোনামণি! মেয়েটির চোখের কোল দুটি ছলছলিয়ে এল।
কতদিন তুমি ওদের ওখানে আছ, বাবলু? মনে পড়ে তোমার?
না—তা অনেক দিন। অনেকদিন আগে একদিন আমার মনে পড়ে আমি ঘুমিয়েছিলাম মার কাছে। জেগে উঠে দেখি ওদের বাসায় আমি কখন এসে গেছি। কত কাঁদলাম মা-মা করে, কিন্তু মা আর এল না, আর মাকে খুঁজে পেলাম না। ওই মোটা লোকটা—যে আমাকে মারছিল না, ওর নাম অবু সর্দার, ওকে অবু বলে ডাকে। অবু বললে : আমি একটা পেত্নী, পেত্নীর মা থাকে না। আমার মা কোনদিনই ছিল না।
অবু মিথ্যা কথা বলেছে বাবলু। তোমার মা নিশ্চয়ই আছেন। আমরা তাঁকে খুঁজে বের করবো। তুমি কিছু ভেবো না, কেমন?
সহসা বাবলুর মলিন মুখখানা যেন একটু আনন্দের খুশিতে ঝলমল করে ওঠে। সে ব্যগ্রকণ্ঠে বললে, সত্যি পারবেন? সত্যি আমার স্বপ্নের মাকে খুঁজে দেবেন? আপনাকে তাহলে আমি খুব ভালবাসব। আপনার সব কথা শুনবো। আপনার সব কাজ করে দেবো।
না, বাবলু। আমার জন্য তোমায় কিছু করতে হবে না। তুমি শুধু আমাকে ভালবেসো। আমি তোমার মাকে নিশ্চয়ই খুঁজে দেবে। কিন্তু যখন তুমি তোমার মাকে পাবে, আমাকে ভুলে যাবে না তো?
আপনাকে ভুলে যাব! না, কোনদিনও না। আপনি এত ভাল! আপনাকে আমি কি বলে ডাকব, বাবু?
জানো বাবলু, আমার ছোট বোন নেই তুমি আমার বোন হবে? আমাকে দাদা বলে ডাকবে?
হ্যাঁ, আপনি আমার দাদা।
দাদাকে তুমি ভালবাসবে তো বাবলু?
হ্যাঁ, খুব ভালবাসবো।
জানো বাবলু, আমার মা নেই।
আহা, আপনার নিশ্চয়ই তাহলে আমার মতই কষ্ট।
হ্যাঁ, কিন্তু আমার নিজের মা না থাকলেও আর একজন মা আছেন।
এমন সময় বেয়ারা ট্রেতে করে নানাপ্রকারের লোভনীয় খাবার নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল!
বাবলু, তোমার নিশ্চয়ই খুব ক্ষিদে পেয়েছে! তুমি তো কিছু খাওনি এস দুজনে খাওয়া যাক।
সুব্রতর কথায় বাবলু যেন সহসা অত্যন্ত সস্ত্রস্ত ও বিব্রত হয়ে উঠলো, না না, আমার এখন ক্ষিদে পায়নি দাদা। তাছাড়া রোজ রাত্রে তো আমি খেতাম না! আপনি খান দাদা।
তা কি হয় ভাই, এসো, আমরা দুজনে একসঙ্গে বসে খাব।
সুব্রত সস্নেহে বাবলুকে নিজের পাশে সোফার ওপরে এনে বসাল।
আমার কাপড়জামা ময়লা, দাদা। আপনার সব নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
তুমি কিছু ভেবো না বাবলু। আমার অনেক আছে। এস এখন খাওয়া যাক।
সুব্রত একটা রসগোল্লা বাবলুর ত্রস্ত কুণ্ঠিত হাতখানার ওপরে তুলে দিল, নাও, খাও। ধীরে। ধীরে অতি সংকোচের সঙ্গে বাবলু খেতে শুরু করে।
কেমন লাগছে খেতে বাবলু?
খুব ভাল।
সুব্রত ধীরে ধীরে বাবলুর সংকুচিত ভীত শিশুচিত্তকে নিজের সস্নেহে ব্যবহারে নিজের দিকে টেনে নিতে লাগল। একটু একটু করে তার মনের বিশ্বাস আনতে লাগল। সুব্রত স্পষ্টই বুঝতে পারছিল, বাবলুর শিশুচিত্তের মধ্যে এমন একটা সংকোচ ধীরে ধীরে গড়ে উঠেছে যেটা দূরীভূত করতে সময়ের প্রয়োজন। আজ তার কাছ থেকে ও যা ব্যবহার পাচ্ছে, এ শুধু তার কাছে অসম্ভবই নয়, অভাবিত। স্নেহ ও দরদ দিয়ে ওর শিশুচিত্তকে জয় করতে হবে। অল্পে অল্পে বাবলু যে তার স্নেহের সিঞ্চনে পুনর্জীবিত হয়ে উঠেছে তাতেও কোন সন্দেহ নেই।
খাওয়া হয়ে গেল। সুব্রত বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গেল।
হাতমুখ ধুয়ে ফিরে এসে ও দেখে বাবলু সযত্নে উচ্ছিষ্ট প্লেটগুলো নিয়ে বাথরুমের দিকে চলেছে।
ও কি! বাবলু ওসব এঁটো প্লেট নিয়ে কোথায় যাচ্ছ?
এগুলো ধুতে হবে না দাদা। ধুতে নিয়ে যাচ্ছি।
ছি ছি, ওসব নোংরা কাজ তোমার না রেখে দাও, রেখে দাও, এখুনি বেয়ারা এসে নিয়ে যাবে।
ভয়চকিত দৃষ্টিতে বাবলু সুব্রতর মুখের দিকে তাকাল, কেন দাদা? আপনি কি আমার উপরে কোন রাগ করেছেন? ওদের ওখানে সব বাসনপত্র তো আমিই ধুয়ে রাখতাম। তাড়াতাড়ি না ধুলে তারা মারত। তবু খেতে দিত না আমাকে।
বাবলুর কথা শুনে সুব্রতর চোখে জল এসে যায়, সে কোনমতে অশ্রু গোপন করে মৃদু সস্নেহ কণ্ঠে বললে, না ভাই, এখন তো আর তুমি তাদের ওখানে নেই। আমার এখানে ওসব নোংরা কাজ একেবারেই করতে হবে না। রেখে দাও এগুলো নামিয়ে। যাও, হাত-মুখ ধুয়ে এস।
বাবলু একবার কাতর দৃষ্টিতে সুব্রতর মুখের দিকে চেয়ে বাথরুমের দিকে চলে গেল, ট্রেটা আবার মাটিতে নামিয়ে রেখে।
সুব্রত এসে আবার সোফায় বসে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বুজলো।
এই মেয়েটি কে? কার মেয়ে? কেমন করে মেয়েটি ঐ গুণ্ডার দলে জড়িয়ে গেল? মেয়েটির আসল পরিচয় কী? কোথায় বাড়ি? নানা চিন্তা একসঙ্গে ওর মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেতে লাগল।
