মানকে সুব্রতর দিকে এগিয়ে এল, সুব্রতর কঠিন একটা ঘুষি দুম করে লোকটার নাকের ডগায় এসে পড়তেই লোকটা চোখে সর্ষেফুল দেখে। সে বসে পড়ল।
বাকি তিনজন তখন এগিয়ে এসেছে। সুব্রত সমানে ঘুষি চালাতে লাগল আর বিদ্যুৎগতিতে চারপাশে চারকির মত ঘুরতে লাগল। আর একজন ধরাশয়ী হল।
ঢ্যাঙা লোকটা তখন পিছন থেকে এসে সুব্রতকে জড়িয়ে ধরেছে। যুযুৎসুর প্যাচে সে-ও কাবু হল। বাকি ছিল একজন। সে এক লাফে ঘর থেকে বের হয়ে পালাল। সুব্রত তখন চকিতে মেয়েটির হাত ধরে এক হেঁচকা টান দিয়ে সোজা ঘরের বাইরের এসে এপাশ থেকে শিকল তুলে দিল এবং তাড়াতাড়ি বারান্দায় এসে অন্য দরজাটায়ও শিকল তুলে দিল। লোক চারটিকে বন্দী করে সুব্রত সোজা মেয়েটির হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নেমে ছুটতে লাগল। এ বারান্দা ও বারান্দা দিয়ে ঘুরে অবশেষে সদর দরজার সামনে এসে দাঁড়াল। রাস্তায় নামতে ও দেখতে পেলে ওর নির্দেশমত কয়েকজন পুলিস তখন রাস্তার ওপরে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের যথাযথ উপদেশ দিয়ে সে পীতাম্বরের ট্যাক্সিতে মেয়েটিকে নিয়ে বসল।
কোথায় যাব, হুজুর?
তাই তো! এখন কোথায় যাওয়া যায়? হোটেলেই প্রথমে যাওয়া যাক, তারপর ভেবে দেখা। যাবে কোথায় যাওয়া যায়। সুব্রত বললে, মমতাজ হোটেল!
গাড়ি মমতাজ হোটেলের দিকে তীব্রগতিতে ছুটল।
এতক্ষণে সুব্রত মেয়েটির দিকে তাকাল।
গাড়ির এক কোণে অত্যন্ত সংকোচে জড়সড় হয়ে মেয়েটি বসে আছে।
দরদভরা কণ্ঠে সুব্রত জিজ্ঞাসা করল, তোমার নাম কী খুকী?
ওরা আমায় ক্ষেন্তী বলে ডাকে। কিন্তু আপনি আপনি আমাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন বাবু? একরাশ উৎকণ্ঠা মেয়েটির কণ্ঠ হতে ঝরে পড়ল।
আমি তোমাকে খুব ভাল জায়গায় নিয়ে যাচ্ছি, যেখানে কেউ আর তোমাকে কষ্ট দেবে না, কেউ মারবে না।
কিন্তু ওরা, মানকে-গোবরা?
কোন ভয় নেই, তারা তোমার নাগাল পেলে তো!
না না, আমাকে সেখানে রেখে আসুন। আমি আপনার সঙ্গে যাব না। না যাব না—ওরা আমাকে মেরে ফেলবে, কেটে গঙ্গায় ফেলে দেবে!
কেন তুমি ভয় করছ খুকী? ওরা তোমাকে পেলে তো। ওরা টেরই পাবে না কোথায় তুমি আছ।
না না, আপনি জানেন না ওদের—ওরা সব পারে! ওরা আমাকে আবার খুঁজে বের করবেই। সর্দারকে আপনি চেনেন না।
দেখলে না, তাদের আমি ঘরে বন্ধ করে রেখে এলাম! এতক্ষণে তাদের জেলে ধরে নিয়ে গেছে আমার লোকেরা। তারা সব জেলে বন্ধ হয়ে থাকবে, কেমন করে তারা তোমাকে খুঁজে পাবে!
না না, তারা ধরা পড়বে না। সর্দারকে কেউ কোনদিন ধরতে পারেনি। কতবার সে জেলে গেল, আবার পালিয়ে এসেছে যেন কেমন করে। সর্দার বলে, জেলে তাকে কেউ আটকে রাখতে পারে না।
সুব্রত নানাভাবে মেয়েটিকে সান্ত্বনা দিতে লাগল। এমনসময় গাড়ি এসে মমতাজ হোেটলের সামনে এসে দাঁড়াল।
সুব্রত মেয়েটির হাত ধরে সোজা নিজের ফ্ল্যাটে গিয়ে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
১৪. মেয়েটি সুব্রতর দরদপূর্ণ সাদর ব্যবহারে
মেয়েটি সুব্রতর দরদপূর্ণ সাদর ব্যবহারে বিস্ময়ে একেবারে হকচকিয়ে গেছে। এ শুধু অজানিতই নয়, অভাবিতও।
সে তো কোনদিনই কারও কাছে এতখানি মধুর ব্যবহার পায়নি। তার শিশুচিত্তের ব্যথা বেদনাতে কেউই তোদরদের সোনার কাঠি ছোঁয়ায়নি।
যেদিন থেকে তার সামান্য জ্ঞান হয়েছে, ও পেয়ে এসেছে শুধু নিষ্ঠুর কঠিন ব্যবহার। পেয়েছে শুধু উঠতে-বসতে, খেতে-শুতে তিরস্কার আর তিরস্কার। নিত্য প্রহার আর শত লাঞ্ছনার অশ্রুজলে তার প্রতিটি দিনরাত্রির কাব্যখানি ভরা।
তার অন্ধকারময় জীবনযাত্রাপথে কেউ তো মণিদীপ জ্বেলে সান্ত্বনার প্রলেপ বুলোয়নি।
তাই তো আজ সুব্রতর ব্যবহারে ওর সদা-শঙ্কিত শিশুচিত্ত বিস্ময়ে কেমন আত্মহারা হয়ে গেছে।
ঐ চেয়ারটায় বসো খুকী!
মেয়েটি কিন্তু চেয়ারে বসল না। তার মলিন ছিন্ন বেশভূষার দৈন্য যেন এই সুখ-ঐশ্বর্যের– মণিকোঠায় তাকে আরও বেশি কুণ্ঠিত করে ফেলেছে। সে নীরবে মাথা হেলিয়ে বসতে অস্বীকার করে বললে, আমার নাম ক্ষেন্তী। ওরা মাঝে মাছে আমাকে পেত্নী বলেও ডাকত।
সুব্রত এবারে হাত ধরে এনে মেয়েটিকে একখানা সোফার ওপরে বসিয়ে দিল।
মেয়েটি যেন অনিচ্ছাসত্ত্বেও অত্যন্ত সংকোচের সঙ্গে জড়োসডো হয়ে বসল। কুণ্ঠাতে যেন তার রুগণ দেহখানি মাটির সঙ্গে মিশিয়ে যেতে চায়।.চিরকাল সে দাঁড়িয়ে থেকেছে।
রাত্রে স্যাতস্যাতে অন্ধকার ঠাণ্ডা ঘরের মেঝেতে আরশোলা ও ইদুরের সঙ্গে মিতালি পাতিয়ে একটা ছেড়া চটের ওপরে শুয়ে শুয়ে রাতের পর রাত কাটিয়েছে।
এই বিলাস-ঐশ্বর্যের প্রাচুর্য তার স্বপ্নের অগোচরে ছিল চিরদিন। চোখের কোল দুটি তার অকারণেই যেন জলে ভরে আসতে চায়।
কেন যেন খালি কান্না পাচ্ছে। একটা অহেতুক ভয়, একটা অজানিত আশঙ্কা যেন তার সমগ্র শিশুচিত্তটিকে সন্দেহের দোলায় দোলাচ্ছে।
কী করবে ও? উঠে পালিয়ে যাবে?
ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছে না তো ও? যেমন করে মাঝে মাঝে রাত্রে সেই ছেড়া ময়লা চটের ওপরে একা একা শুয়ে স্বপ্ন দেখেছে কী সুন্দর তার চেহারা। লালপেড়ে শাড়ি পরা, মাথায় ঘোমটা, ঘোমটার আড়ালে মমতাভরা দুটি চোখের সকরুণ চাউনি। ধীরে ধীরে তিনি এসে ওর শয্যার পাশটিতে বসেছেন। তার নরম ঠাণ্ডা হাতখানি ওর আতপ্ত কপালের ওপরে গভীর স্নেহে ন্যস্ত করেছেন। মা-মাগো! তোমায় যে কেবলি মা বলে ডাকতে ইচ্ছে করে মা। কেবলই আসো তুমি ঘুমের ঘোরে। জেগে উঠলে কেন তোমাকে দেখতে পাই না? কেন পাই না তোমাকে খুঁজে? কোথায় তুমি লুকিয়ে থাক? কোন্ রহস্যের পরপারে? কোন স্বপ্নের সোনার পালঙ্কে থাক তুমি ঘুমিয়ে? সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে ঐ দুর্দান্ত লোকগুলোর কথা। তাদের নিষ্ঠুর ব্যবহার, তাদের গালাগালি, তাদের চিৎকার। মার খেয়ে খেয়ে ওর সমস্ত দেহে ব্যথা হয়ে গেছে। শিউরে উঠে ও চোখ বুজে ফেলল। ও যেন শুনতে পাচ্ছে তারা চিৎকার করে বলছে, ক্ষেন্তী হারামজাদী, আজ তোকে মেরে খুন করবো!
