কার্ডিনাল হাউজের সামনের পার্ক। সন্ধ্যা তখন পেরিয়ে গেছে।
কার্ডিনাল হাউজের তিনতলায় অবস্থিত লাইব্রেরি থেকে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলো জেনের আব্বা ফ্রান্সিসকো জেমেনিজ, জেনের মা ও জেন।
কার্ডিনাল পরিবারের সদস্যরা প্রায় বেড়াতে আসে কার্ডিনাল হাউজে। আজও তেমনি ধরনের বেড়াতে আসা। তবে আজকের বেড়ানোর প্রধান উদ্দেশ্য জেনকে নিয়ে মুক্ত হওয়ায বেড়ানো। সে হাসপাতাল থেকে ক’দিন হলো বের হয়েছে। তার মুখ ম্লান, শরীরটা অনেকখানি কৃশ।
চোখে তার সবুজ গগলাস। তার বাম চোখের দৃষ্টি শক্তি প্রায় নেই। ডাক্তারের পরামর্শ, জটিল একটা অপারেশন আছে যা তার চোখ পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি ফিরিয়ে আনতে পারে। কিন্তু সে অপারেশনের জন্যে জেনকে সুস্থ হওয়া প্রয়োজন।
ফ্রান্সিসকো জেমেনিজরা সিঁড়ির গোড়ায় নামতেই তাদের দেখা হলো ভাসকুয়েজের সাথে।
ফ্রান্সিসকো জেমেনিজ স্প্যানিশ ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের উপদেষ্টা পরিষদের একজন প্রভাবশালী সদস্য।
ভাসকুয়েজের সাথে দেখা হতেই ফ্রান্সিসকো ভাসকুয়েজকে স্বাগত জানিয়ে বলে উঠল, কি মি. ভাসকো শেষ খবরটা কি?’
‘আজ রাত ২টার ফ্লাইটে আমেরিকা থেকে ওরা আসছেন। ১ বিলিয়ন ডলারে রফা হয়েছে। আমরা আজ রাতেই আহমদ মুসাকে ওদের হাতে তুলে দেব।’ বলল ভাসকুয়েজ।
‘একটা ঐতিহাসিক ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে মি. ভাসকো। আহমদ মুসা যে আমাদের হাতে এবং তার যে এই ধরনের পরিণতি ঘটতে যাচ্ছে- এই গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে এখনও স্বপ্ন বলে মনে হচ্ছে।’
‘ঠিক বলেছেন। আজকের দুনিয়ার বলা যায় সবচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি আহমদ মুসা যে এভাবে আমাদের হাতে আসবে, তা আমরা কোনদিন কল্পনায়ও ভাবতে পারিনি।’
‘আপনাকে ধন্যবাদ মি. ভাসকো। আপনার কৃতিত্ব এটা।’
‘ধন্যবাদ, মি. ফ্রান্সিসকো।’
বলে একটু থেমে মি. ভাসকো আবার বলল, ‘আপনি তো আরও কিছু সময় আছেন, আমি আসছি একটু ভেতর থেকে।’
বলে মি. ভাসকো কার্ডিনাল হাউজের দ্বিতলের দিকে চলে গেল।
মি. ভাসকো চলে যেতেই জেন তার আব্বার কাছে সরে এলো। বলল, ‘এ কোন আহমদ মুসা আব্বা?’
‘কেন তুমি জান না তাকে? সেই যে ফিলিস্তিন বিপ্লব, মিন্দানাও বিপ্লব, মধ্যএশিয়া বিপ্লব, ককেশিয়া বিপ্লব,….’
তার আব্বার কথা শেষ না হতেই জেন বলল, ‘তাকে চিনব না! কাগজে কত পড়েছি। সাবই তো তাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ বিপ্লবী নেতা বলে।’
‘হ্যাঁ, সেই শ্রেষ্ঠ নেতাই এখন আমাদের হাতের মুঠোয়।’
‘কিভাবে?’
‘সে এক মজার কাহিনী’ বলে মি. ফ্রান্সিসকো আহমদ মুসা কিভাবে বাস্ক গেরিলাপ্রধানের বোন মারিয়াকে বাঁচাতে গিয়ে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের হাতে বন্দী হয়, কিভাবে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের সতর্কতা ও প্রতিরোধকে পরাভূত করে মেয়েটিকে উদ্ধার করে পালিয়ে যায় এবং কিভাবে আবার সেধরা পড়ে। সব কাহিনী জেনকে শুনিয়ে বলল, ‘আহমদ মুসার বিপ্লবী জীবনের সব লীলাখেলা এবার শেষ হচ্ছে।’
জেনের কাছে তার আব্বার কথা ভালো লাগল না, বরং মনটার কোথায় যেন খচখচ করতে লাগল! জোয়ানের মুখটাও তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। ভাবল, জোয়ান যেহেতু মুসলমান, তাই এ খবরটায় নিশ্চয় সে বড় রকমের আঘাত পাবে। জেন বলল, ‘আব্বা এ ধরনের একজন বিপ্লবী নেতাকে বিক্রি করা কি সম্মানজনক? এমন ব্যবসায় মনোবৃত্তি কি ভালো দেখায়?’
‘তুমি জান না জেন, এটা বিক্রির ব্যাপার নয়, একধরনের বিনিময় বলতে পার। আমাদের যে ক্ষতি হয়েছে আহমদ মুসা দ্বারা তার একটা অংশ পুরণ করলাম আমরা এর মাধ্যমে।’
‘শুনেছি লোকটি নাকি খুবই ভালো। যা কিছু করছেন জাতির জন্যে, নিজের জন্যে কিছুই নয়। আহমদ মুসার চরম বৈরী কাগজ ‘ওয়ার্ল্ড টাইমস’ তার ওপর একটা কভার স্টোরি করছিল। তাতে বলা হয়েছিল আহমদ মুসা ফিলিস্তিন বিপ্লব সমাপ্ত করে যখন ফিলিস্তিন থেকে চলে যান, তখন এক শুভাকাঙক্ষীর কাছ তেকে ১ হাজার ডলার ধার নেন। সব ক্ষেত্রেই অনুরূপ ঘটনা ঘটেছে্। তিনি কোথাও থেকে ব্যক্তিগতভাবে কোন ফায়দা নেননি। এমন নিঃস্বার্থ বিপ্লবী দুনিয়াতে দুর্লভ আব্বা। দুনিয়াতে যারা কষ্ট করে বিপ্লব করেছে, তারা সবাই রাষ্ট্রক্ষমতা ভোগ করেছে, বিপ্লবের সকল সহায় সম্পদের মালিক হয়েছে।’
‘তোমার কথা অস্বীকার করছি না জেন। কিন্তু তার বিপ্লব যাদের ক্ষতি করেছে, আমরাও তাদের মধ্যে। সুতরাং আমরা তাকে ঐভাবে বিচার করব না। তিনি আমাদের শত্রু।’
‘শত্রু হলেও মহৎ শত্রু আব্বা।’ আমি এ কভার স্টোরিতে পড়েছি, বিপ্লবের সময় ও বিপ্লব কর্মকান্ডের বাইরে তিনি কারও কোন ক্ষতি করেননি, ক্ষতি করেন না।’
‘কিন্তু তার পরেও তিনি আমাদের স্বার্থের শত্রু।’
জেন কিছু বলতে যাচ্ছিল, তার আব্বা বলল, ‘চল, পার্কে গিয়ে বসি। আরও কিছুটা সময় আমরা কাটাতে পারি ওখানে গিয়েই আমরা কথা বলব।’
ওরা সকলেই পা বাড়াল পার্কের দিকে।
আহমদ মুসা বুঝল বাইরে সন্ধ্যার অন্ধকার ঘনিয়ে এসেছে।
ধীরে ধীরে সে গিয়ে বাথরুমে প্রবেশ করল।
বাথরুমের মেঝেয় দাঁড়িয়ে আহদম মুসা বাথরুমের ছাদের দিকে তাকাল। যা ভেবেছিল তাই, পয়ঃপাইপ যেখান দিয়ে নেমে এসছে তার পাশের জায়গাটা ছাদের অন্য জায়গা থেকে আলাদা। ছাদের এ এলাকাটা ভেঙে পয়ঃপাইপ বসানো হয়েছে। পরে ছাদের ঐ অংশ আলাদাভাবে তৈরি করা হয়েছে।
আহমদ মুসা পকেট থেকে ল্যাসার কাটার বের করে হাতে নিল। তারপর পয়ঃপাইপ বেয়ে ওপরে উঠে গেল। ডান হাতে পাইপ ধরে রেখে বাম হাতে কাটারের সূক্ষ আগা দিয়ে নতুন তৈরি ছাদটা পরীক্ষ করল। দেখল, লোহার দুই বীমের ওপরা স্টিলের শীট চাপিয়ে তার ওপর ছাদ ঢালাই করা হয়েছে। নিচে থেকে তা অবশ্য বুঝা যায় না রংয়ের কারণে। আহমদ মুসা লেসার কাটার চালু করে স্টিল শীটের যে পাশটা লোহার বিমের ওপর আটকানো, সে পাশটা লেসার বিম দিয়ে কেটে ফেলল। তারপর ষ্টিল শিটের সে অংশটা দেয়ালের মধ্যে ঢুকানো দেয়াল বরাবর সে পাশটাও কেটে ফেলল। কিন্তু ষ্টিল শিটটা পড়ে গেল না। টানাটানি করল, তবু পড়ল না। আহমদ মুসা নেমে এলো নিচে। টয়লেটের ফ্লাশের স্টিলের হাতলটা কেটে নিল। হাতলটার এক প্রান্ত বেশ চোখা।
আবার উঠল আহমদ মুসা। অনেকক্ষনের প্রচেষ্টায় হাতলের সুঁচালো প্রান্ত স্টিল শিটের ওপর দিয়ে ছাদের ভেতর ঢুকানো গেল। তারপর হাতল ধরে অনেক টানাটানির পর স্টিল শিটের একটা প্রান্ত আগলা করা গেল। দেরি সইছিল না। আহমদ মুসা আলগা অংশটা দু’হাতে ধরে ঝুলে পড়ল। কাজ হলো। আহমদ মুসা আছড়ে পড়ল মেঝের ওপর, তার সাথে সশব্দে এসে পড়ল স্টিল শিটটি।
পাইপ বেয়ে আবার উঠে গেল আহমদ মুসা। স্টিল শিটের ওপর ছিল সিমেন্ট দিয়ে পাথর জমানো আস্তরণ। আহমদ মুসা আগের মতোই এক হাতে পাইপ ধরে অন্য হাতে লেসার বিম দিয়ে সিমেন্ট গলিয়ে এক এক করে পাথর খুলতে লাগল। বড় কষ্টকর এই কাজ। ঘেমে উঠল আহমদ মুসা। মেঝেতে আছড়ে পড়ায় পায়ের গোড়ালিতে লেগেছিল, সে জায়গায় চিন চিন করছে। তা’ছাড়া স্টিল শিটটি মাথায় আঘাত করেছিল। সে জায়গাটাও টন টন করছে। কিন্তু বিশ্রাম নেবার সুযোগ নেই। বেশি দেরি হলে ধরা পড়ার আশংকা। বাথরুমে ওদের টিভি ক্যামেরার কোন চোখ নেই বলে রক্ষা। কিন্তু বেশিক্ষণ ঘর থেকে অনুপস্থিত থাকলে ওরা সন্দেহ করতে পারে।
আস্তরণটির ওপরের অংশটা ছিল গুঁড়ো পাথর ও সিমেন্টে জমানো। আহমদ মুসা যতটা পারল লোহার বিম ও দেয়ালের পাশ বরাবর জায়গায় সিমেন্ট গলিয়ে ফেলল। তারপর লেসার কাটার পকেট পুরে দু’হাতে পাইপ আঁকড়ে ধরে দু’পা জোড়া করে ওপরে তুলে সর্বশক্তি দিয়ে লাথি দিতে লাগল। তিন-চারটি লাথির পরই পাতলা আস্তরণটি তার পায়ের ওপর নেমে এলো, তারপর সশব্দে গড়িয়ে পড়ল নিচে মেঝেতে।
ওপরে ছাদে বেশ বড় একটি গহবরের সৃষ্টি হলো। আহমদ মুসা লোহার বিম ও ভাঙা ছাদের প্রান্ত ধরে দ্রুত ওপরের মেঝেতে উঠে গেল। একবার চোখ তুলে তাকাল বাথরুমের দরজার দিকে। দরজা বন্ধ। আহমদ মুসা গভীর ক্লান্তিতে এলিয়ে পড়ল মেঝেতে। বড় বড় দম নিয়ে সে ক্লান্তি দূর করার চেষ্টা করল। এই মুহূর্তে দুনিয়ার মধ্যে তার কাছে সবচেয়ে লোভনীয় মনে হচ্ছে বিশ্রামকে।
কিন্তু মিনিট দুয়েকের বেশি সময় সে নষ্ট করতে পারল না। উঠে দাঁড়াল। গোটা গা ধুলো-বালিতে ভরে গিয়েছিল। একটু ঝেড়ে নিয়ে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে গেল দরজার দিকে। চারদিকে তাকিয়ে বাথরুমটাকে তার কাছে নোংরাই মনে হলো অর্থাৎ বাথরুমটা সাধারণের ব্যবহারের জন্যে! আহমদ মুসার মনে পড়ল এঘরটি তার ওপরের ঘর। এখান থেকেই তার ঘরে খাদ্য সরবরাহ হতো। সুতরাং এঘরটা কিচেন, স্টোর রুম ইত্যাদি জাতীয়ই কিছু হবে।
আহমদ মুসা বাথরুমের দরজার নব ঘুরাতে যাচ্ছিল, এমন সময় দরজার নব ঘরে গেল। সংগে সংগে খুলে গেল দরজা।
একেবারে মুখোমুখি। মাঝারি লম্বা, মোটা সোটা একজন লোক। শক্ত-সমর্থ শরীর। আহমদ মুসাকে সামনে দেখে তার চোখ ছানাবড়া!
বিস্ময়ের ঘোর কাটার আগেই আহমদ মুসা তার ডান হাতের একটা কারাত চালাল লোকটির কানের নিচে নরম জায়গাটায়। লোকটা নিঃশব্দে গোড়া কাটা গাছের মতো দরজার ওপর পড়ে গেল।
আহমদ মুসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করল কিছুক্ষণ। কেউ এলো না। আহমদ মুসা বুঝল, এঘরে কেউ নেই।
লোকটিকে টেনে বাথরুমে ঢুকিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দরজা বন্ধ করে দিল সে।
ঘরটি আসলেই একটা স্টোর রুম।
ঘরের চাদিকে একবার নজর বুলাল আহমদ মুসা। পাশেই একটা বাক্সে সে বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম দেখতে পেল। তারপর সে এগিয়ে গেল দরজার দিকে।
দরজার সামনে একটু দাঁড়িয়ে নব ঘুরিয়ে ধীরে ধীরে দরজাটা একটু ফাঁকা করে বাইরে উঁকি দিল। দেখল লম্বালম্বি একটা করিডোর।
আহমদ মুসার মনে পড়ল এ ধরনের একটা করিডোরের মুখেই নিচে নামার সিঁড়িটি করিডোরে গিয়ে উঠেছে। আহমদ মুসার আরও মনে পড়ল সিঁড়ির পাশেই ইলেকট্রিক সুইচ বোর্ড। বিশাল মাষ্টার সুইচটাকে সে ওখানেই দেখেছে।
আহমদ মুসা দরজা খুলে বেরিয়ে আসবে এমন সময় পেছনে পায়ের শব্দ পেয়ে বিদ্যুৎ গতিতে পেছনে ফিরল। কিন্তু দেরি হয়ে গেছে তখন। একটা লোহার রড নেমে আসছে তার মাথা লক্ষ্যে। শেষ মুহূর্তে তার মাথাটা কাত করে একদিকে সরিয়ে নিতে পারল। মাথাটা বাঁচল, কিন্তু আঘাতটা এসে লাগল গলা ও ঘাড়ের সন্ধিস্থলে।
মাটিতে পড়ে গেল আহমদ মুসা।
ঘাড়ের পেশিটা থেঁতলে গেল বলে মনে হলো। মাথাটাও চিন চিন করে উঠল ব্যথায়। ঘুরে উঠেছিল মাথাটা।
মাটিতে পড়েই আহমদ মুসা দেখল, লোকটি রডটা তুলে নিচ্ছে, আরেকটা আঘাত নেমে আসছে তার ওপর।
আহমদ মুসা এক পাশে নিজেকে ছুঁড়ে দিল। রডের আঘাতটি গিয়ে কংক্রিটের মেঝের ওপর পড়ল।
আহমদ মুসা এক পাশে সরে গিয়েই উঠে দাঁড়িয়েছিল।
লোকটি তৃতীয়বার রডটি তোলার আগেই আহমদ মুসার ডান হাতের কারাত লোকটির বা কানের নিচে ঠিক আগে জায়গাটায়। লোকটি রড আর তুলতে পারল না। মুখ থুবড়ে পড়ে গেল রডের ওপরেই।
আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়িয়ে আবার দরজা দিয়ে উঁকি দিল বাইরের করিডোরে। না, কোন লোক নেই। আহমদ মুসা মুখটা নিচু করে করিডোর ধরে উত্তর দিকে দৌড় দিল। লক্ষ্য, সিঁড়ির ঘর।
আহমদ মুসার স্মৃতি ঠিকই বলেছিল। যেখানে করিডোরটি পুব দিকে মোড় নিয়েছে, সেখানেই পেয়ে গেল সে সিঁড়ি ঘর। সিঁড়ি মুখের পুব পাশে দেয়ালেই সুইচ বোর্ড।
আহমদ মুসা এক লাফে গিয়ে সুইচ বোর্ডের কাছে দাঁড়াল। মাষ্টার সুইচের ওপর নজর বুলাল। পাশাপাশিই অন ও অফ এর বোতাম। আহমদ মুসা চকিতে একবার পুব দিকে তাকিয়ে দোতলায় ওঠার সিঁড়িটা দেখে নিল।
তারপর মুখ ঘুরিয়ে যখন অফ-এর বোতামের দিকে হাত বাড়াল, তখনই বেজে উঠল সাইরেন।
আহমদ মুসা দ্রুত অফ- এর বোতামটি চেপে দৌড় দিল করিডোরে ওঠার সিঁড়ির দিকে।
অন্ধকারে সিঁড়ির রেলিং এর সাথে সে ধাক্কা খেল। তবু খুশি হলো সিঁড়ি পেয়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠে গেল বারান্দায়।
দোতলার বারান্দায় যখন সে উঠল, বিভিন্ন দিকে পায়ের শব্দ ও হৈ চৈ শুনতে পেল। হঠাৎ বিদ্যুত চলে যাওয়ায় বুঝা গেল তারা উত্তেজিত ও আতংকিত হয়ে পড়েছে।
আহমদ মুসা ভাবল, তারা অবিলম্বে আলোর ব্যবস্থা করবে। নিজস্ব জেনারেটরও থাকতে পারে। মাঝেখানে যেটুকু সুযোগ পাবে, তাকেই কাজে লাগাতে হবে।
ভাবল আহমদ মুসা, বারান্দা দিয়ে আরেকটু সামনে এগোলেই নিচের বাগানে নামার সিঁড়িমুখের দরজা। কিন্তু আহমদ মুসার মন বলল, ও পথটা নিরাপদ নয়। সাইরেন যখন বেজেছে, তখন বেরুবার ঐ পথটাই তারা আটকেছে প্রথম। বেরোলেই ওদের ফাঁদে পড়তে হবে।
হঠাৎ আহমদ মুসার মনে পড়ল, ভাসকুয়েজ বলেছিল কার্ডিনাল হাউজের দু’তালা, তিনতালায় লাইব্রেরি আছে। কথাটা মনে পড়ায় আহমদ মুসার মন খুশি হয়ে উঠল। সেন্ডোর সাতে একতলার করিডোরে ওঠার পর সে লক্ষ্য করেছে, যে সিঁড়ি দিয়ে আন্ডারগ্রাউন্ডে নামা যায় সে সিঁড়িটিই ঘুরে দু’তলায় উঠে গেছে। হয়তো সিঁড়ির মাথায় দরজা কিংবা কিছু দিয়ে তিনতলায় উঠে গেছে। হয়তো সিঁড়ির মাথায় দরজা কিংবা কিছু দিয়ে তিনতলায় ওঠার পথ বন্ধ করা হয়েছে। তা হোক, ঐ প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা অনেক নিরাপদ হবে।
চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আহমদ মুসা দেয়ালের গা ঘেঁষে দু’তলার সিঁড়ি মুখের দিকে এগোলো। এ সময় করিডোর দিয়ে বেশ কয়েকজন লোকের ছুটে আসার শব্দ পাওয়া গেল। আহমদ মুসা দেয়ালের সাথে সেঁটে নিঃশ্বস বন্ধ করে দাঁড়াল।
ছুটে আসা লোকরে কয়েকজন তা সামনে দিয়ে ছুটে বারান্দার দিকে বেরিয়ে গেল। আহমদ মুসা বুঝল, ওরা নিচে নামার সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেল।
আহমদ মুসা এবার হাতড়িয়ে দু’তলায় ওঠার সিঁড়িমুখ খুঁজে নিল। তারপর দু’হাত ও দু’পা ব্যবহার করে হামাগুড়ি দেয়ার মতো করে দ্রুত সিঁড়ির মাথায় উঠে গেল। হাতড়িয়ে দরজাটা বের করল। টোকা দিয়ে পরীক্ষা করে বুঝল স্টিলের দরজা।
এই সময় সিঁড়ির অন্ধকারটা অনেকখানি ফিকে হয়ে গেল। আহমদ মুসা বুঝল, মাষ্টার সুইচ তারা অন করেছে। আহমদ মুসা উদ্বিগ্ন হলো, এ সিঁড়িতেও তারা উঠতে পারে। কিন্তু পরক্ষনেই আশ্চর্য হলো এই বলে যে, নিচের তিনটি ফ্লোর খোঁজা কমপ্লিট না করে তারা এ সিঁড়িতে আসবে না। এ সময়ের মধ্যে তাকে সরে পড়তে হবে।
আহমদ মুসা দরজা পরীক্ষা করে বুঝল, স্টিলের দরজাটা ওয়েল্ডিং করে স্থায়ীভাবে আটকে দেয়া হয়েছে।
সে আর সময় নষ্ট করল না। লেসার কাটার বের করে দরজার মাঝখানটা কেটে একটা ফোকর সৃষ্টি করল।
আহমদ মুসা সেই ফোকর দিয়ে বেরিয়ে এলো দু’তলার বারান্দায়।
কেউ কোথাও নেই।
আহমদ মুসা চিন্তা করল কার্ডিনাল হাউজের সম্মুখ ভাগ উত্তর দিকটা। সুতরাং নিচে নামার সিঁড়ি উত্তর দিকেই থাকবে। তখন সন্ধ্যা। লাইব্রেরিতে লোকজন থাকতে পারে। বারান্দাতেও কেউ থাকা বিচিত্র নয়। আহমদ মুসা মাথার চুলটা একটু ঠিক করে ধীর পায়ে এগোলো বারান্দা দিয়ে উত্তর দিকে।
ঘুরানো বারান্দা। উত্তর দিকে কিছুটা ঘুরে আবার পশ্চিম দিকে গেছে।
আহমদ মুসা পশ্চিম দিকে ঘুরেই নিচে নামার সিঁড়ি দেখতে পেল।
সিঁড়িমুখে একজন চেয়ারে বসে আছে। আহমদ মুসা বুঝল, সে প্রহরী। লাইব্রেরীতে প্রবেশ তাহলে নিশ্চয় নিয়ন্ত্রিত।
সে ধীর পায়ে সিঁড়ি মুখের দিকে এগোলো।
সিঁড়ির মুখের লোকটি আগেই দেখতে পেয়েছিল আহমদ মুসাকে। তার চোখে কিছুটা বিস্ময়। আহমদ মুসা কাছে আসতেই সে উঠে দাঁড়াল বলল, ‘স্যার, ওদিকে কেন? কোথায় গিয়েছিলেন?’
‘এই দেখলাম আর কি!’ মুখে হাসি টেনে অনেকটা তাচ্ছিল্যের সাথে বলল আহমদ মুসা।
কিছু বলতে যাচ্ছিল প্রহরী। আহমদ মুসা তার আগেই বলল, ‘তোমার কোন ভয় নেই, ওদিকে কোন সোনাদানা থাকে না। আর আমি খালি হাতে দেখতেই তো পাচ্ছ।’
বলে আহমদ মুসা সিঁড়ি দিয়ে নামতে শুরু করল।
প্রহরী কিছু বলতে গিয়েও আবার চুপ করে গেল। সংকোচের একটা ভাব তার চোখে-মুখে প্রকাশ পেল। সম্ভবত আহমদ মুসার মতো একজন সুন্দর ভদ্রলোককে আর কিছু বলতে তার মন সায় দেয়নি।
এই প্রহরী লোকটি ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান থেকে নিয়োগ করা। তার দায়িত্বের মধ্যে একটি হলো লাইব্রেরি ছাড়া বাড়ির অন্য অংশে কেউ না যায় তা নিশ্চিত করা। তার আরেকটি দায়িত্ব হলো, সাদা চামড়ার লোক ছাড়া আর কেউ যেন লাইব্রেরিতে ঢুকতে না পারে, তা দেখা।
আহমদ মুসা দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নেমে এসে বাড়ির সামনের লনটা পেরিয়ে লাল ইটের সেই রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
এই সময় আহমদ মুসা পেছনে বাড়ির দু’তলার বারান্দায় হৈ চৈ ও দৌড়াদৌড়ির শব্দ শুনতে পেল। আহমদ মুসা পেছনে না তাকিয়েই বুঝল, সে যে দু’তলার সিঁড়িপথ দিযে পালিয়েছে তা ওরা টের পেয়েছে।
আহমদ মুসা দেখল সেই লাল ইটের রাস্তায় একটা নতুন কার দাঁড়িয়ে আছে। পার্কের গেট পেরিয়ে একজন বয়স্ক লোক, একজন তরুনী ও একজন মহিলা রাস্তার দিকে এগিয়ে আসছে।
এই সময় দু’তলা থেকে গুলীর শব্দ হলো। পিস্তলের গুলী। না তাকিয়েও আহমদ মুসা বুঝল, তাকে লক্ষ্য করেই গুলী করা হয়েছে। কিন্তু পিস্তলেল গুলী এত দূর আসবে না। পূর্বদিকের ঘেরা প্রাচীরের গেটেও কয়েকজনের জটলা দেখতে পেল সে। গুলীর শব্দ শুনে ওরা এদিকেই আসছে।
আহমদ মুসা অন্য কিছু আর ভাবতে পারল না। পাশে দাঁড়ানো গাড়ির ড্রইভিং সিটে চোখের পলকে সে উঠে বসল। চাবি স্টার্টারের সাথেই ছিল।
এক হাতে আহমদ মুসা দরজা টেনে বন্ধ করল, অন্য হাতে চাবি ঘুরিয়ে গাড়ি ষ্টার্ট দিল।
ঘুমন্ত গাড়িটা জেগে উঠেই লাফ দিয়ে চলতে শুরু করল। কেউ কিছু বুঝার আগেই গাড়ি কার্ডিনাল হাউজের সীমানা পেরিয়ে রাস্তায় গিয়ে পড়ল।
রাস্তায় পড়ে ভাবল আহমদ মুসা, কোথায় যাবে সে। হোটেলে যাওয়া রিস্কি। শহরে নিজের তো কেউ নেই। চিন্তা করে সময় নষ্ট করার তার সময়ও নেই। ওরা নিশ্চয় পিছু নেবে, অন্যদিকে গাড়ির নাম্বার পুলিশকে জানালে তারাও পাহারা বসাবে। পুলিশ এলার্ট হবার আগেই তাকে নিরাপদ কোথাও পৌঁছতে হবে।
দক্ষিণগামী একটা হাইওয়ে খুব কাছেই। দক্ষিণ দিকে শহর বেশি নেই। শহর পেরুই উঁচু-নিচু পাহাড়ী এলাকা। সেখানে বিশাল এলাকা জুড়ে জলপাই বাগান। জংগলে ভরা। শহরের ম্যাপ যেটুকু সে দেখেছে তাতে এতটুকু মনে পড়ছে।
আহমদ মুসা দক্ষিণ হাইওয়ের দিকেই ছুটে চলল। রিয়ার ভিউতে তার পেছনে কোন গাড়ি সে আসতে দেখছে না। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের গাড়ি আছে প্রাচীর ঘেরা বাগানে। সিদ্ধান্ত নিয়ে সেখান থেকে গাড়ি বের করতে অবশ্যই সময় লাগবে।
আহমদ মুসা শহর থেকে বেরিয়ে সেই জলপাই বাগানে এসে পৌঁছল। সে হাইওয়ে থেকে গাড়িটি বাগানে ঢুকিয়ে একটা বড় ঝোপের আড়ালে এনে দাঁড় করাল। গাড়ি থেকে নেমে চারপাশটা একবার দেখে নিল। জায়গাটাকে তার খুবই নিরাপদ মনে হলো। শহর থেকে বেরুবার পর সে গাড়ির আলো নিভিয়ে দিয়েছিল। সুতরাং তার বাগানে প্রবেশ কারও নজরে পড়ার কথা নয়। কেউ তাকে ফলো করেনি। অন্তত তার এটা নজরে পড়েনি।
নতুন গাড়ি। খুব দামি গাড়ি। গাড়ির কাচ রঙীন। বাইরে থেকে ভেতরের কিছুই দেখা যায় না, কিন্তু ভেতর থেকে বাইরের সব কিছুই দেখা যায়।
আহমদ মুসা গাড়ির আলো জ্বালিয়ে ভেতরটা একবার ভালো করে দেখল। একটি ভ্যানিটি ব্যাগ দেখল পেছনের সিটে। তাছাড়া আরও পেল কয়েক কৌটা ফলের রস ও কেকের প্যাকেট। শেষ দু’টো পেয়ে আহমদ মুসা খুব খুশি হলো। গাড়িতে যারা এসেছিল তারা এগোলো এনেছিলন পার্কে বসে খাবার জন্যে। কিন্তু বোধ হয় তাদের প্রয়োজন হয়নি। এখন যেহেতু ক্ষুধার্ত সে, তাই সে এগোলো খেতে পারে। গাড়ি ফেরত দেবার সময় ওদের অনুমতি নিলেই চলবে।
সত্যিই খুব ক্ষুধা পেয়েছিল আহমদ মুসা। অনেক পরিশ্রম ও ধকল গেছে তার।
গোটা কেকটাই খেয়ে নিল আহমদ মুসা। তার সাথে তিন কৌটা ফলের জুস। খেয়ে খুব আরাম লাগল তার। মনে হলো, যথাসময়ে পরিশ্রমের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ হলো।
খাবার পর গাড়ির সিটে গা এলিয়ে একটু বিশ্রাম নিল সে।
শুয়ে শুয়েই ভাবল গাড়িটা কার কি করে মালিককে খুঁজে পাবে সে! হঠাৎ তা সেই ভ্যানিটি ব্যাগটার কথা মনে পড়ল।
ভ্যানিটি ব্যাগটি তুলে নিয়ে খুললো সে। ভেতরে টাকা, ছোট্ট একটা বিউটি বক্স ও ছোট্ট একটা চিরকুট পেল। তাতে লেখা, ‘জেন, তোর দেখা না পেয়ে এই চিঠিটা তোর ব্যাগে রেখে গেলাম। বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার মতো তোর শরীর হয়েছে, কিন্তু যাচ্ছিস না। এটা ঠিক নয়। লেখাপড়ায় তোর মনোযোগী হওয়া দরকার। মনটাও তাতে ভালো হবে। – হান্না।’
আহমদ মুসা ভাবল, গাড়ির মালিক মেয়েটির নাম তাহলে ‘জেন’! নাম পাওয়া গেল, কিন্তু ঠিকানা?
হঠাৎ আনন্দে মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল আহমদ মুসার। গাড়ির ব্লু-বুকেই তো সব পাওয়া যাবে!
চিন্তার সাথে সাথেই আহমদ মুসা ব্লু-বুক বের করে আনল। খুলে নাম-ঠিকানার ওপর চোখ বুলাল। নাম-ঠিকানা পড়ে আহমদ মুসা স্বগত উচ্চারণ করল জেনের পিতার নাম ফ্রান্সিসকো জেমিনেস ডে সেজনারোসা। ঠিকানা কার্ডিনাল হাউজ দেখে ভাবল, এরা কি তাহলে কার্ডিনাল ফ্রান্সিসকো ডেমেনিজ ডে সাজনারোসার পরিবার। তা’হলে এর কি ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানেরও কেউ?
রাত দশটার দিকে আহমদ মুসা গাড়ি নিয়ে বাগান থেকে বেরুল। গাড়ির নাম্বার সে পাল্টে ফেলেছে্। গাড়ির এমারজেন্সী কেবিনে পেস্টি টেপ ও ছোট কাঁচি পেয়েছিল। ছোট একটা সাদা প্যাড পেয়েছিল‘ ব্লু-বুকের সাথে। আহমদ মুসা নিখুঁতভাবে কাগজ কেটে গাড়ির নাম্বারের দ্বিতীয় অংক ও শেষ অংক পরিবর্তন করেছিল। পরিবর্তিত নাম্বারটা ফিডেল ফিলিপের গাড়ির নাম্বার হয়ে গেল। আহমদ মুসার গন্তব্য কার্ডিনাল হাউজ। লক্ষ্য, গাড়িটা ফেরত দেয়া। গাড়িটা ফেরত না দেয়া পর্যন্ত সে নিজেকে মুক্ত করতে পারছে না। গাড়ি চুরি করার জন্যে ওরা কি পরিমাণ গাল-মন্দ করছে কে জানে!
মাদ্রিদ শহরের রোড় ম্যাপের একটা কপি তার পকেটে সব সময়ই আছে। গাড়ি ছাড়ার আগে সে একবার ওটাতে চোখ বুলিয়ে নিয়েছে।
রাস্তা চিনে নিতে কোন অসুবিধা হলো না আহমদ মুসার। ঠিক রাত সাড়ে দশটায় কার্ডিনাল কটেজের গেটে থামাল আহদম মুসা।
কার্ডিনাল কটেজটি প্রায় একটি রাজপ্রাসাদ।
গাড়ি থামতেই গেট রুম থেকে গেটম্যান উঁকি দিল। আহমদ মুসা বলল, ‘মি. ফ্রান্সিসকো আছেন?’
‘না, নেই।’ বলল গেটম্যান।
‘জেন আছে?’
‘আছে।’
‘তাকে হলেও চলবে।’
‘আমি ওর হারানো গাড়ির খোঁজ নিয়ে এসেছি।’
গেটম্যান সঙ্গে সঙ্গে সরে গেল জানালা থেকে।
অল্প কিছুক্ষণ পরেই গেট খুলে গেল। আহমদ মুসা গাড়ি নিয়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
গাড়ি দিযে দাঁড়াল গাড়ি বারান্দায়।
গাড়ি বারান্দা থেকে দু’ধাপ উঠলেই লম্বা করিডোর।
গাড়ি বারান্দায় পৌঁছে আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নামতে নামতে দেখতে পেল একটি তরুণী এসে করিডোরে দাঁড়াল। তার চোখে মুখে বিস্ময়!
আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমেই দু’ধাপ পেরিয়ে করিডোরে উঠে গাড়ির চাবিটি জেনকে দিতে দিতে বলল, ‘বাধ্য হয়ে আপনার গাড়ি বিনা অনুমতিতে নিতে হয়েছিল, এজন্যে আমি দুঃখিত। আপনার ব্যাগ গাড়িতে আছে।’
আহমদ মুসা একটু থেমেছিল ঢোক গেলার জন্যে।
সেই ফাঁকেই মেয়েটি বলল, ‘আপনার নাম আহমদ মুসা?’ মেয়েটির গলা কাঁপছিল।
‘হ্যাঁ, আমি আহমদ মুসা। আপনি কেমন করে জানেন আমার নাম?’
‘আপনার নাম আগে থেকেই জানতাম। মি. ভাসকুয়েজের কাছ থেকে জেনেছিলাম আপনিই আমার গাড়ি নিয়ে গেছেন।’
‘আমাকে মাফ করবেন। আপনাদের কেক ও ফলের জুসও আমি খেয়েছি, আমি খুব ক্ষুধার্ত ছিলাম। এর জন্যেও আমি ক্ষমা চাই।’
‘আপনি এই ভাষায় কথা বলায় আমি বিব্রত বোধ করছি। আপনি আমাকে গাড়ি ফেরত না দিলেও কিছু মনে করতাম না। ভাবতাম, আমার গাড়ি একজন মহান বিপ্লবীর কাজে লাগছে। আপনি ভেতরে আসুন, বসবেন।’
‘ধন্যবাদ। আপনার পরিচয় কি জানি না। কিন্তু আপনাকে আমার কাছে বিস্ময়ের মনে হচ্ছে।’
‘ভেতরে আসুন, বলব সব।’
‘ধন্যবাদ বোন, আমার সময় কম আর সম্ভবত আমার সব বিষয় তুমি জানো।’
বলে আহমদ মুসা ঘুরে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, ‘গাড়ির নাম্বারটি বদলে নিও বোন।’
আহমদ মুসা দ্রুত পা চালাল সামনে।
জেন আরও কিছু বলতে গিয়েও বলতে পারল না। নির্বাক বিস্ময়ে সে তাকিয়ে রইল আহমদ মুসার দিকে। মনে তার প্রবল আলোড়ন, যার সাথে দেখা হলো, কথা হলো, এই সুন্দর সারল্যে ভরা মুখের এই যুবকটিই কি বিশ্ববরেণ্য বিপ্লবী নেতা?
আহমদ মুসা চলে গেছে জেনদের গেট পেরিয়ে। কিন্তু দাঁড়িয়েই আছে জেন। স্মৃতিচারণ করছে জেন বিস্ময়ভরা মুহূর্তগুলোর। আহমদ মুসা তাকে বো বলেছে। একজন এত বড় বিপ্লবী এত নরম ভাষায় কথা বলে! সত্যিই মানুষকে আপন করে নেবার অদ্ভুত ক্ষমতা তারা ঐ ধরনের বিপ্লবীরা কখনও কি এভাবে গাড়ি ফেরত দিতে আসে। গাড়ি ব্যবহারের জন্যে দুঃখ প্রকাশ করে! না বলে জুস ও কেক খাওয়ার জন্যে মাফ চায়! সত্যি আহমদ মুসা সম্পর্কে সে যা শুনেছিল তার চেয়েও অনেক বড় সে।
ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে এগোলো জেন।
দেখল তার ভ্যানিটি ব্যাগ সিটের ওপর পড়ে আছে। জুসের খালি টিন ও কেন বাঁধা কাগজ গাড়ির মেঝেয় পড়ে আছে। গাড়ি খুলে ভ্যানিটি ব্যাগের সাথে জুসের টিন তিনটিও নিয়ে নিল জেন। আহমদ মুসার স্মৃতিগুলো। জোয়ান দেখলে নিশ্চয় খুব খুশি হবে।
ওদিকে আহমদ মুসা এক ভাড়াটে ট্যাক্সি নিয়েছে। ভাবছে কোথায় যাবে। হঠাৎ তার মনে পড়ল হোটেল পিরেনিজ- এর কথা। ভুলেই গিয়েছিল সে এই হোটেলের ব্যাপারটা। মারিয়ার ভাই ফিডেল ফিলিপ এই হোটেলের কথাই বলেছিল। হোটেলের মালিক বাস্ক গোষ্ঠীর একজন এবং বাস্ক গেরিলার একজন সক্রিয় সদস্য। ফিলিপ টেলিফোন করে হোটেল মালিককে আহমদ মুসার কথা বলে রেখেছে। তা’ছাড়া ফিলিপের একটা কোড চিহ্নও তাকে দিয়েছে ফিলিপ। ওটা এখনও তার জুতার সুখতলার নিচে রয়েছে।
রোডের নাম এখনও মনে আছে তার। আহমদ মুসা ড্রাইভারকে হোটেল পিরেনিজ-এর নাম বলল।
‘খুব চালু হোটেল স্যার, সিট বুক করা আছে?’ বলল ড্রাইভার।
‘না, নেই।’
‘তাহলে কি সিট মিলবে?’
‘দেখি চেষ্টা করে। হোটেলটি খুব চালু, তাই না?’
’হ্যাঁ, ব্যবহার ভালো। খুব ভালো সার্ভিস।’
‘মালিক কোন ধর্মের?’
স্পেনে তো প্রায় একটাই ধর্ম। খৃষ্ট ধর্ম।
‘কেন, ইহুদি, মুসলমান নেই?’
‘ইহুদি কিছু আছে, কিন্তু মুসলমান কোত্থেকে আসবে?’
‘কেন, মুসলমান তো আছে!’
‘চোরের মতো থাকাকে থাকা বলে না।’
‘চোরের মতো কেন?’
‘চোরের মতো ওরা নাম ভাঁড়িয়ে চলে।’
‘কেন?’
‘মুসলমান জানলে চাকরি-বাকরি, ব্যবসায়-বাণিজ্য, এমনকি লেখা-পড়ায় পর্যন্ত সুযোগ-সুবিধা পায় না।’
‘এর জন্যে দায়ী কে?’
‘কি বলব স্যার, দায়ী ওদের অতীত।’
‘অতীতে ওরা স্প্যানিশদের ওপর অত্যাচার করেছে?’
‘না, তা নয়, ওদের অতীত র্শৌয, শক্তি, জ্ঞান ও গৌরবই ওদের কাল।’
‘তুমি এত জান কি করে?’
জবাব দিল না ড্রাইভার।
আহমদ মুসা আবার তার প্রশ্নের পুনারাবৃত্তি করল।
‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস পড়েছি।’
‘তুমি বিশ্ববিদ্যালয় পাস করেছ?’
‘হ্যাঁ।’
‘তাহলে ড্রাইভিং এ এসেছ কেন, রেজাল্ট বুঝি ভালো হয়নি?’
‘না স্যার, আমি প্রথম শ্রেনী পেয়েছিলাম।’
‘তারপরও তুমি এ পেশায় কেন?’
‘চাকরি আমার কোথাও মেলেনি।’
‘প্রতিযোগিতায় টিকতে পারোনি?‘
‘প্রতিযোতিায় টিকেছি, ভাগ্য দোষে চাকরি হয়নি।’
‘কেমন?’
উত্তর দিল না ড্রাইভার।
একটু পরেই আবার মুখ খুলল। বলল, ‘আপনি বিদেশি বলা যায়।’
বলে একটু থামল। তারপর বললক, ‘আমার দুর্ভাগ্য হলো আমি মরিসকো। চাকরিতে যখন ঢুকতে গেছি এ কথা প্রকাশ হয়ে গেছে। তাই চাকরি কোথাও জোটেনি।’
‘সব মরিসকোর বেলায় কি এটাই ঘটছে?’
‘হ্যাঁ, প্রকাশ হয়ে পড়লে আর রক্ষা নেই।’
‘কি হয়েছে তাহলে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহন করে?’
‘এ পাপ আমাদের পূর্বপুরুষদের, কিন্তু বাধ্য হয়েই তারা এটা করেছে, এছাড়া বাঁচার তাদের আর কোন উপায় ছিল না।’
‘পূর্বপুরুষদের ঐ পাপ কি মুছে ফেলা যায় না?’
‘এমন চিন্তা আমাদের অনেকের মাথায় এসেছে, কিন্তু স্পেনে থেকে তা সম্ভব নয়।’
‘এ চিন্তা কিছু সংখ্যক মরিসকোর মধ্যে আছে?‘
‘শিক্ষিত সব মরিসকোই এমন চিন্তা করে।’
একটু থেমেই ড্রাইভার প্রশ্ন করল, ‘স্যারের কি ধর্ম?’
‘তুমি কি মনে কর?’
‘মুসলমান।’
‘কেমন করে বুঝলে?’
‘মুসলমানদের প্রতি, বিশেষ করে মরিসকোদের প্রতি এমন সহানুভূতি কোন অমুসলমান দেখাতে পারে বলে আমি জানি না।’
‘ঠিকই বলেছ ভাই, আমি মুসলমান।’
ড্রাইভার তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না। অনেকক্ষণ পর বলল, ‘আমার কি যে আনন্দ লাগছে, একজন মুসলমানের সাথে এই প্রথম আমি কথা বললাম।’
‘মুসলমানদের ভালোবাস, ইসলামকে ভালবাসে তুমি?’
‘ভালোবাসি কিনা জানি না, কিন্তু গৌরব বোধ করি এজন্যে যে, আমার পূর্বপুরুষরা মুসলমান ছিল। যতবার কর্ডোভায় গেছি, গ্রানাডায় গেছি, না কেঁদে থাকতে পারিনি।’
‘তুমি যাকে গৌরব বলছ, সেটাই তো ভালোবাসা। যাকে মানুষ ভালোবাসে না তার জন্যে গৌরবও বোধ করে না।’
‘স্যার, আমার খুব সাধ হয় মক্কা দেখতে, মদিনা দেখতে। কিন্তু আমি মরিসকো হই, যাই হই, পরিচয় যে আমার খৃষ্টান! আমি কা’বার একটা ফটো যোগাড় করেছি ইতিহাস বই থেকে। সুযোগ পেলেই ওটা দেখি। ওদিকে তাকালে আর চোখ সরাতে পারি না।’ শেষের দিকে গলাটা ভারি হয়ে উঠল ড্রাইভারের। সে চোখ মুছল।
আহমদ মুসার বুকটাও যন্ত্রণায় ককিয়ে উঠল। মরিসকো পরিচয়ে এ যুবকটির বুকে তার স্বজাতি ও স্বধর্মের প্রতি যে অসহায় ভালোবাসা বিরাজ করছে এবং যে মানসিক দ্বন্দ্বে সে ক্ষত-বিক্ষত হচ্ছে প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত তা আহমদ মুসাকে অভিূত করে তুলল। তার মনে হলো, গোটা স্পেনে হাজার হাজার মরিসকো যুবক, বৃদ্ধ ও নারনারীর হৃদয় এভাবে কাঁদছে। কেঁদে কেঁদেই তারা শেষ হয়ে যাচ্ছে, শেষ হয়ে যাবে। দুনিয়ার কেউ দেখতে পাচ্ছে না তাদের হৃদয়ের এই কান্না। দেখতে তো একজন পাচ্ছেন যিনি সর্বশক্তিমান। কবে তাঁর দয়া এদের ওপর বর্ষিত হবে, কবে আসবে এদের মুক্তির সোনালি দিন, কান্নার শেষ!
আহমদ মুসার চোখ দিয়েও অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। চোখ মুছে সে বলল, ‘ভাই, আশা ছেড়ো না, আল্লাহ তাঁর বান্দার কোন একান্ত ইচ্ছা সাধারনত অপূর্ণ রাখেন না।’
গাড়ি এই সময় এসে হোটেল পিরেনিজ এর গাড়ি বারান্দায় প্রবেশ করল।
‘ড্রাইভার গাড়ি দাঁড় করিয় পেছন ফিরে বলল, ‘আপনাকে ধন্যবাদ স্যার, আপনার কথা সত্য হোক!’
আহমদ মুসা মিষ্ট হেসে বলর, ‘আমাকে স্যার নয়, ভাই বলবে। এক মুসলমান আরেক মুসলমানের ভাই।’
‘কিন্তু আমি কি মুসলমান?’
‘তোমার মন মুসলমান।’
কী এক ঔজ্জ্বল্যে ড্রাইভারের মুখ ভরে গেল! কিন্তু রাজ্যের কান্না এসে ঝাঁপিয়ে পড়ল যেন তার গলায়! সে কথা বলল না। দু’হাতে মুখ ঢেকে মনে হলো নিজেকে সে সংযত করছে।
আহমদ মুসা বাইরে বেরিয়ে এসেছে। সে ঘুরে এসে ড্রাইভারের দরজার কাছে দাঁড়াল। ড্রাইভার বেরিয়ে এলো চোখ মুছতে মুছতে।
আহমদ মুসা পকেট থেকে মানি ব্যাগ বের করল।
তা দেখে ড্রাইভার দুই হাত জোড় করে বলল, ‘আপনি ভাই ডেকেছেন। অনুরোধ করব, টাকা দিয়ে ভাইয়ের গৌরব ম্লান হতে দেবেন না।’
আহমদ মুসা মানি ব্যাগ পকেটে রাখতে রাখতে বলল, ‘টাকা দিচ্ছি না একটা শর্তেই যে, কাল তুমি এই হোটেলে আসবে। আর বলো তোমার না কি?’
ড্রাইভার খুশি হয়ে বলল, ‘অবশ্যই আসব, কি বলে খোঁজ করব? আমার নাম রবার্তো।
আহমদ মুসা একটু ভাবল। তারপর বলল, ‘কাল টিক ন’টায় এসো, আমি রিসিপশনে দাঁড়িয়ে থাকব।’
ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে গেল হোটেল থেকে।
আহমদ মুসাও পা বাড়াল হোটেলের রিসেপশন লাউঞ্জের দিকে।
সূর্য তখনও ওঠেনি। একটা দামি শেভ্রলেট গাড়ি এসে থামল হোটেল পিরেনিজ এর গাড়ি বারান্দায়।
গাড়ি থেকে নামল ফিডেল ফিলিপ ও মারিয়া।
ফিলিপকে চেনার উপায় নেই। মুখে বিরাট গোঁফ এবং মাথায় বড় বড় চুল। ছদ্মবেশ নিয়েছে ফিলিপ। ছদ্মবেশ না নিয়ে সে রাস্তায় বেরোয় না। যদিও সরকারে সাথে বাস্ক গেরিলাদের একটা সমঝোতা হয়েছে, তবু সরকার সুযোগ পেলে তাকে সরিয়ে দিতে ছাড়বে না, এটা সবাই জানে।
স্বয়ং হোটেল মালিক মি. আলেকজান্ডার সেসনারোসা গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়েছিলেন। ফিলিপরা গাড়ি থেকে নামরে তাদের তিনি স্বাগত জানালেন এবং ভেতরে নিয়ে চললেন।
‘কোথায় উনি?’ হাঁটতে হাঁটতেই জিজ্ঞাসা করল ফিলিপ আলেকজান্ডারকে।
‘উনি এসেছেন রাত এগারটায়। সরকারের রিজার্ভড পাঁচটি স্যুট ছাড়া আর কোন স্যুট, কেবিন কিছুই খালি ছিল না। আমাদের ফ্যামিলি স্যুটটাই তাঁকে দিয়েছি।’
ফিলিপ থমকে দাঁড়িয়ে আলেকজান্ডারের দিকে তাকিয়ে বলল, ‘আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ। তাঁকে তার উপযুক্ত মর্যাদা দিয়েছেন।’
আবার হাঁটতে লাগল তারা।
‘তাঁর পরিচয়টা কিন্তু দেননি।’ বলল আলেকজান্ডার।
‘বলব, চলুন। এইটুকু জেনে রাখুন তিনি বিশ্বের একজন মহান বিপ্লবী। তার সংগ্রাম ও সাফল্যের কাছে আমরা শিশু।’
ফিলিপরা সবাই তৃতীয় তলায় আলেকজান্ডারের স্যুটে এসে বসল।
আহমদ মুসা রয়েছে ৩১ তম তলায়।
‘মারিয়া, ওকে টেলিফোন কর। বলো আমরা আসছি।’ বলল ফিলিপ।
মারিয়া উঠে টেলিফোন ডেস্কে গেল।
‘ক’দিন খুব উদ্বেগে কেটেছে আলেকজান্ডারের। ওর কিছু হলে সারা জীবন দুঃসহ এক বেদনায় জর্জরিত হতে হতো।’
মারিয়া ফিরে এলো ডেক্স থেকে। বলল, ‘নো রিপ্লাই হচ্ছে।’
বিস্মযে চোখ কপালে তুলল ফিলিপ! ‘উনি তো এ সময় ঘুমান না!’ বলল ফিলিপ।
‘অসম্ভব ভাইজান, উনি এ সময় ঘুমাতে পারেন না।’
ফিলিপ উঠে গিয়ে আবার টেলিফোন করল। নো রিপ্লাই আগের মতোই।
ফিলিপ উঠে দাঁড়াল। বলল, ‘চল, ব্যাপারটা আমার কাছে ভালো লাগছে না।’
লিফটে গিয়ে উঠল তারা তিনজন। আলেকজান্ডার বলল, ‘ঘুমিয়েও থাকতে পারেন। কাল যখন তাঁকে দেখেছি, খুব টায়ার্ড মনে হয়েছে। গোটা গা ছিল ধূলিধূসরিত।’
‘কিছু বলেছিলেন আপনাকে?’
‘আমি যখন স্যুট, কেবিন খুঁজতে ব্যস্ত, তিনি বললেন, আপনি ব্যস্ত হবেন না, আমার একটু বিশ্রাম প্রয়োজন, সেটা করিডোর হলেও আমার আপত্তি নেই। তার এ কথার পর আমি আর দেরি করিনি, আমার ফ্যামিলি স্যুটটাই দিয়ে দিয়েছি।’
চোখ দু’টি ভারি হয়ে উঠল মারিয়ার। মুখ নিচু করল সে। ভাবল, আহমদ মুসার মতো শক্ত মানুষ কেমন অবস্থয় পড়লে করিডোরে হলেও বিশ্রাম নেবার প্রস্তাব করতে পারেন।
আহমদ মুসার স্যুটের দরজায় এসে দাঁড়াল তারা তিনজন।
দরজায় নক করল ফিলিপ। একবার নয় তিনবার। কোন সাড়া সেই ভেতর থেকে।
ফিলিপ শুকনো মুখে তাকাল আলেকজান্ডারের দিকে।
‘ঘুমিয়ে থাকতে পারেন, আমার কাছে মাষ্টার কি আছে, খুলব দরজা?’
মাথা নেড়ে সম্মতি দিল ফিলিপ।
আলেকজান্ডার দরজা খুলল। প্রথমে ঘরে ঢুকল ফিলিপ, তার পেছনে আলেকজান্ডার। সবার পরে মারিয়া। মারিয়ার বুক দুরুদুরু করছে।
বিছানায় শোয়া আহমদ মুসার দিকে চোখ পড়তেই অনেকখানি আশ্বস্ত হলো মারিয়া।
চিৎ হয়ে চোখ বুজে শুয়ে আছে আহমদ মুসা। মনে হয় গভীর ঘুমে, কিন্তু তার মুখটা লাল।
ফিলিপ এগিয়ে গিয়ে গায়ে হাত দিয়েই চমকে উঠল। বলল, ‘উঃ গা পুঢ়ে যাচ্ছে!’
গায়ে হাত রাখল আলেকজান্ডারও। বলল, ‘ভয়ানক জ্বর ফিলিপ। ডাক্তার ডাকতে হবে।’
বলে আলেকডান্ডার দ্রুত সরে এলো টেলিফোনের কাছে।
ফিলিপ হাত বুলাতে লাগল আহমদ মুসার আগুনের মতো কপালটায়।
‘ওঁর তো জ্ঞান আছে ভাইয়া?’ বলল মারিয়া।
এই সময় আহমদ মুসা চোখ খুলল। চোখ খুলেই দেখল ফিলিপকে, তারপর দাঁড়ানো মারিয়াকে। ঠোঁটে তার হাসি ফুটে উঠল। উঠে বসতে চেষ্টা করল আহমদ মুসা। মাথাটা তুলেই ‘আঃ’ বলে চিৎকার করে উঠল সে, মাথাটা আবার তার বালিশে পড়ে গেল। যন্ত্রণায় তার মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল।
আবার চোখ বুজে গেল আহমদ মুসার।
‘কি হয়েছে মুসা ভাই আপনার, কোথাও আঘাত?’ মাথায় হাত বুলিয়ে বলল ফিলিপ।
ডাক্তার এসে ঘরে প্রবেশ করল। ফিলিপ একটু সরে বসল।
ডাক্তার জ্বর পরীক্ষা করে গা থেকে কম্বল সরিয়ে গোটা শরীর পরীক্ষা করতে লাগল। ‘গোটা গা নয়, ডাক্তার। আঘাতের কারণে যদি জ্বরটা হয়ে থাকে তাহলে সেটা মাথায় ও বাম কাঁধে।’ নরম কন্ঠে বলল আহমদ মুসা।
মাথা ও ঘাড় পরীক্ষা করল ডাক্তার।
‘মাথা ও ঘাড়ে কি যন্ত্রনা আছে?’ বলল ডাক্তার।
‘যন্ত্রণা নেই, তীব্র ব্যধা।’
‘ঈশ্বর রক্ষা করেছেন, ফ্যাকচার হয়নি। জায়গা দু’টো ভয়ানক থেঁতলে গেছে।’
ডাক্তার একটু থামল। একটু থেমেই আবার শুরু করল, ‘আঘাতটা কোন ভোঁতা অস্ত্রে হয়েছে, কিসের আঘাত?’
‘মাথার আঘাতটা স্টিল শিটের, ছাদ থেকে বড় একটা স্টিল শিট মাথায় পড়েছিল। কাঁধে পেয়েছিলাম লোহার রডের আঘাত। গত সন্ধ্যায়।’
‘রাতে ওষুধ খেলে কিন্তু অনেক সুস্থ থাকতেন।’
‘রাত ১১টা পর্যন্ত ঘুরে বেড়িয়েছি, কিছুই বঝিনি। শুতে গিয়ে বুঝলাম বড় ধরনের আঘাত খেয়েছি।’
‘ঠিক আছে, সব ঠিক হয়ে যাবে।’ বলে উঠে দাঁড়াল ডাক্তার। যেতে যেতে বলল, ‘আমি ওষুধ পাঠিয়ে দিচ্ছি। জ্বর, ব্যথা কমে যাবে।’
‘প্লিজ ডাক্তার, আগামী কাল আমি বাইরে বেরুতে চাই। আপনি দয়া করে ব্যবস্থা করুন।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আমরা ওষুধ দিই, রোগ ভালো করেন ঈশ্বর। তাকে বলুন।’ বলে হেসে বেরিয়া গেল ডাক্তার।
ডাক্তার চলে যেতেই আহমদ মুসার কাছে সরে এলো ফিলিপ ও মারিয়া।
‘আপনার অন্তত ৭দিন বিশ্রাম নিতে হবে। কোথাও বেরুবার পরিকল্পনা বাদ দিন।’ গম্ভীর কন্ঠে বলল মারিয়া।
‘আমি সময় দিতে রাজী, কিন্তু ষড়যন্তকারীরা কি সময় দেবে মারিয়া?’
মারিয়ার মুখ ভর করে কিছু বলতে যাচ্ছিল, ফিলিপ বাধা দিয়ে বলে উঠল, ‘এসব কথা থাক। আগামীকাল আসুক দেখা যাবে। আমার জানতে কৌতূহল হচ্ছে মুসা ভাই, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের মৃত্যুপুরী থেকে কি করে বেরুলেন? ওখানে যে গেছে, কেউ আর ফিরে আসতে পারেনি। গত ৫শ’ বছরের ইতিহাস এটা ঐ মৃত্যুপুরীর।’
‘সেখানে ছিলাম আমি কি করে জানলে?’
‘আমরা ঐদিনই ড্রাইভারের কাছ থেকে খবর পেয়েছিলাম, আপনি ওদের হাতে ধরা পড়েছেন। পরদিনই আমি ও মারিয়া চলে আসি মাদ্রিদে। সেদিন থেকেই আমরা জানতে পারি কার্ডিনাল হাউজের ভূগর্ভের জিন্দানখানায় আপনাকে রেখেছে। এ খবর আমাদের হতাশ করে। সবাই আমরা জানি, অত্যন্ত কঠিন জায়গা ওটা। সর্বশেষ স্থান ওটা। অবশেষে গতকালই আমরা ভাসকুয়েজকে পণবন্দী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।’
‘ঠিক বলেছ ফিলিপ, কঠিন জায়গা ওটা। আমার গোটা জীবনে এমন সুচিন্তিত বেষ্টনীর মধ্যে পড়িনি।’
‘ঐ মৃত্যুপুরীর ভয়ংকর অনেক কথা আমরা শুনেছি, ওর প্রকৃতি আমরা জানি না। বলুন কি দেখেছেন, কিভাবে বেরুলেন!’
আহমদ মুসা ধীরে ধীরে গোটা কাহিনী ওদের শোনাল। তারপর বলল, ‘তোমরা ভাসকুয়েজকে পণবন্দী করেও আমাকে পেতে না। আমাকে এতক্ষণ আকাশে উড়তে হতো আমেরিকার পথে। স্প্যানিশ ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান আমাকে এক বিলিয়ন ডলারে বিক্রি করেছিল আমেরিকান ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হাতে।’
মুখ হাঁ হয়ে গিয়েছিল ফিলিপের।
কেঁপে উঠেছিল মারিয়া।
‘আমেরিকার ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এক বিলিয়ন ডলারে আপনাকে কিনবে কেন?’ বলল ফিলিপ।
‘তারা মনে করে আমার কাছ থেকে ইসলামী বিশ্বের অনেক মুল্যবান তথ্য পাবে। তাছাড়া আমাকে পণবন্দী সাজিযে ইসলামী সরকারগুলোর কাছ থেকে বহু বিলিয়ন ডলার কামাই করতে পারবে। সবশেষে আমাকে হত্যা করে তারা অনেক পরাজয়ের প্রতিশোধ নিত।’
ফিলিপ ও মারিয়া উভয়েরই মুখ বিস্ময় ও বেদনায় বিবর্ণ!
‘আপনার এত বিপদ, আপনার এত শত্রু!’ কাঁপছিল মারিয়ার গলা।
‘এরা আমার শত্রু নয় মারিয়া, এরা মুসলমানদের শত্রু। মুসলমাসদের জন্যে আমি কিছু করি বলে তারা আমার অস্তিত্ব বরদাশত করতে পারে না।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
‘আপনার একা বেরুনো আর ঠিক নয়। সেদিন আপনাকে একা ছেড়ে দেয়া আমাদের ঠিক হয়নি।’
‘সেদিন আমার সাথে আর একজন থাকলে কি হতো, দু’জনেই ওদের হাতে পড়তাম। আসলে মারিয়া, আমি তো কখনই একা থাকি না। আল্লাহ তো সাথে থাকেন! তাঁর সাহয্য না হলে গতকাল ঐ মৃত্যুপুরী থেকে বের হতে পারতাম না।’
ওষুধ এলো এ সময়। মারিয়া বেয়ারার হাত থেকে ওষুধ নিয়ে প্রেসক্রিপশনের ওপর নজর বুলাল। তারপর ওষুদের মধ্যে থেকে একটা ট্যাবলেট ও একটা ক্যাপসুল বেছে নিয়ে অন্য ওষুধগুলো টেবিলে রেখে দিল। এক গ্লাস পানি নিয়ে এগোলো আহমদ মুসার দিকে। ফিলিপকে বলল, ‘ভাইয়া, ওনার মাথা একটু তুলে ধর।’
ওষুধ খাইয়ে দিল মারিয়া।
‘মারিয়া, তুমি একটু লাউঞ্জে গিয়ে দেখ রবার্তো এসেছিল কিনা। তাকে ওপরে পাঠিয়ে দাও। সে দরজায় পাহারায় থাকবে। তারপর তুমি বাসা থেকে ঘুরে এসো একটু, কিছু খবর আসার কথা আছে। হেডকোয়ার্টার থেকে।’ বলল ফিলিপ।
‘মারিয়া, রিসেপশনকে বলো, রবার্তো নামের এই রকম চেহারার একজন লোক ঠিক ৯টায় সেখানে আসবে। তাকে এখানে পাঠিয়ে দিতে বলবে।’ বলল আহমদ মুসা।
মারিয়া দরজার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলল, ‘ভাইয়া, ওকে বাসায় নেয়া সবদিক থেকে নিরাপদ।’
‘আমারও এই মত।’ বলল ফিলিপ।
‘ধন্যবাদ ভাইয়া।’ বলে দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করল মারিয়া।
৬
জোয়ানের গেটের সামনে এসে হর্ন দিল জেন। কিন্তু গেট রুম থেকে দারোয়ান বেরুল না কিংবা গেট খুলতে কেউই এলো না।
অবশেষে নিজেই গেট খোলার জন্যে গাড়ি থেকে নামল জেন।
কিন্তু গেটের দিকে কয়েক পা এগিয়ে গেটের ওপর চোখ পড়তেই চমকে উঠল জেন্। গেটে এক বিশাল তালা ঝুলছে।
ভীষণ বিস্মিত হলো জেন! জোয়ানের গেটে তো কোনদিন তালা থাকে না! তবে গেটের দারোয়ান কি চলে গেছে? চলে গেছে বলেই কি এই তালা?
গাড়িতে ফিরে এসে জোরে জোরে হর্ন বাজাল।
অবশেষে মোটা মতো একজন লোক বেরিয়ে এলো বাড়ি থেকে। জেন তাকে চেনে না, কোনদিন দেখেনি এ বাড়িতে। বিরক্তি ভরা তার মুখ।
এসে গেটের ওপারে দাঁড়িয়েই জিজ্ঞেস করল, ‘কাকে চাই?’
‘গেট খুলুন।’ বলল জেন ক্ষোভের সাথে।
‘কাকে চাই?’ আবার প্রশ্ন লোকটির।
‘জোয়ান বাসায় নেই?’ বিরক্তি ভরা কন্ঠে বলল জেন।
‘জোয়ানরা এ বাসায় থাকে না।’
‘কি বলছেন আপনি, এটা জোয়ানদের বাড়ি! জেনের কন্ঠে উদ্বেগ।
‘ঠিক এটা জোয়ানদের বাড়ি, কিন্তু এখন নেই।’
কেঁপে উঠল জেন। তার মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! তার মুখ থেকে কোন শব্দ বেরুতে পারল না। শুধু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকল লোকটির দিকে। লোকটি বুঝল ব্যাপারটা।
সে তার আগের কর্কশ কন্ঠটা নরম করে এনে বলল, ‘আপনি এখনও জানেন না দেখছি! জোয়ানরা মরিসকো তো, তারা কোন জমি কিনতে পারে না। কিন্তু পরিচয় ভাঁড়িয়ে কিনেছিল। পরিচয় প্রকাশ হবার পর তাদের বাড়ি ও সম্পত্তি কেড়ে নেয়া হয়েছে।’
জেনের মাথা ঘুরছিল। টলছিল তার দেহ। কোন রকমে স্থলিত পায়ে গাড়ির কাছে এসে গাড়িতে গিয়ে বসল সে।
জেনের কাছে দুনিয়াটা ছোট হয়ে যাচ্ছে। অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে পরিচিত সব কিছু।
চোখ বুজল জেন। গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিল সে। দেহের সব শক্তি তার যেন নিঃশেষ হয়ে গেছে!
গেট খোলার শব্দে চোখ খুলল জেন। দেখল জোয়ানদের কাজে মেয়েটা বেরিয়ে আসছে। কিন্তু খুশি হলো না সে। জানে সে, জোয়ানরা মরিসকো বলে এ মেয়েটা কাজ করতে আসা বন্ধ করেছিল! জোয়ানরা চলে যাবার পর তাহলে এসেছে।
মেয়েটা এসে গাড়ির জানালায় দাঁড়াল। বলল, ‘জোয়ানদের খুঁজছেন?’
‘ওরা কোথায়?‘ কষ্টে উচ্চারণ করল জেন।
‘জোয়ানের মামার বাসা তো আপনি চেনেন। সে বাসার পুব পাশের ফ্ল্যাট বাড়ির নিচের ফ্ল্যাটটাতে গিয়ে ওরা উঠেছেন।’
জেন কিছু বলল না।
সেই আবার বলল, ‘ওরা মরিসকো বলে সমাজের লোকদের ভয়ে শেষে ওদের কাজ করতে পারিনি, কিন্তু ওদের মতো লোক হয় না। আহা সেকি কান্না জোয়ানের মা’র! যাওয়ার সময় আমি ছিলাম ওদের সাথে।
চোখ মুছতে লাগল মেয়েটি।
কোন কথা বলতে পারল না জেন। বুক থেকে উঠে আসা একটা ঝড়কে দাঁতে দাঁত চেপে রোধ করার চেষ্টা করে জেন গাড়ি ঘুরিয়ে নিল।
জোয়ানের সাথে তার মামার বাড়ি অনেকবার এসেছে জেন। জেন গাড়ি চালিয়ে জোয়ানের মামার বাসার সামনে পৌঁছল। গাড়ি নিয়ে দাঁড় করাল তার পুব পাশের ফ্ল্যাট বাড়িটির সামনে।
জেন গাড়ি থেকেই দেখল, নিচের দুই দুইটি ফ্ল্যাট। পশ্চিম দিকের ফ্ল্যাটে ‘টু-লেট’ নোটিশ তাহলে পূর্ব দিকেরটাই হবে।
গাড়ি থেকে নামল জেন। এগোলো ফ্ল্যাটের দিকে।
দরজা বন্ধ। দরজায় নক করল জেন।
দরজা খুলে গেল।
দরজা খুলে দাঁড়িয়ে আছে জোয়ানের মা। জেনকে দেখে সে বিস্মিত হয়েছিল। বিম্ময়ের ঘোর কাটতেই তার চোখ দু’টি ছল ছল করে উঠল। মুখ তার শুকনো।
বুক থেকে উঠে আসা যে ঝড়কে জেন এতক্ষণ দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রেখেছিল, তা এবার বাঁধ ভাঙ্গল।
জেন ‘মা’ বলে চিৎকার করে পাগলের মতো জোয়ানের মাকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে উঠল।
জেনকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল জোয়ানের মা’ও।
কান্নার শব্দ শুনে জোয়ান পাশের ঘর থেকে ছুটে এলো।
জেন জোয়ানের মা’র বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদছিল। কান্না থামছিল না জেনের।
জেন জোয়ানের মা’র বুক থেকে মুখ তুলল জোয়ানকে দেখল। তারপর জোয়ানের পায়ের কাছে বসে পড়ল। কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল, ‘এমন কেন হলো? কেন?’
জোয়ান জেনের হাত ধরে টেনে ওঠাতে ওঠাতে বলল, ‘চল, বলি।’
শূন্য ঘর জোয়ানদের। কাপড়-চোপড়, সুটকেশ ইত্যাদির মতো কিছু জিনিস ছাড়া বাড়ির কিছুই তাদের নিতে দেয়া হয়নি। সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় কর্মকর্তারা তাদের বলেছে, মরিসকো পরিচয় গোপন করে জমি কেনা, বাড়ি তৈরি ও মানুষকে প্রতারণা করার জন্যে তাদের যে শাস্তি দেয়া হচ্ছে না, তাই-ই তো বড়, সম্পদ-জিনিসপত্রের আর লোভ করা তাদের ঠিক নয়।
ড্রইং রুমে সাধারন কয়েকটা চেয়ার।
সেখানেই গিয়ে বসল জেন ও জোয়ান।
জোয়ানের মা চোখ মুছে বলল, ‘তোরা বস জোয়ান। আমি রান্না চড়িয়েছি। জেন, মা আজ কিন্তু খেয়ে যাবে।’
‘আজ আমি চেয়েই খেয়ে যেতাম আম্মা।’ বলল জেন। তার গলা তখনও স্বাভাবিক হয়নি।
জোয়ানের মা এগিয়ে এসে ঝুঁকে পড়ে জেনের কপালে চুমু খেয়ে বলল, ‘তোমার মতো ভালো ‘মা’ আর নেই।’
রান্না ঘরের দিকে চলে গেল জোয়ানের মা।
জেনের মুখ নিচু।
জোয়ানেরও দৃষ্টি নিচের দিকে।
দু’জনেই নিরব। অস্বাভাবিক এক নিরবতা।
অবশেষে মুখ খুলল জেন। মুখ ভারি করে অভিমান ভরা কন্ঠে বলল, ‘এত কিছু হলো, আমাকে কিছুই জানাওনি।’
‘তুমি অসুস্থ ছিলে, আর তোমার ওখানে যেতে সাহসও পাইনি।’ শান্ত কন্ঠে বলল জোয়ান।
‘সেদিন আব্বার কথায় মন খারাপ করেছ না?’ কাঁপছে জেনের কন্ঠ।
‘না, জেন।’
‘সেদিন আব্বার কথার জবাব তুমি দিতে পারতে, কিন্তু দাওনি। আমার কথা তুমি শুনেছ। কষ্ট হয়েছে তাতে তোমার। তুমি আমাকে মাফ কর।’
‘তুমি এসব ভেবে অযথা কষ্ট পাচ্ছ জেন, ঐসব কথায় আমি আর কষ্ট পাই না। তোমাকে বলেছি, মরিসকো পরিচয় এখন আমার কাছে পরম গৌরবের।’
‘তোমাকে একটা বড় খবর দেব জোয়ান।’
‘কি খবর?’
‘তুমি খুব খুশি হবে সে খবরে।’
‘আমি খুব খুশি হবো এমন কি খবর? বিশ্ববিদ্যালয়ের?’
‘না, তোমার চিন্তা ওদিকে যাবেই না, এমন খবর। সাংঘাতিক খবর!’ হাসতে হাসতে বলল জেন।
‘দেখ, এ ধরনের খবর নিয়ে এত দেরি করা চলে না।’
‘আহমদ মুসাকে চেন?’
‘কোন আহমদ মুসা?’
‘সেই বিপ্লবী নেতা আহমদ মুসা!’
’চিনব না কেন তাকে? কত পড়েছি তার কথা! তিনি আমাদের মতো মজলুম মুসলিমদের আশা-ভরসার স্থল।’
‘তাঁকে আমি দেখেছি।’
‘দেখেছ!‘ বিস্ময়ে হাঁ হয়ে গেল জোয়ানের মুখ।
‘আমি তার সাথে কথা বলেছি।’ জেনের মুখে জগৎ জয়ের হাসি!
‘তুমি তার সাথে কথা বলেছ। তুমি জেগে কথা বলছ তো?’ জোয়ানের কন্ঠে বিদ্রুপের সুর।
‘হ্যাঁ গো, হ্যাঁ, জেগে কথা বলছি। গতরাত সাড়ে দশটায় আমার বাড়ির বারান্দায় দাঁড়িয়ে আমি কথা বলেছি।’
‘জেন, আমাকে অন্ধকারে রেখ না, ব্যাপার কি বলো? আমি কিছু বুঝতে পারছি না।’ জোয়ানের কন্ঠে এবার অনুনয়ের সুর।
জেন গম্ভীর হলো। ধীরে ধীরে সে আহমদ মুসা কিভাবে কার্ডিনাল হাউজ থেকে তার গাড়ি নিয়ে যায়, কিভাবে রাত সাড়ে দশটায় তা আবার ফেরত দিয়ে যায়, আহমদ মুসার কি কি কথা, জেন তাকে কি কথা বলেছিল। সব বলল। কথা শেষ করল জেন।
পলকহীন জোয়ান তাকিয়ে আছে জেনের দিকে। বিস্ময় উত্তেজনায় তার বাকরোধ হয়ে গেছে!
কিছুক্ষণ পর জেনই জোয়ানের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘বিশ্বাস হচ্ছে না বুঝি?’
‘অবিশ্বাস নয় জেন, আমি ভাবছি, আহমদ মুসা স্পেনে এসেছেন, কেন? ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান জানল কি করে, আটকই বা করল কেন?’
‘ওসব বড় বড় কথা আমি জানি না জোয়ান। তবে গতরাতে আব্বার কাছে থেকে গল্পে শুনেছি, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান বাস্ক গেরিলাদের একটা মেয়েকে বিমান বন্দর থেকে কিডন্যাপ করে। আহমদ মুসা সেখানে হাজির ছিলেন এবং মেয়েটিকে উদ্ধার করে পালিয়ে যেতে সমর্থ হন আহমদ মুসা। পরে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান আহমদ মুসাকে বন্দী করতে সমর্থ হয়? তাকে সবচেয়ে নিরাপদ কার্ডিনাল হাউজের মাটির তলায় বন্দীখানায় এনে বন্দী করে রাখে।’
একটু থামল জেন। একটা ঢোক গিলে আবার শুরু করল, ‘আহমদ মুসা পালাবার কিছুক্ষণ আগেও ভাসকুয়েজ আমাদের বলেছেন, আজ ভোরেই তারা এক বিলিয়ন ডলার পাচ্ছেন আহমদ মুসাকে আমেরিকান ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হাতে তুলে দেবার বিনিময়ে। ভাল ঘোল খেয়েছে ভাসকুয়েজ।’ বলে হাসতে লাগল জেন।
জোয়ানের মুখে কিন্তু হাসি নেই। বলল, ‘ভাসকুয়েজের আশা ঠিকই জেন। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের একজনের কাছ থেকে গল্প শুনেছিলাম, কার্ডিনাল হাউজরে বন্দীখানা থেকে কোন মানুষের পালানো সম্ভব নয়। ইতিপূর্বে যারাই পালাতে চেষ্টা করেছে তারাই মারা পড়েছে যন্ত্রদানবের হাতে, বন্দীখানার দরজা থেকে বেরুবার সঙ্গে সঙ্গেই।’
‘ঠিক বলেছ জোয়ান। তাই হবে। আহমদ মুসার পালাবার পর ভাসকুয়েজ আব্বার সাথে কথা বলছিলেন। আহমদ মুসার পালাবার কাহিনী বর্ণনা করে তিনি মন্তব্য করেছিলেন, ‘কোন মানুষ এভাবে পালাতে পারে তা অকল্পনীয় ছিল।’
‘সে কাহিনীটা কি জেন?’ উন্মুখ কন্ঠে জিজ্ঞেস করল জোয়ান।
জেন ভাসকুয়েজের কাছে শোনা কাহিনীটা বলল জোয়ানকে।
জোয়ান কাহিনীটা শুনে নিজেকে হারিয়ে ফেলার মতো শূন্য দৃষ্টিতে চেয়ে বলল, ‘ভাসকুয়েজ ঠিকই বলেছে এমন পালানো ব্যাপারটা সত্যিই অকল্পনীয়!’
একটু থেকেই জোয়ান আবার বলল, ‘আজকের দুনিয়ায় তার সাহস, শক্তি ও বুদ্ধির সত্যিই তুলনা নেই জেন।’
‘কিন্তু জোয়ান, তোমরা যাই বলো, ওর হৃদয়টাই সবচেয়ে বড়, নীতিবোধের দিক থেকেও তিনি মহত্তম। একজন বিপ্লবী, বন্দুক যার হাতের খেলনা, রক্ত নেয়া ও রক্ত দেয়াই যাঁর নিত্যদিনের কাজ এবং যিনি আবার এমন বিপদগ্রস্তও, তিনি কিভাবে বিপদের ভয় উপেক্ষা করে শুধু নীতিবোধের কারণে গাড়ি ফেরত দিতে আসতে পারেন এবং না বলে কিছু কেক ও জুস খাওয়ার জন্যে মাফ চাইতে পারেন! এমন বিপ্লবী যিনি, তার কাছে জীবনের চেয়ে নীতিবোধই বড়। আহমদ মুসা, আমি বুঝেছি, সে ধরনেরই একজন বিপ্লবী।’
জোয়ান অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল জেনের দিকে। বলল, ‘ধন্যবাদ জেন, আমি কিন্তু ব্যাপারটাকে ঐভাবে উপলদ্ধি করতে পারিনি। তুমি ঠিকই বলেছ, বিপ্লবী আহমদ মুসার চেয়ে নীতিবান আহমদ মুসা অনেক বড়। এদিক দিয়ে আমার মনে হয় আহমদ মুসার কোন জুড়ি নেই। লেনিন বলো, মাওসেতুং বলো, হোচিমিন বলো কিংবা গুয়েভারাই বলো সবাই উদ্দেশ্য সাধনের জন্য নীতিকে বলি দিয়েছেন, নীতিকে জীবনের চেয়ে বড় করে দেখা তো দূরের কথা!’ থামল জেন।
একটু পর জেন উঠে দাঁড়িয়ে ওপাশের ঘরের দিকে উঁকি দিল। তারপর বলল, ‘জোয়ান, তুমি একটু বস, দেখে আসি আম্মা কী করছেন।’
বলে দৌড়ে সে চলে গেল রান্না ঘরের দিকে।
জোয়ানও উঠে দাঁড়াল।
ঘড়ির দিকে একবার চোখ বুলিয়ে একটু এগিয়ে রান্না ঘরের দিকে মুখ বাড়িয়ে বলল, ‘জেন তাহলে তুমি বস, আমি একটু বাইরে থেকে আসছি।’
জোয়ানের মা রান্না ঘর থেকে বলল, ‘এসে দেখ জোয়ান, জেনের কান্ড। আমাকে কিছু করতে দিচ্ছে না।’
‘ঠিক আছে আম্মা, ওকে একটু কষ্ট করতে দাও।’ বলে হাসতে হাসতে বেরিয় এলো জোয়ান বাসা থেকে।
টেবিলে খাবার সাজিয়ে জেন জোয়ানের খোঁজে এসে দেখল জোয়ান শুয়ে আছে কপালে হাত দিয়ে।
‘ভাবছ কিছু?’ পাশে বসে বলল জেন।
‘ভাবছি তোমার কথা। তোমার আব্বার সে দিনের কথা শুনেছ। তুমি এখানে এসেছ শুনলে তিনি কি যে করবেন!’
‘সে ভাবনা আমার, তোমাকে ভাবতে হবে না।‘ একটু থামল জেন। তারপর আবার বলল, ‘তুমি তো আমাকে বলনি, তুমি কার্ডোভা যাচ্ছ?’
‘বলার সময় তো পাইনি জেন।’ বলল জোয়ান।
‘কেন যাচ্ছ কার্ডোভা?’
‘শুধু কার্ডোভা নয়, প্রথমে কার্ডোভা, তারপর গ্রানাডা, এই স্মৃতি-বিজড়িত সব জায়গা ঘুরে আসব।’
‘ভালই হলো।’
‘কি ভালো হলো?’
‘আমরাও কার্ডোভা যাচ্ছি।’
‘আমরা মানে তুমি আর কে?’
‘আমি, আম্মা ও আব্বা।’
‘কেন?’
‘আব্বার কি কাজ আছে যেন! কিন্তু আমরা যাচ্ছি আমার খালাত বোনের বিয়েতে।’
‘তোমরা কবে যাচ্ছ?’
‘তুমি কবে যাচ্ছ?’
‘আমি বৃহস্পতিবারে যাচ্ছি।’
‘বারে কি কান্ড, আমরাও তো বৃহস্পতিবারেই যাবো ঠিক করেছি।’
‘এভাবে সব মিলে গেল কি করে?’
‘আমার ভাগ্য জোরে।’
‘না, আমার ভাগ্য জোরে?’
‘ঠিক আছে, দু’জনের ভাগ্য জোরে। এবার খাবে, চল।’ হেসে বলল জেন।
‘না, আকেটি কথা।’
‘কি কথা?’
‘তোমরা তো তোমাদের গাড়িতে যাচ্ছ।’
‘হ্যাঁ, তুমিও তো।’
‘আমার গাড়ি কোথায়?’ ম্লান হেসে বলল জোয়ান।
‘কেন, ওরা তোমার গাড়িও তোমাকে দেয়নি?’ ভারি কন্ঠে বলল জেন।
আমার কোন দুঃখ নেই জেন। আগের জোয়ানের সব চিহ্ন এভাবে আমার জীবন থেকে মুছে যাক।’
তৎক্ষণাৎ কোন কথা বলল না জেন। তার মুখটা ম্লান। জোয়ানের মুখের দিকে চাইতে পারছিল না যেন! মুখ নিচু রেখেই বলল, ‘কিসে যাচ্ছ?’
‘সেটা কোন ব্যাপার নয়, আমি যে কথাটা বলতে চাচ্ছিলাম, সেটা হলো ওখানে আমাদের কোথায় দেখা হবে।’
‘কোথায় তুমি বলো।’
কার্ডোভার গোয়াদেল কুইভার ব্রীজে আমি প্রতিদিন বিকেলে থাকব।’
আমারও জায়গাটা খুব পছন্দ।’
খাবার ঘর থেকে জোয়ানের মা’র কন্ঠ শোনা গেল, ‘আমি বসে আছি তোদের জন্যে জোয়ান।’
জেন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ‘আহা ওঁকে আমরা বসিয়ে রেখেছি। ওঠ।’
জোয়ান উঠে দাঁড়াল। দু’জেনই পা বাড়াল খাবার ঘরের দিকে।
