মাদ্রিদ জেনারেল হাসপাতাল।
ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট থেকে ছাড়া পেয়ে জেন কেবিনে এসে উঠল।
জেনের গাড়ি একটা লাইট পোষ্টের সাথে ধাক্কা খায়। আঘাত গাড়ির বাম অংশের ওপর দিয়ে যায় বলে জেন প্রাণে বেঁচে গেছে। তবু সে মাথার বাম পাশে ও বাম চোখে ভয়ানক আঘাত পেয়েছে। ১২ ঘন্টা পর তার জ্ঞান ফেরে। গাড়ির ব্লু-বুক থেকে ঠিকানা নিয়ে পুলিশ জেনের আব্বাকে টেলিফোনে খবর দেয়। জেনের বাবা মা ছুটে আসে হাসপাতালে। সর্বাত্মক চিকিৎসা-যত্ন জেন পায়, কিন্তু তারপরও তার বাম চোখটার ক্ষত রোধ করা যায়নি। জেনকে বাঁচানেই যেহেতু মুখ্য ছিল, তাই চোখের ক্ষতিটা স্বীকার করে নেয়া হয়েছে। জেন জোয়ানের ওখানে গিয়েছিল একথা বাবা-মা’র কাছে গোপন রেখেছে। আর বাবা-মা জানতেও চেষ্টা করেনি, জেন কোথায় গিয়েছিল। জেনকে কেন তারা একা গাড়ি নিয়ে বেরুতে দিল, এজন্যে তারা নিজেরাই নিজেদের অপরাধী মনে করেছে। জেন বাবা-মা’র একমাত্র সন্তান। গত কয়েকদিন জেনের বাবা-মা হাসপাতালেই পড়ে আছে। জেন বিপদমুক্ত হওয়ার এবং ইনটেনসিভ কেয়ার থেকে ছাড়া পাবার পর জেনের বাবা-মা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে।
জেন ইনটেনসিভ কেয়ারে থাকার সময় জেনের বাবা-মা ছাড়া কোন ভিজিটরকেই এ্যালাউ করা হয়নি।
জেনকে কেবিনে স্থানান্তরিত করার কয়েক মিনিট পরেই হান্না গিয়ে হাজির হলো কেবিনের দরজায়। কেবিন থেকে বেরুচ্ছিল জেনের আব্বা-আম্মা। হান্নাকে দেখে তারা খুশি হলো। বলল, ‘মা, এখন আর কোন অসুবিধা নেই জেনের সাথে দেখা করার। যাও, জেন একাই আছে।’
বলে একটু থামল জেনের আব্বা। তারপর বলল, ‘তুমি কতক্ষণ থাকছ হান্না?’
‘কেন আংকেল?’
‘তাহলে আমরা দু’জন বাড়ি থেকে ঘুরে আসতে পারি। ধরো ঘন্টা দু’সময়।’
‘আমি দু’ঘন্টার বেশি থাকতে পারি। অসুবিধা নেই। আপনারা আসুন।’
জেনের আব্বা-আম্মা চলে গেল।
কেবিনে প্রবেশ করল হান্না।
চোখ বুজে শুয়ে আছে জেন। তার বাম চোখে ব্যান্ডেজ। মাথায় ব্যান্ডেজ।
জেন আরও শুকিয়ে গেছে।
হান্না ধীরে ধীরে জেনের পাশে বসে তার হাতে হাত রাখল।
চমকে উঠে চোখ খুলল জেন। হান্নাকে দেখে হেসে উঠল। বলল, ‘এতদিনে এলি, কতদিন তোকে দেখিনি।’
‘বারে প্রতিদিন এসেছি, কিন্তু ইনটেনসিভ ইউনিটে ঢুকতে দিলে তো!’
‘হ্যাঁ, শুনলাম বাবা-মা ছাড়া কাউকেই ঢুকতে দেয়নি।’
জেন মুহূর্তের জন্যে থামল। তারপরেই প্রশ্ন করল আবার, ‘তুই জানতে পেরেছিলি কবে?’
‘এ্যাকসিডেন্টের এক ঘন্টার মধ্যে।’
‘এক ঘন্টার মধ্যে! কি করে?’
‘সে এক কাহিনী!’ মুখ টিপে হেসে বলল হান্না।
‘কাহিনী? কি সেটা?’
হান্না গম্ভীর হলো। বলতে শুরু করল, ‘সেদিন সন্ধ্যা সাতটা। আমি বাইরে থেকে ফিরছি। গেটে জোয়ানের সাথে দেখা। আমাকে না পেয়ে সে ফিরে যাচ্ছিল। তার উস্কো-খুস্কো, বিধ্বস্ত চেহারা। আমাকে সামনে পেয়ে সে শিশুর মতো কেঁদে ফেলল। বলল, ‘হান্না, আমি জেনকে খুন করেছি। আমি আঁৎকে উঠলাম। ধমক দিয়ে বললাম, এসব কি বলছ জোয়ান? জোয়ান বলল, ঠিকই বলছি, ও অসুস্থ, ওকে রাগানো আমার ঠিক হয়নি। আমার ওপর রাগ করে অসুস্থ শরীর নিয়ে গাড়ি চালাতে গিয়ে ও এ্যাকসিডেন্ট করেছে। ও এখন জেনারেল হাসপাতালে। তুমি যাও হান্না, আমাকে খবর এনে দাও। বলে কান্নায় ভেঙে পড়ল জোয়ান। আমি সংগে সংগেই গাড়ি ঘুরিয়ে নিয়ে চলে আসি।’ হান্না থামল।
অশ্রুতে ভরে উঠেছিল জেনের চোখ।
‘ও কোথায় হান্না?’ বলল জেন।
‘ও প্রতিদিন হাসপাতারে আসে, আজও ওয়েটিং রুমে অপেক্ষা করছে। আমি খবর নিয়ে গেলে তবে যাবে।’
‘ওকে ডেকে দিতে পারবি হান্না?’
‘ডাকব। তার আগে একটা কথা বলি, তোর এতটা পাগলামী কি ঠিক হয়েছে? তুই সেদিনই যদি যাবি আমাকে খুলে বললি না কেন?’
‘মাফ কর হান্না, আমি কিছুতেই স্থির থাকতে পারিনি, দেরি করতে পারিনি।’
‘আর ওর ওপর এভাবে রাগ করলি কেন? অভিমান বুঝি এভাবে করে!’
‘কয়দিন ইনটেনসিভ কেয়ারে শুয়ে শুয়ে আমি ভেবেছি হান্না, ঐভাবে রাগ করা আমার ঠিক হয়নি। ওর দিকটা ভাবলে আমি ওর ওপর রাগ করতে পারতাম না।’ হান্না উঠে দাঁড়াল।
‘ওকে পাঠাচ্ছি জেন!’ বলে হান্না কেবিন থেকে বেরুবার জন্যে পা বাড়াল।
‘তুমি আবার চলে যেয়ো না যেন।’ বলল জেন হান্নাকে লক্ষ্য করে।
জোয়ান কেবিনে প্রবেশ করল, জেন তখন দরজার দিকেই তাকিয়ে ছিল। জোয়ান এসে জেনের পাশে দাঁড়াল। জেন তখন তার চোখ নামিয়ে নিয়েছে। চোখ বুজেছে সে। বোজা চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছে জেনের।
জোয়ানের বুকে তখন তোলপাড়। জেনের বাম চোখের ব্যান্ডেজটা তার বুকে সূচবিদ্ধ করছে। কোনদিন কি আর ঐ চোখ দিয়ে দেখতে পাবে জেন! এত বড় সর্বনাশ হলো তারই ভুলে, তারই দোষে। অসুস্থ জেন কোন কথা বলতে না চেয়েও কেন সে ঐসব কথা সেদিন বলেছিল! কি কথা আজ সে বলবে জেনকে। জোয়ানেরও চোখ থেকে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। কেউই কথা বলতে পারছিল না।
সময় বয়ে চলছিল পল পল করে।
মুখ খুলল জোয়ানই প্রথম। বলল, ‘আমাকে মাফ কর জেন, আমি সেদিন ভুল বলেছিলাম। ভুলের খেসারত যে এত বড় হবে আমি বুঝিনি। তোমার চোখ….’
কথা শেষ করতে পারল না জোয়ান। কান্নায় কন্ঠ বন্ধ হয়ে গেল। চোখ খুলল জেন। চোখ থেকে উপছে পড়া অশ্রু স্রোতের মতো নেমে এলো গন্ড বেয়ে। বলল, ‘জোয়ান, আমি আজ সুখী। আমার জন্যে তোমার ঐ চোখের পানি গোটা দুনিয়ার চেয়ে আমার কাছে মূল্যবান। হান্না আমাকে সব বলেছে। একটা চোখ হারিয়েও যদি আমি এটা পেয়ে থাকি আমি ভাগ্যবতী।’
এসময় কেবিনে প্রবেশ করল হান্না। বলল, ‘দু’জনে গন্ডগোল পাকিয়ে অঘটন ঘটিয়ে দু’জনেরই আবার কাঁদা হচ্ছে! কান্না থামাও, চাচাজান আসছেন।’
জোয়ান ও জেন দু’জনেই চোখ মুছল। চোখ মুছে জেন জোয়ানকে নরম কন্ঠে বলল, ‘মরিসকোদের নিয়ে আমাদের কাছে যেমনটা তুমি বলেছিলে, আব্বার কাছে বলো না যেন। তোমাকে অনেক ধৈর্য ধরতে হবে জোয়ান।’
জোয়ান নিরবে গিয়ে বসল সোফায়।
জেনের আব্বা ফ্রান্সিসকো জেমেনিজ কেবিনে ঢুকেই দেখতে পেল জোয়ানকে। মুখে একটা বিস্ময়ের রেখা ফুটে উঠেই আবার মিলিয়ে গেল। তার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, ‘জোয়ান তুমি!’
জোয়ান উঠে দাঁড়িয়েছিল। বলল, ‘জি।’
‘তোমার খবরে আমরা সবাই দুঃখিত, কিন্তু সত্য যা তা হতেই হবে, কি বল?’ বলল জেনের আব্বা।
‘জি।’ বলল জোয়ান।
জেনের আব্বা সোফায় না বসে জেনের খাটে গিয়ে ঠেস দিয়ে দাঁড়াল। তার মুখ জোয়ানের দিকে। বলল, ‘বুঝলে জোয়ান, তুমি এতটুকুন বয়সে যে দুর্লভ কৃতিত্ব দেখিয়েছ এবং আরও যা তুমি পার, জাতির কোন কাজে আসবে না, এটাই দুঃখ। জাতির কেউ মরিসকোদের বিশ্বাস করে না।’
জোয়ান দাঁড়িয়েই ছিল। কোন উত্তর দিল না। মুহূর্ত কয়েক বিরতি দিয়ে জেনের আব্বা আবার শুরু করল, ‘জোয়ান, একটা কথা আমি বুঝি না, মরিসকোরা পরিচয় গোপন রেখে অন্যদের প্রতারণা করে কেন? এতে গন্ডগোল আরও বাড়ে। ধরো তোমার কথা, তুমি মরিসকো পরিচয় দিয়ে লেখাপড়া যদি করতে, তাহলে কি হতো? সুযোগ-সুবিধা, সহযোগিতা কম পেতে। এটা ঠিক। কিন্তু এটা তো বাস্তবতা! এ বাস্তবতা অস্বীকার না করলে তোমাকে তো এমন বিপর্যয়ে পড়তে হতো না।’ থামলো জেনের আব্বা।
জেন চোখ বুজে আছে। তার মুখ লাল হয়ে উঠেছে। জোয়ান মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখও লাল। কিন্তু কোন কথা বলল না সে।
হান্না জেনের মাথার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। সংকুচিত সে। ভয় করছে কিছু বলতে। ভাবছে কিছু বললে হয়তো আঙ্কেলের কথা খারাপের দিকে মোড় দিতে পারে।
জেনের আব্বা গা থেকে কোট খুলে কেবিনের হ্যাংগারে রাখতে রাখতে বলল, ‘জোয়ান, তুমি জেনকে দেখতে এসেছ খুব খুশি হয়েছি। হাজার হলেও ছোটবেলা থেকে এক সাথে পড়েছ। তবে জান কি, জেন ‘দি গ্রেট কার্ডিনাল’ পরিবারের মেয়ে। এভাবে তোমার আসাটা অনেকেই পছন্দ করবে না।’
জেনের মুখটা পাংশু হয়ে গেল যেন মুখের আলোটা দপ করে নিভে গেল! জিহবা, গলা তার শুকিয়ে এলো। কোন কথা বলতে পারল না। চোখ খুলে জোয়ানের দিকে তাকাতেও তার ভয় হতে লাগল। হান্না উৎকন্ঠিত চোখে তাকিয়ে ছিল জোয়ানের দিকে।
কিন্তু জোয়ান পাথরের মতো স্থির। মুখ নিচু তখন তার। দাঁত দিয়ে ঠোঁট সে কামড়ে ধরেছে।
জেনের আব্বা থামলে জোয়ান মুহূর্তের জন্যে চোখ বন্ধ করে, একটা ঢোক গিলে নিজেকে সামলে বলল, ‘আমি আসি, চাচাজান।’
বলে জোয়ান পা বাড়াল দরজার দিকে। পেছন থেকে জেনের আব্বা বলে উঠল, শোন জোয়ান, ‘একটু সাবধানে থেকো। তুমি ‘এ্যারোমেটিক ইঞ্জিনিয়ার্স’-এর চীফ ইঞ্জিনিয়ার মি. মিশেলের নাম শুনে থাকবে। সে মরিসকো বলে জানাজানি হবার পর কে বা কারা তাকে হত্যা করেছে।’
জোয়ান ঘুরে দাঁড়িয়েছিল। মুখ তুলে জেনের আব্বার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘ধন্যবাদ চাচাজান!’
বলে ঘুরে দাঁড়িয়ে শান্ত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল জোয়ান।’
৫
মাদ্রিদে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের হেডকোয়ার্টার। অপারেশন ডিরেক্টরের কক্ষ। অপারেশন ডিরেক্টর সিনাত্রা মেন্ডো তার রিভলভিং চেয়ারে বসে। তার সামনে বিশাল টেবিল।
সিনাত্রা মেন্ডো একটা ফাইল ওপর চোখ বুলাচ্ছে। ফাইলটি এসেছে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান প্রধান বুটাগুয়েনা ভাসকুয়েজের কাছ থেকে। বাস্ক গেরিলা কন্যা মারিয়া পণবন্দী হিসেবে আটক হওয়ার পর হাত থেকে ফসকে যাওয়া, মাত্র একজন লোক ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের ৫ জন লোককে হত্যা করে ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের ঘেরাও বিধ্বস্ত করে দিয়ে মারিয়াকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার মর্মান্তিক ঘটনার ওপর মন্তব্য করেছে বুটাগুয়েনা ভাসকুয়েজ। এমন বিপর্যয় স্পেনের ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের জীবনে আর আসেনি। এমন লজ্জাকরভাবে পরাজিত, অপমানিত তাকে আর হতে হয়নি কখনও। এই ব্যর্থতার জন্যে ভাসকুয়েজ অপারেশন ডিরেক্টর সিনাত্রা মেন্ডোকেই দায়ী করেছে। ভাসকুয়েজ হুশিয়ারী উচ্চারণ করে বলেছে, ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান কোন ব্যর্থতাকেই ক্ষমা করে না, তবে মেন্ডোকে সুযোগ দেয়া হয়েছে।
রিপোর্ট পড়ে ঘামছিল সিনাত্রা মোন্ডো। এই সুযোগ যে তার শেষ সুযোগ তা মেন্ডো মর্মে মর্মে অনুভব করেছিল। এরপর যে কোন ব্যর্থতা তার জন্যে নিয়ে আসবে কাল মৃত্যু। ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যানের অভিধানে ব্যর্থতার অন্য নাম মৃত্যু একথা সবাই জানে।
সিনাত্রা মেন্ডো সমস্ত ক্রোধ গিয়ে পড়ছিল সেই লোকটির ওপর, যে মারিয়াকে তাদের হাত থেকে উদ্ধার করে নিয়ে গেল এবং যে তাদের এত বড় বিপর্যয়ের মূল হোতা। এই সময় পকেটের অয়্যারলেস সেট ‘ক্লিক দেয়া শুরু করল।
তাড়াতাড়ি অয়্যারলেসটি বের করে নিয়ে এন্টেনাটা টেনে দিয়ে কানের কাছে ধরল। শুনেতে শুনতে তার মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। শুনে নিয়ে সে বলল, ‘ওকে, তোমরা ফল করো। আমরা আসছি, পরে যোগাযোগ করব।’ বলে এন্টেনা ক্লোজ করে অয়্যারলেসটি রেখে দিল পকেটে। তারপর টেবিরে একটা মুষ্ঠাঘাত করে লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াল।
ছুটল সে বুটাগুয়েনা ভাসকুয়েজের কক্ষে প্রবশে করে আসামীর মতো গুড়ি মেরে দাঁড়াল ভাসকুয়েজের টেবিলে সামনে।
ফাইল থেকে ধীরে ধীরে মুখ তুলে ভাসকুয়েজ বলল, ‘কোন খবর ?
‘জি, স্যার, সেই লোকটির দেখা পাওয়া গেছে।
‘কোন লোকটির?’
‘বাস্ক গেরিলা কন্যা মারিয়াকে যে উদ্ধর করে নিয়ে গেছে।’
‘কোথায়?’
‘তাকে দেখা গেছে বাট্রাগো ডে লুজিয়ার মাদ্রিদ হাইওয়েতে। সে মাদ্রিদের দিকে আসছে।’
‘তারপর?’
‘আমি তাকে ফলো করার নির্দেশ দিয়ে আপনার কাছে এসেছি।’
‘সে একা?’
‘তার সাথে মাত্র একজন ড্রাইভার।’
‘তোমার কি পরিকল্পনা?’
‘খবরটা পেয়েই আমি আপনার কাছে এসেছি।’
ভাজকুয়েজ দেয়ালে সেট করা বিশাল মানচিত্রের দিকে চোখ নিবদ্ধ করে বলল, ‘সে যেই হোক, তাকে যে আন্ডারএস্টিমেট করা যায় না তা বোধ হয় বুঝেছ তুমি।’
কথা শেষ করে একটু থেমেই আবার সে বলল, ‘মাদ্রিদের ৩০ মাইল উত্তরে ঐ যে আল কামেন্দা শহর, তার উপকন্ঠে একটা উন্মুক্ত উপত্যকায় দেখ পূর্ব-পশ্চিম একটা রোড মাদ্রিদ হাইওয়েকে ক্রস করেছে। এখানেই ওকে চারদিক থেকে আটকাও।’ বলে মাথা নিচু করল ভাসকুয়েজ।
সেন্ডো বুঝল, কথা শেষ, মাথা নিচু করার অর্থ তার চলে যাবার নির্দেশ।
সেন্ডো বেরিয়ে এলো ভাসকুয়েজের রুম থেকে।
অফিসে এসে সেন্ডো আল কামেন্দার ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যান অফিসসহ টেলিফোনে কয়েকটি প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে বেরিয়ে এলো সেন্ডো। সুসজ্জিত দু’টি গাড়ি একটি মাইক্রোবাস, আরেকটি জীপ রেডি হয়ে গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়েছিল। লোকজন যা নেয়ার তারাও গাড়িতে উঠে বসেছে। সেন্ডো জীপের সামনের সিটে গিয়ে উঠল।
গাড়ি দু’টি স্টার্ট নিল।
গাড়ি ছুটতে শুরু করল আল কামেন্দার শহরের উদ্দেশে।
মি. সেন্ডো বাট্রাগো ডে লুজিয়া থেকে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের যে গাড়িটি ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের নতুন টার্গেট আহমদ মুসাকে অনুসরণ করছিল তার সাথে অয়্যারলেসে যোগাযোগ করে তাদের অবস্থান ও গাড়ির স্পিড জেনে নিল। সেন্ডো হিসেব করল, যে গতিতে তারা আসছে তাতে আল কামেন্দার সেই উপকন্ঠে পৌঁছতে ওদের সাড়ে ৬টা বেজে যাবে। আবার ওয়্যারলেস তুলে নিয়ে মি. সেন্ডো আল কামেন্দার অফিসের সাথে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিল।
একদিকে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের যখন এই আয়োজন, তখন আহমদ মুসা নিশ্চিন্ত মনে চারদিকের প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে করতে ছুটে আসছিল মাদ্রিদের লক্ষ্যে।
গাড়িটা ছিল নতুন। গাড়িটা চলতে শুরু করলেই আহমদ মুসা বুঝেছিল ড্রাইভারও যথেস্ট দক্ষ। গাড়ির সিটে গা এলিয়ে আহমদ মুসা সমগ্র হৃদয় দিয়ে সফরটাকে উপভোগ করছিল।
আহমদ মুসার এ উপভোগে বাধ সাধল একমাত্র সাথীটি- ড্রাইভার। বলল, ‘স্যারের বাড়ি কোথায়?’
‘কেন স্পেন যদি হয় আপত্তি করবে?’
‘কেন করব, কিন্তু শুনেছি স্যার বাইরে থেকে এসেছেন।’
‘ঠিক। আসলে কি জানো, গোটা দুনিয়াকেই আমার ঘর মনে করি।’
‘আমার স্যার বলেছিলেন, আপনি খুব বড় বিপ্লবী, আজকের দুনিয়ায় আপনার তুলনা নেই। কিন্তু শুনলাম আপনি মুসলমান।’
‘কেন মুসলমানরা কি বড় হতে পারে না, দুনিয়ার সেরা বিপ্লবী হতে পারে না?’
‘স্পেনে তো মুসলমানদের খুব খারাপ অবস্থা হয়েছিল, তাই বলছিলাম।’
‘তোমার কথা ঠিক। ৮শ’ বছর পর্যন্ত স্পেনকে শিক্ষা, সভ্যতা ও সমৃদ্ধিতে সাজিয়েও মুসলমানরা স্পেন থেকে উৎখাত হয়ে যায়। যারা অবশিষ্ট ছিল তাদেরকে খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করতে বাধ্য হতে হয়েছে। এই অবস্থায় মুসলমানদের সম্পর্কে বড় কিছু চিন্তা করা স্বাভাবিক নয়।’ বলল আহমদ মুসা।
‘খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণ করেও ওদের কোন লাভ হয়নি স্যার। চাকরি-বাকরির দরজা ওদের জন্যে বন্ধ, কায়িক শ্রমই ওদের সম্বল। জমি রাখতে ও জমি কিনতে পারে না বলে ওদের নিজের কোন বাড়ি নেই। আমাদের গ্রামে দক্ষিণ স্পেন থেকে একটা পরিবার এসে জমি কিনে বাড়ি করেছিল। পরে প্রকাশ হয়ে পড়ল ওরা খৃষ্ট ধর্ম গ্রহণকারী ছদ্মবেশী মুসলমান-মরিসকো। আশেপাশের বাইবেল সোসাইটির লোকেরা এসে প্রতারণার অভিযোগে বাড়ির মালিক লোকটাকে মারতে মারতে মেরে ফেলে এবং বাড়ি ও সহায়-সম্পদ সব কেড়ে নিয়ে বাড়ির নারী ও শিশুদের রাস্তায় নামিয়ে দেয়। পরে শুনেছি মাদ্রিদ যাবার পথে ডে মাজুরা গিরিপথে ঠান্ডায় বরফে জমে পরিবারটির সবাই মারা যায়।’
‘মরিসকোদের কেউ সাহায্য করে না?’
‘অনেকেই করতে চায়। কিন্তু সাহস পায় না, সমাজে একঘরে হবার ভয় আছে। তা’ছাড়া ঐ বাইবেল সোসাইটির মতো দেশে অনেক সংগঠন আছে, যারা মুসলমানদের ঘোরতর শত্রু।’
‘সরকারের ভূমিকা কি?’
‘সরকারী আইন তো মুসলমানদের বিরুদ্ধে। তবে সরকার প্রকাশ্যে মরিসকোদের ওপর জুলুম-অত্যাচার করতে আসে না। চার্চ, ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যান প্রভৃতি শক্তিশালী সংস্থাগুলো মুসলমানদের বিরুদ্ধে সব রকম ষড়যন্ত্রের সাথে জড়িত।’
‘তুমি অনেক বিষয় জানো দেখছি।’
‘স্যার, এসব তো চোখে দেখি, না জেনে উপায় কি?’
একটু থেমেই ড্রাইভার আবার বলল, ‘স্যার, মুসলমানদের জন্যে কিছু কি করবেন?’
‘একথা জিজ্ঞেস করছ কেন?’
‘মুসলমানদের একজন নেতা আপনি, আপনারা না ভাবলে মুসলমানদের কথা ভাববে কে?’
‘কি করা যায় বলত?’
‘এখানকার মরিসকো ও মুসলমানদের আত্মবিশ্বাস বলতে কিছু নেই। তারা সচেতন ও ঐক্যবদ্ধ নয়। তাদেরকে সচেতন করতে হবে, ঐক্যবদ্ধ করতে হবে এবং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস জাগিয়ে তুলতে হবে।’
‘তুমি তো মুসলমাদের প্রতি খুব সহানুভূতিশীল, ভালোবাস তো মুসলমানদের?’
‘স্যার, আমরা বাস্করা তো মুসলমানদের মিত্র! আমরা যতটুকু পারি ওদের জন্যে করি। আমাদের এলাকায় ওদের সমস্যা নেই স্যার।’
‘আমি জানি, তোমরা খুব ভালো।’
এই সময় ড্রাইভার উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, ‘স্যার, বহুক্ষণ ধরে একটা গাড়ি একই গতিতে আমাদের পেছনে আসছে। আমি গাড়ির স্পিড কমিয়ে দেখেছি ও গাড়িরও স্পিড কমিয়েছে।’
সন্ধা তখন পার হয়ে গেছে। আহমদ মুসা মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল, পেছনে একটা হেড লাইট ছুটে আসছে।
পেছন থেকে চোখ ফিরিয়ে সোজা হয়ে বসল আহমদ মুসা। বলল, ‘আমরা এখন কোথায় ড্রাইভার?’
‘আল কামেন্দা শহরের প্রায় উপকন্ঠে পৌঁছে গেছি আমরা।’
আহমদ মুসা মুহূর্ত কয়েক ভাবল। তারপর বলল, ‘গাড়িটা নিশ্চয় আমাদেরকে বাট্টাগো ডে লুজিয়া থেকে ফলো করছে। মাঝখানে আমরা কোথাও থামিনি, সুতরাং মাঝপথে আমরা কারো নজরে পড়ার কোন আশংকা নেই।’
‘আমারও তাই মনে হয়।’ বলল ড্রাইভার।
‘যদি তাই হয় তাহলে বড় বিপদটা আসবে আমাদের সামনে থেকে।’
’কিভাবে?’
‘গাড়িটা ঐভাবে নিশ্চিন্তে আমাদের ফলো করার কারণ হলো, তার দায়িত্ব শুধু ফলো করা, পেছন থেকে আমাদের পাহারা দেয়া যে, ঠিক যাচ্ছি আমরা।’
‘তাহলে আমাদের খবরটা মাদ্রিদ কিংবা অন্য কোথাও অনেক আগে পৌঁছে গেছে!’
‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’
‘কিভাবে?’
‘অয়ারলেস অথবা টেলিফোনে।’
একটু থেমেই আহমদ মুসা আবার বলল, ‘সামনে এই হাইওয়ে ছেড়ে ডাইনে বা বাঁয়ে যাবার কোন পথ কি কাছাকাছি আছে?’
‘আছে। আল কামেন্দা শহরে ঢোকার মুখে পুব – পশ্চিম একটা সড়ক এই মাদ্রিদ হাইওয়েকে ক্রস করেছে।’
‘পুব ও পশ্চিম এর মধ্যে কোন দিক দিয়ে মাদ্রিদ পৌঁছা সহজতর হবে?’
‘বাঁ দিক দিয়ে।’
‘তাহলে ঐ ক্রসিং পর্যন্ত পৌঁছে আমরা বাঁ দিকে মোড় নেব।’
ক্রসিং কাছে এসে গেছে। আহমদ মুসা দেখল, পুব-পশ্চিম সড়কটি ফ্লইওভার দিয়ে মাদ্রিদ হাইওয়েকে ক্রস করেছে। সোজা হাইওয়েটি চলে গেছে ফ্লাইওভারের নিচ দিয়ে। আর হাইওয়ের থেকে একটা রাস্তা ধনুকের মত বেঁকে গিয়ে পুবের রাস্তার সাথে মিশেছে। অনুরূপ অন্য একটি শাখা পশ্চিমের রাস্তার সাথে মিশেছে। একইভাবে ফ্লাইওভারের অপর পার্শ্ব থেকেও হাইওয়ে থেকে দু’টি শাখা ঐভাবে পুব ও পশ্চিমের রাস্তার সাথে গিয়ে মিশেছে।
আহমদ মুসার গাড়ির ড্রাইভার ক্রসিং এর মুখে এসে বাম দিকে টার্ন নিয়ে বামের রাস্তাটি ধরে পুবের রাস্তাটির ওপর ওঠার জন্যে এগিয়ে চলল। ফ্লাইওভারের পুব দিকের শেষ প্রান্ত যেখানে, সেখানে গিয়ে মিশেছে হাইওয়ে থেকে আসা রাস্তা।
আহমদ মুসার গাড়ি তখন পুবের রাস্তাটিতে উঠে ৫০ গজের মতো এগিয়ে গেছে, এমন সময় সামনে একসংগে চারটে হেডলাইট জ্বলে উঠল মাত্র কয়েক গজ সামনে, একেবারে নাকের ডগা বরাবর। চারটি হেডলাইট পাশাপাশি। দু’টো গাড়ি, একটা ট্রাক, একটা মাইক্রোবাস।
এ্যাকসিডেন্ট এড়াবার জন্যে আহমদ মুসার গাড়ি বিশ্রী এক শব্দ তুলে দাঁড়িয়ে গেল।
সামনের গাড়ি দু’টোর দিকে একবার তাকিয়ে আহমদ মুসা পেছন ফিরে চারদিকে একবার নজর বুলাল। ঠিক যা সে সন্দেহ করেছে তাই, দু’পাশ থেকে দু’টো করে চারটে এবং পেছন থেকে চারটে হেডলাইট প্রায় এসে পড়েছে তাদের ওপর।
নতুন কিছু ভাবার আগেই দু’পাশ থেকে চারটে এবং পেছন থেকে দুটো গাড়ির ব্যারিকেডের মধ্যে পড়ে গেল আহমদ মুসার গাড়ি।
সামনের গাড়ি দু’টোও এগিয়ে আসছে।
ড্রাইভার পকেট থেকে পিস্তল বের করে বলল, ‘স্যার, পিস্তলটা কি আপনার কাজে আসবে।?’
হাসল আহমদ মুসা। বলল, ‘অনেক দেরি হয়ে গেছে। যে ফাঁদ এড়াতে চেয়েছিলাম, সে ফাঁদে পড়ে গেছি। শোন, তুমি পিস্তলটা লুকিয়ে ফেল। ভাড়াটে ড্রাইভর বলে নিজের পরিচয় দেবে। তোমার অসুবিধা হবে না, ট্যাক্সিটা লা-গ্রীনজা ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের নামে রেজিস্ট্রি।’
কিন্তু স্যার, আপনার কি হবে….।’ কথা শেষ করতে পারল না ড্রাইভার। উদ্বেগে তার স্বর বন্ধ হয়ে গেল।
‘শত্রুর মোকাবিলায় সাধ্যমত সব কিছুই করতে হয়। কিন্তু যখন করার কিছু থাকে না, তখন যা ঘটে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করার মধ্যে কোন লাভ নেই।’ হেসে বলল আহমদ মুসা।
এই সময় আহমদ মুসার গাড়ির দরড়া দু’দিক থেকেই খুলে গেল। দু’পাশেই জনা চারেক করে লোক। দু’পাশ থেকেই উদ্যত স্টেনগান। দক্ষিণ পাশের গেটে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে আছে সিনাত্রা সেন্ডো। সে পিস্তল নাচিয়ে হুংকার দিয়ে আহমদ মুসাকে বলল, ‘নেমে এসো বাছাধন, কত ধানে কত চাল এবারে দেখিয়ে ছাড়ব!’
বেরিয়ে আসার সংগে সংগে সেন্ডা তার সুঁচালো বুটের একটা লাথি হাঁকালো আহমদ মুসার তলপেটে এবং সেই সাথেই বাম হতের একটা কারাত চালাল কানে নিচে ঘাড়ের নরম জায়গায়।
আহমদ মুসা এই ধরনের আক্রমণ আশা করেনি। তাই প্রস্তুত হতে পারেনি।
আহমদ মুসা ঘুরে পড়ে গেল।
দু’জন তাকে টেনে তুলল গাড়িতে।
পাঁচ মিনিটের মধ্যে সব সাঙ্গ হয়ে গেল।
ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের ৭টি গাড়ির মিছিলের মতো সার বেঁধে মাদ্রিদের পথে যাত্রা করল।
গাড়ির মিছিলটি যখন ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের হেডকোয়ার্টারে পৌঁছল, তখন সেখানে মহোৎসব। যেন সেন্ডো বিশ্বজয় করে এসেছে! আহমদ মুসা প্রদর্শনীর বস্ত্ত হয়ে দাঁড়াল। ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের হেডকোয়ার্টারে আহমদ মুসার বিরাট ইমেজ সৃষ্টি হয়েছে। সে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানকে শুধু পরাস্ত করা নয়, ৫জন গুরুত্বপূর্ণ লোককে হত্যাও করেছে। সুতরাং আহমদ মুসাকে এক নজর সবাই দেখতে চায়। তাকে দেখে কিন্তু কেউ তেমন খুশি হয় না। সবারই আশা বিরাট ধরনের ষন্ডামার্কা লোককে তারা দেখবে, কিন্তু তার বদলে তারা দেখে শান্ত সরল চেহারার এক ভদ্রলোককে। তারা বুঝতে পারে না, এমন ধরনের লোক কি করে ক্রিমিনাল হয়!
গাড়িতেই আহমদ মুসার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। তাকে গাড়ি থেকে নামিয়ে ধাক্কিয়ে হেডকোয়ার্টারের ভেতরে এনে তিনতলায় বিশেষভাবে তৈরি বন্দীখানায় রাখল।
বন্দীখানাটা একটা সেলের মতো। ঘুলঘুলির মতো ছোট একটা জানালা উত্তর দেওয়ালে। দক্ষিণ দিকে পুরু স্টিলের দরজা। সেলের মধ্যে আছে একটা খাটিয়া আর কিছু নায়।
আহমদ মুসা কম্বল বিছানো খাটিয়াতে গিয়ে বসেছিল। সেন্ডো ঘরে ঢুকে বলল, ‘আরাম করে নাও, এরপর আরামের সময় কম পাবে। আসছি আমরা।’
বলে বাইরে পা বাড়াচ্ছিল, এমন সময় একজন এসে বলল, ‘বস আসছেন।’
অর্থাৎ বাটা গুয়েনা ভাসকুয়েজ আসছেন। সেন্ডো সংগে সংগেই এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা সেন্ডোর এ পর্যন্তকার বীরত্ব ও এখনকার বসভীতি দেখে মনে মনে হাসল। বলল, ‘মি.সেন্ডো, আপনি কি সেনাবাহিনীতে ছিলেন কখনও?’
‘কেন?’ সেন্ডো কটমট করে তাকিয়ে প্রশ্ন করল।
‘বসকে দেখে এধরনের এ্যাটেনশন হওয়ার অভ্যাস সেনাবাহিনীর লোকদের।’
‘ও, তখন দু’টো ঘা খেয়েও দেখি শিক্ষা হয়নি।’
‘নিরস্ত্র শত্রু যখন নিজের ইচ্ছাতে ধরা দেয়, তখন তার ওপর দুটো ঘা লাগানোর মধ্যে কো বীরত্ব নেই মি. সেন্ডো।’
সেন্ডো মুখ লাল করে কী যেন বলতে যাচ্ছিল, এমন সময় করিডোরে জুতার শব্দ পাওয়া গেল।
মি. সেন্ডো আহমদ মুসার দিকে একবার বিষ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবার এ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়াল। বাটা গুয়েনা ভাসকুয়েজ এলো।
সেলের দরজায় দাঁড়ানো মি. সেন্ডোকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তুমি দেখছি নিজে এবার সেলের দরজায় পাহারায়, সাবধান হওয়া ভালো।’
মি. সেন্ডো মুখ কাঁচুমাচু করে বলল, ‘লোকটি সাংঘাতিক ঘাড়েল স্যার! সাতটি গাড়ি দিয়ে ঘেরাও করে অনেক কষ্টে তবে……..’
‘গ্রেপ্তার করেছ তাই না? কিন্তু শুনলাম একটি গুলীও নাকি খরচ হয়নি?’
‘স্যার, নিখুঁত পরিকল্পনা…….।’
মি. ভাসকুয়েজ সেন্ডোর পিঠ চাপড়ে সেলে প্রবেশ করল।
আহমদ মুসা শুনছিল ভাসকুয়েজ ও মি. সেন্ডোর কথোপকথন। কৌতুক বোধ করছিল তাদের কথার ঢংয়ে।
মি. ভাসকুয়েজ সেলে ঢুকে নিশ্চিন্ত মনের শান্ত চেহারার একজন মানুষকে দেখল। ভাসকুয়েজ বিস্মিতই হলো। বন্দী তো এমন হয় না!
বন্দীর দিকে ভালো করে তাকাতে গিয়ে চমকে উঠল ভাসকুয়েজ। মুখটি তার যেন চেনা! হঠাৎ একটি নাম তার মনে ঝলসে উঠল। একি সেই আহমদ মুসা! মনটা কেঁপে উঠল ভাসকুয়েজের।
উত্তেজিতভাবে ভাসকুয়েজ ঘুরে দাঁড়াল। সেন্ডোকে লক্ষ্য করে বলল, ‘বন্দীকে আমার কক্ষে নিয়ে এসো।’
বলে ভাসকুয়েজ হন হন করে ছুটল তার কক্ষের দিকে।
আহমদ মুসা ভাসকুয়েজের আচরণে খুব বিস্মিত হলো না। ভাবল, ভাসকুয়েজ সম্ভবত তাকে চিনতে পেরেছে অথবা সন্দেহ করেছে।
কিন্তু বসের আচরণ দেখে মি. সেন্ডো শুধু বিস্মিত নয়, উৎকন্ঠিত হয়ে উঠল। বস কি দেখলেন, কি ভাবলেন, কি হলো ইত্যাদি চিন্তা তার মনে উঁকি দিতে লাগল।
বস্ চলে গেলে মি. সেন্ডো আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, ‘তাড়াতাড়ি ওঠ, এসো। বস কোন প্রকার এদিক-সেদিক পছন্দ করেন না।’
‘বসকে তুমি বুঝি খুব ভয় কর?’
‘বক বক করো না। চল, বসকে দেখতে পাবে। ডেকেছেন যখন, একটা কিছু দেখাবেন নিশ্চয়।’
মি. সেন্ডো আহমদ মুসাকে নিয়ে ভাসকুয়েজের কক্ষে হাজির হলো।
ভাসকুয়েজেরে বন্ধ কক্ষের দরজায় দু’জন স্টেনগানধারী প্রহরী।
ঘরটি বিরাট। লাল কার্পেটে আগাগোড়া মোড়া। দেয়ালও কার্পেটিং করা। ঘরের মাঝেখানে বিশাল টেবিল।
বিশাল এক রিভলভিং চেয়ারে বসেন মি. ভাসকুয়েজ। তার বাম পাশের একটা টেবিলে কম্পিউটার। মি. ভাসকুয়েজ কম্পিউপটারের সামনে বসে। মি. সেন্ডো আহমদ মুসাকে নিয়ে সেই বিশাল টেবিলটির সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।
মি. ভাসকুয়েজের সামনের কম্পিউটার স্ক্রিনে একের পর এক ফটো ভেসে উঠছিল, তারপর মিলিয়ে যাচ্ছিল। আহমদ মুসা পরিষ্কার বুঝতে পাল, ভাসকুয়েজ কি খুঁজছে।
একটি ফটো অবশেষে মি. ভাসকুয়েজের কম্পিউটার স্ক্রিনে স্থির হয়ে দাঁড়াল।
মি. ভাসকুয়েজ উঠে দাঁড়াল। ফিরল। তার মুখে বিস্ময়, সেই সাথে আনন্দও। সে মি. সেন্ডোর দিকে চেয়ে বলল, ‘কম্পিউটার স্ক্রিনের ফটোগ্রাফ ও ইনি কি এক ব্যক্তি মনে হচ্ছে?’
‘জি, স্যার।’ আরেকটু ভালোভাবে দেখে নিয়ে বলল সেন্ডো।
‘কে, চেন?’
‘না, স্যার।’ আহমদ মুসার দিকে একবার তাকিয়ে বলল সেন্ডো।
‘যখন ধরলে নাম জিজ্ঞেস করনি?’
‘না, স্যার।’
‘সব অপদার্থ!’
বলে একটু থেমে ঢোক গিলে বলল, ‘জানো দুনিয়ায় সমচেয়ে মূল্যবান ব্যক্তি এখন ইনি এবং সবচেয়ে দামি পণবন্দী ইনি হতে পারেন?’
মি. সেন্ডো একটু বিমূঢ় হলো। যেন বুঝতে পারল না ভাসকুয়েজের কথা! নিরব রইল সেন্ডো।
এবার ভাসকুয়েজ আহমদ মুসার মুখোমুখি হয়ে বলল, ‘চেনেন ঐ ফটোগ্রাফকে?’
‘ফটো খোঁজার দরকার ছিল না। নাম জিজ্ঞেস করলেই বলতাম।’ বলল আহমদ মুসা।
‘হয়তো ছিল না, কিন্তু ঘটনাটা এত বড় যে, আমি আগে নিশ্চিত হতে চেয়েছিলাম।’
বলে ভাসকুয়েজ বিমূঢ় সেন্ডোকে জিজ্ঞেস করল, ‘আহমদ মুসার নাম শুনেছ?’
‘জি, স্যার।’
‘আহমদ মুসার ফটোগ্রাফ দেখনি?’
‘দেখেছি, একবার।’
‘একে চিনতে পার?’ আহমদ মুসার দিকে ইংগিত করে বলল ভাসকুয়েজ।
‘ইনিই আহমদ মুসা!’ বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে দু’পা পিছিয়ে গেল সেন্ডো। তার চোখে-মুখে অপার বিস্ময়। যার কাহিনী রূপকথার মতো এসেছে তাদের কাছে, যার ভয়ংকর একটা ইমেজ তাদের কাছে সর্বদা জীবন্ত, এই সেই আহমদ মুসা! এমন একজন সরল, শান্ত, ভদ্র চেহারার যুবক দেশে দেশে এত কাহিনীর সৃষ্টি করেছে! আহমদ মুসার ওপর থেকে চোখ যেন সরতে চাইছেল না মি. সেন্ডোর!
‘কি সেন্ডো, ভয় পেলে, না প্রেমে পড়লে? বিরোধীকে বোকা বানাবার কিংবা বশ করবার মতো ভয়ংকর যাদু জানে কিন্তু এ।’
‘না, স্যার।’ এ্যাটেনশন হয়ে বলল মি. সেন্ডো।
ভাসকুয়েজ আহমদ মুসার আপাদমস্তক এবার চোখ বুলিয়ে বলল, ‘আপনি ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের হাতের মুঠোয়, কেমন লাগছে আপনার?’
‘বিনা শ্রমে আপনাদের এত বড় সৌভাগ্য লাভ দেখে খারাপ লাগছে।’
‘ঠিক বলেছেন, আকাশের চাঁদ যেন নিজে এসে আমাদের হাতে ধরা দিয়েছে, অথচ তাকে ধরার জন্যে ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যান অতীতে কী করেনি?’
একটু থামল ভাসকুয়েজ। তারপর আবার শুরু করল, ‘মি. আহমদ মুসা, যে ভাগ্য আপনাকে সব সময় বাঁচিয়েছে সেই ভাগ্য এখন আপনার বিরুদ্ধে। সব কিছুরই একটা শেষ আছে। আপনার খেলাও এবার সাঙ্গ হবে। ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের বিশ্ব-হেডকোয়ার্টার প্রতিশোধের জন্যে পাগল হয়ে আছে। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘ওয়ার্ল্ড রেড ফোর্সেস’ আপনাকে চিবিয়ে খাবার জন্যে তৈরি হয়ে আছে। আমরা যদি আপনাকে তাদের হাতেও তুলে দিতে চাই, তাহলেও শত শত বিলিয়ন ডলার ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যান পাবে।’
‘আপনাদের এই বড় ব্যবসায়ের সংবাদে আমি আনন্দই বোধ করছি।’ বলল আহমদ মুসা।
‘এসব কথা বলে মনকে সান্তনা দিন ক্ষতি নেই, কিন্তু জেনে রাখুন, সব খেলা আপনার সাঙ্গ হয়ে গেছে। যে স্পেন মুসলমানদের সমাধি রচনা করছে, সেই স্পেনেই আপনার সব জারিজুরি শেষ হয়ে গেল।’
আহমদ মুসার মনে একটা কথা ঝিলিক দিয়ে উঠল। বলল, ‘স্পেনে মুসলমানদের কোথায় সমাধি হলো, তারা তো আবার মাথা তুলছে। এই মাদ্রিদেই তো তাদের মসজিদের মিনার আবার মাথা তুলেছে।’
হেসে উঠল ভাসকুয়েজ হো হো করে। বলল, ‘আপনার দেখার সময় হবে না, তা না হলে দেখতেন ঐ মিনার গুঁড়ো হয়ে মাটির সাথে মিশে গেছে।’
‘পারবেন না, মি. ভাসকুয়েজ, যে কারণে আপনাদের সরকার মসজিদ তৈরির অনুপতি দিতে বাধ্য হয়েছেন, সেই কারনেই আপনারা পারবেন না মসজিদ গুঁড়ো করতে।’
হাসল ভাসকুয়েজ। এবার আরও জোরে। বলল, ‘আপনি বুদ্ধিমান হয়েও অবুঝের মতো কথা বলছেন। সরকার ভাঙবে কেন? আপনাতেই মসজিদ ভেঙে পড়বে। শুধু ঐ মসজিদ নয়, স্পেনের মাটিতে দাঁড়ানো সব মুসলিম স্মৃতি চিহ্নই ধ্বসে পড়বে আপনা আপনি। সে সাথে ক্রিপলড হয়ে যাবে মসজিদকে কেন্দ্র করে গড়িয়ে ওটা মুসলিম সমাজ।’
‘অবাস্তব আপনার আশাবাদ মি. ভাসকুয়েজ।’
‘অবাস্তব নয়, ধ্বংসের কাজ শুরু হয়ে গেছে লোকচক্ষুর অন্তরালে যা অণুবীক্ষণ যন্ত্র লাগিয়েও কোন চোখ দেখতে পাবে না। কিন্তু দেখবে একের পর এক সব ধ্বসে পড়ছে ইশ্বরের বিষদৃষ্টিতে। কিন্তু তা দেখার জন্যে আপনি বেঁচে থাকবেন না।’
কেঁপে উঠল আহমদ মুসার হৃদয়। গোপন তেজস্ক্রিয় দিয়ে মাদ্রিদের শাহ ফয়সাল মসজিদ কমপ্লেক্স ও স্পেনের জগৎবিখ্যাত মুসলিম স্মৃতিচিহ্নগুলো ধ্বংসের কাজ তা’হলে শুরু হয়ে গেছে!
আহমদ মুসা কিছু বলতে যাচ্ছিল কিন্তু কথা বলে উঠল ভাসকুয়েজ সেন্ডোকে লক্ষ্য করে। বলল, ‘শোন সেন্ডো, বুঝতে তো পেরেছ, ইনি দুনিয়ার সমচেয়ে মূল্যবান মানুষ, আমাদের সবচেয়ে মূল্যবান বন্দী। একে এই খোলামেলা হেডকোয়ার্টারের জনবহুল পরিবেশে রাখা যাবে না। কোথায় রাখতে হবে বুঝতে পেরেছ?’
‘জি স্যার।’
‘কোথায়?’
‘কার্ডিনাল হাউজের আন্ডার গ্রাউন্ড সেলে।’
‘কিভাবে নিয়ে যাবে, যথেষ্ট ফোর্স তোমার আছে?’
‘পুলিশের হাত থেকে ফসকেছিল শুনেছ তো।’
‘জি।’
‘বেশ যাও।’
বলে আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘যান এর সাথে। আপনার সাথে অহেতুক খারাপ ব্যবহার আমরা করতে চাই না। কিন্তু এবার পালাবার সামান্য মতলব আমাদের কাছে ধরা পড়লে সংগে সংগে আমরা কুকুরের মতো গুলী করে মারব। আর যেখানে আমরা রাখছি, পালাবার চেষ্টা করেও কোন লাভ হবে না।’
ভাসকুয়েজ কথা শেষ করে তার চেয়ারে ফিরে গেল। আহমদ মুসা বেরিয়ে এলো মি. সেন্ডোর সঙ্গে।
করিডোর ধরে আহমদ মুসা ও মি. সেন্ডো পাশাপাশি চলছিল। পেছনে দুই স্টেনগানধারী।
হাঁটতে হাঁটতে সেন্ডো বলল, ‘ভালো জায়গা নির্ধারিত হয়েছে আপনার থাকার।’
‘কেন?’
‘আমার জানামতে ওখান থেকে কেউ জীবন্ত বের হয়নি। যারা পালাতে চেষ্টা করেছে, সবাই দানবের হাতে গুলী খেয়ে মরেছে।’
‘দানব কি গুলী চালায় নাকি, এমনিতেই তো ঘাড় মটকাতে পারে।’ দানবটা কি জানার লক্ষ্যেই প্রশ্নটি করল আহমদ মুসা।
‘দানব মানে সে দানব নায়, যন্ত্র দানব! ওর ম্যাগনেটিক চোখকে কেউ ফাঁকি দিতে পারে না এবং ওর ম্যাগনেটিক গানও অব্যর্থ।’
লিফটের দরজায় এসে দাঁড়াল মি. সেন্ডো এবং পেছন ফিরে তাকাল দু’জন প্রহরীর দিকে। সঙ্গে সঙ্গে ওদের একজন আহমদ মুসার হাতে হাতকড়া পরিয়ে দিল।
‘কিছু মনে করবেন না, এটাই ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের নিয়ম। বন্দীকে রাস্তায় বের করলে তার হাতে হাতকড়া থাকবে।’ মুখে বাঁকা হাসি টেনে বলল সেন্ডো।
‘লিফটের যেখানে শেষ-গ্রাউন্ড ফ্লোর-ওটাই গাড়ি বারান্দা। তিনটি গাড়ি দাঁড়িয়েছিল। মাঝখানের মাইক্রোবাসে আহমদ মুসাকে তুলল। তার সাথে স্টেনগানধারী দুই প্রহরী। সামনের সিটে উঠল সেন্ডো নিজে।
তিন গাড়ির মিছিল বেরিয়ে এলো ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের হেড কোয়ার্টার থেকে। চলতে শুরু করল গাড়ি।
‘মি. সেন্ডো, আপনার কার্ডিনাল না কি ভবন, ওটা কোথায় মাটির ওপরে, না মাটির নিচে?’
সেন্ডো তার হাতের পিস্তলটা নাচাতে নাচাতে বলল, ‘রাস্তায় নামার পর ক্লু-ক্ল্যক্স-ক্ল্যানের বন্দীদের কথা বলা নিষেধ। দ্বিতীয় আর একটি কথাও বলবেন না।’
অহেতুক ক্ষ্যাপানো ঠিক মনে করল না আহমদ মুসা। অনেক কথা বের হয়েছে সেন্ডোর মুখ থেকে। আরও বের হতে পারে ধৈর্য ধরলে।
সবাই চুপচাপ। ছুটে চলেছে গাড়ি।
