ওমর বিগোভিকের ড্রইংরুম।
ওমর বিগোভিক এবং সালেহ বাহমন সোফায় পাশাপাশি বসে। দু’জনের চোখেই উদ্বেগ মুখ শুকনো।
ড্রইং রুমের পাশের ঘরে সংযোগ দরজার ওপারেই বসে আছে নাদিয়া নুর এবং তার মা। তাদেরও চোখে মুখে উদ্বেগ।
কথা বলছিল সালেহ বাহমন, ‘ভীষণ তাড়াহুড়া করে একটা জায়গার ঠিকানা চেয়েছে, হঠাৎ করেই আমি এখানকার ঠিকানা দিয়ে দিয়েছি লোকটিকে। পরক্ষণ থেকেই আমি ভাবছি, এ আমার ঠিক হয়নি। কোন হোটেল রেষ্টুরেন্টের কথা বললেই ভাল হতো।
‘লোকটির নাম কি?’ বলল ওমর বিগোতভিক।
‘নাম জানি না।’ বলল সালেহ বাহমন।
‘পরিচয়ও তো জিজ্ঞাসা করার সময় হয়নি।’
‘আমি মাত্র তাকে একটা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করেছি, সে তার উত্তর দেবার আগেই ওরা এসে পড়েছে।’ বলল সালেহ বাহমন।
ওমর বিগোভিক কথা বলল না। চোখ বন্ধ করে সে ভাবছিল। অল্পক্ষণ পর সে চোখ খুলল। বলল, মৃত্যু অথবা কিডন্যাপের হাত থেকে লোকটি তোমাকে বাঁচিয়েছে, সে দিক থেকে তাকে বিশ্বাস করা যায়। কিন্তু তার যে পরিচয়, প্রকাশ পেয়েছে সন্দেহজনক। থামল ওমর বিগোভিক।
সালেহ বাহমন বলল, শুধু তো আমাকে বাঁচানো নয়, মিলেশ বাহিনীর লোকটিকে সেই হত্যা করেছে বলা যায়, কারণ গুম করার পরামর্শ সেই দিয়েছে।
‘ঠিক বলেছ, একথাটা আমার মনেই ছিল না। এদিক দিয়ে তো দেখা যাচ্ছে সে মিলেশ বাহিনীর বিরুদ্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গরম তর্ক-বিতর্ক, এমনকি পিস্তল বের করার পর মিলেশ বাহিনীর লোকেরা তাকে ছেড়ে দিল কেন? এবং পরে সেই বা কেন মিলেশ বাহিনীর লোকদের সাথে গেল? আর তুমি যা শুনেছ সে অনুসারে সে আজ কনষ্টানটাইনের সাথে প্রিষ্টিনা থেকে এসেছে, তাহলে তো সে মিলেশ বাহিনীর প্রধান কনষ্টানটাইনের বিশ্বস্ত লোক।’ বলল ওমর বিগোভিক।
চিন্তার নতুন একটা কালো ছায়া নামল সালেহ বাহমনের মুখে। বলল, সেদিক দিয়ে তো তাই।
থামল সালেহ বাহমন। তারপরেই আবার শুরু করল, কিন্তু হাসান সেনজিক পরিবারের কারো সাথে সে কথা বলতে চায় কেন? আমি তো হাসান সেনজিক পরিবারের লোক নই, আমার সাথে কথা বলতে চাইছে কেন?
‘ঠিক আছে সালেহ বাহমন, আমরা চিন্তা করে কোন কুল পাবনা। আল্লাহ ভরসা। আসতে দাও তাকে।’
ঠিক এই সময়েই ওমর বিগোভিকের গেটের কলিং বেল বেজে উঠল।
সালেহ বাহমনের বুকটা ধক করে উঠল।
সালেহ বাহমন ও ওমর বিগোভিক পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাল।
সালেহ বাহমন উঠে দাঁড়াল। বলল, চাচাজান আপনি বসুন, আমি দেখছি। বলে সালেহ বাহমন গেটের দিকে চলল। বিসমিল্লাহ বলে গেট খুলল।
ঠিক, গেটে দাঁড়িয়ে দোকানে দেখা সেই লোকটি।
সালেহ বাহমন উদ্বেগটা ভেতরে চেপে রেখে মুখে হাসি টেনে তাকে স্বাগত জানাল। বলল, আসুন, খুব খুশি হয়েছি, ভেতরে আসুন।
উভয়ে হ্যান্ডশেক করল। তারপর লোকটিকে নিয়ে সালেহ বাহমন চলে এল ড্রইং রুমে।
ওদেরকে ঢুকতে দেখে ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল।
সালেহ বাহমন লোকটিকে তার সাথে পরিচয় করে দেয়ার জন্যে বলল, ইনি ওমর বিগোভিক। আমার মুরব্বী।
হ্যান্ডশেক করে ওমর বিগোভিক লোকটিকে বসিয়ে তার পাশে বসে পড়ল। সালেহ বাহমন আরেকটি সোফায় বসল।
বসেই সালেহ বাহমন বলল, ওর সামনে তো আমরা আলাপ করতে পারি।
লোকটি অর্থাৎ জাকুব হেসে বলল, কোন অসুবিধা নেই, বরং ভালই হবে।
একটু চুপ করেই জাকুব আবার মুখ খুলল। বলল, প্রথমেই আমার পরিচয় সুষ্পষ্ট করতে চাই। আমি মিলেশ বাহিনীর লোক, আমার নাম জাকুব।
দম নিবার জন্যে কথায় একটু বিরতি দিয়েছিল জাকুব।
নাম ও মিলেশ বাহিনীর কথা শুনেই ওমর বিগোতিক ও সালেহ বাহমনের মুখ অন্ধকার হয়ে গেল।
তাদের এই পরিবর্তন জাকুবের নজর এড়াল না।
জাকুব হাসল। বলল, জানি আমার এ পরিচয়কে আপনারা ভাল ভাবে নেবেন না। কিন্তু এটাই আমার সব পরিচয় নয়। থামল জাকুব।
সালেহ বাহমন ও ওমর বিগোতিক কোন কথা বলল না। জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে রইল জাকুবের দিকে।
জাকুব আবার শুরু করল, আমি মিলেশ বাহিনীর লোক। কিন্তু আহমদ মুসা আমাকে জয় করে নিয়েছেন। আমি এখন মিলেশ বাহিনীর হয়েও মিলেশ বাহিনীর লোক নই।
-তোমার মানে আপনার আহমদ মুসার সাথে দেখা হয়েছে? চোখে আলো জ্বালিয়ে বলল ওমর বিগোতিক।
-শুধু আহমদ মুসা নয়, হাসান সেনজিকের সাথেও দেখা হয়েছে।
-কোথায়? কেমন করে? বলল সালেহ বাহমন।
‘সে এক বিরাট কাহিনী’ শুরু করল জাকুব, ‘সেদিন মিলেশ-এর জন্মদিনে আমি ছিলাম কসভোর মিলেশ স্মৃতি স্তম্ভে। শোনা গেল হাসান সেনজিকের মত একজনকে গাড়িতে মিলেশ স্মৃতি স্তম্ভের পাশ দিয়ে সিটানিক নদীর দিকে যেতে দেখা গেছে। দুরবীণ দিয়ে দেখা গেল তাদের গাড়ি মুরাদের বিজয় সৌধের কাছে থেমেছে। আমাকে ও আমার চাচাত ভাইকে পাঠানো হলো নিশ্চিত হবার জন্যে। আমরা ছুটলাম। গিয়ে আমরা হাসান সেনজিককেই সামনে পেলাম। নিশ্চিত হয়ে আমরা বিজয় সৌধের একটু আড়ালে গিয়ে পরিকল্পনা অনুসারে সংকেত দিলাম। এর কিছুক্ষণ পরেই আমরা দেখলাম, হাসান সেনজিক এবং আরো দু’জন তড়িঘড়ি গিয়ে গাড়িতে উঠেছে। বুঝলাম ওরা পালাচ্ছে আমাদের টের পেয়ে। আমরা দু’জন পিস্তল বাগিয়ে ছুটলাম। কয়েক মুহূর্ত পরেই পেছনে রিভলভারের গুলির আওয়াজ শুনে চমকে উঠে আমরা ফিরে দাঁড়ালাম। দেখলাম উদ্যত রিভলবার হাতে এক যুবক। আমাদেরকে পিস্তল ফেলে দিয়ে ব্রীজের দিকে হাটবার নির্দেশ দিল। বুঝলাম, আমাদের গুলি করে নদীতে ফেলে দেবার জন্যেই নিয়ে যাচ্ছে। আমরা মৃত্যুভয়ে তখন অস্থির। কাঁপছিলাম আমরা। ব্রীজের উপর নিয়ে আমাদের দাঁড় করিয়ে জিজ্ঞেস করল, আমরা কতদিন ধরে মিলেশ বাহিনীতে আছি, বাড়ীতে কে কে আছে। আমরা সত্য জবাব দিলাম। তারপর তিনি আমাদের জিজ্ঞাসা করলেন, আমরা সাঁতার জানি কিনা। জানি শুনে বললেন, যাও তোমরা সিটনিকে লাফিয়ে পড়ে চলে যাও, এটাই তোমাদের শাস্তি। আমরা কানকে বিশ্বাস করতে পারলাম না। জীবন নিতে আসা শত্রুকে যে কেউ মাফ করে, কেউ ছেড়ে দেয় এই প্রথম দেখলাম।
আমরা নদীতে ঝাপিয়ে পড়ে চলে এলাম। আমরা দুই ভাই ঠিক করেছিলাম তাদের বিরুদ্ধে আর যাব না। কিন্তু সেই রাত্রেই যেতে হল।
হাসান সেনজিকের সাথে সেদিন ঐ গাড়িতে ছিল আরও দু’জন, মাজুভ ও নাতাশা স্বামী-স্ত্রী। মাজুভ প্রিষ্টিনা শহরের মিলেশ বাহিনীর একজন নেতৃস্থানীয় লোক। প্রমাণ পাওয়া গেল এবং দেখা গেল সে আহমদ মুসার পক্ষে যোগ দিয়েছে। আরও অনুমান করা হলো এবং খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হওয়া গেল তার বাড়িতে আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিক আছে। সংঙ্গে সঙ্গেই সিদ্ধান্ত হলো সেই রাতেই মাজুভ, নাতাশা, হাসান সেনজিক ও আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ, না পারলে হত্যা করা হবে। ঠিক হলো সার্ভিয়া প্রদেশের মিলেশ বাহিনীর প্রধান দূর্ধর্ষ জারজেস জিবেঙ্কু সহ নয়জন এই অভিযানে অংশ নেবে। আমার ভাই যেতে রাজি হলো না, তাকে গুলি করে মারা হলো। ভয়ে আপত্তি না করে আমি অভিযানে শরিক হলাম।
আটজন দু’ভাগে ভাগ হয়ে আমরা চারজন গেলাম মাজুভ ও নাতাশাকে ধরে আনতে দোতালায়, অন্য চারজন গেল হাসান সেনজিক ও আহমদ মুসাকে কিডন্যাপ অথবা হত্যা করতে।
আমরা চারজন সফল হলাম। মাজুভকে ধরে নিয়ে এসে গাড়িতে তুললাম। নাতাশা কাঁদতে কাঁদতে এমনিতেই সাথে এসেছিল। জোর করে আনতে হয়নি।
কিন্তু অন্য চারজন তখনও ফেরেনি। এই সময় আমরা গাড়িতে এসে উঠতেই ভেতর থেকে ষ্টেনগানের গুলির শব্দ পাওয়া গেল।
আমাদের দু’জন ছুটল কি হল খোঁজ নেবার জন্যে। ওরা যাবার কয়েকমুহূর্ত পরেই আবার রিভলভারের দু’টি গুলির শব্দ হলো। রিভলভারের গুলির পর পরই আহমদ মুসাকে রিভলভার হাতে ছুটে নেমে আসতে দেখলাম আমরা। বুঝা গেল আমাদের লোকেরা পরাজিত হয়েছে। জারজেস একটা গুলি করল আহমদ মুসাকে। কিন্তু তার আগেই সে লনে শুয়ে পড়েছিল।
এই অবস্থায় ভয়ে আমরা মাজুভকে নিয়ে গাড়ি করে পালালাম। কিন্তু নাছোড়বান্দা আহমদ মুসা মাজুভকে উদ্ধারের জন্যে আমাদেরই অন্য গাড়িটা নিয়ে আমাদের পিছু নিল। বেলগ্রেড হাইওয়ে দিয়ে দেড়শ মিটার আসার পরেই আহমদ মুসা আমাদের ধরে ফেলল। জারজেস জিবেঙ্কু পালাতে গিয়ে নিহত হলো। পেছনের সিটে আমি ও মাজুভ ছিলাম। আমি আগেই মাজুভের কাছে আত্মসমর্পন করেছিলাম। এবারও আহমদ মুসা আমাকে মাফ করে দিলেন। অভিযানের ৮ জনের মধ্যে আমিই শুধু বেঁচে গেলাম।
দু’টি গাড়িতে করে আমরা প্রিষ্টিনায় ফিরে যাচ্ছিলাম। প্রিষ্টিনার কাছাকাছি পৌঁছতেই মিলেশ বাহিনীর নেতা স্বয়ং কন্সটান্টাইনের নেতৃত্বে দু’টি গাড়ি আমাদের গতিরোধ করে দাঁড়ায়। গতিরোধ করেই ওরা আমাদের উপর মেশিনগানের অবিরাম গুলি বর্ষণ শুরু করে। তারপর আমার কিছু মনে নেই। আমার জ্ঞান ফিরল কোকা শহরে মিলেশ বাহিনীর ঘাটিতে। জ্ঞান ফিরেই সামনে দেখলাম মিলেশ বাহিনীর নেতা কনষ্টান্টাইনকে। আঁতকে উঠলাম, তাহলে কি আহমদ মুসাদের সবাইকে বন্দী করেছে অথবা মেরে ফেলেছে। পরে ওদের কাছেই শুনলাম, গ্যাস বোমা ফেলে সবাইকে অজ্ঞান করে বন্দী করে কোকার ভূগর্ভস্থ বন্দীখানায় বন্দী করে রাখা হয়েছে। আট ঘন্টার আগে কারও জ্ঞান ফিরবে না। আমাকে ওদের কাছ থেকে উদ্ধার করে ইনজেকশন দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হয়েছে। আরও শুনলাম সকাল ৮ টায় মিলেশ বাহিনীর দরবার বসবে, সেখানে আহমদ মুসা, হাসান সেনজিক, মাজুভ ও নাতাশাকে এনে তাদের জ্ঞান ফিরিয়ে মহা উৎসবের মাধ্যমে তাদের হত্যা করা হবে।
মনটা আমার খুব খারাপ হয়ে গেল। আসলে মানুষকে আপন করে নেবার অদ্ভুত ক্ষমতা আছে আহমদ মুসার। তাছাড়া আহমদ মুসার মত বিষ্ময়কর সাহসী, অকল্পনীয় ক্ষিপ্র এবং অপরূপ কুশলী মানুষ মিলেশ বাহিনীর হাতে মারা যাবে আমার মন কিছুতেই মেনে নিতে চাইছিল না।
পৌনে ৮টায় দরবার বসল। ৮টায় কনষ্টান্টাইন দরবারে আসবেন। পৌনে ৮টায় ৯ জনকে পাঠানো হলো ভূগর্ভস্থ বন্দীখানা থেকে আহমদ মুসা, হাসান সেনজিক, মাজুভ ও নাতাশাকে আনার জন্যে।
আমার সামনে দিয়েই ওরা চলে গেল। আমার মনে হল আমার বুকের উপর দিয়ে ওরা যাচ্ছে। এত কষ্ট লাগল আমার। আমি উঠে দাঁড়ালাম। ওদের বীভৎস উৎসব নিজ চোখে দেখতে পারবো না।
আমি কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক পায়চারি করে বাগানের দিকে যাবার জন্যে সিঁড়ি দিয়ে এক তলায় নামছিলাম। শেষ সিঁড়ি থেকে করিডোরে পা দিয়ে সামনে তাকিয়ে ভূত দেখার মত চমকে উঠলাম। সামনেই আহমদ মুসা, মাজুভ, হাসান সেনজিক ও নাতাশাকে দেখলাম। আহমদ মুসার হাতে ষ্টেনগান।
চমকে উঠার পরক্ষণেই খুশিতে আমার মন ভরে গেল। ওরা মুক্ত হতে পেরেছে দেখে আনন্দিত হলাম। ওরা চলে আসার সময় আমি আহমদ মুসাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, বেলগ্রেডে কোথায় আমি তাদের সাক্ষাৎ পাব। আমাকে হাসান সেনজিকের বাড়ির ঠিকানা দিয়ে ওখানেই তাদের খোঁজ নিতে বলা হয়েছিল। সেজন্যেই আমি আজ হাসান সেনজিকের ওখানে গিয়েছিলাম।
একটু থামল জাকুব। থেমেই আবার বলল, এত কথা বললাম এই কারণে যে মিলেশ বাহিনীর একজন লোককে বিশ্বাস করা আপনাদের জন্যে সহজ নয়।
ওমর বিগোভিক ও সালেহ বাহমনের মুখ তখনও হা হয়ে আছে। তারা যেন বিষ্ময়কর এক রূপকথা শুনছিল।
জাকুব থামার পর ওমর বিগোভিক বলল, আপনাকে ইনজেকশন দিয়ে জ্ঞান ফেরানো হলো। কিন্তু আহমদ মুসারা চারজন কি করে জ্ঞান ফিরে পেল? কেমন করেই বা তারা মুক্ত হলো? অবিশ্বাস্য ঘটনা।
জাকুব বলল, সেদিন মিলেশ বাহিনীর সকলের মনেই এ প্রশ্ন জেগেছিল, আমার মনেও জেগেছিল। কিন্তু উত্তর আমরা পাইনি। ওরা চলে যাবার পর বন্দীখানায় গিয়ে ষ্টেনগানের গুলিতে ঝাঝরা হয়ে যাওয়া মিলেশ বাহিনীর লোকদের ৯ টি লাশ পাওয়া গেছে। মিলেশ বাহিনীর সবার কাছেই ঘটনাটা অবিশ্বাস্য হয়ে আছে। কিন্তু আমি মনে করি আহমদ মুসাকে যতটুকু আমি দেখেছি তাতে মনে হচ্ছে, আহমদ মুসা সব অসম্ভবকেই সম্ভব করতে পারেন। অথচ লোকটির নিষ্পাপ হাসি, সরল মুখ, অত্যন্ত ভদ্র ও দয়ালু ব্যবহার দেখে মনেই হয় না যে অমন এক দুর্ধর্ষ লোক তিনি।
জাকুব থামতেই সালেহ বাহমন প্রশ্ন করল, ওরা কি বেলগ্রেড এসেছেন?
জাকুব বলল, আমি নিশ্চিত ওরা বেলগ্রেড এসেছেন। কিন্তু মিলেশ বাহিনী প্রমান পাচ্ছে না যে, তারা বেলগ্রেড এসেছেন। দক্ষিণ ও পশ্চিম দিক থেকে যত রাস্তা বেলগ্রেডে প্রবেশ করেছে, সব রাস্তার মুখে সকাল থেকেই মিলেশ বাহিনী পাহারা বসিয়েছে। প্রত্যেক ব্যক্তি, প্রত্যেকটি গাড়ি পরীক্ষা করা হয়েছে। তাদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কারোর শহরে ঢুকা অসম্ভব।
-তাহলে আপনি নিশ্চিত হচ্ছেন কি করে যে তারা বেলগ্রেড এসেছেন? বলল সালেহ বাহমন।
-আমি আগেই বলেছি, আহমদ মুসা এমন এক লোক যিনি অসম্ভবকে সম্ভব করেন। বুঝছেন না, মাজুভের মত মিলেশ বাহিনীর একজন নেতৃস্থানীয় লোক কি করে আহমদ মুসার ভক্তে পরিণত হলো, আর আমিই বা কি করে এত তাড়াতাড়ি মিলেশ বাহিনীর বিরুদ্ধে দাঁড়াবার সাহস পেলাম।
-আপনার কথাটাই বলুন তো, কেন কিসে আপনার এই পরিবর্তন? বলল সালেহ বাহমন।
-প্রথমেই আহমদ মুসার দয়া, উদারতা আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমি ভেবেছি, শত্রুর কাছে যে লোক অত সুন্দর হয় সে অনেক বড় মানুষ। দ্বিতীয়তঃ তাকে দেখে আমার অতীতের কথা মনে হয়েছে। আমার দাদা এবং পূর্বপূরুষ মুসলমান ছিলেন। আহমদ মুসাকে দেখে আমার মনে হয়েছে, মুসলমান হওয়া একটা গৌরবের বিষয়। এ দু’টি বিষয়ই মিলেশ বাহিনীর সাথে আমার সম্পর্ক নষ্ট করেছে।
-আহমদ মুসারা বেলগ্রেডে এলে কোথায় উঠতে পারে বলে আপনি মনে করেন? বলল ওমর বিগোভিক।
-এটা বলা মুশকিল। আহমদ মুসার সাথে মাজুভ রয়েছে। মাজুভ বেলগ্রেডের সব কিছুই জানে। সুতরাং তাদের কোন অসুবিধা হবে না। বলল জাকুব।
একটু থেমেই আবার সে বলল, এতক্ষন আমি আমার কথাই বলেছি, আমি যা জানতে চাই তা জানা হয়নি। আপনাদের পরিচয়ও জানা হয়নি।
ওমর বিগোভিক বলল, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকুরীচ্যুত একজন শিক্ষক, এখন ব্যবসা করি।
ওমর বিগোভিক থামলে সালেহ বাহমন বলল, আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র। আরেকটা ছোট পরিচয় আছে। সেটা হলো, আমি হোয়াইট ক্রিসেন্টের একজন কর্মী।
হোয়াইট ক্রিসেন্টের নাম শুনে জাকুব আগ্রহী হয়ে উঠল। বলল, এ সংগঠনের কথা মিলেশ বাহিনীতে এখন খুব আলোচনা হচ্ছে। সংগঠনের বিস্তার কেমন হয়েছে, শক্তি সামর্থ কেমন অর্জন করেছে?
-নতুন সংগঠন। সংগঠিত হওয়ার পর্যায় চলছে। এখনও উল্লেখ করার মত কিছু সংগঠন করতে পারেনি।
-নতুন বটে, মিলেশ বাহিনীতে কিন্তু আতংকের সৃষ্টি হয়েছে। তারা ভয় করছে মুসলমানরা সংগঠিত হলে তাদের গায়ে আর হাত দেয়া যাবেনা, প্রতিটি আঘাতের প্রত্যাঘাত আসবে।
-তারা আঘাত না দিলেই তো পারে, শান্তিতে সহাবস্থান করা যায়। বলল ওমর বিগোভিক।
-এই শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকেই মিলেশ বাহিনী এবং বিদ্বেষবাদী খ্রিষ্টানরা যমের মত ভয় করে।
-কেন? বলল সালেহ বাহমন।
-শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অর্থ হলো, তারা মনে করে, খ্রিষ্টানদের বিপর্যয় এবং মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি ও বিকাশ। বলল জাকুব।
-কেমন করে? বলল সালেহ বাহমন।
-আসলে খৃষ্টধর্ম তো কোন জীবন-ধর্ম নয়, নিষ্ক্রিয় কিছু বিশ্বাসের সমষ্টি মাত্র, যার আবার কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। সুতরাং এ ধর্ম আজকের দিনের চাহিদা পুরণ করতে পারছে না। অন্যপক্ষে, তারা মনে করে, ইসলাম একটি জীবন-ধর্ম। ইসলাম শুধু বিশ্বাস নির্ভর নয়, কাজ নির্ভর ধর্ম, যা বিজ্ঞান ও বাস্তবতা সম্মত। সুতরাং মুসলমানরা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের সুযোগ পেলে তাদের প্রভাব খৃষ্টানদের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়বে। শান্তি ও সত্য সন্ধানী সব খৃষ্টান ইসলামের ছায়ায় গিয়ে আশ্রয় নেবে।
-খৃষ্টানরা মুসলমানদের এত ভয় করে? বলল ওমর বিগোভিক।
-ভয় করবে না? সোভিয়েত ইউনিয়নে কম্যুনিষ্ট সরকার সেখানকার মুসলমানদের জাতিসত্তা ধ্বংসের জন্যে হেন ব্যবস্থা নেই যা গ্রহণ করেনি। আরবী ভাষা বিলুপ্ত করেছে, কোরআন পড়া ও ধর্মীয় শিক্ষা বন্ধ করেছে, সচেতন মুসলমানদের হত্যা করেছে, চালান নীতির মাধ্যমে মুসলিম জনশক্তিকে বিভক্ত, বিশৃঙ্খল করে দিয়েছে। ইতিহাস বিকৃত করে অতীত থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করেছে, অন্য ধর্মাবলম্বীদের সাথে বিয়ে বাধ্যতামুলক করে তাদের জাতীয় বিশুদ্ধতা বিনষ্ট করেছে এবং ধর্ম-কর্ম অপ্রোয়জনীয় ও নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে। যুগের পর যুগ ধরে এই শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা চলার পরেও দেখা যাচ্ছে মুসলমান জাতির মৃত্যু হয়নি। বরং অবস্থা এতটাই উদ্বেগজনক হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, মুসলমানরাই অদুর ভবিষ্যতে সোভিয়েত ইউনিয়নের সংখ্যাগুরু জাতিতে পরিণত হবে। অর্থাৎ মুসলমানদের বিশ্বাসের কোন মৃত্যু নেই, বরং প্রতিকুল পরিবেশে এ বিশ্বাস আরও তাজা হয়ে ওঠে। এ কারণেই মিলেশ বাহিনী মুসলিম-নিধন নীতি গ্রহণ করেছে। তাদের কথা, মুসলমানদের বাঁচিয়ে রাখলে আর ওদের সাথে পারা যাবে না। থামল জাকুব।
-মেরে কি একটা জাতিকে শেষ করা যায়? বলল ওমর বিগোভিক।
-সেটা তারা ভাবছে না। তারা ভাবছে, যা তারা করছে, তার কোন বিকল্প নেই।
কথা শেষ করেই জাকুব বলল, আমার মূল প্রশ্নটায় আমি ফিরে আসতে চাচ্ছি। হাসান সেনজিক পরিবারের কারো সাথে যোগাযোগের পথ কি?
সালেহ বাহমন হাসল। বলল, ওর বাড়ীতে কোন ব্যাটা ছেলে নেই।
হাসান সেনজিকের মা ও ফুফু ছাড়া কোন মেয়ে ছেলেও আর নেই।
বাড়ীর আয়া, চাকর-বাকর তো কিছুই জানে না। অতএব তাদের ওখানে যোগাযোগের কোন পথ নেই। তাদের সাথে অন্যভাবে যোগাযোগ করতে হয়। আমরা এ ব্যাপারে আপনাকে সাহায্য করব।
জাকুব বলল, আমার বেশি প্রয়োজন নেই। আমি আহমদ মুসার সাথে যোগাযোগ করতে চাই। এই যোগাযোগের পয়েন্ট হিসাবে তিনি হাসান সেনজিকের বাড়ির কথাই উল্লেখ করেছেন।
‘ঠিক আছে, উনি যোগাযোগ করলেই আমরা আপনাকে জানাব।’ বলল সালেহ বাহমন।
কথা শেষ করেই সালেহ বাহমন আবার বলল, কিন্তু আপনাকে আমরা পাব কোথায়? জাকুব একটা চিরকুট সালেহ বাহমনের হাতে তুলে দিতে দিতে বলল, এটা মিলেশ বাহিনীর নতুন হেড কোয়ার্টারের ঠিকানা। ঠিকানাটা আপনাদের অবগতির জন্য দিলাম। ওখানে আমার খোঁজ করার দরকার নেই। আমি নিজেই হাসান সেনজিকের বাড়ির পাশের দোকানগুলোতে বিশেষ করে ঐ দোকানের ঐ সেলসম্যানের কাছে খোঁজ করব।
‘ঠিক আছে, এটাই সবচেয়ে সহজ হবে।’ বলল সালেহ বাহমন।
এই সময় ভেতরের দরজায় নক করার শব্দ হলো।
ওমর বিগোভিক ভেতরে চলে গেল।
গিয়েই ফিরে এসে হাসতে হাসতে বলল, আমার ভুল হয়ে গেছে, মেহমানকে শুধু কথাই শোনাচ্ছি, কোন মেহমানদারী এখনও হয়নি। ভেতর থেকে এই অভিযোগ উঠেছে। সুতরাং আপনারা একটু বসুন, আমি আসছি। বলে ওমর বিগোভিক ভেতরে চলে গেল।
সালেহ বাহমন বলল, বিকালে আমার নাস্তা হয়নি, সত্যিই ক্ষুধা পেয়েছে। বলে আবার আলোচনায় ফিরে এল তারা।
‘মা নাদিয়া, আনেক ঘটনা ঘটেছে, আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকরা বেলগ্রেড এসে পৌঁছেছে, এ খবর তো ডেসপিনার কাছে তোমাকে পৌঁছাতে হয়।’ বলল ওমর বিগোভিক।
‘আমার যেন বিশ্বাস হতে চাইছে না। ওরা সত্যিই কি এত প্রতিরোধের মধ্যে বেলগ্রেড ঢুকতে পেরেছেন?’ বলল নাদিয়া নূর।
‘জাকুবের কথা তোমরাও তো শুনেছ। আহমদ মুসা কি করে মিলেশ বাহিনীর পাতা জাল একের পর এক ছিন্ন করেছে, সে সব ঘটনা অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য মনে হয়নি? যদি ঐ অবিশ্বাস্য ব্যাপারগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমার কাছে যা এখন অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে তা সত্য হবে না কেন?’ বলল ওমর বিগোভিক।
‘এই খবর ডেসপিনা এবং হাসান সেনজিকের মা শুনলে ভয়ানক খুশী হবে, আমি এখনই যাই আব্বা ডেসপিনার ওখানে।’ বলল নাদিয়া নূর।
‘আমি তো সে কথাই বলছি, ওদের তাড়াতাড়ি জানান দরকার খবরটা। আর আমরাও জানতে পারব কোন খবর তারা জানে কিনা।’ বলল ওমর বিগোভিক।
‘ঠিক বলেছেন,’ বলে উঠে দাঁড়াল নাদিয়া। হাতের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে চলে গেল নিজের ঘরের দিকে তৈরী হবার জন্যে।
৪
শোয়া থেকে উঠে আড়মোড়া ভেঙে টান হয়ে বসে আহমদ মুসা বলল, এভাবে শুয়ে থাকলে শুয়ে থাকার মজা পেয়ে বসবে। আর নয়।
বলে আহমদ মুসা বাথরুমে গেল।
পাশেই আরেকটা সিটে হাসান সেনজিক শুয়েছিল।
গতকাল বিকেলে আহমদ মুসারা বেলগ্রেড এসে পৌঁছেছে। উঠেছে মাজুভের বোনের বাসায়। মাজুভের বোন ৭ বছরের এক মেয়ে নিয়ে বিরাট এক বাড়িতে বাস করে। মাজুভের ভগ্নিপতি নৌবাহিনীর একজন উচ্চ পদস্থ অফিসার। সে আছে এখন অদ্রিয়াতিক সাগরে।
মাজুভদের বিশেষ করে নাতাশাকে পেয়ে তার বোন মহাখুশি। নাতাশাও হাফ ছেড়ে বেঁচেছে প্রাণ খুলে কথা বলার লোক পেয়ে।
মাজুভের বোনের বাসা বেলগ্রেডের অভিজাত এলাকার সেনাবাহিনীর অফিসার কলোনীতে।
গতকাল থেকে গোটা সময়টাই মাজুভ, নাতাশা, হাসান সেনজিক ও আহমদ মুসা ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। ক’দিনের উদ্বেগ-অস্থিরতার পর নিরাপদ ঘুমটা সবার জন্যেই মধুর হয়েছে। খাওয়া আর নামাজ ছাড়া আর কিছুই করেনি আহমদ মুসারা।
এই সময় তাদের নিস্তরঙ্গ জীবনে তরঙ্গ তুলেছে মাজুভের ৭ বছরের ভাগ্নী রিটা রাইন। মাজুভের বোন মারিয়া মাজুভ ও নাতাশার নামাজ পড়া দেখে ভীত হয়েছে, কিন্তু নামাজ পড়া দেখে খুব মজা পেয়েছে রিটা। তার প্রশ্নের জবাব দিতে সবাই অস্থির।
নাতাশাকে প্রথম নামাজ পড়তে দেখে রিটা অবাক হয়ে তার সামনে হা করে দাঁড়িয়ে থেকেছে। বার বার প্রশ্ন করেছে, কি করছ, কি করছ তুমি বল? কথা বলছ না কেন? সিজদায় গেলে নাতাশার চুল ধরে টানাটানি করেছে আর বলছে, কি হল তোমার মামী? এ রকম করছ কেন? কথা বলছ না কেন?
নাতাশা নামাজ পড়ছে, জবাব দেবে কেমন করে!
অবশেষে মারিয়া এসে রিটাকে ধরে সরিয়ে নিয়ে নাতাশাকে রক্ষা করেছে।
নামাজ শেষে নাতাশা রিটাকে কাছে টেনে বলেছে, নামাজের সময় কথা বলে না, কথা বলব কি করে?
-কেন বলে না? প্রশ্ন করেছে রিটা।
-আমার তোমার সকলের স্রষ্টা যে আল্লাহ সেই আল্লাহর হুকুম নামাজের সময় কথা বলা যাবে না, আর নামাজ যে পড়ছে তাকে কিছু জিজ্ঞাসাও করা যাবে না।
-নামাজ কি?
-নামাজ আল্লাহর কাছে প্রার্থনা।
-আম্মা নামাজ পড়ে না কেন?
বিপদে পড়ে গেল নাতাশা। এখন কি জবাব দেবে? কাছেই মারিয়া দাঁড়িয়েছিল। মুখ টিপে হেসে বলেছে, এখন জবাব দাও। তোমাদের নতুন ধর্ম গ্রহণে কি সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে দেখ।
নাতাশা রিটাকে কাছে টেনে আদর করে বলেছে, তোমার আম্মাও তো প্রার্থনা করে।
-কোথায় করে, একদিনও তো আমি নামাজ পড়তে দেখিনি।
-কেন গির্জায় যায় তো রোববারে। সেখানে প্রার্থনা করে তো।
-তোমার মত বাড়িতে নামাজ পড়ে না কেন?
মহা বিপদে পড়ে গেল নাতাশা। এখন কেমন করে বলে যে, তার মা খৃষ্টান, আর নাতাশারা মুসলমান। আর বললে বিপদ কমবে না, আরও বাড়বে। অবশেষে নাতাশা কোন রকমে পাশ কাটাবার জন্যে বলেছে, সবাই নামাজ পড়ে না, দেখ না আমি আগে পড়তাম না, এখন পড়ি। তোমার মাও একদিন পড়বে।
রিটা বোধ হয় কথাটার যুক্তি বুঝেছিল। সে একটু দম নিল। এই সময় মাজুভ রিটাকে ডাকলে সে ছুটে সেদিকে চলে গেল।
সে চলে যায় বটে, কিন্তু তার মা মারিয়া ধরে বসে নাতাশাকে। বলে, শিশুর কাছে মিথ্যা কথা বলা হলো না? আমি নামাজ পড়ব একথা কি ঠিক?
নাতাশা হেসে মারিয়ার হাত ধরে বলেছে, আপা, আমি ভবিষ্যতের কথা বলেছি। ভবিষ্যতের কথা নিশ্চিত করে আমিও বলতে পারিনা, আপনিও বলতে পারেন না। আমি ইসলাম গ্রহণ করব কোনদিন ভাবিনি।
-অর্থাৎ তুমি বলতে চাচ্ছ, তুমি যা ভাবনি তা যখন ঘটেছে, আমার ক্ষেত্রেও তা ঘটতে পারে।
-ঠিক তা আমি বলিনি। আমি নিছক একটা নীতি কথা বলেছি।
মারিয়া হেসে বলেছিল, তোমরা এই অভাবনীয় কান্ড কিভাবে ঘটালে? ভাবনা-চিন্তার জন্যেও তো সময় দরকার, সে সময়ও তো তোমরা নাওনি। যাদুতে আমি বিশ্বাস করলে বলতাম তোমরা যাদুর কবলে পড়েছ।
নাতাশা বলেছে, কোন ধর্ম যদি পড়া-শুনা করে বুঝে-সমঝে গ্রহণ করতে হয়, তাহলে তার জন্যে সময় দরকার হয়। কিন্তু আমরা পড়ে-বুঝে তো ইসলাম গ্রহণ করিনি। আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি ইসলামকে স্বচক্ষে দেখে।
-সেটা কি রকম? বিমূর্ত কোন আদর্শকে কি দেখা যায়, ইসলামের কি কোন রূপ আছে?
-আদর্শ বিমূর্ত, আদর্শ দেখা যায় না। কিন্তু আদর্শবান মানুষের মধ্যে আদর্শকে জীবন্ত রূপে দেখা যায়। আমরা আহমদ মুসার মধ্যে ইসলাম দেখেছি। তাঁর প্রার্থনায়, তাঁর স্বভাবে, তাঁর আচরণে যে ইসলামকে এক মুহূর্তে আমরা চিনেছি, তা পড়ে বুঝতে বছরের পর বছর লাগত। এ কারণেই ইসলাম গ্রহণে আমাদের দেরি হয়নি।
একটু থেমে দম নিয়েছিল নাতাশা। তারপর আবার শুরু করে, ইসলাম সম্পর্কে অনেক কুৎসা শুনেছি, ইসলামের একটা ভয়ংকর রূপ আমাদের সামনে ছিল। সম্ভবত এ কারণেই ইসলামের প্রকৃত রূপ যখন আমরা দেখলাম, তখন আমরা অভিভূত হয়েছি বেশি। শত্রুর প্রতি যে মানবীয় আচরণ, মানুষের প্রতি যে ভালবাসা এবং সুন্দর ও সুদৃঢ় চরিত্র আমরা আহমদ মুসার মধ্যে দেখেছি, তা আমাদের জয় করে নিয়েছে। সুলতান সালাহউদ্দিনের কাহিনীকে রূপকথা মনে করতাম, কিন্তু আহমদ মুসার মধ্যে তাকে আমরা জীবন্ত দেখেছি।
মারিয়া নাতাশার কথাগুলো গভীর মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
নাতাশার কথা শেষ হলেও কিছুক্ষণ মারিয়া কথা বলেনি। সে কিছুটা আনমনা হয়ে পড়েছিল। বলেছিল, সত্যি নাতাশা, গতকাল থেকে আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের সাথে আমার পাঁচবার দেখা হয়েছে, আলাপও করেছি তাদের সাথে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার একবারও ওরা চোখ তুলে কথা বলেনি।
মারিয়া থামলে নাতাশা বলেছিল, ওরা যখন প্রার্থনায় দাঁড়ায় তখন মনে হয় ওরা যেন এ পৃথিবীর মানুষ নয়-দেবদূত। আবার যখন ওরা সংঘাত-সংঘর্ষের ময়দানে, তখন ওরা কঠোর বাস্তববাদী এবং বিবেচক মানুষ। ভাববাদ ও বাস্তববাদিতার এমন অনুপম সমন্বয় শুধু মুসলিম চরিত্রেই দেখলাম।
এ সময় রিটা আবার ছুটে আসে এবং নাতাশাকে জড়িয়ে ধরে বলে, মামী নতুন মামারা নামাজে ওগুলো কি পড়ছে?
নাতাশা তাড়াতাড়ি রিটাকে আহমদ মুসার ঘরের দরজা পর্যন্ত ঠেলে নিয়ে বলেছিল, ওদের পাশে গিয়ে চুপ করে বস। নামাজ শেষ হলে তোমার নতুন মামাকে জিজ্ঞেস করে নিও ওরা কি পড়ছিল।
রিটা ওঘরে চলে যায়।
‘আর এক ধাক্কা রিটার হাত থেকে বাঁচা গেল আপা।’ বলল নাতাশা।
মারিয়া গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল রিটার হাত থেকে এভাবে বাঁচবে সমাজের হাত থেকে কি বাঁচতে পারবে। তোমার সব যুক্তিই মানলাম সবই ঠিক আছে, কিন্তু এই দিকটা কেন একবারও ভাবনি তোমার? দেখছ না গোঁটা বলকানে আজ মুসলমানদের অস্তিত্ব বিনাশের চেষ্টা চলছে?
নাতাশাও গম্ভীর কণ্ঠে বলেছিল। আপা আমরা সবদিকই ভেবে দেখেছি। সব ভেবে পরকালের চিরন্তন শান্তিকেই আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি এর সাথে এ পৃথিবীতে শান্তির একটা বাড়তি লাভের ব্যাপার তো আছেই।
তোমাদের আশা পূর্ণ হোক। তোমাদের মত করে ভাবতে এখনও আমি পারছিনা নাতাশা। বলে মারিয়া নাতাশার চিবুকে একটা চুমু দিয়েছিল। মাজুভ মারিয়ার ছোট। নাতাশা মারিয়ার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী। খুব ভালবাসে মারিয়া নাতাশাকে।
আহমদ মুসা বাথরুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখল, হাসান সেনজিক উঠে বসেছে।
তুমি আবার উঠেছ কেন শুয়ে থাক। আমি বাইরে বেরুবো তাই উঠলাম। বলল আহমদ মুসা।
‘আমিও তো যাব।’ বলল হাসান সেনজিক।
‘না তুমি যাবে না।’ বলল আহমদ মুসা।
এই সময় ঘরে প্রবেশ করল মাজুভ। আহমদ মুসার শেষ কথাটা শুনেছিল মাজুভ।
বলল কে যাবে না, আপনি কোথাও বেরুচ্ছেন মুসা ভাই?
‘হ্যাঁ বেরুচ্ছি। কিন্তু তুমি আর হাসান সেনজিক বাড়িতে থাকবে। আমি একাই একটু বেরুব।’ বলল আহমদ মুসা।
‘আপনি একা কেন, আমরা থাকব না কেন?’ বলল মাজুভ।
আহমদ মুসা বলল, ‘তুমি ও হাসান সেনজিক সকলের চেনা। তোমাদের সাথে নিলে কারো চোখের আড়ালে থাকা যাবে না। আমি একবার নিরুপদ্রবে বেড়িয়ে আসতে চাই হাসান সেনজিকদের শহীদ মসজিদ রোডটা।
মাজুভ ও হাসান সেনজিক আর বাধা দেবার সাহস পেল না। মাজুভ শুধু বলল, আপনি মিলেশদের জীপটা না নিয়ে আমার দুলাভাইয়ের কারটা নিয়ে যান। এটাই ভালো হবে।
সঙ্গে সঙ্গেই না সুচক জবাব দিয়ে আহমদ মুসা বলল, তোমার ভগ্নিপতি আমাদের আশ্রয় দিয়েছেন এই-ই যথেষ্ট, তাঁকে আমাদের সাথে জডাতে চাই না। তার গাড়ি নিলে চিহ্নিত হয়ে যেতে পারেন তিনি।
এবারও মাজুভ নিরব হয়ে গেল। মনে মনে আহমদ মুসার দুরদৃষ্টির প্রশংসা করল। আরও ভাবল, নিজেকে ঝুকির মধ্য ফেলেও অন্যের মঙ্গল চিন্তা এভাবে কয়জন করতে পারে।
আহমদ মুসা প্রস্তুত হয়ে বেরিয়ে গেল। জীপে উঠল আহমদ মুসা মিলেশ বাহিনীর কাছ থেকে নিয়ে আসা সেই জীপ। গাড়ির নাম্বার আবার পাল্টানো হয়েছে। একটা পরিচিত সরকারী ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানের অকেজো হয়ে পডে থাকা নাম্বার এবার ব্যবহার করা হয়ছে।
জীপের ড্রাইভিং সিটে বসে ষ্টার্ট দিল।
পাশেই সিটের উপর শহরের একটা মানচিত্র। মানচিত্রে শহীদ মসজিদ রোডের বিস্তারিত বিবরণ দেয়া হয়েছে।
শহরের নানা রাস্তা ঘুরে আহমদ মুসা প্রবেশ করল শহীদ মসজিদ রোডে। শহীদ মসজিদ রোডের মুখেই তার জীপ দাঁড করানো হলো। দু’পাশে থেকে দু’জন এসে গাড়ী এবং তার দিকে শ্যেন দৃষ্টিতে তাকাল আহমদ মুসা কোন ছদ্মবেশ নেয়নি। তাকে চিনে এমন খুব একটা কেউ নেই। সেদিন রাতের বেলা ওদের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিল। কিন্তু তাকে ভালো করে দেখার সুযোগ কারোও হয়নি। এটা সে নিজেই দেখেছে।
দু’পাশ থেকে আসা দু’জন লোক একবার শ্যেন সন্ধানী দৃষ্টি ফেলেই চলে গেল।
আহমদ মুসা দু’পাশের পরিবেশ দেখে বুঝল ওদের আরও লোক এখানে আছে।
গাড়ি নিয়ে সামনে এগিয়ে চলল আহমদ মুসার।
শহীদ মসজিদ রোডের প্রায় মাঝামাঝি এসে পডেছে আহমদ মুসার গাড়ি, সামনেই হবে হাসান সেনজিকের বাড়ি। আহমদ মুসা মানচিত্র থেকে মুখ তুলে সামনে তাকাল। সঙ্গে সঙ্গেই তার কানে এল চিৎকার। দেখতে পেল ফুটপাত থেকে দু’টি তরুণীকে রাস্তার পাশে দাঁড়ানো একটা মাইক্রোবাসে জোর করে টেনে তোলা হচ্ছে। প্রাণপণ চিৎকার করছে দু’টি তরুণী।
তরুণী দু’টিকে গাড়িতে তুলে চলতে শুরু করল মাইক্রোবাসটি। আহমদ মুসার পাশ দিয়েই চলে যাচ্ছে। গাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার ও গোঙানীর শব্দ শোনা যাচ্ছে।
চিৎকার ও গোঙানীর শব্দে আহমদ মুসার হৃদয়ে যেন হাতুড়ীর মত আঘাত করছে। আহমদ মুসার রক্তে যেন আগুন ধরে গেল মুহূর্তেই আহমদ মুসা তার গাড়ি ঘুরিয়ে নিল। দ্রুত ধাবমান মাইক্রোবাসটি অনেক দুর এগিয়ে গেছে।
আহমদ মুসা তার পিছু নিল।
শহীদ মসজিদ রোড় থেকে বেরুবার সময় গাড়ির জ্যামে পড়ে আরেকটু দেরি হলো আহমদ মুসার। কিন্তু মাইক্রোবাসটি তবু নজরের বাইরে যেতে পারেনি।
নিউ বেলগ্রেড এভেনিউ ধরে মাইক্রোবাসটি দক্ষিণ দিকে ছুটে চলেছে।
মাইক্রোবাসটি নতুন। বাতাসের বেগে এগিয়ে চলেছে। চালাচ্ছেও বেপরোয়া গতিতে। মনে হচ্ছে সাহসী কোন পক্ষ। কোন বিপদকে এরা থোড়াই পরোয়া করে।
ব্যস্ত রাস্তায় আহমদ মুসা নিজের ইচ্ছামত গাড়ি চালাতে পারছে না তাই দুই গাড়ির মধ্যকার ব্যবধান কমলেও মাইক্রোবাসটি এখনও বেশ দুরে। নিউ বেলগ্রেড এভেনিউটি বেলগ্রেডের নতুন এলাকা দক্ষিণ বেলগ্রেড ঘুরে দানিয়ুব পর্যন্ত পৌঁছেছে। সরল এবং প্রশস্ত এই দীর্ঘ রাস্তাটি।
নতুন বেলগ্রেডের শুরুতেই বিশাল এক বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং পার্ক। এর প্রান্ত ঘেষেই নিউ বেলগ্রেড এভেনিউ। বোটানিক্যাল গার্ডেন ও পার্কে ঢোকার এক বিশাল গেট। টিকেট করে ঢুকতে হয়। মাইক্রোবাসটি বোটানিক্যাল গার্ডেনের গেটে গিয়ে দাঁড়াল। দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গেই গেটটি খুলে গেল। খোলা গেট দিয়ে মাইক্রোবাসটি বোটানিক্যাল গার্ডেনে ঢুকে গেল।
‘ওরা বোটানিক্যাল গার্ডেনে প্রবেশ করছে কেন?’ ভাবল আহমদ মুসা। ভাবতে গিয়ে আঁৎকে উঠল আহমদ মুসা। তাহলে কি ওরা নিছক লালসা বশত তরুণীদ্ধয়কে কিডন্যাপ করেছে।
মাইক্রোবাসটি গেট দিয়ে ঢুকে যাওয়ার অল্পক্ষণ পরেই আহমদ মুসার জীপ গিয়ে গেটে পৌঁছল।
গেটে তখনও একজন লোক দাঁডিয়েছিল। আহমদ মুসা তাকে গেট খুলে দিতে বলল।
লোকটি বলল টিকেট করে আসুন। আর গাড়ি নিয়ে ভেতর যাওয়া যাবে না।
‘ওরা ঢুকল কি করে গাড়ি নিয়ে। আর ওরা তো টিকেটও করেনি?’ বলল আহমদ মুসা।
লোকটি বলল, ওদের সাতখুন মাফ। ওদের টিকেট করতে হয় না।
‘কারা ওরা?’ বলল আহমদ মুসা।
‘ওরা মিলেশ বাহিনীর লোক।’ লোকটি বলল।
চমকে উঠল আহমদ মুসা মিলেশ বাহিনীর নাম শুনে। এত তাড়াতাড়ি ওদের মুখোমুখি হচ্ছে সে এইভাবে।
‘কত টিকেটের দাম?’ জিজ্ঞেস করল আহমদ মুসা।
‘দশ দিনার।’ বলল লোকটি।
আহমদ মুসা ওর হাতে ৫০ দিনার তুলে দিয়ে বলল, আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। তুমি টিকিট করে নিও। আর আমি ওদেরই কাছে যাব, গেট খুলে দাও।
লোকটি একবার ৫০ দিনারের নোট এবং একবার আহমদ মুসার দিকে তাকিয়ে গেট খুলে দিল।
আহমদ মুসার জীপটি দ্রুত ঢুকে গেল বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরে।
বিশাল বোটানিক্যাল গার্ডেন। এদিক সেদিক ঘুরাঘুরি করে অবশেষে মাইক্রোবাসটির সন্ধান পেল আহমদ মুসা। ছুটে গেল গাড়ি নিয়ে সেখানে।
কাছাকাছি পৌঁছেই দেখল, মেয়ে দু’টিকে তারা মাইক্রোবাস থেকে টেনে নামিয়েছে।
মেয়ে দু’টির পরনে ঢিলা লম্বা জামা পা পর্যন্ত নেমে গেছে। দু’জনার গলায় পেছানো চাদর। অভিজাত চেহারা। দেখলেই বুঝা যায় শিক্ষিত এবং অভিজাত পরিবারের মেয়ে দু’টি।
মেয়ে দু’টি আর কাঁদছে না। কিন্তু ভয়ে আতংকে ওদের চোখ যেন বেরিয়ে আসছে।
কিডন্যাপকারী ওরা চার জন।
দু’জন এগিয়ে গিয়ে মেয়ে দু’টির ওডনা টেনে খুলে ফেলল। তারপর দু’জন লোভাতুর বাঘের মত মেয়ে দু’টির দিকে দু’হাত বাড়িয়ে এগিয়ে গেল। মেয়ে দু’টি ভয়ে চিৎকার করে পিছিয়ে গেল।
ঠিক সেই সময় আহমদ মুসা জীপের হর্ন বাজাল। হর্নের শব্দে ওরা চারজনই চমকে উঠে ফিরে তাকিয়েছে।
আহমদ মুসা লাফ দিয়ে জীপ থেকে নেমে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
আহমদ মুসা কিছু বলার আগেই ওদের একজন বলল, তুমি এখানে কেন, যেখানে যাচ্ছিলে যাও। নাক গলাতে এলে ভাল হবে না।
-তোমরা মেয়ে দু’টিকে জোর করে ধরে এনেছ, ছেড়ে দাও। শান্ত কণ্ঠে বলল আহমদ মুসা।
-একশ’ বার ধরে আনব। তোমার কি, তোমার কাজে তুমি যাও।
-মেয়ে দু’টিকে ছেড়ে না দিলে আমি যাব না।
-তোমার কপাল মন্দ হবে যদি বাড়াবাড়ি করো। এরা হিদেন, মুসলমান। শয়তানী এরা। এদের যা ইচ্ছা তাই করার অধিকার আমাদের আছে।
আহমদ মুসার বুকটা কেঁপে উঠল ওদের কাছ থেকে মেয়ে দু’টির পাওয়া পরিচয়ে। ওরা মুসলমান। দেহের প্রতিটি স্নায়ুতন্ত্রীতে একটা প্রচণ্ড জ্বালা ছড়িয়ে পড়ল আহমদ মুসার। গোটা দেহ তার শক্ত হয়ে উঠল। বলল সে, ওরা যেই হোক, ওদের ছেড়ে দাও।
-আমাদের হুকুম দিচ্ছ, স্পর্ধা তো কম নয়। জান আমরা কে? ওদের একজন বলল।
-না, পরিচয় আমার প্রয়োজন নেই। আমি তোমাদের সাথে আত্মীয়তা করতে যাচ্ছি না।
ক্রোধে ওরা জ্বলে উঠল। ওদের লাল চোখ আরও লাল হয়ে উঠল। একজন দু’ধাপ এগিয়ে আহমদ মুসার একেবারে সামনে এসে বলল। ভাল চাওতো এখনি এখান থেকে সরে যাও।
তার কথার প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করে আহমদ মুসা বলল, আমার প্রশ্নের জবাব দাও মেয়ে দু’টিকে ছাড়বে কিনা?
আহমদ মুসার কোথা শেষ হবার আগেই লোকটি একটা প্রচণ্ড ঘুষি ছুড়ে মারল আহমদ মুসার নাক লক্ষ্য করে।
আহমদ মুসা মুখটা সরিয়ে নিয়েছিল। ঘুষিটা আহমদ মুসার মুখে না লেগে গিয়ে লাগল কপালের বাম পাশে। লোকটির হাতে সম্ভবত তীক্ষ্ণ আংটি ছিল। আহমদ মুসার কপাল কেটে গিয়ে ঝর ঝর করে রক্ত বেরিয়ে এল।
আহমদ মুসা তার মাথাটা সোজা করেই বিদ্যুৎ গতিতে ডান হাতের একটা কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ের বাম পাশে কানের নিচে।
সঙ্গে সঙ্গেই লোকটি জ্ঞান হারিয়ে টলতে টলতে পডে গেল মাটিতে।
ঘুষি বাগিয়ে আরেকজন তেড়ে এল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা একধাপ এগিয়ে লোকটির তলপেট লক্ষ্যে একটা লাথি মারল এবং তারপরেই ডান হাতের প্রচণ্ড কারাত চালাল লোকটির ঘাড়ে।
লোকটি টলারও সুযোগ পেল না। বোঁটা থেকে খসে পড়া আমের মতই ঝরে পড়ে গেল মাটিতে।
লোকটি যখন পড়ে যাচ্ছিল তখন আহমদ মুসা দেখল সামনের দু’জনেই পকেটে হাত দিচ্ছে।
আহমদ মুসা এক লাফে সামনে দাঁড়ানো লোকটির ঘাড়ে পড়ে বাম হাতে তার গলা পেঁচিয়ে তাকে বুকের সাথে চেপে ধরল।
লোকটি সবে পিস্তল হাতে নিয়েছিল।
আহমদ মুসা তার হাত থেকে পিস্তল কেড়ে নিল।
লোকটি ছাড়া পাবার জন্যে যতই জোর করছিল, ততই আহমদ মুসার বাম হাতের লৌহ বেষ্টনি তার গলায় চেপে বসতে লাগল।
দ্বিতীয় লোকটি পিস্তল তুলে ধরেছে। কিন্তু মহাবিপদে পড়েছে সে। গুলি করলে গিয়ে লাগে নিজের সাথীর বুকে। আহমদ মুসা তাকে বুকে জাপটে ধরে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।
আহমদ মুসা লোকটির হাত থেকে কেড়ে নেয়া পিস্তল এবার দ্বিতীয় লোকটির দিকে তুলে ধরে বলল, পিস্তল ফেলে দাও না হলে মাথা গুড়িয়ে দেব।
কিন্তু বেপরোয়া লোকটি পিস্তল হাতে ছুটে এল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা তার কৌশলটা বুঝল। সে এসে জড়িয়ে ধরে আহমদ মুসার পিঠ দখল করতে চায়। আহমদ মুসা আর সময় নষ্ট করতে চাইল না। সে উদ্যত রিভলভারের ট্রিগার টিপে ধরল।
মাথাটি গুড়িয়ে গেল লোকটির।
মুখ থুবড়ে পড়ে গেল লোকটি আহমদ মুসার একদম কাছেই।
আহমদ মুসা যাকে ধরে রেখেছিল, তাকেও এবার ছেড়ে দিল।
ছেড়ে দেয়ার সঙ্গে সঙ্গেই লোকটি গোড়া কাটা লতার মত লুটিয়ে পড়ল।
মেয়ে দু’টি কাঠের মত দাঁড়িয়েছিল। রক্তহীন ফ্যাকাশে তাদের মুখ। বাক শক্তি তারা হারিয়ে ফেলেছিল।
আহমদ মুসা পিস্তলটি পকেটে ফেলে ধীরে ধীরে মেয়ে দুটির দিকে এগুলো। নতমুখে নরম কন্ঠে বলল, আর কোন ভয় নেই, তোমরা এস গাড়িতে।
বলে আহমদ মুসা ফিরে দাঁড়িয়ে গাড়ির দিকে হাটতে লাগল।
মেয়ে দু’টিও যন্ত্রের মত ধীরে ধীরে গাড়ির দিকে হেটে এল।
আহমদ মুসা জীপের ড্রাইভিং সিটে উঠে বসল। মেয়ে দু’টি গাড়ির কাছে এসে দাঁড়ালে বলল, তোমরা পিছনের সিটে উঠে বসে বোন।
সিটে বসেই আবার নেমে গেল আহমদ মুসা। নেমে গিয়ে গাড়ির নাম্বার প্লেট খুলে এনে ড্রাইভিং প্যানেলের উপর রেখে দিল। তারপর গাড়ি ষ্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
জীপটি গেটে আসতেই সেই লোকটি তাড়াতাড়ি গেট খুলে দিতে এল।
আহমদ মুসার মুখ রক্তাক্ত দেখে লোকটি চমকে উঠল। তার চোখে সন্দেহের চিহ্ন ফুটে উঠল। কিন্তু কিছু বলার সাহস পেল না।
গাড়ি গেট থেকে যখন বের হতে যাচ্ছে, তখন লোকটি বোধ হয় মরিয়া হয়েই জিজ্ঞেস করল, স্যার ওরা কোথায়? এরা তো আপনার গাড়িতে যাবার সময় ছিল না?
আহমদ মুসা গেট থেকে বের হয়ে একটু হেসে বলল, এসব প্রশ্নের জবাবে তোমার কোন প্রয়োজন নেই, থাকলে দিতাম।
গাড়ি যখন চলে যাচ্ছে, তখন গেটম্যান ভয় ও সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে গাড়ির নাম্বার প্লেটের দিকে চাইল। তার চোখ ছানা-বড়া হয়ে উঠল যখন সে দেখল যে গাড়ির কোন নাম্বার প্লেট নেই।
আহমদ মুসা দ্রুত গাড়ি চালিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেন পেরিয়ে প্রায় মাইল দুয়েক উত্তরে এসে রাস্তার পাশে একটা নির্জন স্থানে নেমে এল। তারপর গাড়ির নাম্বার প্লেট দু’টি নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে গেল এবং নাম্বার প্লেট যথাস্থানে লাগিয়ে দিল।
মেয়ে দু’টি মুর্তির মত আহমদ মুসার সব কাজ দেখছিল। তাদের চোখ থেকে আতংকের ঘোর তখনও সম্পূর্ণ কাটেনি। তবে তারা নিশ্চিত হয়েছে, এই মানুষের কাছে তারা সম্পূর্ণ নিরাপদ। তাদের কাছে মনে হচ্ছে, এ মানুষটি যেন মানুষ নয়, আল্লাহর ফেরেশতা। যে মানুষটি একাই চারজন মানুষকে পরাভূত করল মহাশক্তিধর বীরের মত, তার কন্ঠস্বর, সম্বোধন এতো নরম হয়! কঠোরতা ও নমনীয়তার অপূর্ব সমাহার। ফেরেশতা ছাড়া আর কি! ফেরেশতার মতই তো হঠাৎ করে উদয় হয়েছেন।
আহমদ মুসা গাড়ির নাম্বার প্লেট লাগিয়ে এসে ড্রাইভিং সিটে আবার ফিরে এল। এরপর সে গাড়ির ফার্স্ট এইড বক্স থেকে তুলা বের করে মুখের রক্ত মুছতে লাগল।
মেয়ে দু’টি আহমদ মুসার সারা মুখে রক্ত দেখে আঁৎকে উঠল। তারা এতক্ষণ খেয়াল করেনি। অবাক হলো তারা। তাহলে কি আতংকের ঘোর কেটে তাদের চোখ এখনও স্বাভাবিকভাবে সব কিছু দেখতে পারছে না, বুঝতে পারছে না!
আহমদ মুসা মুখ থেকে রক্ত পরিষ্কার করে কপালের ক্ষতটায় তুলা লাগাল। কিন্তু তুলার নরম আঘাতেও সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে রক্ত নেমে এল। আহমদ মুসা তাড়াতাড়ি বেশি পরিমাণ তুলা ক্ষতস্থানে চাপা দিয়ে ধরে রাখল। আশ-পাশে তাকিয়ে বেঁধে রাখার মত কিছু দেখল না। মেয়েদের একজন আহমদ মুসার দিকে ওড়না এগিয়ে দিয়ে বলল, এটা দিয়ে আপনি ব্যান্ডেজ বাঁধুন। আহমদ মুসা বলল, না লাগবে না বোন অল্পক্ষণের মধ্যেই রক্ত বন্ধ হয়ে যাবে।
সেই মেয়েটি বলল, কিন্তু এভাবে তুলা ধরে রেখে তো গাড়ি চালাতে পারবেন না।
সত্যি, কথাটায় বাস্তবতা আছে।
আহমদ মুসা ওড়না নিয়ে কপালে ভালো করে ব্যান্ডেজ বাঁধল।
তারপর আহমদ মুসা গাড়ি ষ্টার্ট দিতে গিয়ে থেমে গেল। পেছন দিকে না তাকিয়েই আহমদ মুসা বলল, তোমাদেরকে কোথায় পৌঁছে দেব বোন?
মেয়ে দু’টি পরামর্শ করল, তারপর তাদের একজন পূর্ব বেলগ্রেডের একটা রাস্তার কথা বলল।
আহমদ মুসা মানচিত্রে চোখ বুলাল। না মানচিত্রে সে রাস্তার নাম নেই।
আহমদ মুসা বলল, মানচিত্রে ও রাস্তার নাম নেই। আমি বেলগ্রেডে নতুন তো রাস্তা ঘাট আমি চিনি না। তোমরা বলে দিতে পারবে না?
‘পারব।’ বলল ওদের একজন।
আহমদ মুসা গাড়ি ষ্টার্ট দিলে ওই মেয়েটিই বলল, আরেকটু উত্তর দিকে এগিয়ে প্রথম যে পূর্বমুখী রাস্তা পাবেন, সেটা দিয়ে এগুবেন।
আহমদ মুসা মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে বলল, সেন্ট্রাল রোড দিয়ে তো?
মেয়েট বলল, জি হ্যাঁ।
সেন্ট্রাল রোড ধরে ছুটে চলল গাড়ি।
মেয়ে দু’টি সামনে তাকিয়ে আছে। তাদের চোখ বারবার ছুটে যাচ্ছে আহমদ মুসার দিকে। তাদের জিজ্ঞাসা করতে ইচ্ছে হচ্ছে, লোকটি কে? এমন উপকারী লোক আবার এদেশে আছে? বেলগ্রেডে নতুন, তাহলে বেলগ্রেডের বাইরে থেকে এসেছে। কিন্তু ওকে তো যুগোশ্লাভ মনে হয়না। হতে পারে, কত দেশের লোকই তো যুগোশ্লাভিয়ায় বাস করে। জিজ্ঞাসা করবে নাকি লোকটি কে? কিন্ত কেন করবে, প্রয়োজন কি? লোকটিই বা কি মনে করবে। তাদের তরফ থেকে এমন উদ্যোগ নেয়া ঠিক হবে না। যাই হোক উনি তো পুরুষ মানুষ, অপরিচিত।
আহমদ মুসার মনেও চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে। মেয়ে দুটি কে? মুসলমান তো শুনলাম। ওদের নাম কি জিজ্ঞেস করব? কেন করব? কি প্রয়োজন তার? তারা বিপদে পড়েছিল, সাহায্য করেছি। এখন ওদেরকে বাসায় পৌঁছে দেয়ার মধ্যেই তো আমার দ্বায়িত্ব শেষ। প্রয়োজন নেই এমন আলোচনায় যাওয়া তো ঠিক নয়। হ্যাঁ ওদের বাড়ির পুরুষদের পাওয়া গেলে কথা বলা যেতে পারে।
সেন্ট্রাল রোড তীরের মত সোজা একটা রাস্তা। রাস্তাটি সোজা এগিয়ে পূর্ব বেলগ্রেডের প্রান্তে নিউবেলগ্রেড এভেনিউতেই আবার পড়েছে। সেন্ট্রাল রোড নামকরণ যথার্থ হয়েছে। রোডটি বেলগ্রডকে মাঝ বরাবর দু’ভাগে ভাগ করেছে।
পূর্ব বেলগ্রেডে এসে পড়েছে আহমদ মুসার জীপ। সামনেই একটা চৌমাথা। সেন্ট্রাল রোড থেকে উত্তর ও দক্ষিণে দু’টি রাস্তা বেরিয়ে গেছে।
চৌমাথার কাছে পৌঁছতেই যে মেয়েটি পথ-নির্দেশ করছিল সে বলল, এবার আমাদের উত্তরের পথ ধরে যেতে হবে।
আরও কয়েকটি রাস্তা বদলে আহমদ মুসার জীপ একটা সুন্দর দোতলা বাড়ির সামনে দাঁড়াল। যে মেয়েটি গাইড করছিল সে বলল, আমরা পৌঁছে গেছি।
বাড়িটি ওমর বিগোভিগকের।
আহমদ মুসা বাড়ি ও বাড়ির নাম্বারের দিকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, তোমাদের আব্বার নাম কি? কি করেন?
মেয়ে দু’টির একজন যে গাইড করছিল, বলল, আমার আব্বার নাম ওমর বিগোভিক। এটা আমাদের বাড়ি। আমার আব্বা অধ্যাপনা করতেন, এখন ব্যবসা করেন।
একটু থেমে সাথের মেয়েটিকে দেখিয়ে বলল, এর বাড়ি উত্তর বেলগ্রেড এলাকায়। আমার আব্বা ওকে পৌঁছে দেবেন।
তোমার আব্বা কি এখন বাড়িতে আছেন? জানতে চাইল আহমদ মুসা।
মেয়েটি বলল, এক মিনিট, আমি দেখে আসছি।
বলে মেয়েটি বাড়ির ভেতর চলে গেল। মেয়েটি নাদিয়া নুর।
কয়েক মুহূর্ত পরে নাদিয়া নুর ফিরে এসে বলল, আব্বা বাড়িতে নেই, আম্মা আছেন। আপনি ভেতরে আসুন, বসবেন একটু।
আহমদ মুসা একটু হেসে মাথা নেড়ে বলল, ধন্যবাদ বোন। আজ নয়, পারলে আরেকদিন আসব।
নাদিয়া নুরের সাথের মেয়েটি ডেসপিনা জুনিয়র। ডেসপিনা জুনিয়র এবং নাদিয়া নুর হাসান সেনজিকের খবর জানাতে গিয়েছিল হাসান সেনজিকের মাকে। ওরা ফেরার সময় যখন গাড়ির সন্ধানে ফুটপাত দিয়ে হাঁটছিল তখনই তারা মিলেশ বাহিনীর হাতে কিডন্যাপ হয়। ওদেরকে হাসান সেনজিকের বাড়ি থেকে বেরুতে দেখে ইচ্ছা করেই ওদের কিডন্যাপ করা হয়।
নাদিয়া নুর তার পিতার সন্ধানে বাড়ির ভেতর গেলে ডেসপিনা গাড়ি থেকে নেমে গাড়ির কাছেই দাঁড়িয়ে ছিল।
নাদিয়া নুর ফিরে এসে তার কাছেই দাঁড়াল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করে একটু মাথা নিচু করল। তারপর আবার মাথাটা তুলে বলল, একটা কথা বলব বোন, সমগ্র বলকান অঞ্চলে মুসলমানদের কঠিন দুর্দিন চলছে। এ সময় মুসলিম মেয়েদের অনেক সাবধানে থাকতে হবে, সাবধানে বেরুতে হবে।
-আপনি কি মুসলিম? জিজ্ঞেস করল ডেসপিনা।
-‘হ্যাঁ।’ বলল আহমদ মুসা।
-আমাদের ও সন্দেহ হয়েছিল। আমরা কি যে খুশি হয়েছি তা বুঝাতে পারবোনা। বোনদেরকে একটু মেহমানদারীরও সুযোগ দেবেন না?
-না আজ নয়। বলেছি তো, আরেকদিন সম্ভব হলে আসব। বাড়ি চিনে গেলাম।
বলেই গাড়ি ষ্টার্ট দিয়েই কি মনে করে গাড়ির কী বোর্ডের সেলফ থেকে একটা ইংরেজী বই বের করে বলল, তোমরা ইংরেজী জান?
নাদিয়া ও ডেসপিনা দু’জনেই বলল, ইংরেজী আমাদের সাবসিডিয়ারী ভাষা। জানি মোটামুটি।
আহমদ মুসা বইটি তাদের দিকে তুলে ধরে বলল, বইটি তোমাদের দিলাম, ভাল বই।
বইটি সাইয়েদ কুতুব শহীদের। নামঃ ‘দ্য প্রসেস অব ইসালিমক রেভ্যুলেশন।’
ডেসপিনা বইটি হাতে নিয়েই বলল, লিখে দিন।
আহমদ মুসা বইটি হাতে নিয়ে লিখে দিলঃ ‘বোনদেরকে আহমদ মুসা।’
বইটি ওদের হাতে আবার তুলে দিয়েই গাড়ীতে ষ্টার্ট দিল আহমদ মুসা।
ডেসপিনা বইটি হাতে নিল।
দু’জনেই আহমদ মুসাকে সালাম জানিয়ে হাত নাড়তে লাগল।
আহমদ মুসাও একবার পিছনে তাকিয়ে হাত নাড়ল।
যতক্ষণ আহমদ মুসার গাড়ি দেখা গেল ওরা দাঁড়িয়ে থাকল।
আহমদ মুসার গাড়ি চোখের আড়াল হবার আগেই আরেকটি গাড়ি আসতে দেখল তারা। গাড়ি দেখে নাদিয়ার আব্বার গাড়ি মনে হচ্ছে। ওরা আর সরল না।
ঠিক, গাড়িটি নাদিয়ার আব্বারই।
গেটে এসে গাড়ি থেকে নামল নাদিয়ার আব্বা।
আব্বাকে দেখে নাদিয়া প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল, আব্বা তুমি যদি দু’মিনিট আগে আসতে।
কিন্তু ওমর বিগোভিকের খেয়াল নাদিয়ার কথার দিকে নেই। সে নাদিয়া এবং ডেসপিনার চেহারা, চুল ও পোষাকের অবস্থা দেখে বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞাসা করল, তোমাদের একি অবস্থা? মনে হচ্ছে তোমরা যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরলে! ডেসপিনাকে তো কোন দিন চাদর ছাড়া দেখিনি। কি হয়েছে তোমাদের?
আব্বার এ প্রশ্নে নাদিয়ার মুখভাব মুহূর্তে পাল্টে গেল। কিছুক্ষণ আগের দুঃস্বপ্নময় অতীত যেন তার উপর এসে ভর করল। আব্বাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল নাদিয়া।
ওমর বিগোভিক নাদিয়া ও ডেসপিনাকে নিয়ে ভিতরে ঢুকে গেল।
গিয়ে বসল ভেতরের ড্রইং রুমে।
নাদিয়ার মাও এসে বসল। বলল, এই মাত্র ওরা এল। একজন জীপে করে রেখে গেল। লোকটির মুখে রক্তের দাগ। মাথায় ব্যান্ডেজ।
ওমর বিগোভিক উদ্বিগ্ন কন্ঠে বলল, বল কি। লোকটি চলে গেছে কখন?
‘এই তো দু’মিনিটের মত হল, তোমার সাথে কথা বলতে চেয়েছিল।’ বলল নাদিয়ার মা।
নাদিয়ার কান্না তখন থেমেছে। সে পিতার কাঁধে মুখ গুঁজে রয়েছে।
ডেসপিনা মুখ ভার করে বসে আছে।
ওমর বিগোভিক নাদিয়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, কি হয়েছে মা বল।
নাদিয়া মুখ তুলে বলল, ডেসপিনা তুমিই বল।
ওমর বিগোভিক ডেসপিনার দিকে চেয়ে বলল, ঠিক আছে মা তুমিই বল।
ডেসপিনা মুখ তুলল। মুখ তার ফ্যাকাশে। বলল, নাদিয়া হাসান সেনজিকের খবর নিয়ে আমার কাছে গিয়েছিল। আমি ওকে সাথে করে খবরটা দেয়ার জন্যে হাসান সেনজিকের মা’র কাছে গিয়েছিলাম আজ দশটায়। কথাবার্তা বলে ১১টার দিকে বেরিয়ে আসি। হাসান সেনজিকদের গেট থেকে বেরিয়ে ফুটপাত ধরে হাটছিলাম। হঠাৎ একটা মাইক্রোবাস আমাদের পাশে দাঁড়ায়। দাঁড়াবার সঙ্গে সঙ্গে দু’জন লোক বেরিয়ে এসে আমাদের ধরে টেনে হেঁচড়ে গাড়িতে তোলে। আমরা প্রাণপণে চিৎকার করি, কেউ সাহায্য করতে এগিয়ে আসে না।
বলতে বলতে ডেসপিনার চোখ দিয়ে ঝর ঝর করে অশ্রু নেমে এল।
অশ্রু বিজড়িত কন্ঠে ডেসপিনা তাদের কিডন্যাপ হওয়া এবং আলৌকিক ভাবে উদ্ধার কাহিনী বিস্তারিত বর্ণনা করল।
মুখ ভরা উদ্বেগ-আতংক নিয়ে বাক-রুদ্ধভাবে ওমর বিগোতিক ও নাদিয়ার মা ডেসপিনার কাহিনী শুনছিল।
ডেসপিনার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ওমর বিগোভিক সোফা থেকে নেমে মেঝেতে কাবামুখী হয়ে সিজদায় পড়ে গেল।
সিজদা থেকে উঠে দু’টি হাত উপরে তুলে বলল, হে আল্লাহ তুমি আলৌকিক সাহায্য পাঠিয়ে আমাদের মেয়ে দু’টিকে রক্ষা করেছ। তোমার শুকরিয়া আদায়ের ক্ষমতা আমার নেই। আমরা যতদূর কল্পনা করতে পারি না তার চেয়েও তুমি শক্তিশালী, তোমাকে যত বড় দয়ালু বলে জানি, তার চেয়েও বড় দয়ালু তুমি।
ওমর বিগোভিক সোফায় ফিরে এসে বলল, আল্লাহ মানুষকে ফেরেশতা পাঠিয়েও সাহায্য করেন। ও লোকটি আল্লাহরই সাহায্য ছিল। তা নাহলে একজন লোক খালি হাতে এসে চারজন সশস্ত্র লোককে ওভাবে শেষ করে তোমাদের উদ্ধার করতে পারে! কিন্তু আশ্চর্য মা! এত বড় লোক কে, যে নিজে আহত হয়েছে উদ্ধার করতে গিয়ে, তোমরা ঘরে এনে একটু বসাতেও পারলে না, এক গ্লাস পানিও খাওয়াতে পারলে না।
‘না, আব্বা, অনেক বলেছি, উনি কিছুতেই গাড়ি থেকে নামেননি। আপনি আছেন কিনা জিজ্ঞাসা করেছিলেন। থাকলে হয়ত নামতেন।’ বলল নাদিয়া নুর।
‘অদ্ভুত মানুষ উনি, আমাদের নামটা পর্যন্ত উনি জিজ্ঞেস করেননি। আমরা কি করি, কেমন করে কিডন্যাপের ঘটনা ঘটল ইত্যাদি যে সব কথা জিজ্ঞাসা করা স্বাভাবিক, সে সব কথাও জিজ্ঞেস করেননি। মনে হয় এসব কোন ব্যাপারে সামান্য আগ্রহও নেই। কিন্তু যাবার সময় যখন তিনি বলে গেলেন বলকান অঞ্চলে মুসলমানদের কঠিন দুর্দিন চলছে, মুসলিম মেয়েদের সাবধানে বের হওয়া উচিত, তখন মনে হল তিনি অত্যন্ত সচেতন ব্যক্তি।’ বলল ডেসপিনা।
‘উনি কি মুসলিম?’ ওমর বিগোভিক বলল।
‘জি’ বলল ডেসপিনা।
‘এমন একজন মুসলিম ছেলে, তার ঠিকানা জানলাম না, তার নামও পর্যন্ত তোমরা জিজ্ঞাসা করনি, কি দুর্ভাগ্য!’ খেদের সাথে বলল ওমর বিগোভিক।
‘আমাদের নাম যিনি জিজ্ঞাসা করেননি, তার নাম আমরা কেমন করে জিজ্ঞাসা করতে পারি?’ বলল নাদিয়া।
‘নাম পাওয়া গেছে নাদিয়া।’ বলে ডেসপিনা তার পাশে সোফার উপর পড়ে থাকা আহমদ মুসার দেয়া বইটি হাতে নিয়ে কভার উল্টিয়ে লেখার উপর নজর বুলাল।
নজর বুলানোর সঙ্গে সঙ্গে ডেসপিনার চেহারাটা একদম পাল্টে গেল। চোখ দু’টি তার বিস্ফারিত হলো। বাকরুদ্ধ হয়ে গেল সে। দেহটা তার যেন শিথিল, অবসন্ন হয়ে পড়েছে। তার হাত থেকে বইটা খসে পড়ে গেল।
ডেসপিনা অসুস্থ হয়ে পড়েছে মনে করে ওমর বিগোভিক ও নাদিয়ার মা ভীষণ ব্যস্ত হয়ে উঠল। ছুটে এল দু’জন তার কাছে।
কিন্তু নাদিয়া বুঝল লোকটির লেখার দিকে নজর বুলানোর পরই ডেসপিনা অস্বাভাবিক হয়ে পড়েছে।
নাদিয়া বইটি তুলে নিয়ে কভার উল্টিয়ে সেই লেখাটির প্রতি নজর দিয়ে চিৎকার করে উঠল, আব্বা লোকটি ছিল আহমদ মুসা।
‘কি বললে?’ বলে ওমর বিগোভিক নাদিয়ার হাত থেকে বইটি নিয়ে সেই লেখাটির প্রতি নজর বুলাল। দেখল পরিষ্কারভাবে লিখাঃ ‘বোনদেরকে- আহমদ মুসা।’
সোফার উপর ধপ করে বসে পড়ল ওমর বিগোভিক।
কিছুক্ষণ কেউ কোন কথা বলতে পারল না।
নাদিয়ার মা-ই প্রথম মুখ খুলল। বলল, তাই বলি এমন বিস্ময়কর ছেলে এদেশে কোত্থেকে আসবে যে মিলেশ বাহিনীর পিছু নিতে সাহস করে, যে খালি হাতে মিলেশ বাহিনীর চারজনের উপর ঝাপিয়ে পড়তে পারে এবং জয়ীও হতে পারে।
ওমর বিগোভিক সামনের দিকে একটু ঝুকে বসে দু’কনুই হাঁটুর উপর রেখে দু’হাতে মাথা চেপে ধরে বলল, দুর্ভাগ্য আজকের মুসলিম দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ সন্তানকে হাতে পেয়েও আবার হারিয়ে ফেললাম। তাও আবার সে আহত। আঘাতটা কি খুব বেশী মা?
ডেসপিনা এবং নাদিয়া দু’জনেই সোফায় হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে বসেছিল। তারা অতীতে ফিরে গেছে। বহুবিশ্রুত, বিষ্ময়কর আহমদ মুসাকে নতুন করে দেখার জন্য। কি করে সে জীপ থেকে নামল, কেমন শান্ত, অথচ অত্যন্ত দৃঢ়তার সাথে তাদের মুক্তি দাবী করল, কেমন করে আক্রান্ত হল, কেমন করে সে আত্মরক্ষা করে পাল্টা আক্রমণ করল, কেমন করে দু’টি পিস্তলের মুখে পড়েও অদ্ভুত ক্ষিপ্রতার সাথে তাদেরই একজনকে ঢাল বানিয়ে শেষে ওদেরই অস্ত্রে ওদেরকে পরাভূত করল, কেমন ভাবে চোখ নীচু রেখে নরম কন্ঠে তাদের গাড়িতে উঠতে বলল, তার রক্তাক্ত মুখের সেই দৃশ্য, এতবড় ঘটনার পরেও কেমন নিরুদ্বিগ্ন, ভাবলেশহীন ছিল সে, ইত্যাদি দৃশ্য তাদের চোখে এক এক করে ভেসে উঠছে। সেই সাথে ভেবে আঁৎকে উঠছে তারা, উনি যেতে যদি আর পাঁচ মিনিটও দেরি করতেন, তাহলে কি ঘটত তাদের ভাগ্যে। ঐ মানুষটির প্রতি কৃতজ্ঞতায় তাদের চোখে অশ্রু নেমে এল।
পিতার প্রশ্ন শুনে চোখ খুলল নাদিয়া। তারপর ওড়নায় চোখ মুছে বলল, রক্তে ঢাকা থাকার কারণে দেখা যায়নি আব্বা ক্ষতটা কেমন। তবে প্রচুর রক্ত পড়েছে। শেষ পর্যন্ত রক্ত বন্ধ হয়নি। ক্ষতের উপর তুলা দিয়ে ডেসপিনার ওড়না দিয়ে কোন রকমে একটা ব্যান্ডেজ বেঁধে উনি আমাদের পৌঁছে দিয়েছেন।
‘আল্লাহ ওকে ভাল রাখুন মা। দেখা ইনশাআল্লাহ আমাদের সাথে হবেই।’ বলল ওমর বিগোভিক।
ওমর বিগোভিক উঠে দাঁড়াল। বলল, ডেসপিনা মা, খেয়ে দেয়ে রেষ্ট নাও। আমি বিকেলে তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দেব। একা তোমাদের বেরুনো চলবে না।
ওমর বিগোভিক চলে গেল তার ঘরের দিকে। বাইরে থেকে এসে সে এখনও কাপড় ছাড়েনি।
৫
ঐ দিনই সন্ধ্যায় আহমদ মুসা আবার বেরুল শহীদ মসজিদ রোডে যাবার জন্যে। এবার সাথে মাজুভ। আহমদ মুসা একাই যেতে চেয়েছিল। কিন্তু মাজুভ নাছোড়বান্দা, একা ছাড়তে রাজী হয়নি আহমদ মুসাকে। তবে আহমদ মুসার সাথী হওয়ার জন্যে মাজুভকে ছদ্মবেশ নিতে রাজী হতে হয়েছে। মুখে গোঁফ লাগাতে হয়েছে, সেই সাথে লাগাতে হয়েছে কানের নিচ পর্যন্ত জুলফি।
আহমদ মুসা জীপে উঠে বলল, শহীদ মসজিদ রোডে ঢুকেছিলাম পশ্চিম প্রান্ত দিয়ে। আর কোন রাস্তা নেই শহীদ মসজিদ রোডে ঢোকার?
মাজুভ বলল, আছে। পূব প্রান্ত এবং অন্য আরেকটি লেন দিয়েও আমরা ঢুকতে পারি। তবে সেটা কিছু গলিপথের মত হবে।
‘সেটাই তো ভালো।’ বলে আহমদ মুসা গাড়ী ষ্টার্ট দিল।
বিভিন্ন গলিপথ ঘুরে আহমদ মুসার জীপ যখন শহীদ মসজিদ রোডে প্রবেশ করল তখন সন্ধ্যার লালিমা কেটে পুরোপুরি রাত নেমে এসেছে।
পুরানো বেলগ্রেডের মূল এলাকা এটা। বাড়িগুলো পুরানো, রাস্তাগুলোও সংকীর্ণ। সেই তুলনায় শহীদ মসজিদ রোড বলা যায় বেশ প্রশস্ত।
আহমদ মুসা ধীর গতিতে গাড়ি ড্রাইভ করে এগুচ্ছিল। হাসান সেনজিকের বাড়ি বরাবর পৌঁছে গাড়ি দাঁড় করানো তার লক্ষ্য।
হাসান সেনজিকের বাড়ি রাস্তার উত্তর পাশে, আর সে গাড়ি চালাচ্ছিল রাস্তার দক্ষিণ পাশ দিয়ে।
রাস্তা, ফুটপাত বেশ আলোকোজ্জ্বল।
সামনেই রাস্তার উত্তর পাশে বিশাল পুরানো গেট দেখেই আহমদ মুসা হাসান সেনজিকের বাড়ি চিনতে পারল। যে বর্ণনা সে শুনেছিল, তার সাথে মিলে গেল।
আহমদ মুসা গাড়ি দাঁড় করাল।
গাড়ি থেকে নামল। বলল, মাজুভ গাড়ি নিয়ে তুমি এখানে একটু দাঁড়াও। আমি বাড়ির সামনেটা একটু ঘুরে আসি।
আহমদ মুসার গায়ে লম্বা ওভার কোট। মাথায় ফেল্ট হ্যাট। কপাল পর্যন্ত নামানো।
আহমদ মুসা রাস্তা পার হয়ে ওপারের ফুটপাতে গিয়ে উঠল।
ফুটপাতের যেখানে গিয়ে উঠল, সেখানে কতকগুলো দোকান, রাস্তা বরাবর সারিবদ্ধ। দোকানগুলোর পরেই হাসান সেনজিকের বাড়ি।
আহমদ মুসা যখন ফুটপাতে উঠছে, ঠিক সে সময় তার পাশেই একটা মাইক্রোবাস এসে দাঁড়াল।
গাড়ি থেকে নামল কয়েকজন লোক। আহমদ মুসার সামনে দিয়েই ওরা নামল।
আহমদ মুসা থমকে দাঁড়াতে বাধ্য হলো।
গাড়ির দু’দরজা দিয়ে দু’জন প্রথমে নেমে এসে ফুটপাতে দাঁড়াল। তারপর আরেকজন গাড়ি থেকে নেমে একজনকে হাত ধরে টেনে নামাল।
যাকে হাত ধরে টেনে নামাল, সে ফুটপাতে এসে দাঁড়াতেই তাকে একটা ধাক্কা দিয়ে সামনের দিকে ঠেলে দিল। তারপর তাকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে দোকানের দিকে নিয়ে চলল।
আহমদ মুসা সেই লোকটির দিকে চেয়ে চমকে উঠল। এ যে জাকুব!
আহমদ মুসা এক অমোঘ টানে সেই লোকদের পেছনে পেছনে চলল।
জাকুবকে নিয়ে লোকগুলো সামনের দোকানগুলোর পুব প্রান্তের দোকানে ঢুকল।
দু’জন দোকানের কাউন্টারে দাঁড়াল। আরেক জন জাকুবকে টেনে নিয়ে কাউন্টারের ভেতরে চলে গেল।
সেলসম্যান ছেলেটির চোখ দু’টি ছানাবড়া হয়ে উঠেছে। জাকুবকে সে চিনতে পেরেছে। তাতেই তার আতংক আরও বেড়েছে। জাকুবকে কেন এখানে ধরে আনা হতে পারে, তা কিছু কিছু সে বুঝতে পারে।
যে লোকটি জাকুবকে নিয়ে কাউন্টারের ভিতরে প্রবেশ করেছে, সে জাকুবকে দেখিয়ে সেলসম্যান ছেলেটিকে জিজ্ঞাসা করল, চেন তুমি এ-কে?
সেলসম্যান ছেলেটি কোন উত্তর দিল না।
একই প্রশ্ন আবার জিজ্ঞাসা করল লোকটি সেলসম্যান ছেলেটিকে।
ছেলেটি কোন জবাব দিল না। বোবা দৃষ্টি মেলে পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল।
লোকটি রিভলভার বের করল। রিভলভারটি ছেলেটির কপাল বরাবর তুলে ধরে বলল, তুমি সব জান, তোমাকে বলতে হবে সব। সেদিন একজন লোক এখানে খুন হয়েছে। এই লোকটি তার সাথে জড়িত ছিল।
সেলসম্যান ছেলেটি মুখ খুলল না।
লোকটির মুখ শক্ত হয়ে উঠল। চোখ জ্বলে উঠল তার। তার তর্জ্জনিটি হঠাৎ চেপে বসল রিভলভারের ট্রিগারের উপর। বেরিয়ে এল রিভলভার থেকে একটা গুলি। কপাল ফুটো করে তা ঢুকে গেল সেলসম্যান ছেলেটির মাথায়। লুটিয়ে পড়ল ছেলেটি মেঝের উপর।
আহমদ মুসা দাঁড়িয়ে ছিল দোকানের বাইরে। ধীরে ধীরে সে এগুলো দোকানের দিকে। ঢুকল দোকানে। যেন সে রিভলভারের গুলির আওয়াজ শুনে প্রবেশ করেছে এমন ভাব নিয়ে।
আহমদ মুসা যখন কাউন্টারের পাশে দাড়াল, ঠিক তখনই লোকটির রিভলভার ঘুরে গেছে জাকুবের দিকে। জাকুবের কপাল বরাবর রিভলভার তুলে লোকটি বলল, সেলসম্যান ছেলেটির মৌনতাই প্রমাণ করে তুমি অপরাধী, হত্যাকারী।
বলে সে ট্রিগার চাপতে যাচ্ছিল।
আহমদ মুসা দ্রুত বলল, থাম, কি হচ্ছে এখানে। এক সেলসম্যানকে হত্যা করলে, আবার আর একজনকে হত্যা করছ ব্যাপার কি?
লোকটি আহমদ মুসার দিকে মুখ ফিরাল। মুহুর্ত কাল চেয়ে থেকে বলল, বুঝেছি তুমিও তাহলে এর সাথী। সেদিন এর সাথে ছিলে। এখন এসেছ বাঁচাতে। তোমাকেই তাহলে আগে দেখতে হয়।
বলে লোকটি রিভলভারের মুখ ঘুরিয়ে নিচ্ছিল আহমদ মুসার দিকে।
আহমদ মুসা বুঝল, বেপরোয়া লোকটি নির্ঘাত গুলি করবে। আহমদ মুসার দু’টি হাত ছিল কাউন্টারের উপর। ডান হাতের কাছেই ছিল সেলসম্যানের পেপার ওয়েটটা। আহমদ মুসা সেটা তুলে নিয়ে চোখের নিমেষে ছুড়ে মারল লোকটির মাথা লক্ষ্যে।
এতদ্রুত ব্যাপারটা ঘটল যে লোকটি কিছু বুঝে উঠার আগেই ভারি পেপার ওয়েটটি বুলেটের মত ছুটে গিয়ে আঘাত করল লোকটির বাম কানের ঠিক ওপরের জায়গাটায়।
লোকটি একবার টলে উঠেই আছাড় খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে।
আহমদ মুসা পেপার ওয়েট ছুড়েই পকেট থেকে রিভলভার বের করে নিয়েছিল।
আহমদ মুসার সামনে সেলস কাউন্টারের পাশে যে দু’জন লোক দাড়িয়েছিল তারাও হাতে রিভলভার তুলে নিয়েছে।
আহমদ মুসা রিভলভার বের করেই সামনের লোকটিকে গুলি করেছিল, সে তখনও আহমদ মুসার দিকে রিভলভার তাক করে সারেনি। এ লোকটি গুলি খেয়ে পড়ে গেল, কিন্তু আহমদ মুসা দ্বিতীয় লোকটির গুলির মুখে পড়ে গেল। তার রিভলভারের নল তখন উঠে এসেছে আহমদ মুসার কপাল লক্ষ্যে।
রক্ষা করল জাকুব। পেপার ওয়েটের আঘাত খেয়ে যে লোকটি পড়ে গিয়েছিল, তার রিভলভারটি জাকুব সঙ্গে সঙ্গেই তুলে নিয়েছিল। দ্বিতীয় লোকটি ট্রিগার টেপার আগেই জাকুব গুলি করে তার মাথা গুড়িয়ে দিল।
আহমদ মুসা লক্ষ্য করেনি, দোকানে যখন এসব গুলি-গোলা চলছিল, তখন মাইক্রোবাস থেকে আরও চার পাঁচজন লোক নেমে বিড়ালের মত নিঃশব্দে ছুটে এসেছে। তাদের কারো হাতে ষ্টেনগান, কারো হাতে পিস্তল, একজনের হাতে রড। ড্রাইভার লোকটিই আগে নেমেছিল রড নিয়ে।
জাকুব যখন দ্বিতীয় লোকটিকে গুলি করছিল সে সময়ই তারা আহমদ মুসার পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।
আহমদ মুসা পেছনে পায়ের শব্দে মাথা ঘুরাতেই ওদের চার পাঁচ জনকে দেখতে পেল। কিন্তু রিভলভার তোলার আগেই রডের একটা আঘাত এসে পড়ল মাথায়।
আঘাত খেয়ে আহমদ মুসা পড়ে গিয়ে মনে হয় জ্ঞান হারাল।
আহমদ মুসা পড়ে যাবার পর জাকুবও আর গুলি করতে পারে নি। ঐ পাঁচজন লোক অজ্ঞান হয়ে যাওয়া আহমদ মুসা এবং জাকুবকে হিড়হিড় করে টেনে মাইক্রোবাসের দিকে নিয়ে চলল। সকলের আগে যাচ্ছে স্টেনগান ধারী লোকটি। সে আতংক সৃষ্টির জন্যে গুলি বৃষ্টি করতে করতে সামনে এগুচ্ছে।
মাজুভ দেখতে পেয়েছিল আহমদ মুসা কয়েকজন লোকের পেছনে দোকানের দিকে যাচ্ছে। দোকানে ঢুকে গেল তাও সে দেখল।
দোকানে গুলির শব্দ পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠল মাজুভ। সে বেরিয়ে এল জীপ থেকে। রাস্তা পেরুতে পেরুতেই আরও দুটি গুলির শব্দ পেল। সে যখন ওপারের ফুটপাতে উঠল, তখন দেখল আর চার-পাঁচজন লোক দৌড়ে গিয়ে দোকানে উঠল।
মাজুভ দাড়িয়ে পড়ল। সে রিভলভার বের করল। এক পা দু’পা করে এগুতে লাগল। কিন্তু এই সময়েই ওরা গুলি বৃষ্টি করতে করতে ফিরে আসছে। মাজুভ ওদের গুলি বৃষ্টির মুখে পড়ে গেল।
মাজুভ দ্রুত শুয়ে পড়ে ফুটপাতের নিচে রাস্তায় গিয়ে গড়িয়ে পড়ল। জায়গা ছিল আলো থেকে দূরে, প্রায় অন্ধকার। ওরা এদিকে খেয়াল করল না। ওরা গাড়িতে উঠে গাড়ি চালিয়ে চলে গেল।
ওরা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে উদ্বেগ-উত্তেজনায় কম্পিত হৃদয়ে মাজুভ ছুটল দোকানের দিকে।
দোকানে ঢুকে চারদিকে নজর বুলিয়ে চারটি লাশ পড়ে থাকতে দেখল। উদ্বেগে কাঁপতে লাগল মাজুভ। তাহলে কি আহমদ মুসা….। সে এক এক করে চারটি লাশেরই মুখ দেখল। না, এর মধ্যে আহমদ মুসা নেই। মনে একটু বল পেল মাজুভ। আহমদ মুসা অন্তত মরেনি। তাহলে কোথায়? সে কি সরে পড়েছে কোথাও? না, আহমদ মুসা তো যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালান না। তাহলে সে কি বন্দী? আহমদ মুসাকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে?
এই সময় মাজুভের নজর পড়ল সেলস কাউন্টারের গোড়ায় পড়ে থাকা একটা ফেল্ট হ্যাটের দিকে। দেখেই চমকে উঠল মাজুভ, ওটা আহমদ মুসার ফেল্ট হ্যাট। মাজুভ নীচু হয়ে ফেল্ট হ্যাটটি তুলে নিল। সে খেয়াল করল না ফেল্ট হ্যাটের অল্প দূরে একটা লোহার টুপিও পড়ে আছে।
ফেল্ট হ্যাট তুলে নিয়ে এর দিকে চোখ বুলাতে গিয়ে চোখ থেকে ঝর ঝর করে পানি নেমে এল মাজুভের।
একজন লোক গুটি গুটি পায়ে এসে দোকানের বাইরে দাঁড়িয়েছিল। সে মাজুভকে লক্ষ্য করছিল।
মাজুভ যখন ফেল্ট হ্যাট তুলে কেঁদে উঠেছিল তখন বাইরে দাড়ানো লোকটি দোকানে প্রবেশ করল।
পায়ের শব্দে চমকে উঠে মাজুভ মুখ ফিরাল। চোখ পড়ল আগন্তুক লোকটির উপর।
আগন্তুক লোকটি সালেহ বাহমন। গুলির শব্দে সেও ছুটে এসেছিল পাশের দোকান থেকে পেছন দিক দিয়ে। অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সেও দেখেছিল দু’জন লোককে টেনে কয়েকজন গাড়িতে তুলল। সে বুঝতে পারল মিলেশ বাহিনীর হামলা হয়েছে। সে বিষ্মিত হলো, তিনটি গুলি কার বিরুদ্ধে হলো? আর যাদেরকে টেনে ছেচড়ে গাড়িতে তোলা হলো, সে দু’জনের মধ্যে সেলসম্যান নেই, তাহলে ও দু’জন কে? সালেহ বাহমন ধাঁধায় পড়ে গেল, মিলেশরা কার বিরুদ্ধে লড়াই করল।
আগন্তুক সালেহ বাহমন মাজুভকে বলল, আমি আপনার শত্রু নই, আপনি মিলেশ বাহিনীর নন আমি জানি।
-কেমন করে জানেন? প্রশ্ন করল মাজুভ।
-আমি অন্ধকারে দাঁড়িয়ে দেখলাম, আপনি মিলেশ বাহিনীর গুলি থেকে বাঁচার জন্যে ফুটপাতের নিচে গড়িয়ে পড়েছিলেন আর ওরা চলে যাবার পর আপনি দোকানে ঢুকেছেন।
-আপনি মিলেশ বাহিনীকে চিনলেন কেমন করে? আপনি কে?
-মিলেশ বাহিনীকে চিনব না কেন? ওরা তো আমাদের উৎখাতের চেষ্টা করছে। আমি সালেহ বাহমন।
-আপনি মুসলমান?
-হ্যাঁ। আপনি?
-আমি খৃষ্টান ছিলাম। আমি মিলেশ বাহিনীতে ছিলাম। আহমদ মুসা আমাকে নতুন জীবনের সন্ধান দিয়েছেন। আমি মিলেশ বাহিনী ত্যাগ করেছি, ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেছি।
সালেহ বাহমনের চোখ দু’টি ছানা বড়া হয়ে উঠল। বলল, আহমদ মুসার সাথে কোথায় দেখা হলো আপনার? আপনার নাম কি মাজুভ?
-হ্যাঁ মাজুভ। কি করে জানলেন আমার নাম?
-জেনেছি জাকুবের কাছ থেকে। এই দোকানেই তার সাথে আমার পরিচয় হয়। সে যাক, আহমদ মুসা ভাই কোথায়?
আহমদ মুসার নাম শুনতেই মাজুভের মুখ আবার বিবর্ণ হয়ে গেল। আবার উদ্বেগ-আশংকা ফুটে উঠল তার মুখে। বলল, আহমদ মুসার খোজেই আমি এ দোকানে এসেছি। তিনজন লোককে অনুসরণ করে তিনি এ দোকানে ঢুকেছেন। তারপরেই গুলি-গোলা। পরে আরও চার পাঁচজন এ দোকানে এসে ঢোকে। থামল মাজুভ।
-তাহলে আহমদ মুসা ভাই……। উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় কথা শেষ করতে পারলো না সালেহ বাহমন।
-এখানে যাদের লাশ আছে তারা সবাই মিলেশ বাহিনীর। মনে হয়, আহমদ মুসাকে ওরা ধরে নিয়ে গেছে, তিনি আহতও হতে পারেন। তারপর সালেহ বাহমনকে ফেল্ট হ্যাট দেখিয়ে বলল, এটা আহমদ মুসার। আমি মনে করি তিনি আহত হয়ে পড়ে না গেলে তার মাথার হ্যাট পড়ে যেত না।
মাজুভের শেষের কথাগুলো কান্নায় বুজে গেল।
সালেহ বাহমন কিছুক্ষণ বাকরুদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর বলল, ওরা তো চলে গেছে, ওদের পিছু নেয়া আর যাবে না। তাহলে এখন করনীয়?
-মিলেশ বাহিনীর হেড কোয়ার্টার সম্প্রতি বদলেছে। আমি চিনি না। বলল মাজুভ।
-আমি জানি। জাকুব আমাকে ঠিকানা দিয়েছিল। কিন্তু সেখানে যেতে প্রস্তুতির প্রয়োজন আছে। আর এ খবরটা সবাইকে জানানোও দরকার।
-ঠিক বলেছেন।
-চলুন আমরা যাই। তার আগে এদিকের ব্যবস্থাটা করে ফেলতে হবে। বলে সালেহ বাহমন পাশের দোকান থেকে তার লোকদের ডেকে বলল, এ দোকান বন্ধ করে দাও। মিলেশ বাহিনীর তিনটি লাশ ড্রেনে ফেলে দাও। আমাদের সেলসম্যানের লাশটি দাফনের ব্যবস্থা কর।
নির্দেশ দিয়ে সালেহ বাহমন মাজুভকে সাথে নিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়ে আসতে আসতে বলল, ভুলে গেছি জিজ্ঞাসা করতে, হাসান সেনজিক কোথায়?
-নিরাপদে আছে। আমার বোনের বাড়িতে আহমদ মুসাসহ আমরা ওখানেই আছি।
-চলুন তাহলে আমরা ওখানে যাই, তাপর আপনাকে নিয়ে আমি বেরুব।
-সেটাই ভাল, ওদের খবরটা জানানো দরকার।
রাস্তা পার হয়ে জীপের কাছে গিয়ে পৌঁছল দু’জন। মাজুভ জীপের ড্রাইভিং সিটে বসল। সালেহ বাহমান বসল পাশের সিটে।
জীপ চলতে শুরু করল।
মাজুভ বলল, আহমদ মুসা ভাই আহত ছিলেন। আজকেই তিনি আহত হয়েছেন।
-আজকেই? কোথায়, কিভাবে?
-বেলা দশটার দিকে এসেছিলেন উনি এই শহীদ মসজিদ রোডে একা। হাসান সেনজিকের বাড়ির পশ্চিম পাশে ফুটপাত থেকে একটি মাইক্রোবাস দু’টি মেয়েকে কিডন্যাপ করে এবং তারা ছিল মিলেশ বাহিনীর লোক। ওদের সাথে সংঘর্ষে কপালে ক্ষতের সৃষ্টি হয়। মিলেশ বাহিনীর দু’জন মারা যায়, দু’জন জ্ঞান হারায়।
-হাসান সেনজিকের বাড়ির পশ্চিম পাশ থেকে কিডন্যাপ করা হয়েছে। ওরা কি মুসলমান?
-হ্যঁ মুসলমান।
-নাম কি?
-আহমদ মুসা নাম জিজ্ঞেস করেননি।
সালেহ বাহমান কিছু বলল না। কিন্তু তার মনের কোথায় যেন খচ খচ করতে লাগল।
জীপ ছুটে চলল মাজুভের বোনের বাড়ির দিকে।
