সকুদ্রায় পৌছে আহমদ মুসারা কোন দেরী করল না। শুধু কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালে পৌছে দু’জনে বোতল থেকে পানি পান করল। তারপর আহমদ মুসা গাড়ি থেকে নেমে একজনকে ডেকে জিজ্ঞেস করে জেনে নিল পিউকা-কাকেজী রোডে কোন দিক দিয়ে যেতে হবে।
সকুদ্রা থেকে যে সড়কটি পূর্ব দিকে এগিয়ে আলবেনিয়ার সীমান্ত অতিক্রম করে যুগোশ্লাভিয়ার কসভো প্রদেশে প্রবেশ করেছে, তার দু’টি শহর হলো পিউকা ও কাকেজী।
তিরানা-সকুদ্রা সড়কের চেয়ে পিউকা-কাকেজী সড়ক অনেক খারাপ। কাকেজী পৌছতে আহমদ মুসাদের ঠিক দুপুর হয়ে গেল।
কাকেজী যুগোশ্লাভ সীমান্তের নিকটবর্তী একটি সুন্দর আলবেনীয় শহর শহরটির পাশ দিয়ে দ্রিনি নদী প্রবাহিত।
প্রচন্ড ক্ষুধা পেয়েছে আহমদ মুসাদের।
বাজার এলাকার মত দেখতে একটা সুন্দর মোড়ে এসে আহমদ মুসা তার গাড়ি দাঁড় করাল। মোড়ের মাঝখানে একটা সুন্দর আইল্যান্ডে আলেবনিয়ার প্রথম প্রেসিডেন্ট এনভার হোজার একটা মার্বেল মূর্তি। মূর্তিটির বেজে উৎকীর্ণ নাম ‘কাকেজী সেন্ট্রাল স্কোয়ার’। আর রোডটির নাম কাকেজী এ্যাভেনিউ সেটা আগেই দেখেছে। এই এভেনিউটিই দ্রিনি সমান্তরালে অগ্রসর হয়ে আলবেনিয়া সীমান্ত অতিক্রম করেছে।
স্কোয়ারের এক পাশে আহমদ মুসা তার গাড়ি দাঁড় করাল।
আহমদ মুসা নামল গাড়ি থেকে। কাউকে জিজ্ঞাসা করে হোটেলের অবস্থান জেনে নেবে এই ছিল তার লক্ষ্য।
গাড়ি থেকে নেমেই আহমদ মুসা একজনকে সামনে পেয়ে গেল। দীর্ঘ শক্ত সমর্থ চেহারা, কিন্তু মানিচিত্রের মত এবড়ো – থেবড়ো মুখ। হন হন করে হাটছিল।
আহমদ মুসা তার মুখোমুখি হয়ে জিজ্ঞেস করল, মাফ করবেন, আশে পাশে কোন ভাল হোটেল …….
আহমদ মুসা কথা শেষ না করতেই সে তার পেছনে মুখ ফিরিয়ে সামনের দিকে ইংগিত করে বলল, আর একটু সামনে এগুলে রাস্তার এ পাশেই একদম রাস্তার উপরেই ‘কাকেজী ইন্টারন্যাশনাল’।
কথা শেষ করে একটা দম নিয়ে সে বলল, আপনারা নিশ্চয় এ শহরে নতুন, কোত্থেকে আসা হচ্ছে?
–তিরানা থেকে আসছি।
লোকটা আহমদ মুসার আপাদ মস্তকে একবার চোখ বুলিয়ে বলল, মহাশয়ের দেশ কোথায়?
আহমদ মুসা ভাঙা আলবেনীয় ভাষায় কথা বলছিল। সুতারাং তাকে বিদেশী বলে চেনা খুব সহজ।
প্রশ্নটি আহমদ মুসাকে বিব্রত করল। মুহূর্তকাল দ্বিধা করে আহমদ মুসা সত্য কথাটাই বলল। জানাল যে, তারা আর্মেনিয়া থেকে আসছে।
লোকটির পাথুরে মুখে আহমদ মুসা কোন পরিবর্তন লক্ষ্য করল না।
আহমদ মুসা অনেকটা নিশ্চিন্ত মনে তার গাড়িতে ফিরে এল।
গাড়ি এগিয়ে চলল সামনে। আহমদ মুসা মুহূর্তের জন্যে মুখ ফিরিয়ে পেছনে তাকাল। দেখল লোকটি যেমন যাচ্ছিল, তেমনি সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। তবে গতিটা খুবই মন্থর।
‘কাকেজী ইন্টারন্যাশনাল’ সত্যিই বড় হোটেল। কিন্তু খাওয়ার হল ঘর একেবারে পূর্ণ। দুপুরের খাবার সময়ের এটা পিক আওয়ার বলেই এই অবস্থা। অফিস ও কল-কারখানায় যারা চাকুরী করে, তাদেরকে টিফিন আওয়ারের এক ঘন্টার মধ্যেই তাদের খাবারের কাজ করতে হয়। এ কারণে এ নির্দিষ্ট সময়ে হোটেল- রেস্তোরাঁয় ভীড় খুব বেশী হয়। অবশ্য নিম্ন বেতনের চাকুরেদের হোটেল-রেস্তোরাঁয় আসার সৌভাগ্য হয় না, তবু যারা আসে তাতেই হোটেলগুলো উপচে পড়ে।
আহমদ মুসা ডাইনিং হলের চারদিকে একবার দৃষ্টি নিক্ষেপ করে দেখল, এক কোনায় দু’টো সিট খালি আছে।
আহমদ মুসা টেবিলের কাছে গেল। টেবিলের অপর দু’টো সিটে একজন যুবক ও একজন যুবতী বসে। সম্ভবত এক দম্পতি ওরা।
আহমদ মুসা সে টেবিলে গিয়ে দু’টো শুন্য সিটে বসার অনুমতি চাইল, টারকিস শব্দ মিশ্রিত ভাঙ্গা আলবেনীয় ভাষায়।
যুবক-যুবতী দু’জনেই মুখ তুলে চাইল আহমদ মুসা ও হাসান সেনজিকের দিকে। ওরা মাথা নেড়ে অনুমতি দিল টেবিলে বসার জন্য।
ওয়েটার এলে আহমদ মুসা জিজ্ঞাস করল, হালাল জবাই করা গোশত পাওয়া যাবে?
ওয়েটার কথাটা বুঝতে পারলনা। হালালা জবাই অর্থ তার জানা নেই। মুহূর্ত কয়েক বিমূঢ় থাকার পর বলল, স্যার গরু, মেষ, শুকর সব ধরনের গোশতই আছে।
দম্পতির একজন যুবতী মেয়েটি ওয়েটারের কথা শুনে হেসে ফেলল। সে তার আঞ্চলিক ভাষায় ওয়েটারকে সম্ভবত হালাল জবাই কাকে বলে বুঝাল। তারপর সে আহমদ মুসাকে লক্ষ্য করে বলল, আলবেনিয়ার কোন হোটেল-রেষ্টুরেন্টেই হালালা জবাই করা গোশত পাওয়া যায় না।
একটু থেকে মেয়েটি বলল, আপনারা নিশ্চিয় মুসলমান, কোত্থেকে এসেছেন?
আহমদ মুসা ভেজিটেবলস, সালাদ ও রুটির অর্ডার দিয়ে মেয়েটির প্রশ্নের জবাব দিল। বলল, আমরা আর্মেনিয়া থেকে এখানে এসেছি।
–হালাল জবাই করা না হলে কি মুসলমানেরা সে গোশত খেতে পারে না?
–না।
–হালাল জবাই করা গোশত যদি না পাওয়া যায়।
–তাহলে আলবেনীয় মুসলমানরা তো গোশতই খেতে পাবে না। কিন্তু এটা কি সম্ভব?
–সম্ভব নয়, একথা ঠিক। কিন্তু মুসলমানদেরকে বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে যখন এটা সম্ভব হচ্ছে না, তখন মুসলমানদের ব্যক্তিগতভাবে চেষ্টা করতে হবে হালাল গোশত সংগ্রহের।
–কিন্তু এই চেষ্টা যদি অপরাধ হয়, যদি এ জন্য জুলুম নির্যাতন নেমে আসে?
–মুসলমানদেরকে তা মোকাবিলা করতে হবে। প্রকাশ্যে না পারলে গোপনে ঈমানের দাবী পূরণ করতে হবে। তা না হলে জাতীয় অস্তিত্ব বৈশিষ্টই একদিন বিলীন হয়ে যাবে।
দম্পতি দু’জন উত্তরে কিছু বলল না। তাকিয়ে রইল তারা আহমদ মুসার দিকে। খাওয়া তাদের বন্ধ হয়ে গেছে। গোশতের প্লেট তারা ঠেলে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। মুখে তাদের চিন্তা ও বিষাদের ছায়া।
আহমদ মুসা ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল, আপানাদের এসব প্রশ্ন থেকে মনে করছি আপনারা মুসলমান। আমার অনুমান কি মিথ্যা?
–মিথ্যা নয় এই অর্থে যে আমরা মুসলিম পিতা মাতার সন্তান, আবার মিথ্যা এই অর্থে যে, মুসলমান হিসেবে পরিচয় দেবার আমাদের কিছুই নেই।
–কিন্তু হালাল-হারামসহ অনেক বিষয়ই আপনারা জানেন বলে মনে হচ্ছে।
–আমরা স্বামী-স্ত্রী দু’জনেই পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চাকুরী করি। তাই বাইরে যাবার সুযোগ হয়েছে অনেক বার।
প্রশ্নের উত্তর দিয়েই যুবকটি বলল, আমাদের বাড়ী এই কাকেজীতেই। আপনারা কবে এসেছেন, ক’দিন থাকবেন কাকেজীতে?
–এইমাত্র এসে পৌছালাম, আবার খাবার পরেই চলে যাব।
–কোথায় যাবেন?
–যুগোশ্লাভিয়া।
এই সময় হাসান সেনজিক আহমদ মুসার কানে কানে কি যেন বলল।
কথা শুনেই আহমদ মুসা ডাইনিং হলের দরজার দিকে তাকাল। দেখল, মানচিত্রের মত এবড়ো-থেবড়ো মুখওয়ালা সেই লোকটি দরজায় দাঁড়িয়ে। তার সাথে আরও একজন। এদিকেই তাকিয়ে আছে।
মুহূর্তের জন্য আনমনা হলো আহমদ মুসা। তখনই লোকটাকে দেখে তার ভালো মনে হয়নি। জাত ক্রিমিনালের মত চেহারা। প্রশ্ন হলো, মিলেশ বাহিনীর কেউ, না তাদের কোন এজন্টে।
আহমদ মুসার দরজার দিকে তাকানো এবং ভাবান্তর দম্পতির দৃষ্টি এড়ালো না। যুবকটি বললো, কিছু ঘটেছে?
আহমদ মুসা যুবকটির দিকে মুহূর্তকাল চেয়ে বলল, মুসলমানরা মিথ্যা কথা বলে না, কিন্তু সত্য কথাও যে এই মুহূর্তে বলতে পারছি না।
যুবকটি খুশী হলো। বলল, ঠিক আছে বলতে হবে না। আপনার একটা দুঃশ্চিন্তার প্রকাশ দেখছিলাম তো তাই বলছিলাম। আপনাদের কোন অসুবিধা করতে চাই না।
–ধন্যবাদ। এই অসুবিধার ভয়ই আমরা করছি। আমরা প্রবল এক অন্ধকারের মধ্যে দিয়ে পথ চলছি।
মেয়েটি অনেকক্ষণ কথা বলেনি। সে এবার মুখ খুলল বলল, আমি আপনাদের ট্যুরিষ্ট মনে করেছিলাম।
–ট্যুর তো বটেই, কিন্ত একটা বিপজ্জনক ট্যুর। হেসে বলল আহমদ মুসা।
–জানার লোভ কিন্তু বাড়ছে। বিপজ্জনক ট্যুর কথাটির মধ্যে একটা এ্যাডভেঞ্চারের গন্ধ আছে। হেসে বলল মেয়েটি।
–এ্যাডভেঞ্চার কথাটির মধ্যে একটা সৌখিনতা আছে এবং সেখানকার বিপদগুলো ঘটনার প্রবাহের নগদ সৃষ্টি। আমাদের এ্যাডভেঞ্চার সৌখিনতা নয় একটা অপরিহার্য প্রয়োজন। আর এখানকার বিপদগুলো সুপরিকল্পিত।
–তাহলে আমরা বলতে পারি, আপনারা একটা বড় উদ্দেশ্য সাধনের জন্যে বেরিয়েছেন, আর সে উদ্দেশ্য সাধনের ক্ষেত্রে আপনারা মোকাবিলা করছেন এক প্রবল শত্রুকে। এবার কথা বলল যুবকটি।
তখন ২টা বাজতে মিনিট দশেকের মত বাকি। ডাইনিং হল প্রায় ফাঁকা হয়ে গেছে। আহমদ মুসার টেবিলের দম্পতিটিও খাওয়া শেষ করেছিল। তারা গোশত থেকে সেই যে হাত তুলেছিল, আর খায়নি।
আহমদ মুসা যুবকটির কথার উত্তর দিতে যাচ্ছিল, এমন সময় বাইরে একটা প্রচন্ড বিস্ফোরণের শব্দ হলো। সে শব্দে ডাইনিং হলে চেয়ার-টেবিল পর্যন্ত নড়ে উঠল।
বাইরে ছুটাছুটি শুরু হয়ে গেছে।
ডাইনিং হলে যে, দু’চারজন ছিল তারা হোটেল কাউন্টারে টাকা ফেলে দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে।
আহমদ মুসাসহ তার টেবিলের তারা চারজনই উঠে দাঁড়িয়েছে।
দম্পতির যুবক-যুবতির মুখে উদ্বেগ। যুবকটি বলল উৎকণ্ঠিত কণ্ঠে, খুব শক্তিশালী একটা বিষ্ফোরণের শব্দ এটা।
আহমদ মুসা ম্লান হেসে বলল, আমার অনুমান মিথ্যা না হলে আমদের গাড়িটিই বিষ্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দেয়া হয়েছে।
আহমদ মুসার কথার সাথে সাথে যুবক-যুবতীর চোখে-মুখে একটা আতংক নেমে এল।
আহমদ মুসা কথা শেষ করে ধীরে ধীরে হোটেল কাউন্টারের দিকে এগুলো। তার চোখে-মুখে উদ্বেগ-আশংকা কিছুই নেই।
দম্পতির যুবকটির নাম এভরেন রমিজ এবং যুবতীটির নাম লায়লা লিডিয়া। আশংকাকুল তারা। আহমদ মুসার স্বাভাবিক-স্বচ্ছন্দ মুখের দিকে তাকিয়ে বিস্মিত হলো। যদি তাঁর কথা সত্য হয়, তাহলে এই পরিস্থিতিতে উনি এমন স্বাভাবিক থাকেন কি করে?
একটা হ্যান্ড ব্যাগ হাতে হাসান সেনজিক আহমদ মুসার পিছু পিছু চলছিল। রমিজ এবং লায়লাও তাদের পিছু পিছু চলল।
ধীরে সুস্থে আহমদ মুসা কাউন্টারে খাওয়ার পয়সা চুকিয়ে হোটেলের দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল। হোটেল কম্পাউন্ডে তখন দু’চারটি গাড়ি ছিল। আহমদ মুসার গাড়ি ফাঁকা একটা জায়গায় দাঁড়িয়েছিল। বিস্ফোরণে গাড়িটি টুকরো টুকরো হয়ে গেছে। তখনও দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন। আহমদ মুসা বেরিয়ে ঐ আগুনের দিকে চেয়ে রইল।
