অন্ধকার ঘরে চোখ খুলল সালমান শামিল। চিন্তা করতে চেষ্টা করল কোথায় সে? বুঝল কংক্রিটের একটা নগ্ন মেঝেতে সে শুয়ে আছে। তার মনে পড়ল, সে জীপ নিয়ে ইনস্টিটিউটের গেট দিয়ে বের হয়ে এসেছিল। সে বাম দিক মোড় নেবার জন্য স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে নিচ্ছিল। হঠাৎ তার চোখে পড়ে বাম দিক থেকে একটা ট্রাক তার জীপ লক্ষ্যে ছুটে আসছে। কিছু করার আগেই ট্রাকটির প্রচণ্ড একটা আঘাতে জীপ সমেত সে ছিটকে পড়ে। মনে পড়ছে মাথাটা প্রচণ্ড বাড়ি খেয়েছিল পিচ ঢাকা রাস্তার সাথে। চোখ তার অন্ধকার হয়ে আসে। এই সময়েই কারা যেন তাকে গাড়িতে টেনে তলে। একটা মিষ্টি গন্ধ তার নাকে প্রবেশ করে। আর কিছুই মনে নেই তার।
সালমান শামিল হাত-পা নেড়ে দেখল, হাত-পা বাঁধা নেই। কপালের বাম পাশে একটা জায়গা খুব ব্যথা করছে। মাথার ঐ জায়গাটাই রাস্তার সাথে বাড়ি খেয়েছিল।
উঠে বসল সালমান শামিল। চারদিক ঘুটঘুটে অন্ধকার। রাত না দিন কিছুই বোঝা যাচ্ছে ন।
কোথায় সে? সন্দেহ নেই, সে শত্রুর হাতে। এবং তার অনুমান মিথ্যা না হলে ‘হোয়াইট উলফ’-এর হাতে সে বন্দী। ডক্টর স্যারের কথাই সত্য হল, ‘হোয়াইট উলফ’ তার পরাজয়ের প্রতিশোধ নিতে কোন সুযোগই নষ্ট করেনি।
সালমান শামিল উঠে দাড়াল। শরীরটাকে খুব হালকা ও দুর্বল মনে হল। ক্ষুধায় পেট চোঁ চোঁ করছে।
অন্ধকারে হাতড়িয়ে ঘরের দেয়াল স্পর্শ করল সালমান শামিল। দেয়াল ধরে সে দরজার সন্ধানে এগুল। কিছু খোঁজার পরই দরজা পেয়ে গেল। হাত দিয়েই বুঝল ইস্পাতের দরজা। আরেকটু খুঁজে হাতল পেয়ে গেল দরজার। হাতল ধরে টান দিল সে। সঙ্গে সঙ্গে আলো জ্বলে উঠল, কিন্তু দরজা খুলল না।
সালমান শামিল দেখল, বিরাট হল ঘর। হল ঘরের এক পাশে শোবার সুন্দর একটি ডিভান। আর অন্য পাশে সিংহাসনের মত বড় এবং সুন্দর একটা চেয়ার। ঘরের লম্বালম্বি দু’পাশ দিয়ে শোফা সেট সাজানো। শ্বেত পাথরের মেঝ। দেখলে মনে হয় এক দরবার কক্ষ এটা। একমাত্র ঐ দরজা ছাড়া কোন দরজা-জানালা ঘরে নেই। কিন্তু কোন অস্বস্তি বোধ হচ্ছে না। এতক্ষণ সালমান শামিল উপলব্ধি করল, ঘরটা এয়ারকন্ডিশন করা। সালমান শামিল দরজার সামনেই দাঁড়িয়ে ছিল। দেখল সে তার সামনেই দরজাটা নিঃশব্দে খুলে গেল। বুঝল স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা।
দরজা দিয়ে বেরিয়ে এল সালমান শামিল।
বেরিয়ে সে দীর্ঘ বারান্দায় এসে দাঁড়াল। দু’পাশে তাকিয়ে দেখল, বারান্দাটি সামনে গোল হয়ে বেঁকে গেছে।
বারান্দার পরেই উন্মুক্ত উঠান। ওটাও বারান্দার মতই। গোল হয়ে বেঁকে যাওয়া। উঠান এক বিরাট মাঠের মত। মাঝখানটা উঁচু। চারদিকটা ঢালু হয়ে চারদিকের বিল্ডিং এর বারান্দায় গিয়ে ঠেকেছে।
উঠানের মাঝখানে উঁচু শীর্ষবিন্দুটিতে শ্বেত পাথরের একটা বেদী। বেদীর উপর শ্বেত মর্মরের একটা সুদৃশ্য মূর্তি।
সালমান শামীল উঠান পেরিয়ে সেই বেদীর উপর গিয়ে দাঁড়াল।
মূর্তিটির মুখোমুখি হতেই সালমান শামিল চিনল ওটা শামিউনের মূর্তি। শামিউন খৃষ্টান আর্মেনিয়ার জাতীয় বীর। বৃহত্তর খৃস্টান আর্মেনিয়া গড়ার স্বপ্ন নতুন করে সে চাঙ্গা করে এবং সর্বশেষ সংগ্রাম তার দ্বারাই পরিচালিত হয়। রাশিয়ান জারের পতন ঘটলে ১৯১৮ সালের আটাশে মে ককেশাসের মুসলমানরা স্বাধীনতা ঘোষণা করে। কম্যুনিস্ট বিপ্লবের আগে লেনিন ককেশাসের মুসলমানদের এই স্বাধীনতারই আশ্বাস দিয়েছিল। কিন্তু প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে লেনিন মুসলমানদের স্বাধীনতার কণ্ঠ রোধ করার জন্য ১৯১৭ সালে বিপ্লবের পরই বিশাল কম্যুনিস্ট বাহিনীর নেতৃত্ব দিয়ে শামিউনকে ককেশাসে পাঠায়। আর্মেনীয় শামিউন ছিল বৃহত্তর খৃষ্টান আর্মেনিয়া গড়ার স্বপ্নে বিভোর মুসলিম বিদ্বেষী একজন মানুষ। শামিউন কম্যুনিস্ট বাহিনী নিয়ে ককেশাসে প্রবেশ করে প্রথমে ট্রেড ইউনিয়ন ও আঞ্চলিক নির্বাচনের প্রহসন করে ককেশাসের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেবার চেষ্টা করে। কিন্তু ককেশীয় সচেতন জনগণ তাদের সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ করে দেয়। সবখানেই মুসলিম নেতৃবৃন্দ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। এরপরই শুরু হয় গণহত্যা। শামিউন বিশাল কম্যুনিস্ট বাহিনীর সহায়তায় ১৯১৮ সালের মার্চ থেকে পরবর্তী চার-পাঁচ মাসে উল্লেখযোগ্য মুসলিম নেতৃবৃন্দসহ পচাত্তর হাজার মুসলিম নর-নারীকে হত্যা করে। কিন্তু চির স্বাধীনতাকামী ককেশীয় মুসলমানরা এত সহজে দমবার পাত্র ছিল না। তারা নতুন করে সংঘবদ্ধ হয় এবং চার মাসের চেষ্টায় শামিউনসহ কম্যুনিস্ট বাহিনীকে তারা ককেশাস থেকে বিতাড়িত করে। কিন্তু ককেশীয় মুসলমানদের দূর্ভাগ্য, ক্রিমিয়া, তাতারিয়া ও মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের অব্যাহত পরাজয়ে ককেশাসের উপর কম্যুনিস্ট চাপ বৃদ্ধি পায়। ১৯২০ সালের ২৭ এপ্রিল শামিউন রুশ সৈন্যের সাহায্যে ককেশাস দখল করে নেয়। তার অত্যাচার ও গণহত্যার ফলে মুসলিম জনপদগুলো শ্মশানে পরিণত হয়। পুড়িয়ে দেয়া মসজিদ, স্কুল, পাঠাগার ইত্যাদিতে বহু বছর কেউ পা দেয়নি। এই জালিম শামিউনই আর্মেনিয়ার এক মহান নায়ক। কম্যুনিস্টদের জন্য এত কিছু করেও শামিউন কিন্তু কম্যুনিস্টদের কাছ থেকে কিছুই পায়নি। ককেশাস কম্যুনিস্টদের করতলগত হবার পর বৃহত্তর আর্মেনিয়া গঠিত হয়নি, বরং ককেশাসকে জর্জিয়া, আজারবাইজান, তাতারিয়া ও আর্মেনিয়ার মাঝে ভাগ করে দেয়া হয়। আর্মেনিয়ার ভাগে সবচেয়ে কম অঞ্চলই পড়ে। আজ মুসলমানদের উদ্যোগে কম্যুনিস্ট সাম্রাজ্য যখন ধ্বসে পড়েছে, তখন আর্মেনিয়রা তাদের বৃহত্তর খৃস্টান আর্মেনিয়ার স্বপ্ন নিয়ে আবার মাথা তুলেছে ককেশাসের মুসলমানদের বিরুদ্ধে। আর তাদের সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে মুসলমান বিদ্বেষী কম্যুনিস্ট ও খৃষ্টান রাষ্ট্রগুলো। সালমান শামিলের মনে হল, শ্বেত মর্মরে গড়া শামিউনের উই উদ্ধত মূর্তি তাদের সে সম্মিলিত চেষ্টারই প্রতীক। পুজোর বেদীতে শামিউনকে প্রতিষ্ঠা করে তারা শামিউনের সেই গণহত্যা ও সন্ত্রাসেরই পুনরাবৃত্তি ঘটাতে চাচ্ছে ককেশাসে।
সালমান শামিল দেখল, শামিউনের বাম হাতে একটা মানচিত্র। পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। বৃহত্তর আর্মেনিয়ার মানচিত্র ওটা। পারস্যের একটা অংশ এবং গোটা পূর্ব আনাতোলিয়াসহ কৃষ্ণ সাগর ও কাম্পিয়ান সাগরের সমগ্র অঞ্চলকে বৃহত্তর আর্মেনিয়ার অংশ দেখানো হয়েছে। ডান হাত তার মুষ্টিবদ্ধভাবে উপরে তোলা যা শক্তির প্রতীক। অর্থাৎ শক্তির জোরেই তারা বৃহত্তর আর্মেনিয়া গঠন করবে। সালমান শামিলের চোখ নেমে এল নিচে। তার চোখ শামিউনের পায়ের তলার বেদীতে নিবদ্ধ হতেই ভীষণভাবে চমকে উঠলো সালমান শামিল। দেখল, শামিউনের মূর্তি যে প্রস্তরখণ্ডের উপর দাঁড়িয়ে আছে, তার চারদিক ঘিরে নরমুণ্ডু সারিবদ্ধভাবে সাজানো। নরমুণ্ডুগুলো পিতলের প্লেটে রাখা। যেন অর্ঘ দেয়া হয়েছে শামিউনের পায়ে।
নরমুণ্ডুগুলো শামিউনের পদ-তলের সোপান ঘিরে একটি বৃত্ত রচনা করেছে। শামিউনের বাম পাশ থেকে আরেকটি বৃত্তের কাজ শুরু হয়েছে। এ অসমাপ্ত বৃত্তের শেষ নরমুণ্ডুটি সালমান শামিলের একেবারে সামনেই।
সালমান শামিল বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করল এই শেষ নরমুণ্ডটির আগের পিতলের প্লেটটি খালি। একটা প্লেট খালি রেখেই পরের প্লেটে শেষ নরমুণ্ডটি রাখা হয়েছে। একটা কৌতুহলই হলো। সালমান শামিল কয়েক পা সামনে এগুলো। সামনের নরমুণ্ডটি তার কাছে আরো স্পষ্ট হয়ে উঠলো। শামিউনের মূর্তি-মুখো করে দাঁড় করিয়ে রাখা নরমুণ্ডটির মাথার খুলিতে কাল কালিতে লেখা তিনটি শব্দ তার নজরে পড়ল। পড়ার জন্যে সামনে একটু ঝুঁকে পড়লো সালমান শামিল। কালো কালির “আল্লামা ইব্রাহিম এদতিনা” নামটি জ্বল জ্বল করে উঠল তার সামনে।
হদয়ের কোথায় যেন প্রচণ্ড এক ধাক্কা খেল সালমান শামিল। মুহূর্তের জন্যে নিঃশ্বাস নিতেও সে ভুলে গেছে যেন। অব্যক্ত যন্ত্রণার একটা ঢেউ খেলে গেল তার গোটা দেহে -সমগ্র স্নায়ূতন্ত্রীতে।
আরেকটু ঝুঁকে পড়লো সালমান শামিল নরমুণ্ডটির ওপর। ঔষধ দিয়ে মাথাটি পরিষ্কার করা হয়েছে। সালমান শামিল দেখল হাড়গুলো একদম কাঁচা। মনে হচ্ছে, আজই বা এই মাত্র একে এখানে রাখা হয়েছে। লেখার কালিগুলো যেন এখনও ভাল করে শুকায়নি। অর্থাৎ তাকে কিডন্যাপ করে আজ কালের মধ্যেই খুন করা হয়েছে।
সালমান শামিল মাথা তুলে পাশের নরমুণ্ডটির দিকে এগিয়ে গেল। মাথার খুলিতে সেই কালো কালিতে লেখা নাম পড়ল, ‘আবুল বরকত আহমদভ’।
আবুল বরকত আহমদভ ছিল ককেশাসের নাগারনো কারাবাখ অঞ্চলের ‘ককেশাস ক্রিসেন্ট’ এর প্রধান। দিন আটেক আগে সে হারিয়ে যায়।
সালমান শামিল মাথা তুলল। বেদনা বিস্ফোরিত তার চোখ। তার মনে জেগে উঠল জিজ্ঞাসা, তাহলে কি আমাদের হারানো সব নেতৃবৃন্দকে এনে শামিউনের পায়ে অর্ঘ দেয়া হয়েছে?
সালমান শামিল গুণে দেখল, প্রথম বৃত্তটিতে বিশটি মাথা এবং অসমাপ্ত দ্বিতীয় বৃত্তটিতে ছটি মাথা। হিসেব মিলে যায়, বিগত কয়েক সপ্তাহে ছাব্বিশজন মুসলিম নেতার অন্তর্ধান ঘটেছে, আর ছাব্বিশটি মাথাই এখানে আছে। তবুও একবার ঘুরে ঘুরে নামগুলো দেখল। নজর বুলাল তাদের কংকালে পরিণত হওয়া মুখের দিকে। চোখ ফেটে অশ্রু নেমে এল তার। সবশেষে সে এসে দাঁড়াল ছাব্বিশ নম্বরে রাখা পিতলের খালি প্লেটের কাছে, মনে পড়লো, হ্যাঁ-তালিকায় তার নাম ছাব্বিশ নম্বরে ছিল। অর্থাৎ এ প্লেটটি তার মাথার জন্যেই নির্ধারিত। যেহেতু তার মাথা পাওয়া যায়নি এ পর্যন্ত, তাই ওটা খালি রাখা হয়েছে।
এই সময় বেদীর বুক থেকে একটা কণ্ঠ ধ্বনিত হল। বলল, সালমান ঠিকই ভাবছ, এ প্লেটটি তোমার জন্যেই নির্ধারিত। শিঘ্রই তুমি ওর গৌরব বৃদ্ধি করবে।
সালমান শামিল, বুঝল, বেদীর সাথে মাইক্রোফোন সংযোগ রয়েছে।
সালমান শামিল চারদিকে একবার নজর বুলালো। চারদিকে ঘোরানো বিশাল বিল্ডিং এর সবগুলো দরজাই বন্ধ, একমাত্র তার ঘরের দরজাটা ছাড়া।
সালমান শামিল ধীরে ধীরে বেদী থেকে নেমে এল। সে গোটা বিল্ডিংটা একবার দেখতে চায়। কি আছে, কে আছে ঐ বন্ধ ঘরগুলোতে। কেন কেউ তার সামনে আসছে না।
সালমান শামিল যে ঘরে ছিল সেটা বেদীর পূর্ব দিকে। সালমান শামিল পশ্চিম প্রান্তের বিল্ডিং এর দিকে নেমে গেল। ঘোরানো বিল্ডিংটা গোটাটাই তিনতলা। দূর্গের মত দেখতে। ধরণ-ধারণ ও অবস্থা দেখলেই বোঝা যায়, শত বছরেরও বেশি পুরানো বিল্ডিং। কিন্তু খুবই মজবুত তাতে কোন সন্দেহ নেই।
সালমান শামিল চিন্তা করে পেল না, এমন বিল্ডিং ইয়েরেভেনের কোথায় আছে। ইয়েরেভেনের প্রতি ইঞ্চি জায়গা সে চেনে। আড়াই হাজার বছর আগের ধ্বংসাবশেষ, এক হাজার, দেড় হাজার বছর আগের ভগ্ন প্রাসাদসহ সব কিছুই সে দেখেছে। কিন্তু এ ধরণের একটা জায়গা, এ ধরণের একটা ভবন তো কোথাও দেখেনি! তাহলে কি এটা ইয়েরেভেন নয়? আর্মেনিয়ার দূর্গম স্থানের কোন কি গোপন নগরী?
সালমান শামিল এসে বারান্দায় উঠে একটা কক্ষের দরজার দিকে চলল। এ সময় একটা কণ্ঠ বিকট শব্দে হেসে উঠল। বলল, সালমান শামিল ঘরগুলো তুমি সার্চ করতে চাও? পারবে না। দরজা তুমি কোনভাবেই ভাঙতে পারবে না। আর ভাঙলেও কোন লাভ হবে না। এই গোটা বিল্ডিং এ তুমি ছাড়া আর কেউ নেই। তুমি বেঁচে থাকা পর্যন্ত ওখানে কারো যাবারও দরকার নেই।
কণ্ঠটি একটু থামল। একটু পরেই আবার বলে উঠল, ‘হোয়াইট উলফ’ একটা শিকারের ওপর দু’বার ঝাপিয়ে পড়ে না। কিন্তু তোমার ক্ষেত্রে একটা অসম্ভব ব্যতিক্রম ঘটেছে। তাই তোমার ব্যাপারে তারা একটা মজার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তোমার গায়ে তারা হাত লাগাবে না। একজন মানুষ ক্ষুধায়-তৃষ্ণায় কিভাবে তিল তিল করে মৃত্যুবরণ করে সে দৃশ্যটা তারা ধীরে সুস্থে দেখবে। কথা শেষ করে কণ্ঠটি আবার সেই বিকট শব্দে হেসে উঠল।
এক সময় তার হাসিটিও থেমে গেল।
সালমান শামিল কয়েক মূহুর্ত বিমূঢ়ের মত দাঁড়িয়ে থাকল। সে ঐ কন্ঠের কোন কথাকেই অবিশ্বাস করলো না। ‘হোয়াইট উলফ’-এর পেছনে খৃষ্টানদের যে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদী সংস্থা ক্লু-ক্ল্যাক্স-ক্ল্যান এবং যে কম্যুনিষ্ট সন্ত্রাসবাদী সংস্থা, ‘ফ্র’ রয়েছে, তাদের চেয়ে জঘন্য, বর্বর, পশু কোন কিছু আর দুনিয়াতে নেই। এদের উম্মত্ত ও বিকৃত মানসিকতা সব পারে।
সালমান শামিল ফিরে দাঁড়াল ।
সে হাঁটতে শুরু করল তার ঘরের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে সে ভাবল, তার প্রতিটি পদক্ষেপ ওরা টেলিভিশন ক্যামেরায় দেখছে। বিল্ডিংসহ গোটা এলাকার সবকিছুই নিশ্চয়ই টেলিভিশন ক্যামেরার আওতায়।
সালমান শামিল তার ঘরের দরজায় এসেও আবার বারান্দায় ফিরে গেল।
বসে পড়ল সে বারান্দার পাথরের মেঝেতে।
অনেক হেঁটেছে। খুব ক্লান্তি লাগছে তার। আর খাদ্য ও পানি পাওয়া যাবে না শুনে ক্ষুধা-তৃষ্ঞাও যেন হঠাৎ বেড়ে গেল।
৭
কাস্পিয়ান সাগরের কালো পানি কেটে চারদিকের ঘুটঘুটে অন্ধকার ঠেলে পোর্ট আনোয়ার থেকে একটি পেট্রোল বোট এগিয়ে চলেছে পশ্চিম দিকে।
পোর্ট আনোয়ার কাস্পিয়ান সাগর তীরস্থ মুসলিম মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের একটি বন্দর। রুশ শাসন আমলে এ বন্দরের নাম ছিল ক্রাজনোভস্ক। কাস্পিয়ান সাগরের পূর্ব তীরে মুসলিম মধ্য এশিয়ার এটাই একমাত্র বন্দর। মধ্য এশিয়া স্বাধীন হবার পর মুসলিম সরকার এই বন্দরের নাম রেখেছে পোর্ট আনোয়ার -শহীদ আনোয়ার পাশার নাম অনুসারে।
শহীদ আনোয়ার পাশা মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের স্বাধীনতা রক্ষার জন্যে কম্যুনিষ্ট লালফেৌজের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে শহীদ হয়। কম্যুনিস্ট চাপের মুখে মধ্য এশিয়ার মুসলমানদের যখন ঘোর দুর্দিন, তখন সেনাধ্যক্ষ আনোয়ার পাশা কাস্পিয়ান সাগরের পথে ছুটে আসে মধ্য এশিয়ায়। এই বন্দরেই সে বোট থেকে নামে। একজন মহান শহীদের সে স্মৃতি ধরে রাখার জন্যে মুসলিম মধ্য এশিয়ার স্বাধীন সরকার তার নামে বন্দরের এই নাম রেখেছে।
বোটে মাত্র ছয়জন আরোহী। ড্রাইভিং সীটে মুসলিম মধ্য এশিয়ার নৌবাহিনীর তরুণ অফিসার আলী নকীর। তার পেছনে সোফায় আহমদ মূসা। সারফেস টু এয়ার কামান রয়েছে। সারফেস টু সারফেস কামানের পাল্লা পঞ্চাশ মাইলেরও বেশী।
বোটের স্বল্প পাল্লার হেডলাইটের আলোটি ছাড়া সব আলো নিভানো। বোটটি একটা জমাট অন্ধকারের মত এগিয়ে চলেছে পশ্চিমে। লক্ষ্য তার ককেশাসের বাফু ও সীমান্ত নগরী আশতারার মধ্যবর্তী উপকূলের একটি স্থান।
ঘন্টায় পঞ্চাশ মাইল বেগে চলেছে বোটটি। পোর্ট আনোয়ার থেকে বাকু দু’শ মাইল। আহমদ মূসা তার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলেন রাত এগারটা। এই গতিতে গেলে পথে কোন ঝামেলা না হলে তিনটার দিকে তিনি ককেশাস উপকূলে পেৌঁছতে পারবেন।
বহু চিন্তা করে আহমদ মুসা ককেশাস যাবার এই কাস্পিয়ানের পথটাকে বেছে নিয়েছেন। মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের কাজাখিস্তান হয়ে ককেশাস প্রবেশ করা যেত, কিন্তু পথটায় বিপদ বেশি। কাজাখ বর্ডার থেকে ককেশাস বর্ডারের মধ্যবর্তী গোটা তাতারিয়া অঞ্চলে রুশরা সর্বক্ষণ চোখ আর কান খাড়া করে আছে যাতে একটা পিঁপড়াও মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্র থেকে সেদিকে প্রবেশ করতে না পারে। অন্যদিকে পারস্যের পথটা আহমদ মূসার জন্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। অবশেষে কাস্পিয়ানের সংক্ষিপ্ত পথটাকেই সবচেয়ে অনুকূল মনে করেছে। কিন্তু এখানে বিপদ নেই তা নয়। মধ্য এশিয়া প্রজাতন্ত্রের পানিসীমা পার হবার পর আজারবাইজানের প্রায় উপকূল পর্যন্ত দেড়শ’ মাইল পথটি রুশদের কড়া পাহারায় রয়েছে। কাজাখ অঞ্চল থেকে তাতারিয়া অঞ্চলে সে যেমন একটা পিঁপড়া ঢুকতে দিতেও নারাজ, তেমনি কাস্পিয়ান সাগরের পথটাও সে পাহারা দিচ্ছে যাতে মধ্য এশিয়া থেকে ককেশাসে আসা যাওয়া কারও পক্ষে সম্ভব না হয়। এই পাহারা দেয়ার কাজে সাবমেরিন এবং একটি শক্তিশালী নেৌ-গোয়েন্দা ইউনিটসহ অনেক যুদ্ধ জাহাজ ও পেট্রোল বোট রয়েছে। চব্বিশ ঘন্টা তাদের এই পাহারা কাজ চলছে। এতদসত্ত্বেও আহমদ মূসা মনে করেছেন, স্থল পথের চেয়ে পানি পথে শত্রুকে ফাঁকি দেয়া সহজ হবে।
এই বিপদ সংকুল পথে আহমদ মুসাকে এইভাবে একাকি ছেড়ে দিতে কেউ রাজী হয়নি। কিন্তু আহমদ মুসা কাউকেই সাথে নিতে চাননি। শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত হাসান তারিক জেদ করেছে। আহমদ মুসা বলেছেন, এ ধরনের অভিযানে যত কম লোক জড়িত হয়ে পারা যায় তাই করা উচিত। আর হাসান তারিককে তিনি পরামর্শ দিয়েছেন, তার কিছুদিন বিশ্রাম প্রয়োজন। তার দেশ ফিলিস্তিন থেকে সে বহুদিন বাইরে। এমন কি, স্বাধীন ফিলিস্তিনকে সে এখনও দেখেইনি। বাড়িতে মা-বোনের সাথে বহুদিন থেকে বিচ্ছিন্ন। সুতরাং আয়েশা আলিয়েভকে নিয়ে একবার তার দেশে যাওয়া দরকার। প্রয়োজন হলেই তাকে ডেকে নেবে আহমদ মুসা। তাছাড়া আহমদ মুসা মনে করেন, নেতৃত্বের ক্ষেত্রে মাহমুদ ফিলিস্তিনে একাকিত্ব অনুভব করছে। হাসান তারিকের মত দক্ষ নেতৃত্ব তার পাশে থাকলে ইসলামী ফিলিস্তিন আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
একটু মাথা ঝুঁকিয়ে আহমদ মুসা ‘ডিস্টেন্স রেকর্ড’ প্যানেলের দিকে তাকিয়ে বললেন, নকীর, পঞ্চাশ মাইল পেরিয়ে আসছো, এবার বোধ হয় তোমাকে হেডলাইটের আলোটুকুও নিভিয়ে ফেলতে হবে।
কাস্পিয়ান সাগরের ক্ষেত্রে উপকূল পঞ্চাশ মাইল পর্যন্ত জাতীয় অর্থনৈতিক এলাকা নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এই অর্থনৈতিক এলাকা পর্যন্ত স্বাধীনভাবে বিচরণ করা যায়।
পেট্রোল বোটটি একান্নতম মাইলে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে হেড লাইটের আলো নিভিয়ে দিল।
চার দিক থেকে জমাট অন্ধকারের এক পাহাড় এসে বোটটিকে ঘিরে ধরল। বোটটিকে মনে হল চলন্ত এক খন্ড জমাট অন্ধকার।
চোখ বন্ধ করে এগিয়ে চলার অবস্থা। কম্পাস ও সামনে মেলে রাখা মানচিত্রই আলী নকীরের ভরসা। মাঝে মাঝে সে তাকাচ্ছে কঠিন বস্তু নিরীক্ষণ স্ক্রীনের দিকে। বোটের দশ মাইলের মধ্যে কোন কঠিন বস্তু এসে পড়লেই সাদা পর্দায় কাল স্পট জেগে উঠবে। স্ক্রীনটি অসংখ্য বর্গক্ষেত্রে ভাগ করা। বর্গক্ষেত্রে কাল অবস্থান থেকে বুঝা যাবে বস্তুটি কোনদিকে কতদূরে।
আরও চল্লিশ মাইল চলার পর প্রায় একই সময়ে উত্তর ও দক্ষিণ দিগন্তে দুটি আলোক রেখা ফুটে উঠল। বোঝা গেল বড় যুদ্ধ জাহাজই হবে। জাহাজ দুটির প্রত্যেকটিতেই কয়েকটি করে সার্চ লাইট।
আলোগুলোকে ঘুরতে দেখা গেল। এই সময় পশ্চিম দিগন্তেও আরেকটা আলো দেখা গেল। তিনটি আলোই দ্রুত এগিয়ে আসছে।
আহমদ মুসা সেদিকে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণ করার পর বললেন, আলী নকীর, জাহাজগুলো খুব দ্রুতগামী এবং তাদের সার্চ লাইটগুলি খুব পাওয়ারফুল। তাছাড়া তিনটি জাহাজ একা নয়। ভালো করে দেখ, বিড়ালের চোখের মত আরও ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আলো দেখা যাচ্ছে। এর অর্থ পেট্রোল বোটের সারিও এগিয়ে আসছে।
এই সময় রিয়ারভিউ স্ক্রীণের দিকে চোখ পড়তেই আঁৎকে উঠল আলী নকীর। বলল, জনাব, পেছন থেকেও একটা জাহাজ ছুটে আসছে।
মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে বসে থাকলেন আহমদ মুসা। বললেন, আলী নকীর, চারদিক থেকে জাল ফেলে ওদের এই এগিয়ে আসা কোন রুটিন প্রেট্রোল নয়। একটা সচেতন পরিকল্পনা নিয়ে ওরা এগিয়ে আসছে। আমার মনে হয় আমাদের এই যাত্রা শত্রুদের কাছে গোপন নেই।
একটু থামলেন আহমদ মূসা। চারদিকটায় একবার নজর বুলালেন। তারপর বললেন, ভয় নেই আলী নকীর, আমরা ওদের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে আছি। ওরা আমাদের অবস্থান দেখতে পাচ্ছে না, কিন্তু ওদের অবস্থান আমরা দেখতে পাচ্ছি।
আহমদ মূসা উঠে গিয়ে আলী নকীরের পাশে বসলেন। বললেন, আমরা আর সামনে এগুব না। তুমি বোটের মাথা বাম দিকে ঘুরিয়ে নাও। দক্ষিণ দিক থেকে ও পূবদিক থেকে ছুটে আসা জাহাজ আরও ক্লোজ হবার আগে আমরা এ দুয়ের ফাঁক গলিয়ে দক্ষিণ দিকে বেরিয়ে যাব। তারপর ওদের এই বেষ্টনির বাইরে গিয়ে প্রয়োজন হলে পারস্য জল সীমার কাছাকাছি দিয়ে ঘুরে গিয়ে আজার বাইজান জলসীমায় প্রবেশ করব। অনেকটা পথ আমাদের ঘুরতে হবে। তুমি স্পীড বাড়িয়ে দাও। আমি ‘হার্ড অবজেক্ট ভিশন’ প্যানেলের দিকে নজর রাখছি। কারও সাথে ধাক্কা লাগবে এ চিন্তা কর না। বলে আহমদ মূসা ম্যাপটাকে নিজের সামনে টেনে নিলেন।
আহমদ মূসার কথা শেষ হবার আগেই বোটের মাথা দক্ষিণ দিকে ঘুরে গেল।
আহমদ মূসা বললেন, বোটের মাথা আরও পঁয়তাল্লিশ ডিগ্রী ইস্টে সরিয়ে নাও।
বোটের মাথা আরও পূর্ব দিকে ঘুরে গেল। ছুটে আসা জাহাজগুলোর শক্তিশালী সার্চ লাইট সাগরের বিস্তৃত অঞ্চলকে আলোকিত করেছে। চারটি জাহাজ আরও কাছাকাছি এগিয়ে এলে মধ্যবর্তী সাগরের গোটাই আলোকিত হয়ে উঠবে। আহমদ মুসার বোটকে ওরা এই আলোর ফাঁকেই বন্দি করতে চাইছে।
জাহাজ ও পেট্রোল বোটের বেস্টনি গড়ে নিশ্চিন্ত মনেই ওরা এগিয়ে আসছে। ওরা জানে আহমদ মুসার বোট পশ্চিম দিকের কোন ফাঁক-ফোঁকড় দিয়েই কেটে পড়তে চাইবে। তাই সে ফাঁক-ফোকড় বন্ধের জন্য ওরা পেট্রোল বোটের পাহারা সাথে নিয়ে আসছে।
আহমদ মুসা হাসলেন। এত বড় সাগরের সব দরজা ওরা বন্ধ করবে, এটা ওদের দুরাশা।
আহমদ মুসা তাকিয়ে দেখলেন, দক্ষিণ ও পূর্বদিক থেকে যে জাহাজ দুটো এগিয়ে আসছে ওদের সার্চলাইট ক্রমেই নিকটতর হয়ে উঠছে। এক সময় ওরা মিশে যাবে, তার আগেই তাকে এ বেষ্টনি পার হতে হবে।
জাহাজ দুটোর কৌণিক অবস্থান বিবেচনা করে ছোট্ট একটা অংক কষে আহমদ মূসা বললেন, আলী নকীর, পনের মিনিটে আমরা যদি পঁচিশ মাইল পথ পার হতে পারি তাহলে ওদের সার্চলাইট আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না।
আলী নকীর মাথা দুলিয়ে বলল, আমরা এখন ঘন্টায় নব্বই মাইল চলছি। গতিবেগটা আমি একশ’ মাইলে তুলে দিচ্ছি। আমরা পনের মিনিটের আগেই পঁচিশ মাইল পেরিয়ে যাব।
পেট্রোল বোটের স্পিডোমিটারের কাঁটা লাফ দিয়ে নব্বই থেকে একশ মাইলে দিয়ে স্থির হলো। আহমদ মুসার বোট যখন পঁচিশ মাইলের পনের মাইল পার হয়েছে, তখন ‘হার্ড অবজেক্ট ভিশন’ অর্থাৎ ‘শক্ত বস্তু নিরীক্ষণ’ স্ক্রীনে একটা কাল বিন্দু জেগে উঠল।
ভ্রু কুঁচকালেন আহমদ মূসা। কাল বিন্দুটির অবস্থান ঠিক আহমদ মূসার বোটের নাক বরাবর।
আহমদ মুসা বললেন. আলী নকীর, তোমার ঠিক নাক বরাবর দশ মাইল দূরেএকটা পেট্রোল বোট এগিয়ে আসছে।
একটু থেমে আহমদ মুসা বললেন, দুটো জাহাজের সার্চলাইট এবং পেট্রোল বোটটির সার্চলাইট একসাথে মিশে যেতে পারে, এমন জায়গায় যদি ওদের নজরে পড়ি তাহলে বিনা সংঘাতে আমরা বেরিয়ে যেতে পারবনা। আর সংঘাত করে বেরিয়ে গেলেও ওরা পিছু ছাড়বেনা আমাদের বার মাইলের জলসীমা পর্যন্ত। আমরা তাহলে ককেশাসে যেতে পারবনা। তুমি তোমার গতি একশ বিশ মাইলে তোল নকীর।
পেট্রোল বোটের সর্বোচ্চ গতিই হলো একশ তিরিশ মাইল। যে লোড বোটে আছে তাতে গতি একশ বিশে তোলা ঝুঁকিপূর্ণ।
কিন্তু দক্ষ নৌ-অফিসার আলী নকীর বলল, বুঝেছি জনাব, আমরা বার মিনিটেই নির্ধারিত দূরত্ব পার হয়ে যাব ইনশাআল্লাহ।
আহমদ মুসার পেট্রোল বোট প্রচণ্ড বেগে লাফিয়ে লাফিয়ে সামনে এগিয়ে চলল। স্পিডোমিটারের কাঁটা একশ’ বিশে দাঁড়িয়ে থর থর কাঁপছে। কাঁপছে গোটা বোট প্রচণ্ডভাবে। মনে হচ্ছে বড় বড় পাথর ডিঙিয়ে কখনও আছড়ে পড়ে, কখনও লাফিয়ে উঠে দৌড়ে চলেছে একটা জীপ।
আহমদ মুসা ‘হার্ড অবজেক্ট ভিশন’ প্যানেলের দিকে তার চোখ স্থির রেখেছিলেন। এগিয়ে আসা পেট্রোল বোটটা তখন তিন মাইল দূরে।
আহমদ মুসা এ সময় তার সামনের স্পীকার সুইচ অন করে বললেন, আবদুল্লাহ আমাদের সামনেই একটা শত্রু পেট্রোল বোট। তার সার্চ লাইটটা তোমরা দেখতে পাচ্ছ। মনে রেখ কোন প্রকার সংঘর্ষে লিপ্ত না হয়ে আমরা এদের বেষ্টনি থেকে বেরিয়ে যেতে চাই। আক্রান্ত হলেও আমরা গুলি ছুড়বনা, আত্মরক্ষার শেষ মুহূর্ত ছাড়া। সে নির্দেশ আমিই দেব। এখন তোমরা কামানের সবগুলো ব্যারেল নামিয়ে নাও।
আবদুল্লাহ পেট্রোল বোটের চার সদস্য বিশিষ্ট গোলন্দাজ ইউনিটের প্রধান।
নির্দেশের সাথে সাথে কামানের সবগুলো ব্যারেল নিচে নেমে এল।
দক্ষিণ ও পূর্বের দুই জাহাজের সার্চ লাইটের মধ্যে ব্যবধান তখনও অনেক। প্রায় তিন মাইলের মত। শত্রুর পেট্রোল বোটের সার্চ লাইটের হিসেবটা বিয়োগ করলে এক মাইল বিস্তৃত দুটো অন্ধকার লেন সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে শত্রু বোটের দুপাশে।
শত্রু বোট থেকে আহমদ মুসার বোটের দূরত্ব তখন দেড় মাইল, তখন আহমদ মুসা আলী নকীরকে বোটের মাথা ত্রিশ ডিগ্রী ডান দিকে ঘুরিয়ে নিতে বললেন।
বোঝা গেল শত্রু বোটও তখন সামনে কিছুর অস্তিত্ব নিয়ে অস্থির হয়ে উঠেছে। সার্চ লাইট ছারাও হেড লাইটের আলো সে সামনে ফেলেছে।
শত্রু বোটের সাথে মুখোমুখী অবস্থা থেকে ত্রিশ ডিগ্রি টার্ন নিয়ে তীর বেগে ছুটে চলল আহমদ মুসার বোট।
আহমদ মুসার বোটের এই গতি পরিবর্তন শত্রু বোটও টের পেল। তার সার্চ লাইট আরও চঞ্চল হয়ে উঠল হেড লাইটের আলোও এদিকে বেঁকে এল।
আহমদ মুসা বিস্ময়ের সাথে লক্ষ্য করলেন দক্ষিণের জাহাজটির সার্চ লাইটও এদিকে এসে স্থির হল।
কিন্তু শত্রু বোট এ শত্রু জাহাজের সার্চ লাইটের মাঝের ব্যবধান প্রায় এক মাইল। এই অন্ধকার লেন দিয়েই আহমদ মুসার বোট বেরিয়ে যেতে চায়।
আহমদ মুসা বললেন, শত্রু জাহাজ ও শত্রু বোটের মধ্যে সংবাদ বিনিময় হয়েছে। ওদের মনে কিছুটা সন্দেহও হয়েছে। সার্চ লাইট ফেলে অনুসন্ধানের চেষ্টা তারই প্রমাণ। কিন্তু স্বস্তির সাথে লক্ষ্য করলেন শত্রু বোট বা শত্রু জাহাজের গতি পরিবর্তন হয়নি।
আহমদ মুসার বোট যখন শত্রু বোটের সমান্তরালে অর্থাৎ সবচেয়ে কম দূরত্বে এল, ঠিক তখনই শত্রু বোট থেকে কামানের গর্জন শোনা গেল। কয়েকটা গোলা আহমদ মুসার বোটের পাশে ও পেছনে এসে পড়ল।
কামানের গর্জনের সংগে সংগে আলী নকীর বোটটি আরেকটু ডান পাশে সরিয়ে নিয়েছিল। আহমদ মুসার বোট তখন চলছিল ঘন্টায় একশ বিশ মাইল বেগে। কয়েক মিনিটের মধ্যেই দুই বোটের মধ্যে ব্যবধান বেড়ে গেল। ওদিকে কামানের গর্জনও থেমে গেল।
আহমদ মুসা হেসে বললেন, সম্ভবত কোন উত্তর না পেয়ে ওরা ভেবেছে, নিরীহ কোন মাছ ধরা বোট ভয়ে পালাচ্ছে। তারা ধারনা করেনি যে, আহমদ মুসার ককেশাসমুখী বোট এবাউট টার্ন করতে পারে। আহমদ মুসা সম্পর্কে শত্রুর এই উচ্চ ধারণা আহমদ মুসাকে বহুবারই সাহায্য করেছে। শত্রুর মনে এই অনূভূতি সৃষ্টি আল্লাহরই অসীম রহমত। আহমদ মুসা আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করলেন।
ওদের বেষ্টনী পেরিয়ে মাইল দশেক আসার পর আহমদ মুসা বোটের মুখ সোজা দক্ষিণ দিকে ঘুরিয়ে নিতে বললেন। দক্ষিণ দিকে পঞ্চাশ মাইল চলার পর আহমদ মুসা বললেন, ওদের কোন জাহাজের আলো আর দেখা যাচ্ছেনা। মনে হচ্ছে সবই উত্তর দিকে চলে গেছে। কিন্তু আবার ফিরে আসবে। তার আগেই মধ্য-কাষ্পিয়ানে আমাদের পাড়ি দিতে হবে। তুমি বোট পয়তাল্লিশ ডিগ্রী পশ্চিমে ঘুরিয়ে নাও। তারপর ত্রিশ মাইল চলার পর বোট সোজা পশ্চিম দিকে চলবে। তাহলে আমরা পারস্যের পানি সীমা ঘেঁসে আজার বাইজানের সীমান্ত শহর আশতারা উপকূলে পৌঁছতে পারব। এ এলাকায় রুশদের পাহারা একটু কম থাকবে।
আহমদ মুসা উঠে পেছনে সোফায় গিয়ে বসলেন। সোফায় হেলান দিয়ে গা এলিয়ে দিলেন।
ঘন্টায় একশ মাইল বেগে চলছে বোট। গতির তীব্রতায় বোট থর থর করে কাঁপছে।
বোট ইঞ্জিনের গুম গুম আওয়াজ এবং পানি কেটে চলার তীক্ষ্ণজলজ শব্দ ছাড়া চারদিকটা নীরব-নিথর। মাটির গাঢ় অন্ধকারটা যেন আকাশে গিয়ে ঠেকেছে। সেই আকাশ-অন্ধকারে জ্বলছে তারার প্রদীপ।
আহমদ মুসার চোখ ছিল সেই তারার জগতে নিবদ্ধ। বড় ভাল লাগে তাঁর এই তারার জগত। খোদায়ী প্রভূত্বের বিশালতা এবং মহিমাময়তা তাঁর কাছে মূর্ত হয়ে ওঠে এদিকে চাইলে। আমরা বলদর্পী মানুষ- বিশাল পৃথিবীর তুলনায় দৃষ্টি গোচরের অযোগ্য এক দূর্বল অস্তিত্ব আমাদের। বিশাল পৃথিবী ঐ মিট মিট তারার তুলনায় একটা বিন্দু বই আর কিছুই নয়। কিন্তু বিশাল বপু এই তারা আবারন আমাদের ছায়াপথ নামক গ্যালাক্সির গায়ে ক্ষুদ্র এক তিল মাত্র। তাই বলে ‘ছায়াপথ’ গ্যালাক্সির গর্বের কিছু নেই। অন্তহীন আকাশ জগতে লক্ষ-কোটি গ্যালাক্সির মাঝে আমাদের ছায়াপথ গ্যালাক্সি অনুজ্জ্বল এক আলোক বিন্দু ছাড়া আর কিছুই নয়। অসীম বিশালত্বের বিস্ময়ে বিমূঢ় আহমদ মুসার মন ভেবে পায় না, বৃহত্তরের পথে ঊর্ধ্বমুখী এই যাত্রার শেষটা কোথায় যেখানে গিয়ে শেষ সেটাই কি ‘সিদরাতুল মুন্তাহা’ অথবা প্রথম আকাশ! তারও তো অনেক ওপরে সবকিছু সৃষ্টি জুড়ে সর্বশক্তিমান, সর্ব প্রশংসার অধিকারী আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের আরশুল আজিম। মানুষের অসহায় ক্ষুদ্রত্বের কথা বিবেচনা করে এবং মানুষের প্রতি আল্লাহর অসীম দয়ার কথা স্মরণ করে সব সময়ের মত আহমদ মুসার দুচোখ কৃতজ্ঞতার অশ্রুতে ভরে ওঠে।
তারার জগতে একবার পৌঁছুলে আহমদ মুসা নিজেকে হারিয়ে ফেলে। অসীমের উদার স্পর্শ তাকে আকুল করে তোলে। আজও তাই হয়েছিল। কতক্ষণ তিনি এই ভাবে ছিলেন জানেন না। গভীর প্রশান্তিতে তাঁর চোখ দুটোও এক সময় ধরে এসেছিল।
হঠাৎ বোটের গতি কমে যাবার চাপ আহমদ মুসার তন্দ্রা ভেঙে দিল।
চোখ খুলেই আহমদ মুসা ঘড়ির রেডিয়াম ডায়ালের দিকে নজর বুলালেন। রাত আড়াইটা।
আহমদ মুসা মুখ তুলে হঠাৎ বোটের গতিটা এভাবে কমে গেল কেন জিজ্ঞেস করতে যাবেন, এই আলী নকীর পেছন দিকে তাকিয়ে বলল, জনাব, মাইল চারেক সামনে একটা পেট্রোল বোট। অয়্যারলেসে আমাদের পরিচয় জানতে চাচ্ছে। আমি বোটটাকে পাশ কাটাবার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের বোটটা লক্ষ্য করেই ঐ বোটটা এগিয়ে আসছে।
আলী নকীরের কথার জবাব না দিয়ে আহমদ মুসা বললেন, আমরা কোথায় আলী নকীর?
এই মাত্র আমরা আজারবাইজানের জলসীমায় প্রবেশ করেছি। আমরা এখন পারস্য ও আজারবাইজানের জলসীমার মাঝখান দিয়ে আসতারার দিকে চলছি।
বোটটা এখন কার পানি সীমায় আছে?
আজারবাইজানের।
কতদূর বললে?
চার মাইল।
আলো নিভানো?
হ্যাঁ সব আলো নিভানো।
তাহলে ওটা শত্রুদের পেট্রোল বোট। আন্তর্জাতিক পানি সীমায় আমাদের খুঁজে না পেয়ে আজারবাইজানের পানি সীমায় ওরা প্রবেশ করেছে।
আমিও তাই মনে করছি।
তোমার ‘হার্ড অবজেক্ট ভিশন’-এ কারও সন্ধান পাচ্ছ?
না।
তাহলে বোঝা গেল দশ বর্গমাইলের মধ্যে আর কোন শত্রু বোট নেই ।
জি হ্যাঁ।
আমাদের পরিচয় জানতে চাচ্ছে?
জি।
আহমদ মুসা একটু চিন্তা করলেন। তারপর বললেন ঠিক আছে, আমি ওদের সাথে কথা বলছি।
বলে আহমদ মুসা উঠে এসে আলী নকিরের পাশে ওয়ারলেসের সামনে বসলেন।
সুইচ অন করার আগে আহমদ মুসা আলী নকির কে বললেন, তুমি বোটের মাথা ত্রিশ ডিগ্রি পরিমান পারস্যের দিকে ঘুরিয়ে ফুল স্পীডে চালিয়ে যাও।
ওয়ারলেসের সুইচ অন করে আহমদ মুসা আর্মেনীয় ভাষায় বললেন, আমাদের ভয় করছে, আপনাদের পরিচয় আগে বলুন।
কিসের ভয়। ওপার থেকে বলল।
এ উপকূলে দস্যুদের উপদ্রুব বেড়েছে। আপনাদের বোটে বাতি নেই।
আপনাদের নেই কেন?
বললাম তো আমাদের ভয় আছে। পুলিশ, জলদস্যু উভয়কেই আমাদের ভয়।
কি ব্যাপার, আপনারা ওদিকে পালাচ্ছেন কেন?
আপনাদের পরিচয় বললেন না, বাতি নেই কেন তা বললেন না।
হাঃ হাঃ হাঃ ভয় নেই তোমাদের। কি মাল আছে বোটে?
অনেক জিনিস।
তোমরা কি পূর্ব থেকে মানে ওপার থেকে কোন বড় পেট্রোল বোট আসতে দেখেছ?
না।
ততক্ষণে আহমদ মুসার বোট পারস্যের তাব্রিজ উপকূলে কয়েক মাইল ভিতরে ঢুকে পড়েছে। কিন্তু দেখা গেল শত্রু বোটটি তার মাথা ঘুরায়নি। বরং ওদের শেষ প্রশ্নের উত্তরে ‘না’ বলার পর ওরা পূর্ব-উত্তর দিকে বোটের মুখ ঘুরিয়ে চলতে শুরু করেছে।
আহমদ মুসা হাসতে হাসতে বললেন, ওরা আমাদের চোরাচালানই মনে করে খুব মজা করল।
আহমদ মুসা চারদিকে একবার নজর বুলিয়ে বললেন, বোটের স্পীড এবার কমিয়ে দাও। আশতারাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে চল।
সীমান্ত নগরী আশতারার চার মাইল দূর দিয়ে এগিয়ে চলল আহমদ মুসার বোট। রাত সাড়ে তিনটার সময় তারা কুরা নদীর মোহনায় এসে পৌঁছালেন। ককেশাসের আরাকাস ও কুরা নদী সম্মিলিতভাবে এখানে এসে কাস্পিয়ান সাগরে পড়েছে।
মোহনা পাড় হবার পর আহমদ মুসা আলী নকিরকে বোট উপকূলের আরও কাছে নিতে বললেন।
বোট উপকূলের আরও সিকি মাইলের কাছাকাছি এসে পৌছাল। আহমদ মুসা এবার আলী নকিরকে বোটের আলো জ্বেলে দিতে বললেন।
উপকূলের ধার দিয়ে বোট ধীরে ধীরে বাকুর দিকে অগ্রসর হচ্ছে। আহমদ মুসা মানচিত্র থেকে মুখ তুলে বললেন, এবার সিগন্যাল দিতে শুরু কর আলী নকির।
আহমদ মুসার বোটের হেড লাইট এবার সাইমুমের কোডে সিগন্যাল দিতে শুরু করল।
মাত্র মিনিট খানেক পরে পাশের উপকূলে নীল আলো জ্বলে উঠল। নীল আলোটিও সাইমুমের কোডে সংকেত দিয়ে চলল।
আহমদ মুসা সেদিকে একবার তাকিয়ে বললেন, আলী নকীর এবার বোট তীরে নাও। ওটা আলী আজিমভের সংকেত।
কাস্পিয়ানের তীরে কুরা নদীর স্বাগত জানাবার মোহনায় এই ‘কুদতলি’ ককেশাস ক্রিসেন্টের একটা প্রধান ঘাটি।
আজ বাকুর ককেশাস ক্রিসেন্টের নেতা মুহাম্মদ বিন মুসা এবং এখানকার সাইমুম ইউনিট এর প্রধান আলী আজিমভ এসেছে আহমদ মুসা কে স্বাগত জানাবার জন্য। পরিকল্পনা অনুসারে স্বাগত জানাবার জন্য আসার কথা ছিল আল্লামা ইব্রাহীম এদতিনার। তাঁর শাহাদাতের পর ঠিক হয় আজ এখানে আসবে সালমান শামিল। কিন্তু সালমান শামিলও গত পরশু কিডন্যাপ হবার পর স্থানীয়ভাবে আলি আজিমভের সাথে মুহাম্মদ বিন মুসা এসেছে।
আহমদ মুসার বোট ধীরে ধীরে নোঙর করল অস্থায়ীভাবে তৈরি একটি কাঠের জেটিতে। জেটিতে দাঁড়িয়েছিল আলী আজিমভ এবং মুহাম্মদ বিন মুসা। তাদের পিছনে সাইমুম এবং ককেশাস ক্রিসেন্টের একদল মুজাহিদ। তাদের চোখে –মুখে আশা আনন্দের এক দীপ্তি। যেন অমূল্য এক সম্পদ তাদের হাতে এসে পৌঁছেছে।
বোট থেকে নামান হল এলুমিনিয়ামের এক সিঁড়ি।
সিঁড়ি দিয়ে নেমে এলেন আহমদ মুসা। বিসমিল্লাহ্ বলে তিনি পা রাখলেন ককেশাসের মাটিতে।
