অপারেশন কক্ষের বাইরে উদ্বিগ্নভাবে অপেক্ষা করছিলেন আহমদ মুসা ও হাসান তারিক। কর্ণেল চলে গিয়েছিল।
আহমদ মুসা ঘড়ি দেখলেন। রাত আড়াইটা। হাসপাতালে আসার পর প্রায় দেড় ঘন্টা পেরিয়ে গেছে। আরও পনের মিনিট পরে অপারেশন কক্ষের দরজা খুলে গেল। বেরিয়ে এলো সিংকিয়াং এর শ্রেষ্ঠ অস্ত্রোপচারবিদ ডাক্তার চ্যাং। তার মুখ গঙ্ভীর। বলল, অপারেশন সফল, কিন্তু কিছু জটিলতা দেখা দিয়েছে। ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে। আগামী বার ঘন্টা খুবই গুরুত্বপূর্ন।
আর দাদী, মানে বৃদ্ধা মহিলাটির খবর? বললেন আহমদ মুসা।
স্যরি। মাথা নিচু করে বলল ডাক্তার।
সঙ্গে সঙ্গেই একটা অন্ধকার নেমে এল আহমদ মুসার মুখে। বেদনায় নীল হয়ে এল তার মুখটা। কয়েক মুহুর্ত কথা বলতে পারলেন না তিনি।
অপারেশন কক্ষের দরজা আবার বন্ধ হয়েছে। ডাক্তার চলে গেছে।
আহমদ মুসা হাসান তারিককে কিছু বলার জন্য মুখ তুললেন, এমন সময় করিডোর দিয়ে একজন হন্ত-দন্ত হয়ে ছুটে এল। বলল, আহমদ মুসা কে?
আমি। বললেন আহমদ মুসা।
শীগ্রি আসুন, গভর্ণর সাহেবের টেলিফোন।
আহমদ মুসা টেলিফোন ধরতেই ওপার থেকে লি ইউয়ান বলল, আমি সব শুনেছি মি. আহমদ মুসা। ডাক্তারের কাছ থেকে মেইলিগুলির কথাও শুনলাম। চিন্তার কিছু নাই। আমি নির্দেশ দিয়েছি, এই কেস টপমোস্ট প্রাইওরিটি পাবে।
শুকরিয়া মি. গভর্নর।
আমি মেইলিগুলির বাড়িতে পাহারা বসাবার নির্দেশ দিয়েছি। আর মেইলিগুলির আব্বা-আম্মা সরকারী সফরে এখন জেনেভায়। সেখানেও খবর পৌছাচ্ছি।
আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জনাব।
আমি কাল নেইজেনকে নিয়ে একবার মেইগুলিকে দেখতে যাব। একটু থেমে গভর্ণর আবার বলল, আপনি বাসায় চলে আসুন। বিশ্রাম প্রয়োজন আপনার। হাসপাতালের জন্য কোন চিন্তা নেই।
টেলিফোনে কথা শেষ করে আহমদ মুসা বললেন, এখানে আর কোন কাজ নেই হাসান তারিক। চল বাসায় ফিরি। ‘ফ্র’র যে দু’জন লোক ধরা পড়েছে তাদের নিয়ে আহমদ ইয়াং কি করছে চল দেখি।
সেই মাইক্রোবাসে আহমদ মুসারা মেইলিগুলির বাসায় ফিরে এল।
গেট বন্ধ করে দিয়ে আহমদ ইয়াং ও মা-চু গাড়ি বারান্দাতেই বসেছিল। তাদের সামনে বাঁধা অবস্থায় পড়ে আছে বোমার স্প্লিন্টারে আহত ‘ফ্র’র দুজন লোক।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের কাজ আহমদ ইয়াং মোটামোটি সেরেই ফেলেছে। মা-চু কাটা বিদ্যুত সংযোগে জোড়া লাগিয়েছে। আলোয় ঝলমল করছে এখন বাড়ি।
আহমদ মুসা ও হাসান তারিক আসতেই উৎসুকভাবে মুখ তুলল আহমদ ইয়াং এবং মা-চু দুজনেই।
আহমদ মুসা গঙ্ভীর কন্ঠে বললেন, খবর ভাল নয় মা-চু। দাদী নেই, মেইলগুলি এখন ইনটেনসিভ কেয়ারে আছে।
শুনে মা-চু মাথা নিচু করল। দুহাত দিয়ে মুখ ঢাকল সে।
কিছুক্ষন কেউ কিছু বলতে পারল না। অবশেষে মুখ খুললেন আহমদ মুসা। বললেন, এ দিকের খবর কি ইয়াং?
কিছু খবর নিয়েছি। এখানে এবং নেইজেনকে অপহরণ করার অভিযান এক জায়গা থেকেই হয়েছে।
হ্যাঁ, সেটা আগেই বুঝতে পেরেছি।
এই অভিযান ছিল ‘ফ্র’ এবং ‘রেড ড্রাগনের’ সম্মিলিত। নেইজেনকে কিডন্যাপ করে গভর্ণরকে শিহেজী উপত্যকায় হান বসতির পক্ষে ওরা বাধ্য করতে চেয়েছিল।
হ্যাঁ, ওটা তো গভর্ণরও বলেছেন।
আর এখানে জেনারেল বোরিসের অভিযানের লক্ষ্য ছিল আপনাকে অপহরণ করা। আপনাকে না পেয়ে প্রতিশোধ স্পৃহায় অন্ধ বোরিস বাড়িতে যাকেই পেয়েছে তাকেই হত্যা করেছ। মেইলিগুলিকে নিয়ে যাচ্ছিল জিম্মি হিসাবে আপনাকে ধরার জন্য।
জেনারেল বোরিস পিকিং থেকে কবে ফিরেছে?
আজ সকালে। সব প্ল্যান ঠিক করে পিকিং থেকে প্রস্তুত হয়েই সে ফেরে।
একটু থেমে আহমদ ইয়াং বলল, জেনারেল বোরিসের ফেলে যাওয়া মানিব্যাগে একটা টেলেক্স পেয়েছি। টেলেক্সটি এসেছে আর্মেনিয়ার রাজধানী ইয়েরেভেন থেকে। পাঠিয়েছে জনৈক মাইকেল পিটার। বলেছে, চুড়ান্ত প্রস্তুতি এগুচ্ছে। জেনারেল বোরিসকেও সেখানে প্রয়োজন। স্ট্যালিনের জন্মভূমি জর্জিয়া এবং তার সাথে আর্মিনিয়া তাকে স্বাগত জানাবে।
থামল আহমদ ইয়াং।
কি যেন চিন্তা করছিলেন আহমদ মুসা। একটু পরে বললেন, মনে হয় চীনে জেনারেল বোরিসের এটাই শেষ অভিযান ছিল। আহমদ মুসার ওপর প্রতিশোধ নেয়া শেষ করে সে নতুন ষড়যন্ত্রের কেন্দ্র ককেশাসে পাড়ি জমাতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহর চেয়ে তো বড় পরিকল্পনাকারী আর কেউ নেই। জেনারেল বোরিসের যেখানে ককেশাসে যাবার কথা সেখানে যাচ্ছে আহমদ মুসা।
শেষের কথা ছিল ধীর স্বগত কন্ঠের…….
কি মুসা ভাই, আপনি কোথায় যাবেন? চমকে উঠেই যেন বলল আহমদ ইয়াং।
আহমদ মুসা হাসলেন। কোন জবাব দিলেন না। তার দৃষ্টি বাইরে অন্ধকারের বুকে নিবন্ধ কোন ভাবনায় যেন ডুব দিয়েছে আবার আহমদ মুসা।
৪
মেইলিগুলির চোখ ধরে এসেছিল। পায়ের শব্দে সে চোখ খুলল। দেখল মা-চু রুমে ঢুকছে। মেইলিগুলির গোটা দেহ, মুখ পর্যন্ত সাদা চাদরে ঢাকা। খুব দুর্বল মেইলিগুলি। নড়া-চড়া তো নিষিদ্ধই। উঠে বসারও অবস্থা নেই। ভিআইপি পেশেন্টদের জন্য নির্ধারিত সবচেয়ে মূল্যবান রুমটি দেয়া হয়েছে মেইলিগুলিকে। বিরাট ঘরের এক পাশে পেশেন্ট সিট অন্য পাশটা সোফা দিয়ে সাজানো। মাঝখানে সুন্দর একটা সাদা স্ক্রীন। প্রয়োজন হলে গুটিয়ে নেয়া যায়। বেলা তখন বিকেল তিনটা।
মা-চুকে ঘরে ঢুকতে দেখে খুশি হয় মেইলিগুলি।
কেমন আছ মা-চু তোমরা?
ভাল
খাওয়া-দাওয়ার অসুবিধা হচ্ছে না তো? যেভাবে বলে দিয়েছি তা হচ্ছে তো?
জ্বি। মাথা দুলিয়ে বলল মা-চু।
তোমার স্যার কোথায়? কালকে আসেননি, আজকেও আসেননি।
আজ ভোরে শিহেজী উপত্যকায় গিয়েছেন। কিন্তু কাল এসেছিলেন।
এসেছিলেন?
এসেছিলেন, কিন্তু রুমে ঢুকেননি। দর্শনার্থীর নাকি ভীড় ছিল। খোঁজ নিয়ে চলে গিয়েছিলেন।
আসলে মেইলিগুলির রুমে স্রোতের মত লোক আসছে প্রথম দিন থেকেই। এমনকি পিকিং থেকেও লোক এসেছে।
মেইলিগুলি এতে অস্বস্তিই বোধ করেছে। অনেকদিন থেকে সে সবার সামনে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। কিন্তু এখন তো সে কাউকে নিষেধ করতে পারে না। আহমদ মুসা কি এটা ভালো চোখে দেখেনি? না, উনি তো সব বুঝেন, সব জানেন।
আপা, স্যার যেন কেমন হয়ে গেছেন? মা-চুই অবশেষে নীরবতা ভাঙল।
কেমন হয়ে গেছেন মানে? মেইলিগুলির চোখটা চঞ্চল হয়ে উঠল।
আগের চেয়ে কথা কম বলেন, হাসি-খুশি তো দেখিই না।
কেন মা-চু? মেইলিগুলির কন্ঠে যেন উদ্বেগ।
জানিনা, সেদিন দেখলাম চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। আমি ঘরে ঢুকলে ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললাম, কিছু বলবেন স্যার? তিনি ধীরে ধীরে গঙ্ভীর কন্ঠে বললেন, ‘মা-চু এই পরিবারটা কত শান্তিতে ছিল তাই না? আমি এসে সব ভেঙে দিয়েছি।
দাদী নিহত হলেন, মেইলিগুলি মারাত্নক আহত। বলতে বলতে স্যারের চোখে পানি এসে গিয়েছিল। মা-চু থামল।
তুমি কিছু বললেন না? মেইলিগুলির মুখ ম্লান হয়ে উঠেছে।
না, আমি কিছু বলতে পারিনি। স্যারের এ অবস্থা কখনও দেখিনি।
তাঁকে কিছু বলার যোগ্যতা আমার আছে?
মেইলিগুলি কথা বলল না। চোখ বুজেছে সে। তার গোটা হৃদয়টা আলোড়িত হয়ে উঠেছে। বুঝতে পারছে মেইলিগুলি আহমদ মুসার মনের অবস্থা। কি যন্ত্রনা তাঁর মনে তা স্পষ্ট হয়ে উঠল মেইলিগুলির কাছে।
মা-চু উঠে গিয়েছিল। অনেকক্ষন পর চোখ খুলল মেইলিগুলি। তার চোখের কোণটাও মনে হল সজল হয়ে উঠেছে।
মা-চু তোমার স্যার শিহেজী উপত্যকা থেকে কখন আসবেন?
মা-চু দরজার ওদিক থেকে মেইলিগুলির দিকে সরে এসে বলল, আমি জানি না, আপা। মেইলিগুলি আবার নীরব হল।
এই সময় ঘরে ঢুকল নেইজেন। গভর্নর লি ইউয়ানের মেয়ে। রোজ বিকেলে সে মেইলিগুলির কাছে আসে। ঘন্টাখানেক থাকে। মেইলিগুলির সাথে আগে থেকেই পরিচয় ছিল তার।
মা-চু বেরিয়ে গেল।
নেইজেন একটা চেয়ার টেনে নিয়ে মেইলিগুলির সামনে বসল।
কি ব্যাপার আপা, তোমার মুখটা খুব বিষন্ন দেখাচ্ছে? খারাপ লাগছে না তো?
না জেন। তুমি কেমন আছ? হাসতে চেষ্টা করে বলল মেইলিগুলি।
ভাল। আচ্ছা আপা, আমি শুনলাম ফিল্ম লাইন নাকি তুমি একেবারেই ছেড়ে দিয়েছ?
ওটা তো পুরানো খবর।
আমি ভেবেছিলাম তোমার সিদ্ধান্তটা সাময়িক।
জেন, মুসলিম মেয়েদের জনে তো একাজ নয়।
হঠাৎ এ সিদ্ধান্তে তুমি কেমন করে পৌঁছলে? সবাই কিন্তু অবাক হয়েছে। অনেকে বিশ্বাসই করতে চায়না।
মুসলিম মেয়ে হয়েও আমি আগে আমি অন্ধ ছিলাম, আহমদ মুসা আমার
চোখ খুলে দিয়েছেন।
ও বুঝেছি, বুঝেছি। আচ্ছা আপা, ওরা যাদু জানে নাকি?
কেন?
যে কথা তোমাকে বলেছিলাম, সেদিন রাতে আহমদ মুসার সাথে দেখা হওয়ার পর আব্বা যেন বদলে গেছেন। জান, আব্বা নামায পড়া শুরু করেছেন। কুরআন শিখছেন আহমদ মুসার কাছে গোপনে।
ওরা যাদু নয় নেইজেন, সত্যের শক্তি। সত্যের শক্তি অপরিসীম। দেখ না, মুসলমানরা যতদিন সত্যের উপর ছিল, ইসলাম কিভাবে বিস্তার লাভ করেছে। এরা সত্যের উপর, সঠিকভাবে ইসলামের উপর আছেন বলেই ওদের কথার শক্তি অপরিসীম।
তাই হবে হয়তো। তবু আমার বিস্ময়ই লাগে।
কিন্তু পরিবর্তনটা কি শুধু তোমার পিতারই, তোমার পরিবর্তন আসেনি?
হঠাৎ মুখটা লাল হয়ে উঠল নেইজেনের। তারপর সামলে নিয়ে বলল, কি পরিবর্তন?
কেন তোমার মাথায় গায়ে তো কোনদিন চাদর দেখিনি, কিন্তু কদিন থেকে তো……
ঠিক বলেছ আপা। আমার কিন্তু খুব আনন্দ লাগছে। আমি মুসলিম মেয়ে এই অনুভূতি ফিয়ে পেয়ে আমার গর্ববোধ হচ্ছে।
আসলে কি জান জেন, মুসলমানদের ঈমান, ধর্ম বিশ্বাস একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। প্রতিকুল পরিবেশ বা অজ্ঞতার কারনে তা কোন সময় চাপা পড়ে গেলেও সুযোগ পেলেই জেগে উঠে।
সে রাতের ঘটনা এবং সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, ওরা আল্লাহর একটা রহমত হিসেবে এসেছেন।
ঠিক বলেছ জেন।
কিন্তু একটা খবর শুনেছ? মুসা ভাই নাকি চলে যাচ্ছেন?
ভীষনভাবে চমকে উঠল মেইলিগুলি। মূহুর্তেই তার মুখের উপর থেকে একটা অন্ধকার নেমে এল। কিছুক্ষন কথা ফুটল না তার মুখে।
ব্যাপারটা নেইজেনের নজর এড়াল না। একটা প্রশ্ন তার মুখ থেকে উচ্চারিত হতে যাচ্ছিল। কিন্তু তার আগেই মেইলিগুলি নিজেকে সামলে নিয়ে শান্ত কন্ঠে বলল, তুমি কার কাছে এ খবর শুনলে জেন?
আব্বার কাছ থেকে শুনেছি। মধ্য এশিয়া এবং ফিলিস্তিন থেকে যে দুজন মেহমান এসেছেন তারা কি যেন চিঠি এনেছেন। ককেশাসের কি নাকি খারাপ অবস্থা। কি খবর যেন এসেছে সেখান থেকে?
হৃদয় কেঁপে উঠল মেইলিগুলির। সমগ্র দেহটা তার একটা অবশ স্রোতে আচ্ছন্ন হলো। নেইজেনের প্রত্যেকটা কথা বিশ্বাস হলো তার।
আর কথা বলতে পারল নয়া মেইলিগুলি। সামনের সাজানো দুনিয়াটা তার সামনে যেন ওলট-পালট হয়ে গেল। একটা আবেগ যেন তার বুক ফুঁড়ে বেরিয়ে আসতে চাইলো। গোপন করার জন্যে নেইজেনের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল মেইলিগুলি।
নেইজেন বিব্রত হয়ে পড়ল। আহমদ মুসার এই খবর যে মেইলিগুলিকে এই ভাবে আঘাত করবে, তা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি। পারলে সে অসুস্থ মেইলিগুলির কাছে কিছুতেই এ খবর জানাতো না।
নেইজেন একটু ঝুঁকে পড়ে মেইলিগুলির কপালে হাত রেখে বলল, আপা, আমি বুঝতে পারিনি, এভাবে বলা ঠিক হয়নি।
মেইলিগুলি মুখ ফেরাল। তার চোখে পানি। দাঁত দিয়ে ঠোঁট চেপে ধরে আছে সে। কিন্তু কথা বলতে পারলো নয়া মেইলিগুলি।
নেইজেন মেইলিগুলির মাথার কাছে বসে তার মাথায় হাত রেখে বলল, আপা আমি যা শুনেছি তা সত্য নাও হতে পারে।
মেইলিগুলি চাদরটা মুখের উপর টেনে নিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল।
নেইজেনের চোখেও পানি এসেছে। কি বলে মেইলিগুলিকে শান্তনা দেবে তা ভেবে পেলনা নেইজেন। নীরবে মেইলিগুলির মাথায় হাত বুলাতে লাগল।
এক সময় নেইজেন মেইলিগুলির কপালে কপাল রেখে ফিসফিসিয়ে বলল, আপা সব কিছু কি মুসা ভাই জানেন?
জানি না।
অনেকক্ষন পর জবাব দিল মেইলিগুলি।
এই সময় এটেনডেন্ট মেয়েটা ঘরে ঢুকল। একটা স্লিপ দিল নেইজেনের হাতে।
মেইলিগুলি চোখ মুছে নিজেকে সামলে নিয়েছিল।
নেইজেন স্লিপটা হাতে নিয়ে দেখল, স্লিপটা আহমদ মুসার।
নেইজেন স্লিপটা মেইলিগুলির হাতে দিল। স্লিপের উপর চোখ বুলিয়ে মুহুর্তের জন্য চোখ বুজল মেইলিগুলি। তারপর এটেনডেন্ট কে বলল স্ক্রিনটা টেনে নিয়ে ওকে বসতে দাও সোফায়।
আহমদ মুসা সোফায় এসে বসলেন। এটেনডেন্ট দরজা লাগিয়ে দিয়ে চলে গেল। স্ক্রিনের এপারে মেইলিগুলি ও নেইজেন। নেইজেন বলল, আমি একটু ঘুরে আসি আপা।
মেইলিগুলির মুখটা লাল হয়ে আসল লজ্জায়। সে নেইজেনের হাতটা শক্ত করে ধরে রাখল।
আজ কেমন আছি আমিনা, তুমি? স্ক্রিনের ওপার থেকে বললেন আহমদ মুসা।
ভাল।
নেইজেন মেইলিগুলির কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলল, উনি বুঝি তোমাকে আমিনা বলে ডাকেন? আন্ডার গ্রাউন্ড নামটা, যা আমরাও জানিনা, তা ওকে জানিয়েছ?
দাদী ওকে বলেছিলেন। বলল মেইলিগুলি।
ডাক্তার বলেছেন, আর দিন চারেকের মধ্যেই তুমি একটু করে চলাফেরা করতে পারবে। বললেন আহমদ মুসা।
মেইলিগুলি নীরব। কি বলবে ভেবে পেল না। নেইজেন বলল, কিছু বলছ না যে, উনি কি মনে করবেন।
মেইলিগুলি কিছু বলার আগেই আহমদ মূসা বললেন, তোমার আব্বা-আম্মা আসছেন আজ সন্ধায়। মা-চু এয়ারপোর্ট থেকেই সোজা ওঁদের এখানে নিয়ে আসবে।
একটু থেমে আহমদ মূসা বললেন, আমি সম্ভবত দুতিন দিন থাকবো না।
কেন?
ত্বরিত প্রশ্ন করল মেইলিগুলি। তার মুখ বিষণ্ন হয়ে উঠল।
আমি আজ কানশুতে যাচ্ছি। কিছুই নেই সেখানে। তবু জন্মভূমিকে দেখতে চাই।
মেইলিগুলির মুখটা ভারি হয়ে উঠল। মাথা নিচু করল সে। তখনই কোন কথা সে বলল না। একটু পরে মেইলিগুলি মুখ তুলে বলল, আমার পরিবারে যা ঘটেছে তার জন্য কি আপনি নিজেকে দায়ী করছেন?
এ প্রশ্ন কেন আমিনা?
আমি জানতে চাই।
মা-চু তোমাকে কিছু বলেছে নিশ্চয়ই। তার ঠিক হয়নি বলা। এসব কথা নিয়ে তুমি মাথা ঘামিও না। তুমি সুস্থ হয়ে ওঠ।
না আমি জানতে চাই। মেইলিগুলির কথাটা কাঁপল।
আহমদ মুসা কথা বললেন না। মুখটা তার গম্ভীর হয়ে উঠল। সোফায় হেলান দিয়ে বসেছিলেন। সোজা হয়ে বসলেন। বললেন, আমিনা, আমাকে দায়ী মনে করি না, কিন্তু আমাকে উপলক্ষ করেই সব কিছু ঘটল -এমন চিন্তা অবশ্যই সংগত।
কিন্তু চিন্তাই তো প্রমাণ করে আপনি নিজেকে দায়ী মনে করছেন। অর্থাৎ আমাদের পরিবারের জন্যে যেটা গৌরব তাকে আপনি কেড়ে নিতে চাইছেন নির্মমভাবে।
আমিনা তুমি কথাটাকে সিরিয়াসলি নিয়েছ, আমি এভাবে কথাটা বলিনি।
মেইলিগুলি উত্তরে কিছু না বলে ছুপ করে থাকল। একটু ভাবলো। আমার অনুরোধ কানশুর প্রোগ্রাম আপনি বাতিল করুন।
কেন আমিনা?
আব্বা আম্মা আসছেন।
আহমদ মুসার মুখে এক টুকরা হাসি ফুটে উঠলো। বললেন ঠিক আছে করলাম।
নেইজেন মেইলিগুলির কানের কাছে মুখ নিয়ে বলল, প্রথম বিজয় মেইলিগুলি। দেখ আমি বলে রাখলাম যিনি সব মানুষকে ভালোবাসতে পারেন তিনি হৃদয় ভাংতে পারেন না।
মেইলিগুলি নেইজেনের দিকে মুখ তুলে চাইল শুধু। কোন কথা বলল না।
আমিনা, আমি এখনকার মত উঠি। নীরবতা ভেঙ্গে কথা বললেন আহমদ মুসাই।
এখানে নেইজেন আছে। মেইলিগুলি বলল।
নেইজেন এখানে? বিস্ময় প্রকাশ করলেন যেন আহমদ মুসা।
নেইজেন মাথায় চাদরটা ভালো করে টেনে নিয়ে স্ক্রীনের দিকে মুখটা বের করে সালাম দিল আহমদ মুসাকে। বলল ভাইয়া কেমন আছেন?
সালাম নিয়ে আহমদ মুসা বলল, বোনটি, এতক্ষন যে কথা বলনি?
কথা শুনছিলাম তাই।
ভালই হল, শোন তুমি আমিনাকে ভারি বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে নিষেধ কর। ওর স্নায়ুগুলো শান্ত থাকা দরকার।
ভাইয়া একটা কথা বলব?
বল।
মানবতা বড় না কর্তব্য বড়?
মানবতা এবং কর্তব্যকে যদি প্রতিদ্বন্দ্বী ধর, তাহলে প্রশ্ন কঠিন। আমি কিন্তু মনে করি দুটা দুই জিনিস নয়, এক জিনিস। মানবতা যেখানে কর্তব্যও সেখানে।
কিন্তু ধরুন দুটা যদি দুই প্রান্তে গিয়ে দাঁড়ায়?
তাহলে কর্তব্যই আগ্রাধিকার পাবে। কারন মানবতা যদি কর্তব্যবোধ থেকে দূরে সরে যায়, তাহলে তার পিছনে কোন ‘রিজন’ বা যুক্তি থাকে না এবং তাকে তখন সুস্থও বলা যাবে না।
কথা শেষ করেই আহমদ মুসা বললেন হঠাৎ এই দার্শনিক প্রশ্ন কেন নেইজেন?
প্রশ্নের দিকে কান না দিয়ে নেইজেন বলল, কর্তব্যের বাহিরে হৃদয়বৃত্তি বলে কিছু নেই?
আহমদ মুসা থামলেন। বললেন, কর্তব্য হলো যা করনীয়। হৃদয়বৃত্তি বিষয়টা তা থেকে বাহিরে হবে কেন? যদি তা কখনো হয়, তাহলে তা হবে অসংগত এবং তা-ই অবিবেচ্য।
আর একটা প্রশ্ন করব ভাইয়া ?
কর।
আপনাকে নিয়ে আপনি কখন ভাবেন না?
ভাবি। আনন্দিত হলে হাসি, দুঃখ পেলে কাঁদি, বিরক্ত হলে রেগে যাই। এই তো আমাকে নিয়েই তো আমি আছি।
তা নয় ভাইয়া আমি বলতে চাচ্ছি…………।
আহমদ মুসা উঠে দাঁড়ালেন। তোমার আর কোন প্রশ্ন নয় যেতে হবে আমাকে।
নেইজেন একেবারে পর্দার বাইরে গিয়ে দাঁড়াল। বলল না আরেকটা প্রশ্ন জবাব দিতেই হবে।
আহমদ মুসা পা বাড়াতে গিয়েও থেমে গেলেন। বলল ঠিক আছে বল কি তোমার প্রশ্ন।
নেইজেন বলল, আপনাকে নিয়ে আপনি আছেন, ঠিক আছে। কেউ আপনাকে নিয়ে থাকতে পারে তা আপনি দেখবেন না?
আহমদ মুসা বললেন, বোনটি আল্লাহ আমাকে দুচোখ দিয়েছেন দেখার জন্যই তো।
বলেই আহমদ মুসা বেরিয়ে এলেন রুম থকে।
নেইজেন স্ক্রীন ঠেলে চলে গেল ওপারে।
মেইলিগুলি গোগ্রাসে গিলছিল কথা গুলো। নেইজেন গিয়ে মেঝেতে হাটু গেড়ে বসে মেইলিগুলির মুখের কাছে মুখ নিয়ে বলল, শুনেছ তো আপা ভাইয়া কি বললেন?
থাক ওসব কথা। তুমি ওঁর সাথে এইভাবে কথা বলতে পার? ভয় করে না? জান উনি কত বড়?
মেইলিগুলির কাছে অবশ্যই উনি অনেক বড়, কিন্তু আমার কাছে ভাইয়া।
নেইজেনের মুখে দুষ্টামির হাসি।
এই সময় ঘরে একজন ডাক্তার এবং একজন নার্স প্রবেশ করলো।
নেইজেন ঘড়ির দিকে তাকালো। বেলা চারটা।
আপা তাহলে আজকের মত আসি, বলে মেইলিগুলির কপালে একটা চুমু খেতে গিয়ে ফিসফিসিয়ে আবার বলল, তোমার কপালটা ভাগ্যবান আপা। তারপর ফিরে দাঁড়িয়ে ছুটে বেরিয়ে এল ঘর থেকে।
