দুই দেশের সরকার কাশ্মীরের একটা শান্তিপূর্ণ ফয়সালা না করে দুই দেশের জনগণের ক্ষতিই করছেন। দুই দেশের মধ্যে শান্তি কায়েম হলে, সামরিক বিভাগে বেশি টাকা খরচ না করে দেশের উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করা যেত। তাতে দুই দেশের জনগণই উপকৃত হতো। আমার মনে হয়, ভারতের একগুয়েমিই দায়ী শান্তি না হওয়ার জন্য।
নাইজেরিয়ার খবর দেখলাম, আবার হত্যাকাণ্ড শুরু হয়েছে। নাইজেরিয়ার লৌহমানব সামরিক রাষ্ট্রপ্রধান জনসন সান্ডন সারনমি নিহত হয়েছেন। একজন কর্নেল ইয়াকুবু নাইজেরিয়ার সর্বময় ক্ষমতা দখল করেছেন।
জনাব আইয়ুব খান সাহেব আজকাল আল্লা ও রসুলের নাম নিতে শুরু করেছেন। খুব ভাল কথা। প্রেসিডেন্ট আইয়ুব বলেন, দেশের দুই অংশকে যুক্ত করার সূত্র আমাদের পয়গম্বর হজরত মহম্মদ (দ.)-এর মহান ব্যক্তিত্বেই পরিলক্ষিত হইয়াছে। যতদিন এই যোগসূত্রের অস্তিত্ব থাকবে ততদিন জাতীয় একতা অক্ষুন্ন থাকিবে। মহান আদর্শের নামে নিশ্চয়ই হজরত মহম্মদ (দ.) দেশের একটা অংশ অন্য অংশকে শোষণ করবে এ কথা বলে যান নাই। তিনি তো ইনসাফ করতে বলেছিলেন। শোষক ও শোষিতের মধ্যে সংগ্রাম হয়েই থাকে এবং হবেও। শোষকদের কোনো জাত নাই, ধর্ম নাই। একই ধর্মের বিশ্বাসী লোকদেরও শোষণ করে চলেছে ছলে বলে কৌশলে। প্রেসিডেন্ট আজও ছয় দফা দাবির উপর ইঙ্গিত দিয়েছেন। জনাব সবুর তো প্রকাশ্যভাবেই বলে চলেছেন, পাকিস্তানকে দুই ভাগ করার অভিসন্ধি নাকি ৬ দফার মধ্যে আছে? কোথায় পেলেন? কিভাবে পেলেন? পাকিস্তান এক না থাকলে এই দাবিগুলি আদায় হয় কি করে? এই সমস্ত কথা বলে আর মানুষকে ধোঁকা দেওয়া চলবে না। জনগণ বুঝতে শিখেছে।
৩রা আগস্ট ১৯৬৬ ॥ বুধবার
সকালে দেখতে আসলেন সিভিল সার্জন সাহেব। আমার শরীর ভাল না তাই। শরীর কি ভাল থাকে, একলা থাকলে জেলখানায়? প্রায়ই শরীর খারাপ হয়। আমার স্ত্রীকে কিছুই বলি নাই। কারণ, চিন্তা করে শরীর নষ্ট করবে।
আজ অনেকক্ষণ হাঁটাচলা করলাম। বিকালে চা খেতে বসেছি, দেখি সিকিউরিটি ব্রাঞ্চের সিপাহি সাহেব এসেছে আমাকে জেলগেটে নিতে। ‘দেখা’ এসেছে-জহিরুদ্দিন সাহেব, আবুল সাহেব ও আমার স্ত্রী। ছোট তিনটা বাচ্চাদের নিয়ে এসেছে। মামলা সম্বন্ধে আলোচনা হলো কিছুটা। আইবি অফিসারদের সামনেই আলোচনা করতে হবে। দুইজন ইন্সপেক্টর দিয়েছে। সামনেই বসে থাকে কোনো কিছু আলাপ করার উপায় নাই। কিভাবে মামলা চালাব তাহাই আইবি জানতে চায়। আর আমরা তা বলব কেন? বললাম, নকল (certified copy) নিতে। নকল না দিলে মামলা করব না। বলে দিব, যাহা ইচ্ছা করুক। কাগজপত্র না পেলে মামলা চালাইব কি করে? সালাম সাহেবও আসবেন। শুনলাম অনেক উকিল আসবেন ৮ তারিখে জেল গেটে মামলা করার জন্য। রেণুকে বললাম, কিছু টাকা দিতে নকল নেওয়ার জন্য। ছোট্ট ছেলেটা আমার কানে কানে কথা বলে। একুশ মাস বয়স। বললাম, আমার কানে কানে কথা বললে আইবি নারাজ হবে, ভাববে একুশ মাসের ছেলের সাথে রাজনীতি নিয়ে কানে কানে কথা বলছি। সকলেই হেসে উঠল। এটা রাসেলের একটা খেলা, কানের কাছে মুখ নিয়ে চুপ করে থাকে আর হাসে। আজ আমার কাছ থেকে ফিরে যাবার চায় না। ওর মায়ের কাছে দিয়ে ভিতরে চলে আসলাম। ছোট্ট মেয়েটা রেহানা আমার কাছ থেকে সরতে চায় না, তাই তাকে একটু আদর করলাম। মামলায় যে কি হবে জানি না। তবে সরকারের উৎসাহ একটু বেশি মনে হয়। অনেকগুলি মামলাই তো আছে। জেল থেকে কবে যে বের হতে পারব জানি না। সন্ধ্যার একটু পূর্বে আসলাম, আমার সেই পুরানা বাড়িতে।
বাইরে থেকে তালা বন্ধ করে দিল। একজন সিপাহি আমাকে জিজ্ঞাসা করল, স্যার আপনাকে নাকি আপনার বাবা ত্যাজ্য পুত্র করে দিয়েছে, রাজনীতি করার জন্য আর বারবার জেলখাটার জন্য?’ বললাম, এরকম কথা জীবনে আমি অনেক শুনেছি। আমার বাবা আজও আমাকে যে স্নেহ করেন বোধহয় অনেক পুত্রের কপালেই তা জোটে না জীবনে। আমার আব্বা কখনও আমার সাথে মুখ কালো করে কথা বলেন নাই। এখনও কাছে গেলে ছোট ছেলের মতো আদর করেন। আর কোনোদিন আমাকে কোনো কিছুর জন্য নিরাশ করেন নাই। আমার বাবা কখনও বড়লোক ছিলেন না। অনেক কষ্ট করেছেন, কিন্তু আমার প্রয়োজন তিনি মিটাইয়াছেন। এমনকি আমি জেলে থাকলেও আমার ছেলেমেয়ের দরকার হলে ধান, পাট বিক্রি করে টাকা পাঠাতে কৃপণতা করেন নাই। সিপাহিকে দেখালাম কয়েকদিন পূর্বের চিঠি। তাতে লিখেছেন ‘তাঁর (আমার বাবার) মতো সুখী এ জগতে কয়জন আছে।‘
মনে মনে বললাম, ওরে আমার রাজনীতি, তোমার জন্য জীবনে কত কথাই আমাকে শুনতে হলো। এগার মাস মন্ত্রীত্ব করেছিলাম। ‘চোর’ বলতে কারও বাঁধলো না। আমি নাকি সিনেমা হল করেছিলাম! একজন সিপাহি জিজ্ঞাসা করে বসল, আপনার বলাকা সিনেমা হলটা সরকার নিয়ে গিয়াছিল, ফেরত দেয় নাই, না!’ হাসতে হাসতে উত্তর দিলাম, আমার সিনেমা হল বলাকা, নিশ্চয়ই বলাকা সিনেমার মালিক এ খবর পেলে হার্টফেল করে মারা
যাবে। কারণ বেচারা বহু টাকা খরচ করে ইস্টার্ন ফেডারেল ইস্যুরেন্স কোম্পানীর কাছ থেকে হলটা কিনেছে। আমার একআনা শেয়ারও যদি থাকত তবে আর কষ্ট করতে হতো না। বেচারা অবাক হয়ে চেয়ে রইল আমার দিকে। বলেন কি স্যার, আজও তো অনেকে বলে।’ বললাম, বলতে দিন, ওটা তো আমাদের কিসমত-যাদের জন্য আমি রাজনীতি করি তাদের কেউ কেউ আমাদের বিশ্বাস করে না। অনেকক্ষণ ভাবলাম, এই তো দুনিয়া! জনাব সোহরাওয়ার্দীকে ‘চোর’ বলেছে, হক সাহেবকে ‘চোর’ বলেছে, নেতাজি সুভাষ বসুকে, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনকে এই বাঙালিরা ‘চোর’ বলেছে, দুঃখ করার কি আছে!
