৪ঠা আগস্ট ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
রেণু কিছু খাবার দিয়ে গেছে-কি করে একলা খেতে পারি? কই মাছ খেতে আমি ভালবাসতাম, তাই ভেজে দিয়েছে। কয়েকটা মাছ পাকিয়ে দিয়েছে, মুরগির রোস্ট, এগুলি খাবে কে? কিছু কিছু খেয়ে বিলিয়ে দিলাম কয়েদিদের মধ্যে। তারা কত খুশি এই জিনিস খেয়ে! কেহ বলে, সাত বৎসর কেহ বা পাঁচ বৎসর, কেহ বা তিন বৎসর এই জেলে একঘেয়ে খাওয়া খেয়ে বেঁচে আছে। যখন মিঠা কুমড়া শুরু হয় কয়েক মাস মিঠা কুমড়াই চলে, আবার যখন ক্ষেতে উঁটা জন্মায় আবার শুরু হয়ে কিছুদিন চলে, আবার কিছুদিন পুঁইশাক। ডাল তো আছেই। আমার এক ছাফাইয়া ছিল একটু রসিক, সাত বৎসর জেল হয়েছে, প্রায় পাঁচ বৎসর খেটেছে বলে খালাসের সময় হয়ে এসেছে। বলে, এই রকম মজার খাবার পেলে আর কিছুদিন জেলে থাকতে রাজি আছি? মেট বলে, “পেটে ডালের চর পড়ে গিয়াছিল। বিশ বৎসর সাজা, সাত বৎসর খেটেছি এখন আর ডাল খেতে হয় না।’
আমি যাহা খাই ওদের না দিয়ে খাই না। আমার বাড়িতেও একই নিয়ম। জেলখানায় আমার জন্য কাজ করবে, আমার জন্য পাক করবে, আমার সাথে এক পাক হবে না! আজ নতুন নতুন শিল্পপতিদের ও ব্যবসায়ীদের বাড়িতেও দুই পাক হয়। সাহেবদের জন্য আলাদা, চাকরদের জন্য আলাদা। আমাদের দেশে যখন একচেটিয়া সামন্তবাদ ছিল, তখনও জমিদার তালুকদারদের বাড়িতেও এই ব্যবস্থা ছিল না। আজ যখন সামন্ততন্ত্রের কবরের উপর শিল্প ও বাণিজ্য সভ্যতার সৌধ গড়ে উঠতে শুরু করেছে তখনই এই রকম মানসিক পরিবর্তনও শুরু হয়েছে, সামন্ততন্ত্রের শোষণের চেয়েও এই শোষণ ভয়াবহ।
আমি তো অনেক আরামেই থাকি; কিন্তু সাধারণ কয়েদিদের জীবন তো দুর্বিষহ। কয়েদিরা যেন মেশিন হয়ে গেছে। আমার জন্য যারা কাজ করে তারা ছাড়াও আমার এরিয়ায় যারা কাজ করে তাদের প্রত্যেককেই আমি মাঝে মাঝে কিছু কিছু খেতে দিতে চেষ্টা করি। কিছু কিছু করে জমাই আমার খাবার থেকে, তারপর ডাকাইয়া ওদের মধ্যে বিলি করি। কত আনন্দ দেখি ওদের মুখে। ২৬ সেলে যারা সিকিউরিটি আইনে বন্দি আছেন, বহুদিন ধরেই আছেন। ধীরেন বাবু ওখানে ফুলের বাগান করেন। আমি শুনেছি এত সুন্দর বাগান নাকি ঢাকা শহরেও নাই। ঐ বাগানটা আমি ১৯৬২ সালে শুরু করি, তখন ওখানে টমেটোর বাগান ছিল। কিছুদিন পরে আমি খালাস হয়ে যাই তখন থেকে তাঁহারা ওখানেই আছেন। আমি খবর দিয়েছিলাম কয়েকটা গোলাপ ফুলের চারা দিতে। আজ বিকালে তিনটা লাল গোলাপের চারা পাঠাইয়া দিয়েছেন। আমি লেগে পড়লাম বাগানে, তাড়াতাড়ি গর্ত করে, সার দিয়ে লাগাইয়া দিলাম। এত ইটের টুকরা পরিষ্কার করতে জান শেষ হয়ে যায়। আমার বাগানটাও এখন সুন্দর হয়ে উঠেছে। দেখতে বেশ লাগে। এইত আমার কাজ। বই পড়া ও বাগান করা।
ওকালতনামা আইবির কাছ থেকে সেন্সর হয়ে এসেছে আমার সই নেবার জন্য। দেখলাম, দুইটা ওকালতনামায় না হলেও প্রায় ৪০ জন এডভোকেট দস্তখত করেছেন। জেলগেটে কোর্ট করে বিচার হবে, কি চমৎকার ব্যবস্থা। আমাকে নাকি বাইরের কোর্টে নিলে, ভয়ানক গোলমাল হবে। এতই যদি ভয় হয়, তবে ছেড়ে দেও এবং ৬ দফার দাবি মেনে নেও।
আমি নাকি ভয়ানক প্রকৃতির লোক? আমাকে নাকি জেলগেট থেকে কেড়ে নিবে? তাই চারজন করে বন্দুকধারী সিপাহি রাখা হয়েছে-জেল দরজার কাছে। ইংরেজ আমল থেকে আমার এবার জেলে আসা পর্যন্ত একজন বন্দুকধারী পাহারা থাকত। ইংরেজ আমলে যখন বিপ্লবীরা গুলি চালায়ে সাদা চামড়াদের হত্যা করত তখনও একজন সিপাহি বন্দুক নিয়ে থাকত, এখন। জেল সিপাহি একজন, আর্ম পুলিশ থেকে দুইজন, আর আনছার দুইজন। বন্দুক নিয়ে চব্বিশ ঘণ্টা গেটের কাছে দাঁড়াইয়া পাহারা দেয়। ভয় নাই, ভয় নাই এ রাজনীতি এখনও আমরা করছি না। পালাব না, আর জেলগেট ভাঙতেও কেহ আসবে না।
আজ ডিপুটি জেলার সাহেব একবার এসেছিলেন।
আমার মুড়ি ফুরাইয়া গিয়াছিল, জমাদার সাহেব আজ মুড়ি কিনে দিয়েছেন।
আমার মুড়ি জেলখানায় খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। সিপাহি, জমাদার ও কয়েদিদের মধ্যে থেকে অনেকে পালিয়ে মুড়ি খেতে আসে।
সুপ্রীম সোভিয়েত আলেক্সী কোসিগিনকে দ্বিতীয়বারের জন্য সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করেছে। মি. কোসিগিন অভিযোগ করেছেন, চীন সরকার সোভিয়েট নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাইয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে ব্যাপক সাহায্য করিতেছে। আমার মনে হয় কথাটার মধ্যে কিছুটা সত্য নিহিত আছে। সমাজতান্ত্রিক দেশগুলির বিভেদকে আমেরিকা পুরাপুরি ব্যবহার করতে ছাড়বে না।
৫ই আগস্ট ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
কয়েদিদের ধারণা, আমি ছাড়া পেলে ওদের মুক্তিরও একটা সম্ভাবনা আছে। একজন কয়েদি কিছুদিন পূর্বে ২০ বৎসর সাজা খেটে মুক্তি পেয়েছিল, তিন বৎসরের মধ্যেই আবার ২৫ বছর জেল নিয়ে ফিরে এসেছে। খবর নিয়ে জানলাম, যারা তাকে খুনের মামলায় সাক্ষী দিয়ে জেল দিয়েছিল তারা খুব প্রভাবশালী লোক। কোথায় একটা ডাকাতি ও খুন হলো আর তাকে আসামি করে সাক্ষী দিয়ে আবার সাজা দিয়ে দিয়েছে। শপথ করে বলল, এ ঘটনা সম্বন্ধে সে কিছুই জানে না। বাড়ি যেয়ে বিবাহ করেছিল। ঠিক করেছিল যে কয়দিন বেঁচে আছে, সংসার করবে আর কোনো গোলমালের মধ্যে যাবে না। প্রথম যখন জেলে এসেছিল তখন যে স্ত্রীকে রেখে এসেছিল সে তারই এক চাচাতো ভাইয়ের সাথে পরে বিবাহ বসে। চাচাতো ভাইয়ের ভয় হয়েছে, যদি প্রতিশোধ নেয়। তাই সেও তার বিরুদ্ধে এই ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিল। আর একজন বরিশাল থেকে এসেছে। পূর্বে ২০ বছর জেল খেটে গেছে। এবার ২৫ বছর জেল নিয়ে এসেছে। ৪০-৫০ বছর এমনকি ৭০ বৎসর জেল হয়েছে বিভিন্ন ডাকাতি ও খুন মামলায় এরকম কয়েদিও ঢাকা জেলে আছে। জেল খাটছে, হাসছে, খেলছে। অল্প দুঃখে কাতর, অতি দুঃখে পাথর’, অনেকেই পাথর হয়ে গেছে। মনে করে এই জেলেই তাদের বাড়ি। জীবনে আর যাওয়া হবে না বাইরে। এতদিন জেল খাটলে কি আর বাঁচবে। তবুও আশা করে আর সুযোেগ পাইলেই বলে, স্যার, আপনি নিশ্চয়ই আমাদের ছাড়বেন, আপনি যদি ক্ষমতায় যান-জেল কি জিনিস আপনিই বোঝেন, তাই আমাদের ছেড়ে দিবেন। মনে মনে বললাম, আমাকে এরা ছাড়বে না আর.. তোমাদের আশা এ জীবনে আর পূরণ হবে না।
