পাকিস্তানের ১৯ বৎসরে যা দেখলাম তা ভাবতেও শিহরিয়া উঠতে হয়। যেই ক্ষমতায় আসে সেই মনে করে সে একলাই দেশের কথা চিন্তা করে, আর সকলেই রাষ্ট্রদ্রোহী, দেশদ্রোহী আরও কত কি! মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি রেখে অনেক দেশনেতাকে শেষ করে দিয়েছে। তাদের স্বাস্থ্য নষ্ট করে দিয়েছে, সংসার ধ্বংস হয়ে গেছে। আর কতকাল এই অত্যাচার চলবে কেই বা জানে! এই তো স্বাধীনতা, এই তো মানবাধিকার!
অনেকক্ষণ চিন্তা করলাম বসে বসে। মনে হয়, এ পথ ছেড়ে দেই, এত অত্যাচার নীরবে সহ্য করব কি করে? বিবেক যে দংশন করে। বয়স হয়েছে, শরীর তো খারাপই হতে থাকবে। স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে পারব কি না? মনকে সান্ত্বনা দেই এই কথা ভেবে, আর কতদিনই বা বাঁচব? চলুক না। এই দেশের মানুষের জন্য কিছু যদি নাও করতে পারি, ত্যাগ যে করতে পারলাম এটাই তো শান্তি।
ব্যথাটা অনেক সেরে গেছে। আস্তে আস্তে হাঁটাচলা করতেও আরম্ভ করেছি।
৪. আগস্ট ১৯৬৬
বড় আশ্চর্য লাগছে। মোনায়েম খান সাহেব কিছুদিন একেবারেই চুপচাপ। একটাও হুমকি ছাড়েন নাই, পিন্ডি থেকে এসে। সর্বদলীয় সভা জনাব নূরুল আমীন সাহেবের বাড়িতে হয়েছে। নিম্নতম কর্মসূচির ভিত্তিতে আন্দোলনে আমার আপত্তি থাকার কোনো কারণ নাই। কিন্তু আন্দোলন করার নেতা কেউই নন। ছয় দফা দাবির ভিত্তিতে পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি এবং রাজবন্দিদের মুক্তি, জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার, ইত্তেফাক প্রেস বাজেয়াপ্ত করার আদেশ প্রত্যাহার, কৃষক শ্রমিকদের দাবি-দাওয়ার ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ আন্দোলন হতে পারে। আমার মনে হয়, এনডিএফ নেতারা তাদের সেই গাধা নীতি ধরে বসে আছেন: ‘গণতন্ত্রের দাবি’। আর কোনো দাবির প্রয়োজন নাই, দলও থাকবে না, এক কমান্ড’ বলে বেড়ান। এতে আন্দোলন হয় না, আর দাবি আদায়ও হয় না। ঘরে বসে গুজগুজ রাজনীতি চলে, আর কোনো মতে একটা আপোস করা যায় কিনা সেই ফন্দি। ন্যাপ আলাদের অন্য পথ, সকলের সাথে মিশে কাজ করতে রাজি, তবে তাদের দাবিগুলি নিম্নতম কর্মসূচির মধ্যে গ্রহণ করতে হবে।
এদেশে এসব হবে না। আন্দোলন যে দল করবে, ত্যাগ যে দল করবে, তারাই জনগণের সমর্থন পাবে এবং শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলনের মধ্য দিয়েই দাবি আদায় হবে। আওয়ামী লীগের যারা এখনও জেলের বাইরে আছে তারাই কাজ করে চলুক। দেখা যাক কি হয়। জনসমর্থন ছয় দফার আছে, শুধু নেতৃত্ব দিতে পারলেই হয়। ৭ তারিখে নেতৃত্ব যে ভুল করেছে তা এখানে লেখলাম না।
ভেবেছিলাম এডভোকেট ও আমার স্ত্রীর সাথে সাক্ষাৎ মিলবে, কারণ মামলা আরম্ভ হবে জেলগেটে, ৮ই আগস্ট থেকে। কোর্ট তো জেলগেটেই বসবে। মাত্র ছয়দিন আছে, কখন কাগজপত্র নিবে, নকল নিতে সময় লাগবে কোর্ট থেকে। কোন কোন এডভোকেট থাকবে? এরা বিচারের নামে প্রহসন করতে চায়। মার্শাল ল’ যখন চলছিল তখনও বিচার পেয়েছিলাম, আজকাল জামিনের কথা উঠলেই টেলিফোন বেজে উঠে।
২রা আগস্ট ১৯৬৬ ॥ মঙ্গলবার
মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের সঠিক খবর জানার জন্য খুব ব্যস্ত হয়েছিলাম। এক্স-রে কি পাওয়া গেছে? ডাক্তার সাহেব আমাকে দেখতে আসলেন। জিজ্ঞাসা করলাম, মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের কি অবস্থা? তিনি বললেন, এক্স-রেতে ধরা পড়েছে এখনও তিনি ভুগছেন যক্ষ্মা রোগে। একে জেলে ধরে আনার যে কি অর্থ হতে পারে বুঝি না। এ রকম নিরীহ লোক আমার জীবনে দেখিনি। তিনি অফিসের কাজ করেন। কোনোদিন সভায় বক্তৃতা করেন। নাই। কোথাও পার্টি গঠন করতে যান নাই। অফিসের কাজগুলি দেখতেন এইমাত্র। বোধহয় সরকারের কাছে দরখাস্ত করেছেন তার ভাল চিকিৎসার বন্দোবস্ত করার জন্য, নতুবা মুক্তি দিতে। জানি না কি হবে, তবে তার শরীর যদি আরও খারাপ হয় আর কোনো অঘটন ঘটে তবে সরকারই দায়ী হবে।
আমার কাছেই একজন কয়েদি পাহারা থাকে, নাম ফয়েজ, বাড়ি মানিকগঞ্জ। বাড়ি থেকে তার ললাকেরা দেখা করতে এসে কিছু লেবু দিয়ে গিয়েছিল। সেই লেবুর থেকে চারটা লেবু এনে আমার সেলের কাছে দিয়ে গিয়াছে, বলেছে আমাকে খেতে। আমি ডেকে বললাম, ফয়েজ আমার তো রোজই লেবু আসে। তোমরা খাও। বলে কিনা, স্যার, খুব দুঃখ পাব যদি আপনি না খান। আমার সঙ্গে আর কোনো কথা হলো না। শুধু ভাবলাম, এদের কত বড় মন, থাকলে সবই দিয়ে দিতে পারত। তার বাড়ির থেকে লেবু এসেছে, আমাকেও খেতেই হবে।
পাঁচটা কাগজ রাখি, কোনো সংবাদই নাই। কাগজগুলিকে প্যামফ্রেট করে ফেলেছে। আইয়ুব সাহেবের মাস পহেলা বক্তৃতা ভালভাবে পড়লাম, তবে ভারতের সাথে আলোচনা ও ফয়সালা হতে হলে কাশ্মীরের একটা সন্তোষজনক মীমাংসা হওয়া উচিত। ভালই বলেছেন তিনি। পত্রিকায় লিখেছে : ‘President Ayub Khan said today, without meaningful talks on the problem of Jammu and Kashmir, any treaty between India and Pakistan to resolve basic disputes would be futile.’ আমি ‘meaningful অর্থটা বুঝলাম না। পূর্বেও প্রেসিডেন্ট সাহেবের মুখ থেকে একথা শুনেছি। এর অর্থ কি এই হয় না যে আমাদের আর গণভোটের দাবি নাই। যদি না থাকে, তাহাও পরিষ্কার করে বলা উচিত। ভারতও তার মতের কোনো পরিবর্তন করতে রাজি নয়। গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ভারত, গণতন্ত্রের পথে যেতে রাজি হয় না কেন? কারণ, তারা জানে গণভোটের মাধ্যমে কাশ্মীরের জনগণের মতামত নিলে ভারতের পক্ষে কাশ্মীরের লোক ভোট দিবে না। তাই জুলুম করেই দখল রাখতে হবে।
