২৭শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ বুধবার
ছেলেমেয়েরা চলে যাবার পরই আমাকে একটা নোটিশ দেয়া হলো। নোটিশ পাঠাইয়াছেন, এ আহমদ প্রথম শ্রেণীর ম্যাজিস্ট্রেট-আমার বিচার হবে জেলগেটে। কোর্টে নেওয়া হবে না। এই মামলাটা রমনা থানার ৮০(৪)/৬৬ নম্বরের মামলা। জি. আর, নম্বর ১৮৯৩/৬৬ ইউ. আর, ৪৭ ডিপিআর ১৯৬৫। এই মামলাটা ঢাকায় আমার গ্রেপ্তারের কিছুদিন পূর্বে দায়ের করা হয়েছিল। এই মামলায় আমাকে জেলা জজ বাহাদুর জামিন দিলে আবার রাতে আমার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে সিলেট পাঠাইয়া দেয়। ডিপিআর-এ গ্রেপ্তার করে অনির্দিষ্টকালের জন্য বিনাবিচারে বন্দি করে রেখেও এদের শান্তি নাই। অত্যাচারেরও একটা সীমা থাকে! আটটা মামলা সমানে আমার বিরুদ্ধে দায়ের করেছে। একজন লোকেরই এই বুদ্ধি। তিনি পূর্ব পাকিস্তানের পিছন দরজার রাজনীতিতে যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। এই সকল নীচতা দেখে মনটা আমার বিষিয়ে ওঠে। যে জাতের ভিতর এইরকম নীচ প্রকৃতির লোক জন্ম নিতে পারে, তাদের মুক্তি কি কোনোদিন আশা করা যায়!
নোটিশটা আর ২০/২৫ মিনিট পূর্বে পেলে সুবিধা হতো। আমার স্ত্রীর কাছে বলে দিতে পারতাম জহিরুদ্দিন ও অন্যান্য উকিল সাহেবদের আসতে। কাগজপত্র, নকল কত কি প্রয়োজন। এমনি আইবি আজকাল খুবই কৃপণতা করে, দেখা করতে অনুমতি দিতে। মনে করে, জেলে বসে রাজনীতি করি। তাদের বোঝা উচিত আমরা ও ধরনের রাজনীতি করি না। তাহলে তো প্রকাশ্যে ৬ দফার কথা না বলে গোপনে গোপনে কাজ করে যেতাম। আমি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। যদি ঐ পথে কাজ করতে না পারি ছেড়ে দিব রাজনীতি। প্রয়োজন কি! আমরা একলা দেশসেবার মনোপলি নেই নাই। যারা সন্ত্রাসবাদীতে বিশ্বাস করে তারাই একমাত্র রাজনীতি করবে, মাটির তলা থেকে ধাক্কা দেবে সুযোগ পেলেই। আমার কি আসে যায়? বহুদিন রাজনীতি করলাম। এখন ছেলেমেয়ে নিয়ে আরাম করব। তবে সরকার যেভাবে জুলুম চালাচ্ছে তাতে রাজনীতি কোনদিকে মোড় নেয় বোঝা কষ্টকর।
আজ দিনভরে শুয়েই কাটালাম বেশি। নিজের জন্য আমার বেশি ভাবনা নেই। শুধু দুঃখ হয় এদের অত্যাচারের ধরনটা দেখে। আমার উপর এতো অত্যাচার না করে ফাঁসি দিয়ে মেরে ফেললে সব ল্যাঠা মিটে যেত। শুনলাম, আমার বিরুদ্ধে চট্টগ্রাম, সিলেট, ময়মনসিংহ, ঢাকা সব জায়গাতেই মামলা দায়ের করছে। আমি একা এত মামলা সামলাব কেমন করে? আমি ভাসাইয়া দিয়াছি নিজেকে যাহা হবার হবে। খোদাই আমাকে রক্ষা করেছে জালেমদের হাত থেকে, আর ভবিষ্যতেও করবে।
২৮শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ বৃহস্পতিবার
ভীষণভাবে ব্যাথা শুরু হয়েছে, পিঠ থেকে কোমর পর্যন্ত। বুঝতে পারলাম না, কেন এই ব্যথা। বসতেই পারি না। শুয়ে থাকলে একটু আরাম লাগে। হাঁটতে পারি। হাঁটলে বেশি ব্যথা লাগে না, তবে সোজাভাবে হাঁটতে হয়। দিনভরই শুয়ে থাকতে হয়। সরিষার তেল গরম করে মালিশ করালাম দুইবার। রফিক ছাফাইয়াটা মালিশ ভাল করে। রাতে ঘুমাতে পারি নাই।
২৯শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
সারাদিন ব্যথায় কাতর। ডাক্তার ক্যাপ্টেন সামাদ সাহেব এলেন আমাকে দেখতে। খাবার ঔষধ দিলেন, আরও দিলেন মালিশ। বিছানায় পড়ে রইলাম। সন্ধ্যার দিকে কষ্ট করে বের হয়ে বাগানের ভেতর আরাম কেদারায় কিছু সময় বসে আবার শুয়ে পড়লাম। খুবই কষ্ট পেতেছি।
৩০শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ শনিবার
আজ সিভিল সার্জন সাহেব এলেন, ঔষধও দিলেন। ব্যথা একটু কমেছে তবে উঠতে বসতে কষ্ট হয়। সারাদিন তো একলাই আমাকে থাকতে হয়। তারপর আবার শরীর খারাপ। বিকালে বাইরে বসে আছি, দেখি আমাদের অফিস সেক্রেটারি এডভোকেট মোহাম্মদউল্লাহকে নিয়ে চলেছে পুরানা ২০ সেলের এক নম্বর ব্লকে। আমি যেখানে থাকি তার সামনে দিয়েই রাস্তা। জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছে? বুঝতে আমার বাকি রইল না। মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের ১৯৫৫ সালে একবার যক্ষ্মা হয়ে মহাখালী টিবি হাসপাতালে ছিলেন প্রায় ৭/৮ মাস। চিকিৎসা করে ভাল হয়েছিলেন। বোধহয় আবার আক্রান্ত হয়ে পড়েছেন। এক্স-রে করতে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে তাকে নেওয়া হয়েছিল। রিপোর্ট বোধহয় খারাপ। তাই তাকে ১০ সেল থেকে টিবি ওয়ার্ডে নিয়ে এসেছে। জেলখানার টিবি ওয়ার্ড মানে সেল। ভাল লোকের মাথা খারাপ হয়ে যায় সেলে থাকলে। আর অসুস্থ মানুষের কি হবে সহজেই বুঝতে পারা যায়। কথা বলতে না পারলেও দেখতে পারব, খোঁজখবর নিতে পারব। মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের আর্থিক অবস্থা আমার জানা আছে। মহাখালী হাসপাতালে কেবিন নিয়ে থাকতে বহু খরচ। তারপর আবার বাড়ির খরচ। জানি না সরকার মুক্তি দিবে কিনা তাকে! দিন কেটে যায়, আর যাবেও। কোনো কাজেই লাগছি না।
৩১শে জুলাই ১৯৬৬ ॥ রবিবার
সোনার খাঁচায়ও পাখি থাকতে চায় না। বন্দি জীবন পশুপাখিও মানতে চায় না। আমরা মানুষ, আমাদের মানতে কি ইচ্ছা হয়! মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবের কথা ভাবতে ভাবতে অনেক কথা আজ মনে পড়ল। যুগে যুগে যারা আদর্শের জন্য জীবন দিয়েছে তারা নিশ্চয়ই ক্ষমতা দখলের জন্য করে নাই। একটা নীতি ও আদর্শের জন্যই ত্যাগ স্বীকার করে গেছে। কত মায়ের বুক খালি হয়েছে, কত বোনকে বিধবা করেছে, কত লোককে হত্যা করা হয়েছে, কত সংসার ধ্বংস হয়েছে। কারণ তো নিশ্চয়ই আছে, যারা এই অত্যাচার করে তারা কিন্তু নিজ স্বার্থের বা গোষ্ঠী স্বার্থের জন্যই করে থাকে। সকলেই তো জানে একদিন মরতে হবে। তবুও মানুষ অন্ধ হয়ে যায় স্বার্থের জন্য। হিতাহিত জ্ঞান থাকে না। পরের ছেলেকে যখন হত্যা করে, নিজের ছেলের কথাটি মনে পড়ে না। মানুষ জাতি স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়।
