ডিআইজি সাহেব খুব ধর্মভীরু, বেশি সময় তিনিই বলেন, আমি শুনি। মাঝে মাঝে দুই এক কথা আমি বলি।
১৫ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ শুক্রবার
কি ব্যাপার, আমি যে ঘরে থাকি তা মাপামাপি করছে কেন? চল্লিশ ফুট লম্বা, চারফুট চওড়া, কয়টা জানালা, কয়টা দরজা সব কিছু লিখে নিতেছে জমাদার সাহেব। বললাম, ব্যাপার কি? সরকার জানতে চেয়েছে? আরও একটু লিখে নেন না কেন, দক্ষিণ দিকে ছয়টা জানলা, কিন্তু তার এক হাত দূরে চৌদ্দ ফুট উঁচু দেওয়াল, বাতাস শত চেষ্টা করেও ঢুকতে পারে না আমার ঘরে। জানলা নিচে, দেওয়াল খুব উঁচু। উত্তর হলো, ও সব লেখা চলবে না। লেখুন না আর একটু-দেওয়ালের অন্য দিকে গরুর ঘর, পূর্বদিকে পনের ফিট দেওয়াল ও নূতন বিশ। ভয়ানক প্রকৃতির লোক-যারা জেল ভেঙে দুই একবার পালাইয়াছে তাদের রেখেছিল এখানে। আর উত্তর দিকে ৪০ সেল, সেখানে ৪০ পাগলকে রেখেছে। আর পশ্চিম দিকে একটু দূরেই ৬ সেল ও ৭ সেল, যেখানে সরকার একরারী আসামি রেখেছেন। আর এরই মধ্যে শেখ সাহেব’। তিনি বললেন ‘ও বাত হামলোক নেহী লেখতে ছাকতা হায়, নকরি নেহি রহে গা।
আধা ঘণ্টা পর দেখি সিভিল সার্জন সাহেব জেল ডাক্তার নিয়ে এসেছেন। আমার কি কি রোগ হয়েছে দেখার জন্য। বললাম, ভালই আছি। পাইলস হয়েছে, কিছু কষ্ট দেয়। পেটটা মাঝে মাঝে খারাপ হয়। আমাশা আছে। ঘুম একটু কম হয়। বসে থেকে মোটা হয়ে নিষ্কর্মা হয়ে যাবো আর কি! ওজন দেখলেন। ভাঙা একটা মেশিনে, সাত পাউন্ড নাকি বেড়েছে। ভালই, ভুড়ি হতে আর বেশি দেরি হবে না। যাহোক ভদ্রলোক চলে গেলেন।
ভাবলাম সরকারও বোধ হয় আমার স্বাস্থ্যের জন্য উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছিল। অথবা হাইকোর্টে বলতে হবে যে, দেখ কি ভালভাবে শেখ সাহেব’কে রেখেছি আমরা। কোনো কষ্ট দিচ্ছি না। আমাকে যে একলা এক জায়গায় কারও সাথে কথা বলতে বা দেখা করতে দেওয়া হয় না, সে কথা বোধ হয় চাপা দিবারই চেষ্টা করবেন। আজকালকার দিনে সত্য কথা একটু কমই বলা হয়। ওটা নাকি, নয়া ডিকটেটোরিয়াল রাষ্ট্রবিজ্ঞান।
আজ সকালে আওয়ামী লীগের অফিস সেক্রেটারি মোহাম্মদউল্লাহ এডভোকেট সাহেবকে গ্রেপ্তার করে এনেছে।১০ সেলেই রেখেছে। দ্রলোক শুধু অফিসের কাজকর্ম দেখেন। কোনোদিন জীবনে একটা বক্তৃতাও করেন নাই, কোনো সভা সমিতিতে বেশি যেতেন না, কোনোদিন মফস্বলে যান নাই, সভা করতে। আজ ১৫ বৎসর নীরবে অফিসের কাজকর্ম করে থাকেন। মোহাম্মদউল্লাহ সাহেবকে যখন গ্রেপ্তার করেছে তখন আওয়ামী লীগের কাহাকেও আর বাইরে রাখবে না। মোহাম্মদ উল্লাহ সাহেবের ছেলেমেয়েদের খুব কষ্ট হবে, কারণ অর্থাভাব কিছুটা আছে, উপার্জন না করলে চলে না। বড় নিরীহ ভদ্রলোক, কোনোদিন কিছু দাবি করে নাই। একবার জাতীয় পরিষদের সদস্য পদের জন্য নমিনেশন দেওয়া হয়েছিল মাত্র ১২ ভোটে পরাজিত হয়। কয়েক বৎসর পূর্বে যক্ষা রোগে ভুগে, ভাল হয়ে গিয়েছিলেন। জেলে এসে আবার আক্রান্ত না হয়। একই কারাগারে থেকেও আমার সাথে দেখা হওয়ার উপায় নাই।
আজ দূর থেকে তিনজনের মুখ দেখলাম হাসপাতালে। হাফেজ মুছা, শাহাবুদ্দিন চৌধুরী ও রাশেদ মোশাররফ হাসপাতালে এসেছে অসুস্থ হয়ে। আমার এখান থেকে হাসপাতালের দোতালায় দাঁড়ালে চেহারাটা দেখা যায়। তবে অনেক দূর, চিৎকার করে বললেও কথা শুনবে না।
১৬ই জুলাই ১৯৬৬ ॥ শনিবার
১৯৬৬-৬৭ সালের নয়া আমদানী নীতি পড়লাম, বোঝা গেল প্রতিযোগিতায় ক্ষুদ্র আমদানিকারকগণ টিকে থাকতে পারবে না। পূর্ব পাকিস্তানিরা যাও দুই একজন কিছু কিছু আমদানি করত, তারাও শেষ হয়ে যেতে বাধ্য হবে।
বৃহৎ ব্যবসায়ী গ্রুপ অবাধ আমদানি নীতির এই সুযোগে তাদের প্রতিষ্ঠিত ব্যাংকসমূহের সহায়তায় যথেষ্ট পরিমাণ আমদানী করে বাজার থেকে ক্ষুদ্র আমদানিকারকগণকে বিতাড়িত করতে সক্ষম হবে। একচেটিয়া পুঁজিবাদী সৃষ্টি করার আর একটা পরিকল্পনা করা হয়েছে। পূর্ব বাংলার ক্ষুদ্র শিল্পপতিরাও এবার চরম আঘাত খেতে বাধ্য হবে। কারণ বোনাস ভাউচার দিয়ে আমদানি করে পশ্চিম পাকিস্তানি শিল্পপতিদের সাথে প্রতিযোগিতায় না পেরে তাদের কাছেই বিক্রি করতে বাধ্য হবে তাদের শিল্পগুলি। জেলের মধ্যে বসে একথা চিন্তা করে লাভ কি? যার সারাটা শরীরে ঘা, তার আবার ব্যথা কিসের! গোলামের জাত গোলামি কর। আমি কারাগারে আমার বন্ধু-বান্ধব নিয়ে আরামেই আছি! ভয় নাই, মাহমুদ আলি, জাকির হোসেন, মোনায়েম খান, আবদুস সবুর খান, মহম্মদ আলী এরকম অনেকেই বাংলার মাটিতে পূর্বেও জন্মেছে, ভবিষ্যতেও জন্মাবে।
দুপুর বেলা কাগজ পড়ছি। হঠাৎ হৈ চৈ করছে কয়েদিরা। কান খাড়া করে শুনলাম। কোর্টের ভিতর ঢাকা গ্যাং ডাকাতি মামলার ১০০ জনের মতো আসামির উপর ঘর বন্ধ করে টিয়ার গ্যাস মেরেছে। কয়েকজনের অবস্থা ভাল। জেলগেট থেকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়াছে। আমার কাছেই আসামী একজন থাকে। তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, কি হয়েছিল? সে কোর্ট থেকে এসেছে। বলল, সাত-আট বৎসর আমরা হাজতে। বিচার হয় না। মাঝে মাঝে কোর্টে নিয়ে যায়, আর ফিরিয়ে আনে। সিআইডিরা ইচ্ছা করেই দেরি করায়। একরারীদের উপর নির্ভর করে এই মামলা। তারা ইচ্ছামত কোর্টে যায়। আবার ইচ্ছা হলো না, সিআইডির পরামর্শে অসুস্থ হয়ে পড়ে। সাত-আট বৎসর হাজতে। আমাদের কি আর আছে! বাড়ি ঘর আত্মীয় পরিজন কিছুই তো নাই। যারা ছিল, না খেয়ে মরে গেছে বা কোথাও ভিক্ষা করে খেতেছে। আসামীদের পক্ষ থেকে হাকিমকে জানালো, স্যার আমাদের বিচার করুন। এখনও নিম কোর্টে, এরপর হবে জজকোর্টে। কারণ ডাকাতি ও খুনী মামলার আসামিই বেশি। গ্যাং কেস আন্তঃজেলা মামলা।
